সেমিকোলনের আত্মজীবনী -৪

সেমিকোলনের আত্মজীবনী || পর্ব - ৪

সা য় ন


কবিতাই আমার সোভিয়েত, মানুষ আমার ইউনিয়ন

২৫ শে ডিসেম্বর, ১৯৯১। কবি সকালবেলা কাগজ- কলম নিয়ে লেখার টেবিলে বসে আছেন। বাইরে তখন ক্রিসমাস ক্যারল, বাইরে তখন রুটির জন্য প্রার্থনা। লেখার টেবিলের পাশে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন- স্বপ্ন। কাঁধে ধাক্কা দিয়ে কবিকে বলল- “আরে, এবার আমেরিকার সঙ্গে লড়াইটা দেবে কে? পৃথিবীটা কী শুধু আমেরিকার হয়ে যাবে?” 
কবি বললেন- “কেন? আমাদের একটা সোভিয়েত ইউনিয়ন আছে, বুঝলে! "
স্বপ্ন পা উ্ল্টে হাসতে লাগল টেবিলের উপর, আর বলতে লাগল- “১১টা ৫৯  অবধি বলিস- All power to Soviet” কারণ ১২টা হয়ে গেলেই… যাক্গে, চল্ আমরা শেষবারের মতো মস্কোর ক্রেমলিনের আকাশে লাল পতাকা দেখে আসি। যীশুর Last Supper এর রুটির মত মিখাইল গরভাচব  Soviet Union কে ভাগ করে দেবে  ইউক্রেন, জর্জিয়া, বেলারুস, আর্মেনিয়া, আজেরবাইজান, কাজাকস্তান, কিরঘিজস্তান, মলডোভা, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকস্তান, এবং উজবেকিস্তান- এই এগারোটা টুকরে। যীশুর সঙ্গে তো শেষদিন বারোজন অ্যপোস্টেল      ছিল- তাহলে এখানে দ্বাদশ জনটি কে? স্বপ্ন বলল- “১২ নং হল একজন মানুষ- সেটা হলি তুই। হ্যাঁ তুই- এখন তোকেই খুঁজতে হবে “ভালো জায়গাটা কোথায়?” 

ভালো জায়গার ইতিহাস : ১ 

কবির কানে ভেসে আসতে থাকে ক্রিসমাসের পবিত্র প্রার্থনার জায়গায় গরভাচভের প্রেসিডেন্ট পদ প্রত্যাহারের উক্তি- “We are now living in a new world. An end has been put to the cold war and to the arms race, as well as to the mad militarization of the country, which has erippled our economy, public attitudes and morals.’’। এই পতনবানী অক্ষরেখা বরাবর ক্রেমলিন থেকে কাকদ্বীপ ছড়িয়ে পড়তে লাগল আগুনের মতো। আগুন  হয়ে পুড়িয়ে দিতে লাগল কবির খাতার প্রত্যেকটা পাতা, ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠে- “সোভিয়েত ভেঙে পড়ল।” 

কবির ঘাম ঝরছে, স্বপ্ন টুকরো টুকরো হয়ে এক একটা শব্দ হয়ে ভরে উঠছে মাথা- "স্টালিন ৬ কোটি মানুষকে খুন করেছিল। সাইবেরিয়ায় পাঠিয়েছিল। প্যারানয়েভ ছিল। সবাইকে সন্দেহ করত। বন্ধুদের বিশ্বাস করত না। লেখকদের দরজায় মধ্যরাতে পুলিশ দিয়ে কড়া নাড়াত। সেই সোভিয়েত ভেঙে গেছে, তা নিয়ে এত দুঃখ করার কী আছে? আমার মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন। এবার কী হবে?" (‘সোভিয়েত নিয়ে না রোরোকে নিয়ে?’, সুবোধ সরকার) 
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং গ্লোবালাইজেশনের মধ্যে যে সরলরেখা, তাকে ক্রশকাঠ করে তুলে আনলেন সুবোধ সরকার। সেই সরলরেখার এক একটি বিন্দু হয়ে উঠল বাঙালির সংকট, ভারতবর্ষের এক একটি কবিতা। 

ভালো জায়গার নেই ইতিহাস : ২

আলিমুদ্দিনের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন এক যীশুখ্রীষ্ট, যা শ্রমিক শ্রেণীর কাছে হয়ে উঠল হিংস্র জুডাস। অবিশ্বাস, শাসন, মুছে দেওয়া, চেপে দেওয়ার সংস্কৃতি, রাতের অন্ধকার বুকে নিয়ে তলপেটে বন্দুকের নল - কবিতার মধ্য দিয়ে এখন “একটা গুলি ছুটে গেছে / গত বসন্তে / পলাশে পলাশ জঙ্গলে জঙ্গল এবং নক্ষত্র/ আজ ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখছি-/ ওটা গুলি নয় / মাত্র তিন ইঞ্চি দূর দিয়ে ছুটে গেছে/ তোমার ভালোবাসা।” (কানের পাশ দিয়ে) 
বন্দুকের নলই আমাদের ভালোবাসা, সংস্কৃতির উৎস। উৎসের দিকে যতই হাঁটি, ততই আমার বাঁদিক হয়ে যায় ইতিহাস, আর ডানদিক কবিতা। একজন সামনে দাঁড়িয়ে বলল- 
“মুখে রড ঢুকিয়ে পেছনের ফুটো দিয়ে 
বের করে আনব, শালা দেড়েল। 
বিটগাজর যখন রসে উঠে যায় ভারত মহাসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে মেঘ দেখে
আপনি কী বলবেন? 
গুরু গুরু মেঘ গরজে গগনে………।” 
(বিটগাজর যখন রেগে উঠে যায়)
১৯৯৯ সাল থেকে কবিতাগুলো ২১ বছর রামবাবুর কাছে প্রশ্ন করে গেল- “কিন্তু এখন আপনি আর/ আপনি নেই, আপনি/ আদবানীকে ভুজুং দিচ্ছেন/ জয়ললিতাকে ফুচুং।/……………সারা দেশ জুড়ে লেগে যাক্ ফেরত আর ফেরত/ এই ফেরত দেওয়ার মারি ও মড়ক/ আপনি সামলাতে পারবেন, রামবাবু?” (রামবাবু) 

ভালো জায়গা খোঁজার ইতিহাস : ৩

এক একটা কবিতার বই বীজের মত হয়। সময়ের মাটিতে তার ফলন হয়। শব্দবৃক্ষের চেতনায় আমাদের ‘মাড়ি ও মড়ক’, গুজরাতের দাঙ্গা থেকে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড- সবই লেখা থাকে। 
‘আমেরিকা থেকে’ একটা কবিতার ইথার তরঙ্গের মধ্যে ভেসে আসছিল- “এই তো ব্রুকলিন ব্রীজ, ফেরিঘাট ছিল/ হুইটস্ম্যান এখানে গণতন্ত্রের কথা বলেছিলেন/ আমার বাবা খালি গায়ে মাঘ নিশীথের তারাভরা আকাশের নীচে/ হুইটসম্যানের কবিতা পড়ে শোনাতেন ছোটবেলায়।” সেই বাচ্চাছেলেটা আজও দেখছে আমেরিকার কার্পেটের নীচে লুকিয়ে রাখা জর্জ ফ্রয়েডের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে এ ভাইরাসের মহামারী অন্যদিকে আর্থিক মহামারীর পাশে। 
ভালো জায়গাটা খুঁজতে খুঁজতে চারপাশে এমন কোরাস হচ্ছে, স্বপ্ন ঘাড় ধরে দেখাচ্ছে কবিকে, 
“দেখছেন তো এখন এটা একটা পুকুর 
এখানে উঠবে চারতলা, পাঁচতলা, ছতলা……….
ওই তো জানলাটা, ওই জানলা খুলে
আমার ছেলে পাখি দেখবে, এবং…..”

ভালো জায়গা নিয়ে প্রেমিকাকে চিঠি লেখা যায়, ইতিহাস লেখা যায়, পরকীয়া আর প্যারাসিটামলের মধ্যে চাঁদনী রাত বানানো যায়- কিন্তু ‘কোথায়’ প্রশ্ন করলে থ্রেট আসে, ভারত মহাসাগরের নীচে যাওয়ার বাইপাস আসে। ভালো জায়গাটা ঠিক ‘কোথায়?’ এই প্রশ্নটার মুখে বাঁধা আছে লিউকোপ্লাস্ট কারণ “…… কৌশল ও প্রতিভার বিচার/ পাগলের সঙ্গে শয়তানের ব্যবধান/ ক্রমশ কমে আসছে/ আমাদের ধূসর পৃথিবীতে।” (ফুটবল) 
সুবোধ সরকারের ফোনে একটা ম্যাসেজ গেল- এসব কী লিখছেন? 
“একটা ছেলেকে আপনারা কেন এম. এ. পড়ান, কোন্ আহ্লাদে
 আট খানা
বিশ্ববিদ্যালয়  বানিয়েছেন, তুলে দিন
এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের 
ফোন বেজে উঠল, ফোন বেজে চলল, ফোন বেজেই চলল
২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে, আরও কুড়ি বছর বাজবে।”   
(রূপম)

২৯ বছর পর একটা উত্তর এল বালি ঘড়ি উপুড় করে-
“যখন সারাটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে ঘুষের টাকার ওপর 
তখন রবীন্দ্ররচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটা 
সুইসাইড নোট!
হাসপাতালের গাছের তলায় গা ছম্ছম্ করছিল
এগিয়ে গেলাম সাদা কাপড়ে ঢাকা মাস্টারমশাইয়ের দিকে
একটু বেরিয়ে থাকা পা দুটোর দিকে
ওই একটু বেরিয়ে থাকা পা’ দুটো যেন ভারতবর্ষের শেষ মাটি।”
             (ঘুষ)

ভালো জায়গার দলিলের ইতিহাস : ৪

কবি এবার স্বপ্নকে ঘাড় ধরে বললেন - একটা ভালো জায়গার জন্য মানুষ প্রতিটা যুগে যুগে গিলোটিনের সামনে, বুলেটের সামনে, গুলাগের সামনে,হাঁটুর নিচে শুয়ে কাঁদছে । এবেল মিরোপল 'Strange Fruit' গান লিখে তার থাপ্পড়টা দিয়ে বলেছিলেন - " I hate lynching, and I hate injustice, and I hate the people who perpetuate it." 
কালো মানুষ থেকে দলিত, রোহিঙ্গা থেকে পশ্চিম এশিয়ার শরণার্থী আমাদের দিকে আঙুল তোলে মানচিত্রে - " হাওড়া, শেয়ালদা, চৌরঙ্গি,কালীঘাট,শোভাবাজারের/ ফুটপাথ থেকে ছোট্ট ছোট্ট কচি হাত/ হাজার হাজার হাত উঠে এল ঘুমের ভেতর: / আমার জন্য তুমি অ্যপ্লাই করেছ?" (ময়ূরপঙখি)
মহারাষ্ট্র থেকে ম্যাসিডন, নিউ ইয়র্ক থেকে নন্দীগ্রাম, বালি থেকে বার্লিন একটা ভালো জায়গার ইতিহাস লিখবে বাংলা কবিতা - " সেই কালি দিয়ে দেয়ালে লিখেছি/ তুমি সেই মেয়ে/ ক্ষুধার্তের এক থালা ভাত, থালার পাশে/ দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্লাস ঠান্ডা জল/ সেটা আমি" (দশ বছর বাদে) এবার সময় এসেছে এমন একটা ভাষায় কবিতা লেখার, যেখানে কোনো বর্ডারের শাসন নয়, U.N.O নয় - অনেক বেশি করে সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন মন ও মানসিকতার দ্বারা সেটা চালিত হবে। ভালো জায়গাটার দলিলে লেখা থাকবে কয়েকটা বারুদভরা প্রশ্ন - 
" কী যেন একটা কাগজে সই করতে হবে আমাদের?
সই করে কী হয়? আপনার হ্যান্ডব্যাগে কত সই
কত তারিখের মাঝখানে কত বছর ঘুমিয়ে কাটালাম
সই করে কি কোনও যুদ্ধ আটকানো যায়?" (প্রেসিডেন্টের চিন সফর)





Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল