জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯২

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯২
চিত্রগ্রাহক - নীলাব্জ ঘোষ

সম্পাদকীয়,
স্কুলে স্কুলে বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হলেই ছুটি। সেই ছুটিতে খেলাধুলা হবে জমিয়ে। ঠিক গগণজ্যোতি স্কুলের মতো। রতনতনু জ্যেঠু বলেছে পাথরকুসমা গ্রামের সবাই যাচ্ছে ক্রিকেট খেলা দেখতে। আমরাও যাব, তোমরাও এসো। পরীক্ষা শেষ হলেই আবার ফোন নিয়ে বসে যেও না। স্বাগতা পিসির গল্পটা পড়ে নিও ফোন পেলেই। নীলাব্জ মামার পাঠানো ছবিতে দেখছি পাথরকুসমা গ্রামের ঐ ছেলেটা গ্রামের মুখে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের পথটা চিনিয়ে দেবে বলে। গ্রামটার ছবি এঁকে পাঠিয়েছে সৌরদীপ। আর মোনালী ওর ভাইকে নিয়ে একটা মজার গল্প লিখে পাঠিয়েছে। আর মলয় জ্যেঠু প্রতিবারের মতো পাঠ প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছেন। সেই পাঠ প্রতিক্রিয়া ছোটোবেলার সম্পদ। এসো এবার খেলা দেখতে যাই। --- মৌসুমী ঘোষ।

ধারাবাহিক উপন্যাস

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
পর্ব ৮

রতনতনু  ঘাটী

আগামী শনিবার মাঠে ক্লাস এইট এ-সেকশানের সঙ্গে বি-সেকশানের ক্রিকেট ম্যাচ হবে। কিন্তু তার আগে মাঠে শুধু এ ক’দিন ক্রিকেট কোচিংই হবে না। হেডস্যার নিজে মাঠে হাজির থাকবেন এক-একদিন, এ কথা দেবোপমস্যারকে জানিয়ে দিলেন। হেডস্যার এও বললেন, ‘দেখি, তোমাদের ক্রিকেটের কোচিং কেমন চলছে। আমি নিজের চোখে একবার দেখতে চাই!’
   স্কুলের ঘন্টিদাদুকে সব ছাত্রছাত্রীরা ডাকে ‘ঘন্টিদাদু’ বলে। তাঁর আসল নাম সম্মতিচরণ দাস। স্কুলের রেজিস্টারে ওই নামই লেখা আছে। তবে সম্মতিচরণ নামটা কবেই ঢাকা পড়ে গেছে ‘ঘন্টিদাদু’ নামের আড়ালে। 
   ভূগোলের ভুবনস্যার একদিন ঘন্টিদাদুর গল্প করতে গিয়ে তাঁর চাকরিতে জয়েন করার কথা বলেছিলেন ছাত্রদের, ‘যখন ঘন্টিদাদু স্কুলের চাকরিতে জয়েন করেন, তাঁর নামটা চাকরির জন্যে রেফার করে পাঠিয়েছিলেন তখনকার পঞ্চায়েতরাজ অফিসের অবনীন্দ্রনাথ ঘোষ। তিনি মস্ত বড় স্বাধীনতাসংগ্রামী ছিলেন। নিজের হাতে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় একজন ইংরেজের স্পাই-চৌকিদারকে হত্যা করেছিলেন। তাই তাঁর কথা মান্যতা পেত গোটা পাথরকুসমা গ্রামে। অবনীন্দ্রনাথবাবু তাই সম্মতিমোহন দাসকে হেডস্যারের কাছে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তাঁর গগনজ্যোতি স্কুলে একটা চাকরি হয়ে যায়। 
   লোকটি স্কুলে এসে হেডস্যারের রুমে ঢুকে তাঁর হাতে একটা চিঠি দিয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়ালেন। হেডস্যার চিঠিটা পড়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বললেন, ‘ও, তোমাকে পাঠিয়েছেন অবনীন্দ্রনাথবাবু। হ্যাঁ, আমাকে ফোন করে বলেছেন তোমার কথা। তা হলে তুমি এক কাজ করো, এ মাস থেকেই কাজে লেগে পড়ো! তোমার নামটি কী?’
   লোকটির বয়স চল্লিশের বেশিই হবে। রোগা ছিপছিপে ধরনের চেহারা। শ্যামলা গায়ের রঙ। মাথায় ঝাঁকড়া কাঁচাপাকা চুল। ডান ভুরুর উপর একটা বড় আঁচিল। 
   লোকটি কাঁচুমাচু মুখ করে বললেন, ‘আজ্ঞে স্যার, আমার নাম সম্মতিচরণ দাস। বিজনডিহি গ্রামে আমার বাড়ি।’ 
   হেডস্যার থমকে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন মিনিট খানেক। তারপর একটা কাগজে কিছু লিখতে শুরু করলেন। তিনি সেই কাগজে লিখলেন, ‘মান্যবর অবনীন্দ্রনাথবাবু, আপনার পাঠানো লোকটিকে আমার স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর পদে নিয়োগ করতে আপত্তি নেই। শুধু একটাই ব্যাপারে আমার মন সামান্য অমত করছে। লোকটির নামটি বড় খটমট—‘সম্মতিচরণ দাস’! নামটা কি কারেকশান করে ছোট করে নেওয়া যায় না?’ 
   চিঠিটি নিয়ে লোকটি ছুটল অবনীন্দ্রনাথবাবুর কাছে।
   সে চিঠির উত্তর আসতে একটুও দেরি হল না। অবনীন্দ্রনাথবাবু তক্ষুনি লিখলেন, ‘মাননীয় নবনীতস্যার মহাশয়, আপনি ওর নামটা ছোটই করে দিন, না হলে মন চাইলে নামটা বড় করেও নিতে পারেন। কিন্তু চাকরিটা হোক। লোকটি খুব সৎ এবং বড় অভাবী মানুষ।’
   সে চিঠি নিয়ে তক্ষুনি লোকটি এসে হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করলেন। চিঠি পড়ে হেডস্যার হাসি ধরে রাখতে পারলেন না! বললেন, ‘তোমার নামটা স্কুলের রেজিস্টারে সম্মতিচরণই থাকল। ওই নামেই তোমার চাকরি হবে। কিন্তু তোমাকে আমি ডাকব ‘ঘন্টিচরণ’ বলে, কেমন রাজি তো?’
   তারপর নিজের মনেই কেমন দ্বিধায় পড়ে গেলেন হেডস্যার। কলমটা টেবিলে ঠুকঠুক করতে করতে বললেন, ‘না। তোমার নাম ‘ঘন্টিদাদু’ই থাক। ছেলেমেয়েদের পক্ষে ডাকতে সুবিধেই হবে। আমিও ওই নামেই তোমাকে ডাকব? তোমার আপত্তি নেই তো? তবে যখন স্কুলে ইনস্পেক্টর সাহেব আসবেন, বা বাইরের কোনও অতিথি আসবেন, আমি তাঁদের সামনে তোমাকে কিন্তু ‘সম্মতিচরণ’ নামেই ডাকব। যতই হোক, এটা তোমার বাবা-মায়ের দেওয়া নাম তো! তা ছাড়া তোমার তো একটা মানসম্মান আছে?’
   উত্তরে ঘন্টিদাদু মাথা চুলকে বললেন, ‘না না! সে কী কথা স্যার? আপনি পিতৃতুল্য মানুষ! আপনি যে নামেই ডাকুন, আমার সে নামটাই পছন্দ!’
   সেদিন থেকেই ঘন্টিদাদুর চাকরি হয়ে গেল। এখন স্কুলে সকলের কাছে খুব পপুলার ঘন্টিদাদু! 
   আজ শনিবার ঘন্টিদাদুকে ডেকে হেডস্যার বললেন, ‘ঘন্টিদাদু, অঙ্কের দেবোপমস্যারকে আমার রুমে একবার আসতে বলো তো!’    
   ঘন্টিদাদু গিয়ে বলা মাত্রই দেবোপমস্যার শশব্যস্ত হয়ে হেডস্যারের রুমে ঢুকলেন, ‘স্যার, আমাকে ডেকেছেন?’
   ‘বোসো দেবোপম! একটা কথা বলি। তোমার তো স্কুল ছুটির পর পুরোদমে ক্রিকেট কোচিং চলছে স্কুলের মাঠে। একটা ক্রিকেচট ম্যাচও হয়ে গেছে এর মধ্যে। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেশ একটা সাড়াও লক্ষ করেছি।’
   দেবোপমস্যার সম্মতির সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার! স্কুলে বেশ একটা সাড়াও পড়ে গেছে। এমনকী, শুধু পাথরকুসমা গ্রামেই নয়, এই গ্রামের বাইরেও আমাদের স্কুলের ক্রিকেট নিয়ে একটা সাড়া পড়েছে, আমি নিজের কানে শুনেওছি।’
   ‘তোমার ক্রিকেট কোচিং কেমন চলছে, আজ আমি একবার মাঠে গিয়ে নিজের চোখে দেখতে চাই?’
   ‘খুব ভাল কথা স্যার! আপনি তা হলে আমাদের কয়েকজন স্যারকেও মাঠে উপস্থিত থাকতে বলুন না! আর হ্যাঁ, শুধু স্যাররাই বা কেন, ম্যামদের দু’-তিনজন যদি হাজির থাকেন, খুব ভাল হয়। আমাদের স্কুলের মেয়েরাও তো ক্রিকেট খেলছে। ওরা ম্যামদের দেখলে উৎসাহিত হবে।’
   ‘ঠিক আছে, আলেখ্যম্যাম আর গীতিকাম্যামকে বলে দিচ্ছি! ওঁরাও যেন স্কুল ছুটির পর আজকের ক্রিকেট কোচিং দেখতে মাঠে উপস্থিত থাকেন!’
   খুশি মনে চলে গেলেন দেবোপমস্যার কথাটা স্কুলে রাষ্ট্র করতে। হেডস্যার ঘন্টিদাদুকে বললেন, ‘তুমি তো শুনলে ঘন্টিদাদু, আমরা কয়েকজন স্যার এবং ম্যামরা মিলে মাঠে আজ ক্রিকেট কোচিং দেখতে যাব। তুমি কয়েকখানা চেয়ার নিয়ে গিয়ে কর্পূর গাছের দিকে মাঠের ধারে সাজিয়ে দিও কোচিং শুরুর খানিকটা আগে।’ 
   অ্যাসেম্বলি হলে প্রেয়ার শেষ হওয়ার পর, আজ গানও হল। তারপর হল মহাজীবনের রচনা থেকে পাঠ। এবার হেডস্যার নিজে উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘আজ তোমাদের একটা দারুণ সংবাদ জানাই। হাফ-ডে স্কুল হওয়ার পর স্কুল ছুটি হবে না আজ। কী, আমার কথাটা শুনেই সকলের মুখ গোমড়া হয়ে গেল তো? কিন্তু আমার কথা শুনলে এক্ষুনি ফের হাসিতে ভরে উঠবে তোমাদের সক্কলের মুখ। আজ সক্কলে মাঠে চলে যেও। যারা-যারা পারবে শুধু তারাই যাবে। কোনও জারিজুরি নেই। কয়েকজন স্যার আর ম্যামের সঙ্গে আমিও মাঠে উপস্থিত থাকব। তোমাদের সঙ্গে আমরাও আজ ক্রিকেট কোচিং দেখব।’
   ঘন্টিদাদু স্কুলের হাফ-ডে ছুটির ঘন্টা বাজানোর আগেই নিজে সাতটা চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে সেট করে ফেললেন মাঠে কর্পূর গাছের দিকে। ঘন্টিদাদু বুদ্ধি খাটিয়ে মাঝখানে একটা হাতলওয়ালা বড় চেয়ার রেখেছেন। সকলে দেখে বুঝতে পারছি, সেই চেয়ারটা বলাই বাহুল্য, হেডস্যারের। তার বাঁ দিকে তিনটে এবং ডান দিকে তিনটে, মোট ছ’টা চেয়ার সাজানো হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, আজই কোনও একটা ফাইনাল ক্রিকেট ম্যাচ আছে নাকি? 
   ছুটির ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা ছুটল মাঠের দিকে। দেবোপমস্যার ক্রিকেট বলের ব্যাগটা নিয়ে খানিক পরেই মাঠে চলে এলেন। একটু পরেই দেখা গেল হেডস্যার এগিয়ে আসছেন মাঠের দিকে। তাঁর পিছন-পিছন ভূগোলের ভুবনস্যার, ইতিহাসের অনুলেখাম্যাম, জীবনবিজ্ঞানের মনোজেশস্যার, ফিজিক্সের যাদবমোহনস্যার এবং বাংলার গীতিকাম্যাম চলে এলেন। 
   এমন সময় গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠটা যেন গমগম করছে। এখন দেখা যাচ্ছে, পাথরকুসমা গ্রামের লোকজনও গুটিগুটি পায়ে অনেকেই মাঠের দিকেই আসছেন। স্কুলের ছেলেমেয়েরা মাঠের চাদ্দিকে কলকল করছে। এখন শুধু খেলা শুরুর অপেক্ষা! 
   আজ দেবোপমস্যারের মুখে হুইশল। তিনি হেডস্যারের দিকে ইঙ্গিতে খেলা শুরুর অনুমতি চাইলেন। হেডস্যার হাত নেড়ে অনুমতি দিলেন। দেবোপমস্যার বাঁশি বাজিয়ে ক্রিকেট টিমের ছেলেমেয়েদের প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। বললেন, ‘আজ হেডস্যারের সঙ্গে অন্য স্যার এবং ম্যামরাও ক্রিকেট কোচিং দেখতে মাঠে এসেছেন তোমরা দেখতেই পাচ্ছ। আমি আজ আর টস করলাম না। আজ প্রথমে ক্লাস এইটের সি-সেকশান ব্যাট করবে। আর বল করবে এইট ডি-সেকশান। দু’টো টিমই সাত ওভার করে খেলবে। প্রথমে ডি-সেকশানের বোলিং। 
   স্যারের কথা শেষ হতেই স্যারের কাছ থেকে বল নিয়ে বোলিং পজিশনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ডি-সেকশানের চন্দ্রেশ সূত্রধর। চন্দ্রেশ এক ওভারে একটা স্পিন বল করে তো পরের বলটা করে ফুলটস। ব্যাটসম্যানকে ধাঁধায় ফেলতে ওস্তাদ! প্রথম বলটা খুব জোরে করল চন্দ্রেশ।
   ওপাশে সি-সেকশানের ব্যাটসম্যান সিন্ধুজা দত্ত ব্যাট ধরে তৈরি হয়েই ছিল। সপাটে বলটা হিট করল। উইকেটের ওদিকে বল উড়ে চলে গেল বাউন্ডারি সীমানার দিকে। 
   হেডস্যার হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘চৌকা! চৌকা! সিন্ধুজা চার!’
   না, চার হল না। ডি-সেকশানের প্রমিত ওদিকে ফিল্ডং করছিল। দৌড়ে গিয়ে শুয়ে পড়ে বাউন্ডারি আটকে দিল। ততক্ষণে রকি দেববর্মা সিন্ধুজার ডাকে সাড়া দিয়ে উইকেটের ওদিক থেকে দৌড়তে শুরু করল। না, এক রানেই থামল না ওরা। বাউন্ডারি হল না বটে। প্রমিত বলটা তক্ষুনি উইকেটের দিকে ছুঁড়ে দিল। না, উইকেটে লাগাতে পারল না। রান আউট করা বেশ সহজ ছিল। ক্লাস এইট ডি-সেকশানের সমর্থকরা হতাশ হয়ে পড়ল। 
   পরের বল করল চন্দ্রেশ। জোরে বল করার ওর জুড়ি নেই। খুব জোরে বল করল চন্দ্রেশ। বলটা সিন্ধুজার মাথার উপর দিয়ে বাঁইবাঁই করে উড়ে গেল। এরকম সময়ে সকলেই জানে, সিন্ধুজা কখনও ক্রিজ ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে ব্যাট চালাতে জানে। আবার কখনও বিপদ বুঝলে রক্ষ্মণাত্মক ভঙ্গিতে খেলতে সিন্ধুজার জুড়ি নেই গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেটারদের মধ্যে। কিন্তু এই বলটাকে কঠিন ভেবে ব্যাট তুলেও দনোমনো করে ছেড়ে দিল সিন্ধুজা। 
   দেবোপমস্যার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই বলটা না খেলে ছেড়ে দিলে কেন সিন্ধুজা? ব্যাট তুলে ঘুরিয়ে দিলেই উইকেট কিপারের পিছন দিক দিয়ে বল বাউন্ডারি সীমানা টপকে যেত! অনায়াসে চার হয়ে যেত! বিরাট কোহলির এরকম ব্যাটিং দ্যাখোনি?’
   ইতস্তত করল সিন্ধুজা। হেডস্যার চেয়ার থেকে উঠে এসে দেবোপমস্যারকে বললেন, ‘দেবোপম, আমাকে একটা বল খেলতে দাও দিকি!’ হেডস্যার সিন্ধুজার হাত থেকে ব্যাট নিয়ে তৈরি হয়ে পিচে দাঁড়ালেন। চন্দ্রেশ, তুমি একটা দারুণ বল করো তো আমাকে!’
   চন্দ্রেশ একটা ঘূর্ণি বল করল সজোরে। হেডস্যার বিপদ বুঝে সাঁ করে মাথাটা নামিয়ে নিলেন। কোনও রান পেলেন না। দেবোপমস্যার বললেন, ‘বাঃ! আপনার রিফ্লেক্সটা একটু কম। না হলে বলটা উড়িয়ে দিতে পারতেন!’
  হেডস্যার লজ্জিত মুখে বললেন, ‘কতদিন ব্যাট ধরিনি! সেই কলেজে পড়ার সময় আমরা ফার্স্ট ইয়ারে একটা ক্রিকেট টিম গড়েছিলাম। সেবার আমাদের বলটা উড়ে গিয়ে একজন পথচারীর মাথায় গিয়ে পড়েছিল। ভাগ্যিস তিনি ছাতা মাথায় দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই কোনও বিপদ হয়নি। অবশ্য, তার পর থেকে বিপদের আশঙ্কায় আমাদের সেই ক্রিকেট টিম ভেঙে গিয়েছিল।’ 
   এর পর হেডস্যার ব্যাটটা সিন্ধুজার হাতে তুলে দিয়ে নিজের চেয়ারে এসে বসলেন। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকরা চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার, আপনি আর একটা বল খেলুন না প্লিজ!’
   হেডস্যার মুখে হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমরা কি চাও এর পরের বলে আমি আউট হয়ে যাই?’
   অমনি গোটা মাঠ জুড়ে হাসির হট্টগোল উঠল। হেডস্যার বললেন, ‘তুমি খেলা শুরু করো দেবোপম!’
(এর পর নয় পর্ব)
সৌরদীপ ঘড়া,  প্রথম শ্রেণি, বিদ্যাসাগর শিশু নিকেতন,  মেদিনীপুর

দুষ্টু লোক 
স্বাগতা ভট্টাচার্য্য 

আকাশ ভদ্র তিনদিন ধরে স্কুলে আসছে না ছেলেটি তোমরা কেউ বলতে পারো ও আসছে না কেন?
নতুন মাস্টারমশাই-এর কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে ম্যাজিক পয়েন্ট স্কুলের ক্লাস-টু এর পঁচিশ জন ছেলেমেয়ে,
অনন্য একটু দমে যায়I স্কুলটা স্টেশন  থেকে হাঁটা পথে খুব একটা দূরে নয়, রীতিমত ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে বেশ কয়েকজন ছিল তাদের মধ্যে থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ ওকে নিয়েছে, ইংরেজী, বাংলা ক্লাস নিতে হচ্ছে ক্লাস টু এর ক্লাস টিচার করা হয়েছে এখন আপাততঃ মর্নিং সেকশনে ক্লাস দেওয়া হয়েছে, আকাশ ভদ্র ছেলেটি কে তিনদিন ধরেই এবসেন্ট! হেসে লুটিয়ে পড়া মেয়েটি সৃষ্টি, হাত নেড়ে বললো, "স্যর ও তো ব্লগার! এইটুকু পুঁচকে বাচ্চাদের মুখে ব্লগার শব্দটা শুনে মনে মনে থমকে গেল অনন্য, জিজ্ঞাসা করলো সেটা কি?"
বিশ্বরূপ গালে হাত দিয়ে দুঃখিত ভঙ্গিতে বললো, "সেকি স্যর তুমি ব্লগার চেনো না! ওরা ফানি ভিডিও, খাবারের ব্লগ, রিলস এসব বানায়! মা দেখে  আর আমিও দেখি! প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য সেদিন টুনটুনির গল্প ফেঁদে বললেন!
 মাথায় ঘুরছে এগুলো থেকে এই ছোট ছোট বাচ্চাদের কিভাবে বের করে আনা যায়!
নতুন আনকোরা শিক্ষক সে, সদ্য কাজে যোগ দিয়েছে এখন কি কেউ ওর কথা শুনবে? তবুও একবার এইচ এম কে বললো, 'স্যার একটা কথা ছিল'। 
নিজের পেপার ওয়ার্ক করতে করতে উনি বললেন,"বলো কি বলতে চাও।"
আপনি তো বছরে দু'বার প্যারেন্টস মিটস রাখেন সেখানে এই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল দেওয়া না হয় সে ব্যাপারে কোন বিশেষজ্ঞ যদি বক্তব্য রাখেন।
এইচ এম মন দিয়ে কাগজপত্র দেখতে দেখতে বললেন, "নতুন এসেছ তাই এরকম ইচ্ছে হয়!তোমাকে নিরাশ করবো না কিন্তু অভিভাবকরা নিজেরা বিশেষ করে মায়েরা এসব রিলস বানায় আর সাথে বাচ্চা দের যুক্ত করেI সহজে অর্থ আয় করবে!"
"আমার এক বন্ধুর ছেলে পাবজী খেলতে খেলতে পড়াশোনা করা ছেড়ে দিলো, এখন একটা গ্যারেজে কাজ করে"। ঢুকলেন অনিন্দ্য স্যার, উনি ম্যাথ টিচার 
"আরেকটু বড় হয়ে নানারকম প্রতারণার স্বীকার হচ্ছে, যেগুলো সবসময় ছেলেমেয়েরা আলোচনা করতে পারে না আত্মহত্যা বেছে নেয়!"
চোখ জ্বলজ্বল করছে মানব স্যারের, "আমার মেয়েটাকে আমি এভাবে হারিয়ে ফেলেছি।" একটু দম নিয়ে মানব স্যার নিজের ভেতর থেকে আনমনে বলতে আরম্ভ করেন- "ক্লাস ইলেভেনে পড়ছিল মেয়েটা আমার, পড়াশোনা র জন্য মোবাইল দিয়েছিলাম অনলাইন ক্লাস, পরীক্ষা দেবার জন্যে, তারপর একদিন গভীর রাতে সুইসাইড করলো  ও কানে হেড ফোন দেওয়া ছিল, কত জায়গায় ছোটাছুটি করলাম কেন এমনটা করলো এটাই জানতে চাইছিলাম আমরা, একদিন থানার অফিসার আমাকে বললেন,- "এসব আর কি দরকার! মেয়ের সম্পর্কে খারাপ কিছু জানলে কি ভালো লাগবে?"
-কিন্তু কেন এটা ঘটল সেটা তো জানতে চাই!
উনি বললেন, "কেউ মেয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কোন দুর্বল সময়ের আপত্তিকর ছবি নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছিল, সেটা আমার মেয়েটা নিতে পারেনি, হয়তো আমরা মারতাম, বকতাম কিন্তু মেয়েটা তো বাঁচতে পারতো!"
কান্নায় গলা ধরে এলো, অনন্য দেখলো এই কয়েকদিন এই স্কুলে পড়বার সুবাদে এই কাজটা ওকে করতে হবে, মোবাইল সম্পর্কে বোঝাতে হবে অভিভাবকদের, স্কুলে নানারকম কালচারাল কাজে বাচ্চাদের আরো যুক্ত করে নিতে হবে I রিলস, ফুড ব্লগিং, ফানি ভিডিও বানাবার একটা বয়স আছে I সেটাই বোঝাতে হবে, শিক্ষকরা সবাই মোটামুটি এগিয়ে আসছেন, এই কাজে  ফুলের মত শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য এটুকু চেষ্টা তারা সবাই মিলে করবে I" দুষ্টু লোক ভ্যানিশ....
সেই বিখ্যাত ডায়ালগ টা মাথায় ঘুরছে।

🍂

ঘঁচুর পাগলামি
মোনালী প্রধান
সপ্তম শ্রেণি, পি এম শ্রী জওহর নবোদয় বিদ্যালয়, পশ্চিম মেদিনীপুর

আমার ভাই-এর নাম গণেশ। কিন্তু ওকে পাড়ার সবাই ঘঁচু বলে ডাকতো। কারণ সে একটু ঘঁচর ঘঁচর করতো, মানে একটু বেশিই কথা বলতো। আর একটু আধটু পাগলও ছিল বটে। অনেকে মজা করে বলতো ওকে ঘঁচু বলে ডাকা হয় বলে ওর মাথার স্ক্রু গুলো হয়তো ঢিলে হয়ে গেছে। 
একদিন মা ওকে বাজার থেকে কয়েকটা সবজি এনে দিতে বলল। ঘঁচু বাজারে গেল বটে, কিন্তু পেঁয়াজের দোকানে ঢুকে নাচতে শুরু করে দিল। শুধু নাচই না, পেঁয়াজ দিয়ে গান বানিয়ে গাইতে শুরু করে দিল, 
পেঁয়াজ আমার ভাই
পেঁয়াজকে আমি চাই।
বাড়িতে নিয়ে যাই
পেঁয়াজ আমি খাই।
গান গাইতে গাইতে সে দোকামদারের সাথে হাত মিলিয়ে পেঁয়াজগুলো থলিতে ভরে বেরিয়ে এল।  তাকে নাকি মা পেঁয়াজ আর আলু আনতে বলেছিল। 
আলুর দোকানে ঢুকে সে দোকানিকে স্যালুট করে বলল, 
বন্দেমাতরম
আলু খেয়ে পেট গরম।
ঘঁচুর পাগলামির কথা শুনে দোকানদার হেসে তাক থলিতে আগেভাগে আলু ভরে দিল। সে তখন গান গাইতে গাইতে চলে এল।
আলু আর পেঁয়াজ নিয়ে ঘঁচু যখন সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল তখন উলটো দিক থেকে এক বুড়ো দাদু আসছিল। একেই তো ঘঁচু একটা পাগল তারপর আবার ঐ দাদুটাও ছিল পাগল। তাই দুই পাগলে দেখা হলে কী হতে পারে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। 
দুজন দুদিক থেকে পাগলের মতো জোরে সাইকেল চালিয়ে এসে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেল। ঘঁচুর বাজারের থলি থেকে আলু-পেঁয়াজ সব পড়ে গড়িয়ে গেল আর ঘঁচুর হালকা চোট লাগল। তবে বুড়ো দাদু পড়ে যেতেই তার নাকি পাটাই ভেঙে গেল। 
সেই দেখে দু:খ না পেয়ে পাগল ঘঁচু বুড়ো দাদুকে হেসে হেসে বলল,
বুড়ো রে বুড়ো
হলি যে খুড়ো
সাইকেল থেকে 
পড়লি তো বেশ।
বুড়োর কোমরেও খুব লেগেছিল,এদিকে পাগল ঘঁচুর কথা শুনে মাথা গেল আরো চটে। খোঁড়া পা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ঘঁচুর দিকে তেড়ে গেল। 
ঘঁচুও ছড়া কেটেই চলল। দুই পাগলের রঙ্গ দেখতে অনেকে জড়ো হয়ে গেল। 
তারপর দুজনের বাড়ির লোক গিয়ে তবেই তাদের থামায়। বাড়ি ফিরতেই মা যখন ঘঁচুকে আলু আর পেঁয়াজ কোথায় জানতে চায়, তখন পাগল ঘঁচু মায়ের মারের ভয়ে আবার ছোটে গান গাইতে গাইতে,
পেঁয়াজ আমার ভাই
আবার তাকে খুঁজতে যাই....

পাঠ প্রতিক্রিয়া : মলয় সরকার 
ছোটোবেলা সংখ্যা ১৯১ 

মৌসুমীর সম্পাদিত ছোটোবেলা সংখ্যাটি পেলাম। পত্রিকাটি হাতে পেয়েই যেখানে চোখ আটকায়, তা হল এর প্রচ্ছদ। ঋপণ আর্যের ক্যামেরা কথা বলে। 
সব সময়েই আমি তাঁর ছবিতে যে শিশুরা থাকে তাদের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করি। তা এতই জীবন্ত ও সত্যি কথা বলে, যে সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব আর কৃত্রিমতার জগত ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়ি শিশুদের জগতে। শীতের রোদ, কমলালেবুর রঙের ঔজ্বল্য ও শিশুর মুখের সারল্য তিনটি একেবারে যেন ত্রিভুজ তৈরী করেছে ছবিটির মধ্যে।

রাজবাড়ির সিংহদ্বার দেখেই ভিতরের ঐশ্বর্যের আন্দাজ হয়।তবে আমরা যারা পুরানো পাঠক, তাদের তো দুঃখ একটু হয়ই। আগে ছিল হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, পাইক-বরকন্দাজ লোকলস্করে ভরা। আর এখন তার পুরানো ঐশ্বর্যটুকু মাথায় রেখে আগামী সুদিনের প্রতীক্ষা করা। আমরাও অবশ্যই প্রতীক্ষায় আছি। “নব দিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পূরবে”।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক রতনতনু ওপেনিং ব্যাটস্‌ম্যান হিসাবে মাঠে নেমেছেন যখন, আশা তো রাখি আগামী দিনে পত্রিকা আবার পূর্ণমাত্রায় ভরে উঠবে। চলুক গগনজ্যোতির খেলা। তবে এর মধ্যে উনি ‘কাকতালীয়'’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করেছেন আবার ক্রিকেটের কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটনাও তুলে এনেছেন যা ছোটদের ভাল লাগবে। 
সুকন্যা মাইতির ছবিটি বেশ সুন্দর।
রাজর্ষি মণ্ডলের মোমের পুতুল বেশ সজীব হয়ে গেছে মনে হয়।
অস্মিতা ঘোষের কাল্পনিক সাদা মেঘ ও কালো মেঘের  কথোপকথন ও কার্যকারিতা দিয়ে ও এক বৃহৎ সত্যের দ্বার খুলে দিতে চেয়েছে। এটাই ভাল লাগল যে, ও বোঝাতে চেয়েছে৷ ভিন্নতার জন্য কেউ ছোট বড় হয় না৷ বরং ভিন্নতার সম্মিলনেই হয় সৌন্দর্যের প্রকাশ। আমাদের মানব সমাজে এই সত্য, মানুষ কবে তা অনুভব করবে জানি না।

Post a Comment

0 Comments