লোককথা - বোকাতাঁতি- ৩


লোককথা - বোকাতাঁতি 

সু ব্র ত কু মা র  মা ন্না   
 
৩.
ছাড়া মাত্রই মুরগীগুলাে যেদিকে খুশি চলে গেল

বােকা তাঁতি ঠিক করল ব্যবসা করবে। শুনে তার এক বন্ধু বলল, তাের কি বুদ্ধি আছে ,যে তুই ব্যবসা করবি? বােকা বলল, “দেখিয়ে দেব।”

তারপর মাকে এসে বলল, আমকে দু-বস্তা ধান বের করে দাও আমি ব্যবসা করব। মা বলল, সবাই তাে টাকা দিয়ে ব্যবসা করে, তুই ধান দিয়ে কি করবি ? বােকা তাঁতি বলে, লােকে প্রথমেই টাকা বের করে বােকামি করে। আমি প্রথমেই টাকা বের করে বােকামি করতে রাজি নই। অতএব সে গােরুর গাড়িতে করে দু বস্তা ধান নিয়ে হাটে চলে গেল এবং সেগুলি নামিয়ে রেখে বলতে লাগল, 
'চার-বস্তা যদি পাই 
দুবস্তা তারে দিই।'

হাটে ধূর্ত লােকেরা সুযােগ খোঁজে। বােকা তাঁতিকে এমনই এক লােক চার-বস্তা গমের ভুসি দিয়ে ধান নিয়ে নিল। আর বােকা রামও হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরল। বাড়িতে আসতেই কাণ্ড দেখে তার মা অবাক হল। কিন্তু ভাবল প্রথম প্রথম ওরকম একটু লােকসান হবে। পরদিন বােকা তাঁতি আবার হাটে গিয়ে সেই চার বস্তা ভুসি নামিয়ে রেখে

বলতে লাগল, -

'চার বস্তার বদলে আট বস্তা পাই
হাসতে হাসতে বাড়ি যাই।'
 
তখন সেই লােকটি আবার আট বস্তা ঘাস তাকে দিয়ে গমের ভুসি নিয়ে চলে গেল। বােকা তাঁতিও হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরল। পাড়াপ্রতিবেশীরা কিন্তু তার কাণ্ড দেখে অবাকই হয়। 

সে ভাবল, কাপড়ের ব্যবসা করবে। কিন্তু তাতে টাকা লাগবে। পাড়াপড়শিরা ভাবে সে ভালই ব্যবসা করছে। তাই গ্রামের এক মাতব্বর তাকে টাকা ধার দেয়। সে দোকানও খুলে ফেলল। রােজ সকালে যায়, দুপুরে বাড়ি আসে, আবার বিকেলে যায়। দোকানে তাকিয়ায় সারাক্ষণ হেলান দিয়ে শুধু গড়গড়া টানে। খদ্দের এলে বলে, দাঁড়াও গড়গড়াটা টানা হােক। ফলে খদ্দের জোটে না।

এইভাবে কিছুদিন যাবার পর সেই ধূর্ত লােকটি তাকে এসে উসকে দিয়ে বলে কাপড়ের ব্যবসায় খদ্দেরের আশায় বসে থাকতে হয়। কিন্তু মুরগীর ব্যবসায় শুধুই লাভ, লালে লাল হয়ে যাবে। তাই আমি মুরগীর ব্যবসা শুরু করেছি। আপনার দ্বারা আর কি কাপড়ের ব্যবসা চলে। বােকা তাঁতি বলে, আমার দোকানে সাড়ে তিনশ টাকার শাড়ী, ধুতি আছে। যদি কেউ সাড়ে তিনশ মুরগী দেয় তাকে দোকানটা বেচে দেব।

কিছুক্ষণ পরেই তার ঠিক করে দেওয়া একটি লােক চারজন মুটে নিয়ে চারটি ঝাঁকায় সাড়ে তিনশ মুরগী নিয়ে এল। বােকা তাঁতি সেই লােকটিকে দোকানটি গুছিয়ে দিয়ে মুরগী নিয়ে বাড়ি চলে এল। মা তার কাণ্ড দেখে অবাক তাকে জিজ্ঞাসা করল ব্যাপার কি? তখন সে বলল, "এবার থেকে মুরগীর ব্যাবসা করবো।" মুটেরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বলল, হুজুর মুরগি রেখে ঝাঁকা নিয়ে  যেতে বলেছেন। কিন্তু ছাড়া মাত্রই মুরগীগুলি যেদিকে খুশি চলে গেল। এইভাবে কিছু মুরগী গেল শিয়ালের পেটে, কিছু মুরগী গেল পাড়াপড়শির পেটে, কিছু গেল বােকারামের পেটে। মুরগীগুলাে বাচ্চা নিয়ে পাড়ার চারপাশে হানা দিল খাদ্যের খোজে। তারা নিজেরাও অনেকের খাদ্য হয়ে গেল। কাণ্ড দেখে মা কপালে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদতে লাগলেন।

Comments

Post a Comment

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো