প্রকৃতির কবিতা ভবনে/গৌতম বাড়ই

প্রকৃতির কবিতা ভবনে

গৌতম বাড়ই

এই দু- দিনে টোটো চালক বিষ্ণু অনেকটা নিজের আপনজন হয়ে উঠেছে। বোলপুর স্টেশনে নেমে যে অস্থায়ী ডেরা বাঁধব বলে আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম, সেখানে নিয়ে যেতে দেখলাম একেকটা গাড়ি এক- এক রকম ভাড়া চাইছে। অথচ ভৌগলিক দূরত্ব তো আর গাড়ি বদলে পাল্টায় না! যত দেখি ততই এক বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা জন্মায়। দালালরাজ আর দালালদের খপ্পর থেকে যেন নিষ্কৃতি নেই। পুরো বোলপুর ষ্টেশন চত্বরের বাইরেটা আজ ওদের যেন মুক্তাঞ্চল। আর জানি এরা বেশ সংগঠিত  চক্র। কাজ নেই ওরা বেকার, তো বলির পাঁঠা এই বেড়াতে আসা লোকজন। নাও লুটেপুটে খাও। আর সাতপাঁচ ভেঙ্গে কী লাভ! অথচ তারপরের অভিজ্ঞতাটুকু খুব ভাল। এই যেমন বিষ্ণু, দু- দিনেই কত আপনজন হয়ে উঠেছে। 

-- দাদা আপনাকে আমি পুরো শান্তিনিকেতন আর আশপাশ ঘুরিয়ে দেখাব। 

আমি বলি ঠিক আছে বিষ্ণু। তুমি তোমার পারিশ্রমিক নিয়ে চিন্তা করবে না। দু- দিনেই দেখলাম বিষ্ণু বেশ ভাল গাইড- ও। কোথায় আলুর চপ, কোথায় মনকাড়া চা, কোথাকার এক অজানা জমিদারবাড়ি সব চেনাতে শুরু করল। ওর টোটোর সওয়ারী হয়ে অনেক কিছু জানলাম এই রাঙামাটির দেশের। একটা পুকুর দু- তিনটে তাল গাছ আর তার নিচে একটি শিবমন্দির। আঁকাবাঁকা পথ। লালমাটির ছোঁয়া। জনশূন্য অনেক সাধের বাগানবাড়ি একমাত্র  বৃদ্ধা বেতের চেয়ারে বসে। সামনে অযত্নের ঝোপঝাড়। আমলকি, শিমূল, পলাশ, জাম, কাঠগোলাপের গাছ এদিক- সেদিক। এখানে মনের বসত ঘরে বাউল ডেরা বাঁধবে না তো কোথায়? বৈষ্ণবী বলে দু- কাটাতে বাগান বাড়ি করা যায়? আমি বলি আমাদের হৃদয় অন্তর কত ইঞ্চির? ওখানেও করা যায়। মন তো আমার উদাস হয়ে ওঠে, যেমন উদাস হয়ে ওঠে কাঠামবাড়ির জঙ্গলে এক পানাপুকুর দেখে। বিষ্ণু ছন্দ কাটায় মনের। আমার কুটিরের জঙ্গল থেকে বেরুচ্ছি।

---- দাদা আমাদের এই মাটি আপনাকে বিবাগী করবেই ঘরে। দেখবেন আপনি আবার ছুটে আসবেন। ঐ বড় ঠাকুরকে কি কলকাতা ধরে রাখতে পেরেছিল? সেই যে এলেন আর এই শান্তিনিকেতন গড়ে তুলেছিলেন? অবশ‌ জানি এখন এই শান্তিতেও অনেক অশান্তির ছায়া। আপনি কখনো প্রকৃতি ভবনে গিয়েছেন? 

-- আনমনা আমি খোয়াই সোনাঝুড়ির সৌন্দর্য উপভোগ করছি। তাল কেটে বললাম-- না তো! ওখানে কী আছে?

-- আজ চলুন আপনায় বল্লভপুরে ঐ প্রকৃতি ভবন দেখাব। 

সোনাঝুড়ির হাটের আগেই বামদিকে নেমে গেল টোটো। সামনে প্রকৃতি ভবনের গেট। বাইরে থেকেই দেখে ভেতরে ঢুকবার জন্য মন চঞ্চল হয়ে উঠল। ওসব কী ভেতরের বাগানে? বড়- বড় প্রস্তরখন্ড, ভাস্কর্য আর সুন্দর একটি দোতলা ঘর। গেট দিয়ে ঢুকতেই সামনে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক বললেন-- সামনের কাউন্টার থেকে মিউজিয়ামে ঢুকবার টিকিটটি কেটে নিন। আর মোবাইলে ফটো তুললে তার জন্যও টাকা লাগবে। আমি এগিয়ে গেলাম বাঁ- হাতের কাউন্টারের দিকে।

প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে এখানে ওখানে পড়ে রয়েছে নেচার মিউজিয়ামের ভেতর ভাস্কর্য। গাছের গুঁড়ি, পাথরের চাঁই। সব প্রকৃতি থেকে আহরণ করা। কাস্টমসের এক বড়পদে আসীন সুব্রত বসুর একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভারতবর্ষের এই একমাত্র প্রাকৃতিক ভাস্কর্যের সংগ্রহশালাটি গড়ে উঠেছে বল্লভপুরের জঙ্গলে। সামান্য শেকড় বাকড়ও এখানে অসামান্য আর্ট। প্রকৃতি প্রেমী এই  শিল্পী কুড়িয়ে এনেছেন প্রকৃতি মায়ের বুক থেকেই। চমকে গেলাম মিউজিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করে। ইন্দিরা ঠাকুরণ যে! আরে এ ফুটবলারটি কে? একটা প্রস্তরখন্ড যে আদতে একটি ষাঁড়! দেশে- বিদেশে প্রায় তিরিশ বছর ধরে সুব্রতবাবু সংগ্রহ করেছেন তার প্রকৃতি ভবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় দেড়- হাজারের ওপর এই প্রাকৃতিক ভাস্কর্য আর শিল্প। ১৯৯৮ সালে এই প্রকৃতি ভবনের শুরু আর পূর্ণতা পায় ২০০৩ সালে। 

বিষ্ণু বলে--  দাদা ভাল লাগলো?

আমি বলি-- শুধু ভালো। বিষ্ণু আমায় তো তুমি কবিতার দেশে নিয়ে গেলে আজ। এরকম কবিতা আমিও কোনদিন লিখে উঠতে পারব না। শান্তিনিকেতনের এক স্থান মাহাত্ম্য আছে মানতেই হবে। 

-- তা ঠিক বলেছেন দাদা। আমরা অল্পে খুশি। বাউলমনা তো আমরা সবাই। কত কষ্ট গেছে দাদা কোভিডের সময়। তবে দানের বা ত্রাণের ভাগাভাগির অল্প পেয়েই আনন্দে আছি। 

এ ভবনে ঢুকলে হারিয়ে যেতেই হয়। বেলা পড়ে আসছিল। পলাশ শিমূল ফুটে রয়েছে থরে- থরে এখানে ওখানে। আমি ঘোরে রয়েছি শিল্পের। কিছু ফটো তুললাম আর ভেতরে যে পরম আনন্দ উপভোগ করলাম তা অনেক বেশি। আমাদের সৃষ্টির যে উৎস এই প্রকৃতি তা উপলব্ধি করলাম আবার এখানে এসে। সুব্রতবাবু নাকি বলেন-- প্রকৃতি আমাদের মা। আমরা এই মাকে আজ ভুলতে বসেছি। সেই প্রকৃতি মায়ের জন্য আমার সামান্য এই প্রয়াস। 

কূর্নিশ তাকে করতেই হয়। সেলাম তাকে জানাতেই হয়। বিষ্ণু সোনাঝুড়ির দিকে টোটো চালিয়ে যেতে যেতে বললে-- দাদা সত্যি করে বলেন  আপনার ভাল লেগেছে তো? চুপ করে আছেন কেন? জানেন এবারে তো বন্ধ আছে কোভিডে। প্রতিবার এখানে বাউল আর সুফী গানের মেলা হয়। দোল উৎসব, পৌষ মাসে উৎসব হয়। আসবেন, দেখাব।

কী করে বোঝাই তাকে। এ চুপ তো গভীরে ডুব মেরে। শেষের কবিতার অমিত- লাবণ্য , আর প্রবেশের শুরুতে মৈত্রীর পাথুরে ভাস্কর্য, বীর হনুমান, পেঙ্গুইন সবইতো কবিতার মতন ঘাসের মাঠেও  সাজিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। 

আমি শুধু বলি-- আবার ফের যখন আসব, আমায় এখানে নিয়ে আসবে। মন বলে তাই, "খোঁজ খোঁজ খুঁজলে পাবি, হৃদয়মাঝেই বৃন্দাবন। " তবে পাগল হতেই হবে সুব্রতবাবুর মতন হারিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির বৃন্দাবনে। এক পরম প্রকৃতি শিল্পীর আজ খোঁজ পেলাম, ছুঁয়ে এলাম রবি ঠাকুরের বোলপুরে।

পেজ-এ লাইক দিন👇

Comments

  1. অসাধারণ।সাধারণ কথার মাঝে অসাধারণ আপনার কোটেশন গুলো অনুভূতি কে আরও গভীর করে।
    খুব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি