অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল বনাম আঁতেল -৮


অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল বনাম আঁতেল ||পর্ব--৮

স ন্দী প  কা ঞ্জি লা ল

বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ 


বুদ্ধিজীবী বলতে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটকালে বৌদ্ধিক পরামর্শদানের মাধ্যমে যথার্থ দিক নির্দেশকারী পণ্ডিত। অর্থাৎ সমাজে ও রাষ্ট্রে যখন কোনো সমস্যা বা সংকট দেখা দেবে, তখন তার সমস্যা সমাধানে যাঁরা এগিয়ে আসবেন তাঁরাই বুদ্ধিজীবী! দার্শনিক প্লেটোর মতে মানুষকে তিনভাগে ভাগ করা হয়- (১) প্রজ্ঞা (২) সাহসী (৩) প্রবৃত্তি। এই প্রজ্ঞা বিশিষ্ট দার্শনিকরা বুদ্ধিজীবী। 
বুদ্ধিজীবীর পরিচয় দিতে গিয়ে দার্শনিক 'গ্রামশি' বলেন, "যিনি জ্ঞানচর্চা করেন তিনি বুদ্ধিজীবী! সব মানুষই বুদ্ধিজীবী কিন্তু সবাই সমাজে বুদ্ধিজীবীর কাজ করে না। বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি জাতীয়তাবাদ ও কর্পোরেট বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন।" অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি জনগণের প্রতি জনগণের জন্য সোচ্চার। এ সকল ব্যক্তি সরকারি কিংবা অন্য কোনো সুবিধালাভের আশা করেন না। এদের প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, তারা কঠিন পরিস্থিতির শিকার হন। এমনকি তাদের প্রাণ সংশয় পর্যন্ত ঘটে থাকে। যেমন 'জিওর্দানো ব্রুণো', 'কালবুর্গি', 'গৌরি লঙ্কেশ', 'দাভেলকর', ও অন্যান্যরা। কিন্তু শাসক গোষ্ঠী বা বিরোধী গোষ্ঠী মনে রাখে না, ধনীদের মেরে যেমন গরীবকে ধনী করা যায় না, তেমনি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে সমাজের উন্নতি করা যায় না। যারা এই সমস্ত কাজ করেন তারা প্রকৃতপক্ষে সমাজের ও মানবসভ্যতার শত্রু। 
আর এই পৃথিবীতে, যে মানুষ নিজের স্বার্থ হাসিল, বস্তুগত লাভ, নিজের ক্যারিয়ার, শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা বুদ্ধি থাকলেও সাধারণ মানুষ। বুদ্ধিজীবীরা সাধারণ মানুষ থেকে সাহসী বলে নয়, তারা তাদের থেকে বেশি সাহস দেখায় বলে তারা সমাজে বুদ্ধিজীবী! ইংরেজ লেখক 'সমারসেট মম' বলেছিলেন, "ঈশ্বর যদি মানুষ সৃষ্টি করে থাকেন তো মানুষের মধ্যে এ-গুণের সম্মুখীন হলে, স্বয়ং ঈশ্বরকেই লজ্জায় মুখ লুকোতে হবে।" এক কথায় বলা যেতে পারে বুদ্ধিজীবীরা এক দুর্লভ গুণের অধিকারী!  সাধারণ মানুষ যেখানে পৃথিবীকে বাণিজ্যক্ষেত্র বলে ভাবে প্রকৃত বুদ্ধিজীবী ভাবে এটা প্রেমের জায়গা ভালোলাগার জায়গা। ব্যবসায়ীর লক্ষ্য সর্বাধিক মুনাফা! অল্পমূল্যের বস্তুর বিনিময়ে বেশি গ্রহণ করে। আর প্রকৃত বুদ্ধিজীবী অল্প নেয় বৃহত্তম পরিমাণে ফিরিয়ে দেয়। অধিক দান এবং সামান্য গ্রহণ করা। সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত প্রয়োজন সাধনের জন্য পৃথিবীকে ব্যবহার করে। তাই তাদের সম্পর্ক কখনোই পৃথিবীর সাথে দীর্ঘস্থায়ী হয় না, কারণ তাদের প্রয়োজন শারীরিক ও আবেগজনিত। আর বুদ্ধিজীবীর সম্পর্ক পৃথিবীর সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক! তাই তাদের সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী! চিরকাল পৃথিবী তাদের মনে রাখে। 
কথিত আছে রামকৃষ্ণ পরমহংস ভারত বিখ্যাত বৈদান্তিক তোতাপুরীর জগতের প্রতি পরম নিরাসক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ঠিক, তেমনই মনে মনে বিচলিত বোধও করেছিলেন। মানুষের জগতে বাস করে, তার সুখ দুঃখের সাক্ষী হয়েও এমন নির্লিপ্ত ভাব দেখে তার মনপ্রাণ কেঁদে উঠেছিল। নিজের ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী একটা পথ তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন। তোতাপুরীর মতো  মহাত্মাকেও তিনি অনুসরণ করতে পারেননি। 
সাধারণ মানুষ নিজের এবং পরিবারের উন্নতির জন্য সর্বদা চিন্তা করে। কি করে আরো বেশি সুখ বেশি সমৃদ্ধি পাওয়া যায়।  তাই নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে ক্লান্ত বোধ করে। এদিকে পৃথিবী সবার কথা ভাবতে ভাবতে সে ও তখন ক্লান্ত। পৃথিবী ক্লান্ত, সেই সাধারণ মানুষও ক্লান্ত। নিজেদের নিয়ে ক্লান্ত দুজন একত্রিত হলে পরস্পরকে ক্লান্ত করে তোলে। তাই সাধারণ বৈষয়িক মানুষ পৃথিবীকে শুধু ক্লান্ত করে আর কিচ্ছু দেয় না। সাধারণ মানুষ পৃথিবীর কাছে চায় সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য! যে গ্রহীতা সে দুর্বল! আর এই দুর্বলতা থেকে জন্ম নেয় নেতিবাচক মনোভাব। দাবি বা চাহিদা ভালোবাসাকে নষ্ট করে, প্রকৃত প্রেম কোনো দাবি করে না। প্রেম দাবি দাওয়া সহ্য ও করে না। যখন মানুষ প্রেমে পড়ে, প্রেমিক হাজারবার তার প্রেমিকাকে বলে, "আমি তোমাকে এত ভালোবাসি, তুমি এত সুন্দর"। আসলে তখন প্রেমিকরা আত্মহারা হয়ে যায়। যখন সত্যি কেউ প্রেম পূর্ণ হয়, সে যে কি বলে আর কি করে অনেক কিছুই সে নিজেও বুঝতে পারে না। তাই সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী মানুষ দেশকে এতটাই ভালোবাসে, তারা কি করছে নিজেও জানে না। এমনকি নিজের জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে না। যেমন- নেতাজী, বিবেকানন্দ, গ্রামশি আরও অনেকে। 
প্রকৃত বুদ্ধিজীবীরা মনে করে, সমাধানহীন কোনো সমস্যাই পৃথিবীতে নেই। তারা মনে করেন সমস্যা মানে, আমার ভিতরে কতটা ক্ষমতা তা যাচাই করে নেওয়ার উপযুক্ত সময়। কতটা আমি আমার উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও নিজস্বতা প্রকাশ করতে পারি তা দেখে নেওয়া যাবে। সমস্যাই তো আমাদের নিষ্ক্রিয় মন ও বুদ্ধিকে কর্মক্ষম করে তোলে। 
আর যাদের জীবনে সমস্যা  থাকে না তাদের জীবন জন্তু জানোয়ারের মতো খায় দায় আর ঘুমায়। সাধারণ মানুষ আশা করে মসৃণ জীবন। যেন কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকে। তাই তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ সমস্যা সমাধানের কথা চিন্তা না করে, সমস্যার মন্দ দিকগুলো আগে ভাবতে থাকে। তাতে সমস্যা সমাধান না হয়ে আরোও বড় হয়ে যায়। মগজের সঠিক ব্যবহার করতে তারা অপারগ। 
জীবনের নানা ধরনের ঘটনা থাকা দরকার! তাহলেই জীবন বেশি উপভোগ্য হয়। মনে করি, একটি নাটকে সবাই জ্ঞানী লোক। তার ফলে নাটক একঘেঁয়েমি লাগবে। কোনো সংঘাত তৈরি হবে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ঘটনা ঘটবে না। তাহলে সে নাটকে কোনো মজা থাকবে না। আর সে কাহিনী চিত্তাকর্ষক হবে না। বেশি দর্শক  দেখতে চাইবে না। তাই বুদ্ধিজীবীদের জীবন উপভোগ্য জীবন। সমুদ্রের জীবন। আর সাধারণ মানুষের জীবন? পচাডোবা তরঙ্গহীন! যার ভেতরে বাস করে শোল, কই, মাগুর সব কৌশলবাজ মাছ! তাই সাধারণ মানুষকে যতটা সহজ সরল ভাবি ঠিক ততটা নয়! তারা ফন্দি ফিকিরে ওস্তাদ! প্রকৃত বুদ্ধিজীবী যিনি, তিনি সৎ ও শক্তিমান, সহৃদয় ও নির্মল এবং মানুষের চরিত্র সম্পর্কে তার স্বতঃস্ফূর্ততা। যে কারণে 'নীটশে' তার গুরু সহকর্মী 'বুকহার্ট' কে লিখেছিলেন, "প্রিয় অধ্যাপক, ভগবান হওয়ার চাইতে বাসেলে অধ্যাপকের পদ লাভ বেশি কাম্য বটে, কিন্তু সেই লোভনীয় পদের জন্য নতুন জগৎ সৃষ্টির দায়িত্ব ত্যাগ করবো এতটা আত্মকেন্দ্রিক আমি নই"। পরিবর্তনকে স্বীকার করে নেওয়ার দায়িত্ব অধিকাংশ সাধারণ মানুষের নেই। তাই আত্মরক্ষার জন্য তারা আশ্রয় নেয় ধর্মে, প্রতিষ্ঠানে, সুনিয়ন্ত্রিত ধ্যানধারণায়। তাদের কাছে সত্যের চাইতে নিরাপত্তা অনেক বেশি কাম্য। নিয়ত পরিবর্তনীয় জগতে কোনো স্থায়ী সম্পর্ক যে হতে পারে না, এটা তাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরা বা ছেড়ে না দেবার নামই ভয়। এই ভয়ে সাধারণ মানুষ ভীত! এমনকি মৃত্যুকে পর্যন্ত তারা ভীষণ ভয় করে। বিছানায় শুয়ে গু-মুত ঘেঁটেও বাঁচতে চায়। আর বুদ্ধিজীবীরা মরতে ভয় পায় না, শুধু বার্ধক্যকে ভয় পায়।
গীতাতে শ্রী কৃষ্ণ অর্জুন কে বলেছেন, " সক্তাঃ কর্মণ্যবিদ্বাংসো যথা কুর্বন্তি ভারত।/ কুর্যাদ্ বিদ্বাংস্তথাসক্তশ্চিকীর্যুর্লোকসংগ্রহম্"।। (কর্মযোগ ২৫নং শ্লোক) অর্থাৎ অজ্ঞানীরা যেমন কর্মফলের প্রতি আসক্ত হয়ে তাদের কর্তব্য কর্ম করে, তেমনই জ্ঞানীরা অনাসক্ত হয়ে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য কর্ম করেন। সাধারণ মানুষেরা কর্মফলের হিসাব কষে কর্ম করে, তাই তারা অন্ধের মতো ঘুরে বেড়ায়। 
একবার এক উট ব্যবসায়ী বেশ কিছু উট নিয়ে বাজারে যাচ্ছিল বিক্রি করার জন্য। দু তিনদিনের পথ। রাত্রে বিশ্রাম নেবার জন্য সরাইখানায় এলে, সব উট বাঁধার দড়ি আছে, কিন্তু একটি উটের নেই। ব্যবসায়ী বিপদে পড়লো। তখন ওখানে একজন ফকির ছিল। ফকির  তাকে বললো, আপনি উটটিকে দড়ি দিয়ে বাঁধছেন বলে, ওর গলায় হাত ঘোরান। দেখবেন ও ঠিক বাঁধা পড়েছে ভেবে, চুপচাপ শুয়ে থাকবে। ব্যবসায়ী তাই করলো। সত্যি সত্যি উটটিও শুয়ে আরামে জাবর কাটতে লাগলো। পরদিন সকালে দড়ি বাঁধা সব উটকে গলা থেকে দড়ি খুলতেই তারা উঠে দাঁড়ালো।কিন্তু ঐ উটটি উঠে দাঁড়াচ্ছে না! যাকে বাঁধার অভিনয় করে বাঁধা হয়েছে। লাঠি দিয়ে মারলো ব্যবসায়ী। তবু উঠছে না!  ব্যবসায়ী ফকিরের কাছে আবার এলো। ফকির বলল, আরে মশাই যেমন বাঁধার  অভিনয় করেছিলেন, তেমনি খোলার অভিনয় করুন, দেখবেন উঠে দাঁড়াবে। ব্যবসায়ী তাই করতে উটটি অমনি উঠে দাঁড়ালো। তেমনি সাধারণ মানুষ এইরূপ মনের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের কাজ হল,সাধারণ মানুষকে এই অদৃশ্য বাঁধন থেকে মুক্ত করা।কারণ  বুদ্ধিজীবীরা মুক্ত পুরুষ।

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল