লোককথা - বোকা তাঁতি


লোককথা - বোকা তাঁতি


পর্ব - ১০

সু ব্র ত কু মা র  মা ন্না    


জামাই হাঁড়ি থেকে মুখ বের করতে পারছে না

বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় বােকা বউয়ের সঙ্গে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। মা বলেন, বােকা প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিস, ওখানে গিয়ে বড়দের গড় হয়ে প্রণাম করবি। কোকিলের সুরে কথা বলবি। এখানের মতাে যেখানে সেখানে মাটিতে বসবি না। জামাই বলে কথা। উঁচু আসনে বসবি। খেতে দিলে একটু লজ্জা লজ্জা করে কম কম খাবি।

মায়ের উপদেশগুলাে মনে মনে মুখস্থ করে বোকা শ্বশুরবাড়ি গেল। সেখানে গিয়ে সব বড়দের প্রণাম করে শেষে বউকেও একটা টিপ করে প্রণাম করে
ফেলল। শ্বশুর বাড়ির লােক বােকার কাণ্ডে হেসে কুটিকুটি, বউ লজ্জায় ঘরের মধ্যে চলে গেল। শ্বাশুড়ী পরিস্থিতি সামলে নিয়ে বলেন, “ভালাে আছাে তাে বাবা ?" বোকার মায়ের কথা মনে পড়ল। কোকিলের মতাে কথা কইতে হবে। তাই বলে উঠল, ‘কুহু,কুহু। 
উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শাশুড়ী ভাবলেন তিনি ঠিকমতাে শুনতে পাননি, অথবা জামাই বাবাজীবনের বােঝায় ভুল হয়েছে। তাই আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'বাবা তােমার মা ভালাে আছেন তাে? বােকা আবার বলে উঠল কুহু কুহু। 

শাশুড়ীমা অধােবদনে সেখান থেকে চলে গেলেন। বউ বলে, - "আচ্ছা তােমার কি কোন বুদ্ধি শুদ্ধি নেই? সবাই তােমাকে কি ভাবছে বলতাে ? আমি যে লজ্জায় মরে যাচ্ছি। মা তােমাকে কোকিলের মতাে করে কথা বলতে বলেছেন মানে, কোকিলের মতাে মধুর সুরে কথা বলতে বলেছেন, কুহু কুহু ডাকতে বলেননি। বােকা এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পারল। ঠিক সেই সময় শাশুড়ী জলখাবার নিয়ে এলেন। ভূমিতে আসন পেতে খেতে দিলেন। কিন্তু মা তাে উঁচু আসনে বসতে বলেছেন। সামনা সামনি কোন উচ্চাসন দেখতে না পেয়ে, বােকা সামনের কুলুঙ্গিটাতে লাফ দিয়ে উঠে বসে বলল, “আমি এখানেই খাব। মা আমাকে উচ্চাসনে বসতে বলেছে।” শাশুড়ী সব বুঝতে পেরে একটা জলচৌকি আনলেন, জলখাবার আর একটা উঁচু ঢিবির উপর রাখলেন। বােকা কুলুঙ্গি থেকে নেমে এসে খেতে বসল, কিন্তু মায়ের কথা মনে করে নামমাত্র খাবার মুখে দিয়েই উঠে পড়ল। শাশুড়ী কত অনুরােধ করলেন। কিন্তু মায়ের উপদেশ বােকার মনে আছে। সে আর খেল না।

বােকার শাশুড়ী বলেন, "কিছুই তাে খেলে না বাবা এই পায়েস কিন্তু পেটভরে খাও। তােমার জন্যই বানিয়েছি।" বোকা দেখে জিনিসটা তার মায়ের করা ক্ষুদসিদ্ধের মতাে দেখতে। বােকা বলল, “না না খাব না খাব না। ওতাে আমার মা রােজ করে। রােজ খাই। বােকা থালার ওপর হাত চাপা দিল কিন্তু হাতা থেকে একটুখানি পাতে পড়ল। সেটুকু মুখে যেতেই অমৃতের মতাে লাগে। বােকার ভীষণ লােভ হয়। কিন্তু বােকা নিজেকে সংযত করে পাতের পায়েসের ফোঁটাটাই চেটেপুটে খায়।

রাত্রির খাবারও বােকা একটু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল মাত্র। খাবারগুলাে খুব সুস্বাদু আর বােকারও খিদেতে প্রাণ যাওয়ার জোগাড়। তবুও বােকা খেল না। অনেক স্থানে বােকা তার বােকামির জন্য অনেক অসম্মানিত হয়েছে, কিন্তু আর না। শ্বশুর বাড়ীতে বােকা সন্মান হারাবে না। কিন্তু রাত্রে ক্ষিদের জ্বালায় বােকার ঘুম এল না । বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে লাগল। এতাে খিদের জ্বালা বােকা আগে কোনদিন সহ্য করেনি। রাত্রে বােকা এক কাণ্ড করল। রান্নাঘরে গিয়ে পায়েসের হাঁড়িটার সন্ধান পেল। কাছে পিঠে বাসনকোসন না দেখতে পেয়ে হাঁড়ির মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে পায়েস খেতে লাগল। বাবা প্রাণটা বাঁচল। খাওয়া শেষ হল। কিন্তু বােকা হাঁড়ি থেকে মুখ বের করতে পারল না। অনেক চেষ্টা করছে বােকা কিন্তু হাঁড়ির মুখটা বেশ সরু।

এদিকে রান্নাঘরে আওয়াজ পেয়ে শ্বশুর বাড়ীর লােকেরা ভাবল, নিশ্চয় রান্নাঘরে কুকুর ঢুকেছে। অন্ধকারেই লাঠি দিয়ে কুকুরকে উত্তম মধ্যম দিল, কিন্তু কুকুর ঘেউ ঘেউ করে না কেন ? আলাে এনে দেখে বাড়ির জামাই হাঁড়ি থেকে মুখ বের করতে পারছে না। মাটির হাঁড়ি ভেঙে জামাইকে উদ্ধার করা হল। সম্বন্ধী বলে, "জামাই তােমার খিদে পেয়েছিল তাে বললেই পারতে। শুধু শুধু এতগুলাে মার খেলে। তুমি সত্যিই বােকার হদ্দ।”
_________________________________
নিয়মিত পড়ুন। 
www.jaladarchi.com  

Comments

Post a Comment

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো