উপন্যাসের আয়নায় -৩


উপন্যাসের আয়নায় পর্ব -৩   

প্র শা ন্ত  ভৌ মি ক 

হুমায়ূন আহমেদ : যুক্তিবাদী মিসির আলি

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র মিসির আলি। হিমু যেমন যুক্তিহীনভাবে সব ব্যাপার দেখে, মিসির আলি ঠিক তার উল্টো। প্রতিটি ব্যাপারকেই যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন তিনি। মিসির আলির মতে, পৃথিবীতে যুক্তি ছাড়া কোন কিছু ঘটতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট মিসির আলি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। 
মিসির আলি সিরিজের প্রথম বই 'দেবী' প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। শেষ বই 'যখন নামিবে আঁধার' প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এই সাতাশ বছরের পথ পরিক্রমায় মিসির আলি বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনাকে যুক্তি দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। মিসির আলি ছিলেন প্যারানরমাল সাইকোলজির শিক্ষক৷ মনোজগতের জটিল ক্রিয়াকে সরল করে তুলে ধরতেন, ব্যাখ্যার অতীত বিষয়বস্তুকেও ব্যাখার মাধ্যমে স্পষ্ট করতেন তিনি। 
হুমায়ূন আহমেদ 'মিসির আলির কথা' শিরোনামের লেখায় মিসির আলি সম্বন্ধে লিখেছেন- "মিসির আলি এমন একজন মানুষ, যিনি দেখার চেষ্টা করেন চোখ বন্ধ করে। যে পৃথিবীতে চোখ খুলেই কেউ দেখে না, সেখানে চোখ বন্ধ করে দেখার এক ফলবতী চেষ্টা।"
মিসির আলি কে? কেন তাকে নিয়ে পাঠকের এত কৌতুহল? হুমায়ুনের ভাষায়- "মিসির আলি এমন একজন মানুষ যার কাছে প্রকৃতির নিয়ম-শৃঙ্খলা বড় কথা। রহস্যময়তার অস্পষ্ট জগৎ তিনি স্বীকার করেন না। সাধারণত যুক্তিবাদী মানুষরা আবেগ বর্জিত হন। যুক্তি এবং আবেগ পাশাপাশি চলতে পারেনা। মিসির আলির ব্যাপারে একটু ব্যতিক্রমের চেষ্টা করলাম। যুক্তি ও আবেগকে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে দিলাম।"
হুমায়ূন আহমেদ অকপটে স্বীকার করেন মিসির আলিকে তিনি দেখেননি। তিনি নিজে মিসির আলি নন। লেখক বলেন- "আমি কখনো মিসির আলীর মতো মনে করিনা প্রকৃতিতে কোন রহস্য নেই। আমার কাছে সব সময় প্রকৃতিকে অসীম রহস্যময় বলে মনে হয়।
মিসির আলি  তবে কে? 
মিসির আলি খুব সাধারন একজন মানুষ। বিশেষত্বহীন। থাকেন একা। নিজেই রেঁধে খান। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকে একই জিনিস। চাল, ডাল এবং সবজির খিচুড়ি।
মিসির আলির উপস্থিতি আমরা পাই উনিশটি উপন্যাসে এবং দুটি গল্পগ্রন্থে।
মিসির আলি কিন্তু গোয়েন্দা নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পাশাপাশি মনোবিদ হিসেবেও কাজ করেন তিনি। সব সমস্যার সমাধান তিনি যুক্তি দিয়ে করতে চেষ্টা করেন। আবার কখনো প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন - "প্রকৃতি সব রহস্য মানুষকে জানাতে চায় না। কিছু নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতে চায়  থাকুক না সেই রহস্য লুকোনো৷ সব জানতেই হবে এমন কোন কথা আছে?"
মিসির আলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য-
১) কোন বিষয়ে আগ্রহী হলে, তার শেষ দেখে ছাড়েন। 
২) তার নৈতিকতা এবং মমত্ববোধ প্রবল।
৩) অসম্ভব বুদ্ধিমান।
৪) পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ।
৫) ধুমপান করেন।
৬) প্রেমের কিংবা ব্যক্তিগত যেকোন সম্পর্কের ক্ষেত্রেই দূরত্ব বজায় রাখেন।
মিসির আলির বয়য় কত? শুধুমাত্র 'নিশীথিনী' বইতেই মিসির আলির বয়স নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে মিসির আলির বয়স ৪১। সংসার বলে তার কিছু নেই।
অবশ্য 'অন্যভূবন' বইতে মিসির আলির বিয়ের কথা উল্লেখ ছিল। 
মিসির আলি যদিও রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করে থাকেন, তাও তিনি মনে করেন সমস্যার সমাধান করা তার পেশা নয়। 'বাঘবন্দি মিসির আলি'তে মিসির আলির ভাষ্যেই পাই, "জগতের বড় বড় রহস্যের সমাধান বেশির ভাগই থাকে অমীমাংসিত।  প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে। রহস্যের মীমাংসা তেমন পছন্দ করে না।"
মিসির আলিকে নিয়ে একাধিক টেলিভিশন ও মঞ্চ নাটক নির্মিত হয়েছে৷ সম্প্রতি মিসির আলি সিরিজের প্রথম উপন্যাস 'দেবী' নিয়ে 'দেবী' চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে৷
একটা কথা উল্লেখ্য যে, মিসির আলি সিরিজের বইগুলো কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। যারা যুক্তি দিয়ে যেকোন সমস্যার সমাধান করা পছন্দ করেন, তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য মিসির আলি সিরিজের বইগুলো। 
'দেবী' দিয়ে শুরু হয়েছিল মিসির আলির পথচলা। হুমায়ূনের প্রয়ানের সাথে 'যখন নামিবে আঁধার' দিয়েই কি সেই পথের শেষ?
চমক হাসানের গানে-
সব যুক্তির মায়াজাল
রহস্যের চার দেয়াল,
মিসির আলি আর কোনদিন
কোনদিন ভাঙবেনা...

Comments

Trending Posts

কথাকার সন্মাত্রানন্দ-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্বলদর্চি-র পক্ষে মৌসুমী ঘোষ

বাঙালি জীবনে দামোদর ব্রত/বিভাস মণ্ডল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

ষষ্ঠীপূজা / ভাস্করব্রত পতি

বিশ সাল বাদ উদার আকাশ : ফারুক আহমেদ/ খাজিম আহমেদ

ইতু পূজা /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ভীম ঠাকুর /অমর সাহা