উপস্থাপনার সাতকাহন - ২



উপস্থাপনার সাতকাহন || দ্বিতীয় পর্ব

পৌ লো মী  ভ ট্টা চা র্য্য
 

"দু কথা বলি যদি কানে তার"

সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় একবার খেদ করে বলেছিলেন, বাঙালির বড় সমস্যা হল কিছুতেই নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। সত্যিই এখানেই বোধহয় আমাদের কমবেশি সকলের অপারগতা। একের পিঠে এক, আবার এক দশ এক.... দুটোই  কিন্তু এগারোকে সামনে আনে। অথচ বলা দুটো আলাদা। পরেরটা বিজ্ঞানসম্মত, প্রথমটা শিশুসুলভ। আমরা শিশুপনাটাকেই চট করে নিয়ে নিই। এবার প্রশ্ন কোন সময় আমরা কতটা শিশুপনা করব! কারণ নিক্তি ওজনের মাপে কিন্তু জীবনের সব কটা পাতা উল্টানো যায় না। এসেই পড়ে সেই সমস্যা.... কি করে বলবো! আগেই বলেছি প্রফেশনাল শব্দটার বিতিকিচ্ছিরি ঝুট-ঝামেলাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে আমরা একটু বেশি চেনা আল ধরে হাটি। ফ্রয়েড সাহেবকে পেন্নাম জানিয়ে ঢুকে পড়ি একটু চেনা একটু ছোঁয়াতে। স্কুল জীবন, তারপর কলেজ, চাকরি সব জায়গায় ঘাপটি মেরে থাকে, সে। আপনি টের পান একশো ভাগ। কিন্তু, উপস্থাপনাতে কাঁচকলা! এখানে উপস্থাপনা বলতে একবারও কিন্তু আমি জামাকাপড় পড়ে, ঘাড়ে পাউডার মেখে, আপনার প্রেজেন্টেশন এর কথা বলছি না। বলছি না, ঠিক শব্দ, ঠিক বাক্য দিয়ে নিজেকে সাজানোর কথা। আপনার ব্যারিটোন ভয়েস থাকতে হবে এমন কোনও কথা নেই।
'সাধা গলা মাজা সুর'.... না-ই বা হলেন, কিন্তু আহ্লাদে ভরপুর হতে তো কেউ বারণ করেনি। প্রথম থেকেই সেইটে হয়ে পড়ুন। সমস্যা অর্ধেক খতম। অর্থাৎ সেই পজেটিভ ওয়েব, বেশিরভাগ সময় যেটা থাকে না আমাদের। তাই কাঁচাগোল্লা খেতে চাইলেও রসগোল্লাই বরাদ্দ হয়। আপনার ভেতরের সত্যটায় যদি জল মেশানো ভড়ং না থাকে তাহলে আপনাকে ঠেকায় কে! এমনিতেই ভালোবাসার কথা তো আগ বাড়িয়ে বলাটাই কঠিন। রাতের বেলা যে  'গান' এলো, সকাল বেলা সেইটাই লাগলো না ঠিক
'সুরে'। এতো স্বয়ং গুরুদেবই বলেছেন। কাজেই সমস্যা চিরকালীন। এইসব না-বলা শব্দের পুরোটাই একটা নিখুঁত চেহারা হয়ে উঠতে পারে আপনার নিজের জোরে। কখনো কখনো সেইটাই হয় সঠিক  'উপস্থাপন'। নীরবতাই সেখানে বাঙময়। আপনার সেলফ কনফিডেন্স টুকুই সেখানে আসল। এই কনফিডেন্স আপনার রোজকার জীবন থেকেই শুষে নিন। দিব্যি পারবেন। আর পারলেই সংসারের রিং এ আপনার অপনেন্ট এর সবকটা পাঞ্চ অনায়াসে ফিরিয়ে দেবেন। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই , প্রেমেই হোক আর অ্যারেঞ্জড প্রেমেই হোক, শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর পরে সেখানকার সব কজনের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ না খুঁজে, দেখা যেতেই পারে আপনার ভেতরের সত্যগুলো কতটা তাদের কাছে পৌঁছাল। অনেকেই জিজ্ঞেস করবেন, ভিতরের সত্যি বলতে?...সেটি আর কিছুই না, মন মুখ এক করা। যা ভাবছি আর যা করছি তার মাঝখানে ফারাক না রাখা। হ্যাঁ, মনে হতেই পারে, আমার মনের তো কোন আলট্রাসনোগ্রাফি হচ্ছে না, যে লোকজন ভেতরটা দেখতে পাবে!
ভণ্ডামি করতে দোষ কি!
এখানেই মুশকিল ! অন্য মানুষকে ছোট ভাবা আর অশ্রদ্ধা করার মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকে আন্ডারকনফিডেন্ট হবার বীজটি। উপস্থাপনা তখন ১:১ এর সমীকরণ। আপনার দুটো কথা কানে কানে , প্রাণে প্রাণে বাজে... সেই বাজনাই সম্পর্কের মীরে গাঁথে শুদ্ধ স্বরলিপি। আমরা এসব বোঝার চেষ্টা করি না। ফলে পরিবার বৃত্তে , বন্ধুমহলে উপস্থাপনের অঙ্কে কোনদিনই পাসওয়ার্ড জোটে না। লাদখাওয়া চোখে দেখি পাশের বন্ধুর উপস্থিতি কেল্লাফতে করে বেরিয়ে গেল। চার বার বিদেশ না গিয়েও, কোন ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং ছাড়াও যৌথ পরিবারের দিদিশাশুড়ির নির্ভরযোগ্যতা অনায়াসে আপনার সামনে সহজ উদাহরণ হতে পারে। আর এখানেই সেই সারসত্য লুকিয়ে। কি নেই তা না দেখে, কি কি রইল তা দিয়েই তৈরী করেছেন তাঁরা রোজনামচা। আমরা এইটি করতে এক্কেবারে ভুলে যাই।
'উপস্থাপন '  নিয়ে মাথা ঘামাই। ছুটে বেড়াই এদিক ওদিক। অথচ নিজের ভিতরে সৎ আবেগটাকে একটু যত্ন করলেই আপনিই আপনার বৃত্তে আলো। আপনিই তখন একক উপস্থাপক।


Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল