লোককথা - বোকা তাঁতি

লোককথা- বোকা তাঁতি
গল্প -১৩


সু ব্র ত কু মা র  মা ন্না     


লোকটা মরে-টরে গেল নাকি ?

বৌ অনেকদিন বাপের বাড়িতে আছে, মা বােকাকে বলেন, "বৌকে বাড়ি নিয়ে আয়। আমি একা হাতে আর পারছিনে।” বােকা একহাঁড়ি সন্দেশ নিয়ে দুপুরবেলা ভাত খেয়ে শ্বশুর বাড়ি বেরােলাে। বােশেখের রােদ বেশ চড়া। মা বড় ছাতাটা বের করে দিলেন।

মাঠ পার হয়ে খালবাঁধ ধরে হাঁটছে বােকা। বোকা ছাতা মাথায় দিয়ে যাচ্ছে আপন খেয়ালে। চড়া রােদে জনপ্রাণী নেই। বােকার যেন মনে হল কেউ তার পিছু নিয়েছে। পায়ের শব্দও যেন শুনতে পেল। বােকা পিছন ফিরে তাকাল, সত্যিকার আরাে একজন তারই মতাে কালাে লােককে তার পিছনে দেখতে পেল। লােকটা একটু বেঁটে আর মােটা। বােকা কিছু বলল না, তবে হনহন করে হাঁটতে লাগল। অনেকটা পথ যেতে হবে, কিন্তু লােকটা তাে বড় অদ্ভুত, বােকা যদি বাঁয়ে মােড় নেয় তাে ও-ও বাঁয়ে মােড় নেয়, বােকা সােজা গেলেও লােকটা যায়। বােকা বসে পড়ে, লােকটাও বসে পড়ে। বােকা ভীষণ রেগে গিয়ে বলে, আমি শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি , তুমি আমার সঙ্গ নিচ্ছ কেন ? লােকটি কিছু বলল না, বসেই থাকে। বােকা ছাতাটা তার হাতে দিয়ে বলে, “যাও বাপু পালাও ছাতা মাথায় দিয়ে যেখানে পারাে যাও।" বােকা আরও কিছুক্ষণ রােদে পথ হাঁটার পর ঘুরে দেখে ব্যাটা ছাতা ঘরে রেখে এসে আবার পিছু নিয়েছে। বােকা বলে, "এ তােমার খুব অন্যায়। বাপু, ছাতাটা হাতালে। এখন দেখছি সন্দেশের হাঁড়িটার দিকে নজর। ঠিক আছে নিয়ে যাও, কিন্তু আমার পিছু পিছু আর আসবে না।” লােকটা কোনাে কথা বলে না দেখে বােকা ভাবে ও সন্তুষ্ট হয়নি। এ তাে আচ্ছা আপদ। বােকা বলে, "ঠিক আছে তােমায় জামাটাও দিয়ে দিলুম। যাও ভাগ।" বেলা পড়ে এসেছে, সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। বােকা জোরসে পা চালাল। শ্বশুরবাড়ির গায়ে এসে হঠাৎই পিছন ফিরে দেখে সেই লােক। ব্যাটা বদমাসের ধাড়ি। সন্দেশ সব খেয়ে হাঁড়িটাকেও রাস্তায় ফেলে এসেছে, জামাটা কোথায় ফেলল কে জানে। দাঁত চিপে বলল, আমার শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার মতলব, সেটি হচ্ছে না। দেখি তাের লােভ কতখানি। এই নে জুতা জোড়া আর গেঞ্জি দিলাম। যা চলে যা, আর আমার কাছে তাের কিছু নেওয়ার নেই। এই ধুতি, ভেতরের পেন্টটুকু ছাড়া।”

শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় এসে বােকার লজ্জা লজ্জা করতে লাগল। হাড় বদমাসের পাল্লায় পড়ে খালি পায়ে শুধু ধুতি পরে তাকে শ্বশুরবাড়ি আসতে হয়েছে। এই কথা ভেবে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখে সেই লােক। বােকা বুঝতে পারে ওর ধুতিটাও চাই। ধুতিটাও দিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে বােকা খুব লজ্জা পেল। সে শুধু একটা ছােটো প্যান্ট পরে আছে। ছােটো বেলায় যেমন পরে খেলতে যেত। ইস এভাবে কি শ্বশুরবাড়ি যাওয়া যায় ? লােকটার উপর খুব রাগ হল। পিছন ঘুরে কিছু একটা বলবে ভেবেছিল, কিন্তু দেখে লােকটা ভেগেছে। উঃ বাবা বাঁচালে। সবে বিকেল, পাড়ার লােকে দেখতে পেলে বলবে কি? পরিচিত একজন সে পথে আসছে। দেখে বােকা ছুটে শ্বশুরবাড়ির পিছনের দিকে পুকুরপাড়ে চলে গেল। গাছ গাছালির আড়ালে দিব্যি ঘন্টাখানেক লুকিয়ে থাকা যাবে। ঘাটের ধারে একটা আমড়া গাছে উঠে বসল। সন্ধে হলে তারপর না হয় ঘরে ঢোকা যাবে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল। আস্তে আস্তে চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। বােকা গাছ থেকে নামবে ঠিক করল এমন সময় বােকার বৌ আর শ্যালিকা চাল ধুতে পুকুরঘাটে এল। জলে নেমে যখন তারা চাল ধুচ্ছে তখন বােকা রসিকতা করে একটা আমড়া তাদের দিকে ছুঁড়ে দিল। বােকার শ্যালিকা বলল, দেখ দিদি একটা আমড়া পড়ল। আবার একটা আমড়া পড়ল। কিছুক্ষণ পর আরও দু-তিনটে কাঁচা আমড়া তাদের গায়ে এসে পড়ল। বােকার বৌ কিছুটা ভয় পেয়ে আমড়া গাছের দিকে তাকাল, আবছা অন্ধকারে একটা লােক যেন গাছে ঝুলে আছে। তারা দুজনে ওগাে চোরকে বলে চিৎকার করে চালের ধুচুনি ফেলে ঘরের দিকে ছুটল। বােকা গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ল। পাড়ার লােক চীৎকার শুনে লাঠি তাড়া নিয়ে দল বেঁধে ছুটে এল। এখন গ্রামে খুব চুরি হচ্ছে। পাশের গাঁ থেকে চোরের আমদানি হয়েছে। বােকা বিপদ বুঝে - "না গাে আমি চোর নই গাে বলে চেঁচাতে লাগল। কিন্তু বােকার কথা কারাের কানে ঢুকল না। পাড়ার লােকেরা অন্ধকারে বােকাকে পেয়ে কিল চড় মারতে লাগল। বােকা কেঁদে ফেলল। বােকার অত্যন্ত দুর্ভাগ্য আজ। বােকা অসহায় ভাবে চিৎকার করতে লাগল, - "আমার কথা বিশ্বাস কর, আমি চোর নই।” মারমুখী লােক বিদ্রুপ করে বলে, “ভর সন্ধেবেলায় ঘাটের ধারে ঘুরঘুর করছ, আমড়া চুরি করছ, মেয়েদের আমড়া ছুঁড়ে মারছ - তুমি চোর নও তাে মাথার ঠাকুর।" বােকার ভাগ্যে আরও মার জুটতে লাগল। এত মার বােকা জীবনে খায়নি। বােকা চিৎকার করে বলল, "আমি জামাই গাে জামাই।” লােকেরা অট্টহাস্য করে বলে “হা..হ্যা, তুমি তো জামাই বটে, বড়কুটুম, সন্ধেবেলা খালি গায়ে এসেছ কুটুম্বিতে করতে।” মার খেয়ে বােকা অজ্ঞান হয়ে পড়ল। বােকার শাশুড়ীর কেমন সন্দেহ হল, আলাে নিয়ে এসে বলে, “লােকটা কথা কয় না যে। দেখ না মরে টরে গেল নাকি?” লােকে মুখের সামনে আলাে ধরতেই শাশুড়ী চিৎকার করে বলেন, “ওরে তােরা আমার কি সর্বনাশ করলি রে, আমার জামাইকে মেরে ফেললি।” বােকার বৌ মাগাে' বলে অজ্ঞান হয়ে গেল। অমনি চিৎকার উঠল ওরে জল নিয়ে আয়, পাখা নিয়ে আয়। সবাই মিলে বােকার চোখে মুখে জল ছেটাতে লাগল, কেউ পাখা করতে লাগল। বৌয়েরও শুশ্রূষা চলল । জ্ঞান ফিরতেই বােকা আমি চোর নই গাে, বলে চিৎকার করতে লাগল। সেই চিৎকারে বৌয়ের দাঁতকপাটি ছাড়ল। সবাই মিলে বােকাকে ধরে ঘরে নিয়ে গেল। পাড়ার লােক যে যার পথ দেখল। বলতে লাগল শুধু প্যান্ট পরে কেউ শ্বশুরবাড়ি আসে, লজ্জা নেই জামাইটার।

রাত্রে বিছানায় বৌ বােকার কাছে সব শুনল। বৌ হেসে পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। বলে লােকটা কেউ ছিল না গাে, ও তােমারই ছায়া। বােকানিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেই হেসে ফেলে।

Comments

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো