আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৩৪/ শ্যামল জানা

আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৩৪

শ্যামল জানা

ক্রিস্টাল কিউবিজম্ (১৯১৪ – ১৯১৮)

১৯০৭ সালে “লে দ্যামোয়াজেলস দ’ অ্যাঁভো” থেকে কিউবিজম্-এর সূত্রপাত হওয়ার পর নানা মতামতের ভেতর দিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা কিউবিজম্-কে যে চার ভাগে ভাগ করলেন, তা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে৷ সেগুলি হল— Proto-Cubism (১৯০৭-১৯০৮), Early Cubism (১৯০৯-১৯১৪), Crystal Cubism (১৯১৪-১৯১৮) ও Cubism after 1918 ৷ আমরা ইতিমধ্যে প্রথম দুটি ও তার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য বিষয়গুলির আলোচনা করে ফেলেছি৷

    এবার আমরা আসব ক্রিস্টাল কিউবিজম্-এ৷ জন্মের পর থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে প্রায় সাত বছর ধরে এগিয়ে চলার পর কিউবিজম্ নিয়ে যে সব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভাঙচুর বা অদল-বদল ঘটেছিল, তার অধিকাংশটাই ঘটেছিল ১৯১৪ থেকে ১৯১৬-র মধ্যে৷ এই সময়কালকেই ক্রিস্টাল কিউবিজম্ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷
তবে, এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল— কিউবিজমকে কেন্দ্র করে ছবিতে জ্যমিতিক সমতল ও সমতল পৃষ্ঠদেশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা৷ আর, এই যে চিত্রকলার শৈলীর ও ভাস্কর্যের শৈলীর যে সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল, তা মূলত ঘটেছিল ১৯১৭ থেকে ১৯২০-র মধ্যে৷ আর, এই চর্চা ওই সময় বহু চিত্রশিল্পী ও ভাস্কররা করতে শুরু করেছিলেন৷ বিশেষ করে, ‘লিওন্স রোজেনবার্গ’(সেই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চিত্রশিল্প সংগ্রাহক ও আর্ট ডিলার৷)-এর অধীনে যে সব চিত্রশিল্পীরা চুক্তিবদ্ধ ছিলেন তাঁরা এই চর্চা বাধ্যতামূলকভাবে করেছিলেন৷ এই চিত্রশিল্পীদের ছবির কম্পোজিশন ছিল অত্যন্ত আঁটোসাঁটো৷ যাইই আঁকুক না কেন, সেগুলি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, কোথাও কোনো ধোঁয়াশা ছিল না৷ আর, অত্যন্ত নিপুনভাবে এই সব কিছুর সমন্বয়সাধন করতেন পুরো ছবিটিতে৷ কোথাও কোনো অস্পষ্টতা থাকত না, একেবারে স্বচ্ছ (Crystal)৷ এরকম নিখুঁতভাবে তাঁরা করতেন বলেই সেই সময়ের সবচেয়ে কড়া সমালোচক ‘মৌরিক রেনাল’ কিউবিজম্-এর এই ধরনটির নাম দিয়েছিলেন ‘ক্রিস্টাল কিউবিজম্’৷

এই কিউবিস্ট শিল্পীরা প্রথম ছবিতে সময় সংক্রান্ত বিষয়গুলিকে যুক্ত করার জন্য বিবেচনা করলেন, বা ভাবলেন৷ এগুলি যে ছবির বিষয় হতে পারে, তা এতদিন কেউ কল্পনাতেও আনতে পারেনি! এই সময় সংক্রান্ত ভাবনাগুলির সূত্রপাত হয়েছিল ‘ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল রেভলিউশন’ ও ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’-র মতো ঘটনা ঘটেছিল বলেই৷ এই দুটি ঘটনা সামগ্রিকভাবে গোটা পৃথিবীর অর্থনীতি, সমাজনীতি ও আধুনিকতার ধারণাকে আমূল পাল্টে দিয়েছিল৷ মানুষের আধুনিক জীবনে এসেছিল প্রচণ্ড গতিশীলতা৷ ফলে, সময় হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়! 

    ১৯০৫ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন “বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ-এর তত্ত্ব” ( Theory of special relativity) আবিষ্কার করেন ৷ বিষয়টি আমরা জানি ৷ পদার্থের ভর (Mass) ও শক্তি (Energy)-কে কেন্দ্র করে যে ফর্মুলা E = mc2 ৷ আইনস্টাইনের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের মধ্যে Spacetime একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৷ যার থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘ফোর্থ ডায়মেনশন’-এর ধারণা৷ পৃথিবীতে যত বস্তু আমরা দেখি, তাদেরকে এতদিন চারটি মাত্রায় ভাগ করা হত শূন্য মাত্রিক(Zeroth Dimention), প্রথম মাত্রিক( First Dimention), দ্বিমাত্রিক( Second Dimention), ত্রিমাত্রিক ( Third Dimention)৷ কিন্তু E = mc2 ফর্মুলা আবিষ্কারের পর আর একটি মাত্রা যোগ হয়ে পাঁচটি মাত্রায় ভাগ করা হল৷  সেটি হল— চতুর্মাত্রিক( Fourth Dimention)(ছবি-১)৷ যেটি তৈরি হল ‘স্থান ও সময়’(Spacetime)-এর প্রেক্ষিতে৷ প্রকৃতিতে থাকা ত্রিমাত্রিক বস্তুকে আমরা যেভাবে দেখি, সে যদি জায়গা পরিবর্তন করে, তাহলে, তার দৃষ্টিকোণ(Perspective)আালাদা হয়ে যাবেই৷ আমাদের চোখের দৃষ্টিতে বস্তুটি আমাদের দিকে এলে একটু বড় লাগবে, আর আমাদের দিক থেকে দূরে গেলে একটু ছোটো লাগবে, যা বাস্তবে সত্য নয়৷ বস্তুটি কিন্তু ছোটো হয়ে যায় না৷ তাহলে, কোনো বস্তু স্থান পরিবর্তন করলে, সে যে স্থানের ওপর ছিল, সেই স্থানটির যেমন পরিবর্তন হল৷ আবার, এই স্থান পরিবর্তন করার জন্য খানিকটা সময়ও লাগল৷ এটাকেই এক কথায় বলা হল— Spacetime ৷ মাত্রা হিসেবে চতুর্মাত্রিক( Fourth Dimention)(ছবি-১)৷ 
এই আধুনিক জন-জীবন অত্যন্ত গতিশীল হওয়ার কারণে সময় অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠল বলেই এই ফোর্থ ডায়মেনশনের সৃষ্টি হল।

সময় সংক্রান্ত আর একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার হল— হেনরি বার্গসন-এর ‘স্থিতিকালের ধারণা’(concept of duration)৷ থিওরিটির নাম— ‘সময় ও চেতনা’  (Time and consciousness)৷ একটি বস্তু, চলমান বা স্থির, সে কতক্ষণ একস্থানে স্থিতি হয়ে থাকবে(duration), এই ধারণাটি(concept) তৈরি হয় কণ্ডিশনের ওপর৷ আর, এই কণ্ডিশনটি বোঝার(Analyses) জন্য সময় সংক্রান্ত চেতনার (Time and consciousness) প্রয়োজন৷
সামন্ততন্ত্রের কালে সম্পত্তি বলতে বোঝাতো জমি(Land)৷ তখন ঘড়ি ধরে চলার কোনো প্রয়োজন পড়ত না৷ তেমনভাবে কোনো মূল্য ছিল না সময়ের৷ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশনের পর ঘড়ি ধরে চলা শুরু হল৷ কারখানায় শ্রমিকদের ঘড়ি ধরে ঢুকতে হত, বেরতে হত৷ এর জন্য আলাদা বিশ্লেষণ-এর বা চেতনার প্রয়োজন হত৷ কারখানায় বেরোবার আগে একঘন্টা লাগে চান-খাওয়া জামা-কাপড় পরতে৷ বেরোবার পর কারখানায় পৌঁছোতে সময় লাগে একঘন্টা৷ অর্থাৎ কারখানায় হাজিরা দেওয়ার দু-ঘন্টা আগে চান করতে না গেলে সময়মতো পৌঁছোতে পারব না, এই চেতনা মানুষের মগজে নতুন বিশ্লেষণের সুচনা করল৷ কিউবিস্ট চিত্রশিল্পীরা এই সময় সংক্রান্ত বিষয়গুলি কল্পনাতীতভাবে ছবিতে যুক্ত করার প্রয়াস নিল এতদিনের প্রচলিত ধারণাগুলিকে গণ্ডী ভেঙে ফেলে দিয়ে(ছবি-২)৷ 
ফলে, ১৯১৪ থেকে ১৯২০-র মাঝামাছি পর্যন্ত সময়কে বলা হয় কিউবিজমকে কলঙ্কমুক্ত করার সময়৷ এ সময় কিউবিস্টরা নিজেদের মধ্যে একতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা দিয়ে তৎকালীন ফরাসি সমাজ ও ফরাসি সংস্কৃতিকে রক্ষণশীলতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করে আধুনিক ও বৃহত্তর ভাবাদর্শে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছিল৷ (ক্রমশ)

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি