লোককথা - বোকা তাঁতি



কবিরাজ ফোলা গালে হাতুড়ি মারল

সু ব্র ত কু মা র  মা ন্না   

গল্প - ১১

একবার একটা কাজে বােকা তাঁতি তার বউকে বাড়িতে রেখে শ্বশুর বাড়ি গেল। সে সময়টা ছিল শরৎকাল। পুজোর সময়। চারিদিকে কাশফুল ফুটেছে, চারিদিক সাদা হয়ে গেছে। তাঁতি পথে যেতে যেতে দূর থেকে দেখে ভাবল, চারিদিক সাদা হয়ে গেছে মানে নদীতে নিশ্চয় বন্যা হয়েছে। সে কিভাবে নদী পেরিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাবে ভেবে পেল না। হঠাৎ সে ভাবল সাঁতার দিয়ে নদী পার হবে। কাশফুলকে বন্যার জল ভেবে সে দৌড়ে এসে ঝাঁপ মারল। এরপর তাঁতির চারিদিক কেটে গেল, ব্যথায় সে চিৎকার করতে লাগল। কিন্তু শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার আনন্দে সে আবার পথ চলতে লাগল।

তাঁতি শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছে দেখল সে সময় তার শাশুড়ি বাড়িতে একা আছে। জামাইয়ের শরীরের এই আবস্থা দেখে তার শাশুড়ি তাকে জিজ্ঞাসা করল, "কিভাবে হল"। তাঁতি বলল, রাস্তার মাঝে এক বড় গর্তে সে পড়ে গিয়েছিল তাই তার এখন বিশ্রামের প্রয়ােজন। জামাইয়ের এই অবস্থা দেখে শাশুড়ি তাড়াতাড়ি রান্না করে জামাইকে খেতে দিল। ততক্ষণে বাড়ির সবাই বাড়িতে ফিরেছে। তাই তা  জামাইয়ের কাছে গিয়ে বসল। কিন্তু এত লােকের সামনে তাঁতির খেতে লজ্জা করল। তাই সে বেশি খেতে পারল না। শাশুড়ি জামাইয়ের জন্য চালের তৈরি পিঠে বানিয়েছিল। সেটি জামাইয়ের খুব ভাল লেগেছিল। কিন্তু ভালাে লাগলেও লজ্জায় বেশী খেতে পারল না, তাই খিদে নিয়েই জামাই উঠে গেল। এরপর বাড়ির সবার খাওয়া হলে সবাই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। বােকা তাঁতির তাে পেট ভরেনি। গভীর রাতে সে খাবার জন্য চুপি চুপি রান্না ঘরে গেল। রান্না ঘরে অনেক ডিম রাখা ছিল। জামাই ডিমগুলােকে পিঠে ভেবে দুটো মুখে পুরে নিল। রান্না ঘরে শব্দ হওয়াতে বাড়ির সবাই ভাবল বাড়িতে চোর ঢুকেছে, তারা চোর.. চোর বলে চিৎকার করতে লাগল।

বােকা তাঁতি ভাবল বাড়িতে বােধহয় চোর ঢুকেছে তাই সে ছুটে গিয়ে নিজের ঘরে লুকিয়ে পড়ল। বাড়ির সবাই ছােটাছুটি করেও কাউকে দেখতে পেল না। সেই সঙ্গে জামাইকেও দেখতে পেল না। তারা ভাবল জামাইকে বুঝি চোরে নিয়ে গেল। তারা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। তাদের চিৎকার শুনে জামাই যদিও বেরিয়ে এল কিন্তু কোনাে কথা বলতে পারল না, কারণ তার মুখের মধ্যে তখনও ডিম দুটো ছিল। জামাই কোনাে কথা বলছে না, আবার তার গাল দুটো ফুলেও গেছে - এটা দেখে তারা ভাবল জামাইয়ের বােধ হয় কোন অসুখ করেছে। তাই সে কথা বলতে পারছে না। তারা কবিরাজ আনল বাড়িতে। কবিরাজ জামাইকে দেখে হাঁ করতে বলল। কিন্তু সে হাঁ-ও করতে পারল না, পাছে কেউ তার মুখের ভেতর ডিম দেখে হাসে।

জামাই হাঁ করছে না দেখে বাড়ির সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। ভাবল জামাইয়ের কোনাে কঠিন অসুখ করেছে তাই তারা কান্না শুরু করে দিল। কবিরাজ সব দেখে শুনে জামাইয়ের দু-গালে হাতুড়ি মারল। হাতুড়ির ঘায়ে ডিম দুটো ফেটে গিয়ে কুসুম বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে। কবিরাজ বলে, “জামাইয়ের গালে পুঁজ জমেছিল, তাই জামাইয়ের এত কষ্ট হচ্ছিল।" এদিকে তাঁতি বেচারি এত কষ্ট সহ্য করতে না পেরে রাগে কেঁদে ফেলে । বলে, “বুড়ো হাবড়া কবিরাজ, আমার গাল থেকে পুঁজ বেরােচ্ছে ? ওগুলাে পুঁজ নয়, ডিমের কুসুম। পুঁজ আর ডিমের কুসুমের তফাৎ জানে না, বেটা কবিরাজ হয়েছে। দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে। আমার কোনাে অসুখ হয়নি খিদে পেয়েছে। তাই রান্না ঘরে গিয়ে কিছু খুঁজে না পেয়ে ডিমগুলো এনেছিলাম।” তা শুনে শালা, শালার বৌ হাে হাে করে হাসতে লাগল । শ্বশুর, শাশুড়ি অপ্রস্তুতে পড়ল। শালার বৌ বলল, এমন বােকা ভূ- ভারতে নেই। শুনে ঝি-চাকরেরা হেসে লুটিয়ে পড়ল।

Comments

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো