পূর্বমেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কথ্যভাষা-২৬/ বিমল মণ্ডল

Spoken language of the fishing community of East-Medinipur district / Bimal Mondal
পূর্বমেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কথ্যভাষা
পর্ব-২৬

চতুর্থ অধ্যায় || বাক্যতত্ত্ব (Syntax) 


পূর্ব মেদিনীপুর জেলার  মৎস্যজীবীদের  কথ্যভাষায় যে জটিল বাক্যের ব্যবহার  দেখা  যায় তা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন  অঞ্চলানুযাযী জটিল বাক্যের  ব্যবহার উদাহরণ সহ  নিম্নে আলোচিত হল—

ক. হলদিয়া 

i.তু যদি আল্লার  কিরা খাউ তাহিলে মুই কথাটা বলবো।( তুই যদি আল্লার  দিব্যি  খাস তাহলে আমি কথাটা  বলবো।) 
ii.জখনই তোর খুড়া নউকায় যাইছিল,তোখনই ঝড় উঠিয়ালা।( যখনই  তোর কাকা নৌকায়  গিয়েছিল , তখনই  ঝড় উঠে এলো।) 

খ.রামনগর 

i.আপনঁ যা কহে মু তাই করিমি।( আপনি  যা বলেন  আমি তাই করবো। 
ii.যখনঁ তোমারো সাথোরো যিবা তখনঁ মুই কথাটা  পাড়িবা।( যখন তোমার সাথে  যাবো  তখন আমি কথাটা বলবো।) 

গ.নন্দীগ্রাম

i.যদবা তুই মাচ ধত্তে  যাবু তদবা আমি যাবো। ( যখন তুই মাছ ধরতে  যাবি তখন আমি যাবো। 
Ii.তুই যাই বদা দেখথুলু,সউঠিটা টকাটা লুকিয়াছে।( তুই যেখানে ষাঁড়  দেখেছিলি, সেখানে  ছেলেটা লুকিয়ে আছে।) 
iv.অরকুম জাঁঁইলে তোর সাথে সরকুম মিসতায় নি।( এরকম  জানলে তোর সাথে  সে রকম মিশতাম না।)

ঘ.খেজুরী

i.তোনে নৌকা লিয়া  যাইকে যাবু আমি সউঠিকে যাবা।( তোরা নৌকা  নিয়ে যেখানে যাবি আমি সেখানে যাবো।) 
ii.আমি জানকের ডাকবানি কহিল্লি তুই তানকের ডাকবু।( আমি যাদের ডাকবো  না ভেবে ছিলাম  তুই তাদের ডেকে  আনবি।)
iii.আমি যাই যাবা তুই তাই চল।( আমি যেখানে  যাব, তুই সেখানে চল।

ঘ.নন্দকুমার 

i.উকে এ্যকাকে যেমুন মুবাইল দিবি তেমুন মোকেও দিবি।(ওকে একাকে যেমন  মোবাইল  দিবি তেমনি আমাকেও দিবি।)
ii.তোরমোনে যতটা  জেগিয়া লিছু আমারমোনে ততটা  জেগিয়া লুব।( তোরমনে যতটা  জায়গা  নিয়েছিস আমারমনে ততটা জায়গা  নেব।)
iii.তুই যউ নউকা লিযাবি,মুই সউ নউকায় থাইলি।(তুই যে নৌকা  নিয়ে  যাবি, আমি সেই নৌকায়  ছিলাম।) 

ঙ.গেঁওখালী(মহিষাদল) 
i.তোন্নে যাইকে গেছুলু মুই সউটিকে যাইথিলি।( তোরা যেখানে গিয়েছিলি আমি সেখানে  গিয়েছিলাম।) 
ii.তোকে যউ ডাকেরে সউ মোর কুটুম হয়।( তোকে যে ডাকছে সে আমার আত্মীয়  হয়।)

৬.৩.যৌগিক বাক্যঃ

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবীদের কথ্যভাষাতে সরল ও জটিল বাক্যের অধিক  ব্যবহার  দেখা যায়।আবার কিছু কিছু  ক্ষেত্রে এই জেলার  মৎস্যজীবীদের  কথ্যভাষায় কোন কিছু  বর্ণনা বা বিবৃত  করতে গিয়ে যৌগিক বাক্যের  ব্যবহার করা হয়ে থাকে।এখানে  সাধারণত দুটো বাক্যের মধ্যে সংযোজক রূপে কিন্তু, তাহিলে,তাইনে,তাও,তারজানে, মোনকের জানে,সউজানে,নাইলে,নইলে, নাইনে,নাই তো, আর, আবার প্রভৃতি অব্যয়বাচক শব্দের ব্যবহার  দেখা  যায়। যেমন-

ক.তাও

i.রাম চুমুড় মাচ ধত্তে যাবু তাও লয়া জামা পরিয়া?( রাম চিংড়ি  মাছ ধরতে  যাবি তাতে নতুন জামা পরে?)
ii.টকাটাকে পড়তে কইলেও  তাও ঘাপটি মারিয়া বুসিয়া রইবে।( ছেলেটাকে  পড়ার কথা বললেও তাতে চুপ করে বসে থাকে।) 
iii.লোকটা  নৌকা লিকি যাবে তাওকি দেরি করি।( লোকটা  নৌকা নিয়ে যাবে তা সত্ত্বে দেরি করে।) 

 খ. কিন্তু/ কিনতু

i.তুমারমনে কিনতু দৈপুর বেলায় যিও।( তোমরা  কিন্তু  দুপুর বেলায়  যাবে।)
ii.দশ দিনরো কিনতু মাজ গাঙেরো রইথায়।( দশ দিন ধরে কিন্তু  মাঝ সমুদ্রে  থাকতো।) 
iii.কদগা মাচ পড়থালা  কিন্তু  একটা  ঘর লিতে পাল্লি নি।( কতগুলো  মাছ পড়ছিল  কিন্তু  একটা  ঘর নিয়ে যেতে পারলাম  না।) 

গ.তাইলে/তাহিলে /তাইনে

i.আমি যাবানি কইছি তাহিলে ডাকুটু কেনি?(আমি যাবো না বলেছি তাহলে ডাকছিস কেন?)
ii.নউকা টা তো সারাইলু তাইনে গাঙে যাবু।( নৌকাটা তো সারানো  হয়েছে তাহলে সমুদ্রে যাবি।)
iii. অনেক  সময়রো ঠিয়া হইচু তাইলে একটু বুসি কি পড়।(  দীর্ঘ সময়  দাঁড়িয়ে  আছিস তাহলে একটু  বসে পড়।) 

ঘ. নাইনে/ নাইলে
i.আঁই তু যা নাইনে তকে মারবে।( আরে তুই যা নাহলে তোকে মারবে।)
ii.মুই তার দরে গেছিলি নাইলে তুমার সাথে দেখা হইতায়।(আমি তার বাড়িতে  গিয়েছিলাম নাহলে তোমার সাথে দেখা হতো।) 
iii. আমি আসথিলি নাইলে তোকে দাউলি দিয়া কাটিয়াদিত।( আমি এসেছিলাম নাহলে তোকে কাটারি দিয়ে কেটে দিত।)

ঙ.তারজানে/মোনকের জানে/ সউ জানে।তারুর জানে

i.লোকটা  মরিয়ালো বলিয়া সউজানে আইজ হাট বন্দ হয়ালো।( লোকটা মরেগেল বলে সেইজন্য  আজ হাট বন্ধ আছে।)
ii.লোকটা বাঁচিয়ালো শুধু  তারুর জানে।(  তার জন্য লোকটি বেঁচে  গেল।)
iii. ভদ্রলোকোরো মোনকের জানে মাচ পাঠাইথিলা।( ভদ্রলোকেরা আমাদের জন্য মাছ পাঠিয়েছিল।)

চ. নাই তো/আবার/আরো

i. অকে নউকায় লিয়া চ নাই তো আমি যাবানি।(  ওকে নৌকায়  নিয়ে চল না হলে আমি যাবো  না।) 
ii.তুমারমোনে অউঠি বুসিয়া আবার লেই করোঠো?(তোমরা এখানে বসে আবার তর্ক করছো?)
iii. তাকুকে গটায় বই আরো গটায় খাতা দুবা।( তাকে একটা  বই আর একটা  খাতা দেব।)

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মৎস্যজীবীদের কথ্যভাষায় বাক্যের শ্রেণিবিভাগ আলোচনায় মান্যচলিতের সঙ্গে  যে এখানকার  এই বাক্যের ব্যবহারের কিছুটা ফারাক দেখা যায়। পরবর্তী পর্বেও বাক্যের  অন্যান্য বিভাগ নিয়ে আলোচিত হবে।

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি