হারিয়ে যাওয়া ঝিঁঝি পোকা / পর্ব - ৬


হারিয়ে যাওয়া ঝিঁঝি পোকা || পর্ব ৬

গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ

আমার মন  ভুলায় রে।

এই যে এতক্ষণ এক গ্রামের কথা বললাম সে গ্রামের নাম পতঙ্গপুর। ঘন জঙ্গল ঘেরা এ গ্রাম বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মোটামুটি ১৯৬০-৬২এর  বিবরণ এটি। তার আগের বিবরণ শুনেছি বাবা ঠাকুমার মুখে। সে বিবরণ আরও ত্রিশ বছরের আগের। শুনতে শুনতে হা করে তাকিয়ে থাকতাম বিস্ময় চোখে, যেমনটি আমার ছেলেমেয়েরাও তাদের ছেলেবেলায় তাকিয়ে থাকত আমার দেখা গ্রামের বিবরণী শুনে। 
সেদিনের গ্রামীণ অবস্থা  ও চালচিত্রের সাথে আজকের অবস্থা যদি মিলিয়ে দেখা হয় তবে এই প্রজন্ম অবাক হয়ে যাবে, কী ছিলাম আর কী হয়েছি এই তফাৎ দেখে।  জঙ্গলমহলের এক প্রত্যন্ত গ্রাম এই পতঙ্গপুর। আমার জন্মস্থান, আদি নিবাস। কৃষিভিত্তিক আয় দিয়ে সংসার চলত। উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা বা বাজারের (বেচা কেনার জন্য) প্রয়োজনে গ্রাম থেকে শহরে মানুষ যাতায়াত করত। যাব বললেই তো যাওয়ার জন্য ঘরে ঘরে মোটর সাইকেল, স্কুটার, কার বাস- ট্যাক্সি ছিল না। তাছাড়া ছিল না পাকা রাস্তাও। রাঙামাটির পথ ধরে যাওয়া। বাবা বলতেন তার সময়ে ঘন জঙ্গলে বাঘ ভালুক হায়না শিয়াল নেকড়ে যত্রতত্র। আজ অবশ্য একটা শিয়াল দেখতে যেতে  হয় চিড়িয়াখানায়। তখন আমি নিজেও বাঘের হাত থেকে একবার বেঁচে ফিরেছি। কাকা ফিরেছেন প্রাণ হাতে। গল্প মনে হতে পারে। ছেলেবেলায় বাবা আমাদের শোনাতেন কীভাবে বাবাকে হায়নাতে ভয় দেখাতো চোখ নাচিয়ে। মোল (মহুয়া) গাছের নিচে বাবা কীভাবে কতবার ভালুকের হাত থেকে বেঁচে  ফিরেছেন শুনতাম। দাদুর  প্রিয় একটা গাই বাছুরের জন্ম দিলেই নেকড়েবাঘ গোয়াল থেকে বাছুর কীভাবে টেনে নিয়ে যেত সে গল্প শোনাতেন ঠাকুমা। গা ছমছম করা সে সব বিবরণ আমাদের কাছে গল্প মনে হত।  চাষের জমি থাকলেও সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকায় দূরদর্শী বাবা ভেবেছিলেন গ্রামে অন্ন সংকুলান পরে সম্ভব হবে না। তাই আমাদের শহরমুখি হতে হল। গ্রাম থেকে শৈশবেই এলাম বিষ্ণুপুরে। বাঁকুড়ার মহকুমা শহর, একদা মল্লরাজাদের রাজধানী। কিন্তু ঠাকুমা যাকে গ্রামীণ ভাষায় আমরা কত্তামা বলতাম তিনি কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন। তিনি চান আমাদের নিয়ে তাঁর সাথেই গ্রামে থাকতে হবে। দাদু কত্তামা আর বাবার মধ্যে ত্রিপাক্ষিক সমঝোতা করলেন। সমঝোতা অনুযায়ী আমাদের বিষ্ণুপুর যাওয়া মঞ্জুর হল। তবে মাঝে মাঝে নাতি নাতনিদের পতঙ্গপুরের দেশের গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে হবে, এই ছিল ঠাকুমার নিদান। সেই রায়ও মানা হল। কিন্তু যাব বললেই তো যাওয়া যাবে না। সদলবলে যাবার একমাত্র  বাহন গরুর গাড়ি। রাস্তায় বাঘ ভালুক চোর ডাকাতের ভয়। দাদুর একটি লেঠেল ছিল। তাঁর নাম তিতা খয়রা। সে আমাদের সাথে থাকত। 
দিনের বেলায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা গরুর গাড়িতে যেতে বাঁধের জলে চপ মুড়ি খাবার সময় নিয়ে  আমাদের  প্রায় ঘণ্টা তিন লাগত যেতে। শহর থেকে গ্রামে গিয়েই বনে জঙ্গলে ঘুরতাম, বাঁধে সাঁতার কাটতাম, গাছে উঠে আম, জাম, খেজুর পাড়তাম। খেলার মধ্যে ছিল কুমিরের জলে নামা খেলা, কুক নুকানি (লুকোচুরি) খেলা, লাউ কাটাকাটি, এক্কা দোক্কা, লাটিম, মারবেল, ডাং গুলি, সিগারেট খাপের তাস, ফুটবল, কিতকিত (হাডুডু) প্রভৃতি। হারিয়ে যেতাম প্রকৃতির কোলে।

----

Comments

  1. অসাধারণ যেন ছেলে বেলা ভেসে উঠছে
    চোখের সামনে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল