গণতন্ত্রের বধ্যভূমিতে অলীক কুনাট্য/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

গণতন্ত্রের বধ্যভূমিতে অলীক কুনাট্য

সন্দীপ কাঞ্জিলাল

একজন শাসকের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল তাঁর রাজত্ব ও রাজ্যকে নিজের অধীনে রাখা। সার্বভৌমত্ব ও শাসনাধীন রাজ্য যেন তাঁর অনুগত থাকে। 
আর এক ব্যক্তি মানুষের কামনা হল, নিজেকে সর্বদিক দিয়ে সুরক্ষিত রাখা। প্রথমে একটু আলোচনা করি সার্বভৌমতা কাকে বলে? সার্বভৌমত্ব বলতে কোনো দেশ বা রাষ্ট্রের নিজের অভ্যন্তরীণ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতাকে বোঝায়। অর্থাৎ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র অন্য কোনো শক্তি বা রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল বা অন্য রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত নয়। আর সার্বভৌম ব্যক্তি কোনো পরিচালনা পরিষদ বা বাইরের কোনো উৎস বা সংগঠনের হস্তক্ষেপ ছাড়া কাজ করার পূর্ণ অধিকার ও ক্ষমতা চায়। সার্বভৌম কেবল নিজের এলাকার চূড়ান্ত কর্তাই নয়, সে তার কর্তৃত্ব আর কারোর সাথে ভাগ করে না। কারণ সে মতবিরোধ সহ্য করতে পারে না। সার্বভৌমের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকবে না, যদি তার বাইরে কোনো সালিসি শক্তি থাকে। যে নির্ধারণ করবে কখন সার্বভৌম শর্ত ভঙ্গ করেছে। 

  আমাদের দেশে এই সালিসি শক্তি হচ্ছে জনগণ। সে কারণে আমাদের দেশে শাসকের অন্যায় আচরণ দেখলে আন্দোলন সংগঠিত হয়। যে জন্য পাঁচ বছর অন্তর ভোটের মাধ্যমে আমরা শাসক পাল্টাই। 
শাসক কাকে বলে? যিনি শাসন করেন। ইংরেজিতে যাকে বলে গভর্ন। গভর্ন বলতে অনেক সময় শাসন করা বা পরিচালন করা বোঝায়। যখন বলি নিজেকে গভর্ন করা প্রয়োজন তখন নিজের শাসন বা পরিচালনা করাও হয়। অর্থাৎ গভর্নমেন্ট বলতে আমরা এমন এক কার্যপ্রণালী বুঝবো, যার উদ্দেশ্য হলো মানুষের আচরণকে গড়ে পিটে নেওয়া। 
দার্শনিক ফুকো বলেছেন, গভর্নমেন্টকে দেখা হয়েছে বস্তু সামগ্রীর সঠিক বিলি ব্যবস্থা প্রণালী হিসেবে। সত্যি বলতে কী, সার্বভৌম, যদি ভালো সার্বভৌম হন, তবে তিনি সবসময় সকলের সুখ সমৃদ্ধি কামনা করেন এবং সকলের কল্যাণের জন্য কাজ করবেন। অর্থাৎ 'সাধারণের হিত' করবেন। 'সাধারণের হিত' মানে আইনকে মান্যতা দেবেন। আবার শাসকের শাসনতন্ত্র 'সবার এবং প্রত্যেকের জন্য', অর্থাৎ শাসন প্রতিটি ব্যক্তি ও জনসমূহ এই দুইয়ের জন্যই হতে চায়।
 একজন শাসক তার শাসন ক্ষমতা পান ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তিনি এর অংশ নন, তিনি এর বাইরে থাকেন। তাহলে বলা যেতেই পারে, এই শাসন ক্ষমতা অবশ্যই ভঙ্গুর এবং সবসময়ই আশঙ্কা থাকে তার গদি উল্টে যাওয়ার। জনগণও তাকে সরিয়ে দিতে পারে। 

  সরকারের কাজ হলো, মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করা। কিন্তু ফ্যাসিবাদীরা চায় সরকার যেন মানুষের স্বাধীনতার দ্বারা গঠিত না হয়। আর তা যদি হয়,তবে শাসকের ক্ষমতা হারানোর ভয় থাকে। ফ্যাসিবাদ বলতে বোঝানো হয় সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে সরকার জাতীয়তাবাদী শ্লোগান ও ধর্মের সুড়সুড়ি দেয়। মানবাধিকারকে তারা বুড়ো আঙুল দেখায়, শত্রুর ভয় ও দেশের নিরাপত্তার কথা উসকিয়ে তারা একটা কমন শত্রু খাড়া করে। যাকে দেখিয়ে জনগণকে ধোঁকা দেয়। দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা হয় দেশের সৈন্যরা অতিশয় মহৎ। যে কারণে বাজেটে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো হয়। ফ্যাসিবাদী সরকার সাধারণত দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠের ধর্মকে দাবার চাল হিসেবে ব্যবহার করে। ধণিক ব্যাবসায়ী ফ্যাসিবাদী সরকার গঠনে সাহায্য করে। এবং সরকার ঐ গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখভাল করে। শ্রমিকদের একতাবদ্ধ আন্দোলনকে এরা ভয় করে। তাই তারা ধর্মঘট শ্রমিক ইউনিয়ন দেশে বন্ধ করে দেয়। বুদ্ধিজীবীদের উপর নেমে আসে শাস্তির খাড়া। এবং সমগ্র মিডিয়া সমাজকে এরা নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে। ভোটে জেতার জন্য জনগণকে বিশ্বাস করে না।কর্পোরেট সংস্থাকে কাজে লাগায়।

  দার্শনিক 'ক্লসউইৎজের' বিখ্যাত উক্তি- 'যুদ্ধ হল অন্য উপায়ের মাধ্যমে রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া।' আর রাজনীতি হল অন্য উপায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। যার ফলে একজন শাসক সর্বশক্তি এবং সর্বপ্রকার কৌশল প্রয়োগ করে, ভোটে জিতে নিজের ক্ষমতাকে ধরে রাখতে। উপরে উল্লেখ করেছি, সরকার মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করে। কিন্তু যে সরকার নিজে স্বাধীন মতামতের দ্বারা গঠিত হয় না,  সে আবার মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করবে কি করে? যখন শাসকের একমাত্র কাজ হলো শুধু ক্ষমতা ধরে রাখা, তখন গনতন্ত্র ধর্ষিত হয়। আবার খোঁজা হয় সেই ধর্ষণের প্রেক্ষিত। গণতন্ত্র মানে- যেখানে বাহুবলীরা ভয় দেখিয়ে নিজের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করে, বা ভোট দিতে দেয় না। গণতন্ত্র বলতে- সংখ্যার প্রাধান্যে যারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট তারা প্রতিভাসম্পন্ন গুণীজনকে বিনাশ করে, আদর্শহীন রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করে। তাই করতে গিয়ে কোনো শাসক ধর্ম নিয়ে খেলছেন, কেউ বা আবার সহানুভূতি আদায়ের জন্য বিভিন্ন প্রকার কৌশল প্রকরণ হাজির করছেন। আর শাসকরা মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে মূল্য না দিয়ে মন্দিরে মসজিদে ঘুরছেন। 

  আর তাদের পোষিত মিডিয়া মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা বাদ দিয়ে ঘন্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করছেন, এইসব বিষয় নিয়ে। ১৪৮৭ সালে হাইনরিখ ক্রেমার নামে এক ধর্মযাজক একটি বই লিখেছিলেন- ম্যালিয়াস ম্যালিফিকেরাম বা ডাইনির হাতুড়ি। বইতে বলা হয়েছিল সাধারণ মানুষ কীভাবে সহজে বুঝবেন কে ডাইনি নয়। আর কীভাবেই বা চালাবেন ডাইনি খতম অভিযান। এই বইটি লুথারের বাইবেলকে ছাপিয়ে গেছে বিক্রিতে।

  সমকালীন ইতিহাসবিদ নিয়াল ফারগুসন বলেছিলেন, ম্যালিয়াস ম্যালিফিকেরাম বা ডাইনির হাতুড়ি হল বর্তমানের সংবাদ মাধ্যম। যারা খবর তৈরি করে, নকল খবর বানায়, কিংবা মানুষের আশা, আকাঙ্খা, বেকারত্বের কথা বাদ দিয়ে শাসকের ভোটে জেতার নাটককে প্রচার করতে ব্যস্ত থাকে। ঘন্টার পর ঘণ্টা সেই নাটক দেখিয়ে তারা মানুষকে ব্যস্ত করে, সেই শাসকের দিকে মনোভাব ঘুরিয়ে দিতে। আর সন্ধ্যাবেলায় চা বিস্কুট সহযোগে কিছু ক্রিটিক টি.ভি.তে উপস্থিত হন, নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে। 

  এখন আর গণতন্ত্র মানে শুধু জনগণের স্বর নয়। আজকাল দেখা যাচ্ছে সব থেকে বড় স্বর হল শাসকের নিজস্ব স্বর। তার মধ্যে মিশে থাকে আমিত্বের অহংকার। সেখানে বড় হয়ে উঠে আমিত্ব। আমি-ই সব। আমি-ই সব কেন্দ্রের প্রার্থী, সুতরাং আমি-ই সব। আর সব মিথ্যা। আমি-ই যা বলবো, তাই সত্যি। একটি ঘটনা নিয়ে আমার বক্তব্যই শেষ কথা। পুলিশ প্রশাসনের তদন্তের আগে আমি-ই বলে দেব, কোন ঘটনা কী!  আর তাই নিয়ে সংবাদ মাধ্যম সব ভুলে সেই ঘটনা নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকে। আর আমরা সাধারণ মানুষ, সারাদিন সব ভুলে তাই দেখতে থাকলাম। 

আর যারা টিভিতে সান্ধ্যকালীন আসরে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে উপস্থিত হন, তাঁদের অধিকাংশ ভুলে যান, সাধারণ মানুষ অনেক কিছু বোঝেন আর জানেন। তাঁরা ভুলে যান তাঁদের কাজ জ্ঞানের মধ্যে কি মিথ্যা প্রবেশ করেছে, বা জ্ঞান কোথায় তার মাত্রা ছাড়িয়েছে তাই খুঁজে বের করা। শুধুমাত্র সমালোচনার স্বার্থে, শুধু সমালোচনা করবো বলেই, বা শাসকের অন্যায় কাজকে সমর্থন করার জন্য, তাঁদের ডাকা হয়নি, আর এটা তখনই সম্ভব যখন তিনি কোনো ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হন। 

  এখন প্রচার চলছে ধর্ম আর দেশ নিয়ে।  এখন চলছে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ। যে বাদানুবাদের কোনো সারবত্তা আছে?না কি পুরোটা লোক দেখানো!

  কারণ, যাতে সমস্ত জনগণ বেকারত্বের কথা ভুলে, কৃষক শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকারের কথা বিস্মৃত হয়ে, পরিযায়ী শ্রমিকের কথা বেমালুম চেপে, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হাওয়ায় ভাসিয়ে, নকল অভিনয় দেখে যেন ঘোরের মধ্যে থাকে। আবার মুখে বলছে, জনগণ দেবতা। মাথা নুইয়ে, সুনিপুণ কথার জালে সমস্ত শ্রদ্ধা ভক্তি অর্পণ করে গণদেবতার পায়। আমরা সাধারণ মানুষ ভুলে যাই শয়তানের সবচেয়ে বড়ো ছল, আমাদের নিশ্চিত করা যে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আর আমরা জনগণ গণতন্ত্রের বধ্যভূমিতে অলীক কুনাট্য দেখতে দেখতে তলিয়ে যাচ্ছি ঢাকনাহীন ম্যানহোলে। যেখান থেকে বেরোবো লাশ হয়ে। আর এক ক্ষ্যাপা, যে সারাজীবন হায়রান পরশ রতন খোঁজে। সে তো বলেই দিয়েছে, ঢোঁড়া নয় জাত কোবরা। এক ছোবলেই ছবি। 

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি