অলংকরণ - প্রান্তিকা মাইতি

অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল বনাম আঁতেল
পর্ব- ১৩

স ন্দী প  কা ঞ্জি লা ল


বুদ্ধিজীবী জন্ম রহস্য 


ঘটনাঃ (১) ১৩ই জানুয়ারী ১৮৯৮ এক ব্যক্তি 'ভোর' নামে এক খবরের কাগজে চিঠি লিখছেন দেশের রাষ্ট্রপতিকে, সাড়ে চার হাজার শব্দের। প্রথমেই লেখা, আপনি অপরাধী। আপনাকে আমি অভিযুক্ত করছি। 
ঘটনাঃ (২) ২০শা জানুয়ারী ১৮৯৮ এই চিঠি লেখার জন্য, লেখককে কারাবাস ১(এক) বছরের। লেখক লুকিয়ে পালিয়ে গেলেন লন্ডনে। 
ঘটনাঃ (৩) এই ঘটনার প্রতিবাদ করে, সর্বপ্রথম 'অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল' (ইন্টেলেকচুয়াল) বা বুদ্ধিজীবী শব্দের প্রয়োগ। 
ঘটনাঃ (৪) ভুল বুঝতে পেরে চিঠির লেখককে ১৮৯৯ সালে জনমতের চাপে দেশে ফিরিয়ে আনা। 
ঘটনাঃ (৫) ১৯০১-১৯০২ নোবেল পুরষ্কারের জন্য চিঠির লেখকের নাম বিবেচিত হওয়ার সত্ত্বেও দেওয়া হয়নি। 
ঘটনাঃ (৬) প্রচণ্ড শীতের রাত! ঘরের ভিতর আগুন জ্বলছে উষ্ণতার জন্য। রাত্রে ঘরে চিমনি বন্ধ। ভেতরে কার্বন মনোক্সাইড জমা হয়ে চিঠির লেখকের সপরিবারের মৃত্যু। ঐ বাড়ির ঝাড়ুদার পরে জানায় সে চিমনি বন্ধ করে দিয়েছিল। তাহলে চিঠির লেখককে সপরিবারে মেরে ফেলা হয়েছে? হত্যার ষড়যন্ত্রকারী কে? রাষ্ট্র? 

ঘটনার স্থল ফ্রান্স! চিঠি লেখক ফরাসি ঔপন্যাসিক নাট্যকার 'এমিল জোলা' বিশ্বের প্রথম বুদ্ধিজীবী! চিঠি দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতিকে 'ড্রাইফাস' মামলায় মাননীয়  বিচারপতি রাষ্ট্রের চক্রান্তে অন্যায় অর্ডার দেওয়ার জন্য। 
অগ্রগণ্য ভাষাতত্ত্ববিদ, দার্শনিক 'নোয়াম চমস্কি' এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'বুদ্ধিজীবী' নিয়ে ধারণাটি খুবই কৌতূহল জাগায়। 'ড্রাইফাস' মামলার আগে পর্যন্ত শব্দটির ব্যবহার ছিল না, ড্রাইফাসপন্থীদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। আদতে তীব্রভাবে নিন্দা জানানো হয়েছিল তাদের,যারা এইসব লেখক শিল্পীরা, রাষ্ট্রের সম্রাট ও এর প্রতিষ্ঠান সমূহকে আঘাত করার জন্য উদ্যত হয়েছিল। দার্শনিক 'নোয়াম চমস্কি' র কথায়, বিশ্বের প্রথম বুদ্ধিজীবী হল লেখক ও সাহিত্যিক। অথচ আজকের লেখক সাহিত্যিক অধিকাংশ চাঁদ ফুল নদী লতা পাতা আর নারী নিয়ে দিন কাটিয়ে দিল। সেই শূন্যস্থানে উঠে আসছে একদল এঁচোড় পাকা স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী! এসব বিষয় নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। এখন আলোচ্য বিষয় 'ড্রাইফাস' মামলা কী? কিভাবে 'বুদ্ধিজীবী' শব্দের উৎপত্তি? 
ফ্রান্সের একটি দৈনিক খবরের কাগজ 'ভোর' যার প্রত্যেকদিন কপি বিক্রির সংখ্যা ত্রিশ হাজার। সেই কাগজটির বিক্রির সংখ্যা রাতারাতি বেড়ে হয়ে গেল তিন লাখ। সেই কাগজে কী ছিল? ছিল ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি 'ফেলিক্স ফোর' কে লেখা একটি চিঠি। যার প্রথমেই ছিল "আমি অভিযোগ করছি" (I accuse...)। লিখছেন ফরাসি বাস্তববাদী ঔপন্যাসিক, 'জেরমিনাল' উপন্যাসের স্রষ্টা 'এমিল জোলা' এই চিঠিটি লেখার সঙ্গে সঙ্গে সেই পাঁচ পয়সার দামের কাগজ 'ভোর' ঢুকে গেল ইতিহাসের পৃষ্ঠায়।'এমিল জোলা' র কলম ছিল খাপ খোলা ধারালো ইস্পাতের তরবারী! যার দ্যুতি ঠিকরে পড়েছে ফ্রান্সের মানুষের চোখে মুখে। তিনি ঘুরছেন ন্যায় ও সত্যের সন্ধানে। যা পরে হয়ে দাঁড়াবে তার মৃত্যুর কারণ। 
ঘটনার সূত্রপাত ১৮৯৪ সালের ডিসেম্বর। ফরাসি বিপ্লবের একশো বছর পরে।'আলফ্রেড ড্রাইফাস' যিনি ফ্রান্সের আলজাসের এক নগণ্য ইহুদি আর্টিলারি অফিসার। ফরাসি সেনাবাহিনী অভিযোগ আনে, ফ্রান্সের সামরিক তথ্য জার্মান দূতাবাসে পাচার করেছেন তিনি।তাঁর এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাকে পাঠানো হয় ফ্রান্সের গায়নার "শয়তানের দ্বীপ" এ। যেখানে সে পাঁচ বছর এক নির্জন দ্বীপে শাস্তি ভোগ করে। এর ঠিক দু'বছরের মাথায় ১৮৯৬ সালে ফ্রান্সের গুপ্তচর বিরোধী কমিশনের প্রধান "জর্জ পিকার" নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করে জানতে পারে। "ড্রাইফাস" দোষী নয়, মূল অপরাধী "এস্তেরাজি" নামে এক খৃষ্টান ফরাসী সেনাপতি। সেনাবাহিনীর কর্ণধারেরা আসল কাগজপত্র লুকিয়ে দুদিনের বিচারের প্রহসনের পর তাঁকে খালাস করে দেয়। আবার নতুন করে কাগজপত্র সাজানো হয় "ড্রাইফাসে"র বিরুদ্ধে। 
এই সত্য ঘটনা চাপা দেওয়ার খবর দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়লো ফ্রান্সের বন থেকে বনান্তরে। প্রত্যেকটি অবলা প্রাণীর মুখে সেই খবর।আর তা বলতে না পারার জন্য তারা ছটফট করছে। আকাশ বাতাস সমুদ্র নদী প্রান্তর দিগন্ত বলতে না পারার জন্য মন মরা। ফ্রান্সের কথা বলা প্রাণীর ও কানে কানে এই খবর পৌঁছে গেছে। কিন্তু কারোর মুখ থেকে কথা ফুটছে না। প্রত্যেকেই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। নিজের সংসার স্ত্রী ছেলেমেয়েদের নিয়ে। কিন্তু যার কলম তরবারী হয়ে ঝলকাচ্ছে, যার একমাত্র প্রতিজ্ঞা অন্যায়ের নিধন, তিনি চুপ করবেন কেন? ইতিহাস যাকে আমন্ত্রণ জানায়, তিনি কি আর চুপ থাকতে পারেন? তাই তিনি ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতিকে খোলা চিঠি দেন, আপনি অপরাধী। আর সেনাবাহিনীর জেনারেল 'পেলিও' কে লেখেন, "আপনি তলোয়ার চালান, আমি কলম। ইতিহাস বিচার করবে কার জয় হবে।" হ্যাঁ, ইতিহাস বিচার করেছে। তার ন্যায়ের তুলাদণ্ডে নিক্তি মেপে বিচার করেছে। ইতিহাস তার মাথায় পরিয়ে দিল নতুন মুকুট - বিশ্বের প্রথম "বুদ্ধিজীবী"। তখন পাখিদের ছটফটানি বন্ধ, সমুদ্রের ঢেউ শান্ত, বাতাসের মৃদু মন্দ বিচরণ, দিনের আকাশে স্মিত সূর্যের কিরণ আর রাতে চাঁদের মুখে সেকি প্রশান্তি! দূরে দিগন্ত আর মাটির লুটোপুটি! প্রান্তর ও বা চুপ করে বসে থাকবে কেন? সে ও ফুটিয়েছে অবাক করা ফুল। 
এই ঘটনা সমগ্র ফ্রান্সকে দ্বিখণ্ডিত করে দিল। এমিল জোলার সাথে যোগ দেন বিজ্ঞানী এমিল দুক্লো, চিত্রশিল্পী ক্লোদ মনে,সাহিত্যিক জুল ব্যনার, ঐতিহাসিক গাব্রিয়েল মনো, আরও অনেক প্রথিতযশা মানুষ। আর এর মুখ্য ভূমিকায় সংবাদপত্র এবং সাহিত্যিক "এমিল জোলা"। যে ঘটনা ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় অবিচারের এক প্রতীক হয়ে উঠবে, তা বারো বছর ধরে, ফ্রান্সের ভূগর্ভ থেকে টেনে আনবে তপ্ত ম্যাগমা। যা লাভা হয়ে ছড়িয়ে পড়বে গোটা ফ্রান্সের প্রান্তরে। 
২০শা জানুয়ারী ১৮৯৮ দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ নেতা "আলব্যের দ্য মুন" জোলার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন সংসদে এবং তাঁর শাস্তির দাবি করেন। ২৩শা জানুয়ারী "জর্জ ক্লেমাঁসো" এই ড্রাইফাস কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম- "অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল" (ইন্টেলেকচুয়াল) শব্দটি প্রয়োগ করেন। এই "এমিল জোলা"র পথ ধরে মুক্ত চিন্তক প্রজাতন্ত্রীরা সরকারের উপর চাপ দিতে শুরু করলো। উলঙ্গ হয়ে যায় সমাজের লুকিয়ে থাকা সব ক্ষত, আর শিল্পী সাহিত্যিকদের সামনে এঁকে দেয় প্রশ্নচিহ্ন, কারা তোষণ করবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে? কারা ব্যস্ত থাকবে তারা নদী ফুল গাছ নিয়ে? আর কে বা কারা এসব প্রত্যাখ্যান করে তৈরি করবে মানুষের প্রকৃত ইতিহাস? 
জোলার পথ ধরে "ড্রাইফাসপন্থী" মুক্ত চিন্তকের দল সরকারের উপর চাপ দিতে শুরু করে পুনর্বিচারের জন্য। অন্যদিকে "ড্রাইফাসপন্থী"দের বিরুদ্ধে ইহুদিবিরোধী মুখপত্র 'মুক্তকথা' য় ক্রমাগত বিষবর্ষণ। সরকারপন্থীরা তথাকথিত প্রতিরক্ষা, সমাজ সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা বলে চিহ্নিত করলো "এমিল জোলা" ও তার সম্প্রদায় রাষ্ট্রদোহী। ফ্রান্সের বুদ্ধিজীবীরা দ্বিখণ্ডিত হলেন। সরকারের পক্ষ থেকে এবং সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে "এমিল জোলা" দের জন্য সংগঠিত হতে লাগলো চক্রান্ত। তখনই ফ্রান্স জুড়ে এক নতুন শক্তির জন্ম হল-'বুদ্ধিজীবী'। একদিকে নতুন বিচারের দাবি, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী নেতা "মরিস বারেস" এর মতে, "ওই আভিজাত্যেরা জনতাকে ঘৃণা করে, জনগণ  থেকে আলাদা শ্রেণী হিসেবে চিহ্নিত হতে চায়।" 
যখনই "জোলা" র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলো, তখনই "ড্রাইফাসপন্থী" মুক্ত চিন্তার মানুষেরা, ২৬১ জন শিক্ষক, ২৩০ জন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করে পুনর্বিচারের।এর পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের সমাজে রাজনীতি এবং দর্শন বিষাক্ত হয়ে উঠে। একদিকে মাত্র কয়েকজনের স্বাধীন চিন্তার সাম্প্রদায়িকতাহীন মানুষের  লড়াই। অন্যদিকে জার্মান বিদ্বেষ, ইহুদিদের প্রতি অসম্ভব ঘৃণা জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়। তাদের পিছনে ফ্রান্সের অধিকাংশ মানুষ। চারদিকে আওয়াজ উঠে "ড্রাইফাসপন্থী" মানে রাষ্ট্রদোহী। একদিকে ন্যায় বিচারের জন্য গুটিকতক মানুষের লড়াই, অন্যদিকে দেশের জাতীয়তাবাদীর জিগির তুলে জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা। এইসময় জাতীয়তাবাদী নেতা "মারেস বারেস" এর সেই কুখ্যাত উক্তি, "যুক্তি দিয়ে হবে না, এসময় দরকার আবেগের শক্তি, জাতীয়তাবাদ মানে আত্ম পূজা।" 
শুরু হলো নতুন লড়াই মুক্ত চিন্তা বনাম জাতীয়তাবাদ। এরপর ফ্রান্সের সরকার ব্যাস্ত হয়ে উঠলো "জোলা" কে এদেশ থেকে তাড়ানোর। প্রমাণ করতে সচেষ্ট হল, "জোলা" নাকি বহিরাগত। তিনি নাকি "ভেনিসীয়", তার বাবা ইতালীয়। তিনি আদপেই ফরাসি না।তাই তার দেশের ব্যাপারে কথা বলার অধিকার নেই। "রম্যাঁ রলাঁ" প্রথমদিকে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও, শেষ পর্যন্ত সবকিছু বুঝে শুনে 'জোলা'র পাশে দাঁড়ান। মুক্তমনকে এভাবে ভয় দেখানো যায়? যে "জোলা" সাহস রাখেন এক দেহোপজীবিনীকে জীবন সঙ্গিনী বানাবার, তৃতীয় নেপোলিয়নের চোখে চোখ রেখে কথা বলার হিম্মত বা চিরপ্রতিবাদী ভিকতর য়ুগ্যোর শোক মিছিলে লাল গোলাপে পথ হাঁটার মানসিকতা। তাই তো তাকে ফ্রান্সের সরকার ১৮৯৮ সালে একবছরের জন্য কারাদণ্ড দেয়। তিনি সেই শাস্তি এড়াবার জন্য লন্ডনে চলে যান। তিন মাস পরে জনমতের চাপে বাধ্য হয় সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে। 
"জোলা" যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তার উত্তাপে বাধ্য হয় ফ্রান্সের সরকার ১৯০৬ সালে "ড্রাইফাস" কে মুক্তি দিতে এবং তাকে সসম্মানে মেজর পদে উন্নীত করে পুনর্বহাল করতে। 
কিন্তু "ড্রাইফাস" এর মুক্তির চার বছর আগে ১৯০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ রাত্রে জোলার ঘরে চিমনি বন্ধ। ঘর ভর্তি হয়ে গেল কার্বন মনোক্সাইডে। মারা গেল জোলা সপরিবারে। "জোলা" র বাড়ির ঝাড়ুদার পরে  জানায়, সে নিজে রাত্রে চিমনি বন্ধ করে দিয়েছিল। কার নির্দেশ ছিল? রাষ্ট্র? 
তবু "জোলা"র শেষ কৃত্যে যোগ দিতে এসেছেন হাজার হাজার মানুষ। শাসক কি বাধ্য করতে পারে ইতিহাসকে নিজের পথে চালাতে? পারেনা! তাইতো যেখানে অন্যায়, যেখানে "ড্রাইফাস", সেখানে দাঁড়িয়ে একটি কলম যা খোলা তরবারীর মতো ধারালো, তাই হাতে প্রথম বুদ্ধিজীবী "এমিল জোলা", যে প্রস্তুত সরকারের দেওয়া পুরষ্কারের উপর পেচ্ছাপ করতে।
      এমিল জোলা