মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

বিজ্ঞানের অন্তরালে বিজ্ঞানী ।। পর্ব ― ১৬
মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র 

পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ইন্টারমিডিয়েট-এ প্রথম শ্রেনীতে উত্তীর্ণ হয়ে ডাক্তারি পড়ার জন্য কলকাতায় ইন্টারভিউ দিতে চলেছে মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের সদ্যযুবা ছেলেটি। অচেনা জায়গা। নতুন পরিবেশ। বিদেশ-বিভুঁইয়ে সঙ্গী বলতে আপন অনুজ। সেটা ১৯৪৮―১৯৪৯ সাল। তখন ডাক্তারি পড়ার জন্য লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার চল ছিল না। ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থী মনোনীত করা হত। কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভালোভাবে ইন্টারভিউ সমাপ্ত করে দু'ভাই রওনা হল বসু বিজ্ঞান মন্দির। ওরফে বোস ইনস্টিটিউট। সেখানে বিখ্যাত বাঙালি পতঙ্গ বিশারদ ও বিশিষ্ট উদ্ভিদবিদ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে। কারণ শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানীর হুকুম ছিল কলকাতা এলে একটিবার দেখা করার। সে-হেতু গ্রাম্য ভ্রাতা যুগলের বোস ইনস্টিটিউটে আগমন।
'তুমি সূর্যেন্দু?'― বৈজ্ঞানিক শুধালেন।
'আজ্ঞে, হ্যাঁ!'― চোখে-মুখে বিষ্ময় ফুটে ওঠে সূর্যেন্দু'র।
'তোমার পরিচয় জানতে চাই। তুমি কী কর?'
সব কথা গড়গড়িয়ে বলতে শুরু করে সূর্যেন্দু। গ্রাম-জমিদারি-স্কুল-কলেজ সব অভিজ্ঞতা উগরে ব্যক্ত করে সে। সব শুনে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বল্লেন―
'চলো, তোমাকে স্যারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব।'
'স্যার! কোন স্যার? আমি কাউকে চিনি-জানি না।'
'প্রফেসর সত্যেন বোসের নাম শুনেছ?'
আকাশ থেকে পড়বার জোগাড়! নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সূর্যেন্দু― বিখ্যাত সায়েন্টিস্ট সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ! মহান বৈজ্ঞানিককে চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য― দিবা-স্বপ্ন নয়তো! যা শুনছি, সব সত্যি? পরক্ষণেই অজ্ঞাত ভয়ে শিউরে ওঠে মন। বিজ্ঞানী কেন ডেকেছেন তাকে? কীসের দরকার?
ভুত-ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে করতে সামান্য পুরনো প্রেক্ষিতটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। তখন ১৯৪৮ সাল। সদ্য স্বাধীন হয়েছে ভারতবর্ষ। এ সময় বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রসারের প্রয়োজন অনুভব করলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তাঁর নেতৃত্বে সেবছর কলকাতায় 'বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ' গঠিত হয়। এই পরিষদের মুখপত্র হিসাবে বাংলা ভাষার বিজ্ঞান পত্রিকা 'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' প্রকাশিত হয়। খবরের কাগজে এমন সংবাদ পড়ে খুব আপ্লুত হন যুবক সূর্যেন্দু। সেও মনে মনে এমন একটা পত্রিকার সন্ধান করছিল যেখানে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান আর্টিকেল লিখতে পারবে। খুব উৎসাহ ভরে একটি প্রবন্ধ লিখেও ফেলল সে। তার প্রবন্ধ ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম ছাপার অক্ষরে 'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' পত্রিকায় বের হয়। উৎসাহিত হয়ে পর পর আরও তিন–চারটি আর্টিকেল লিখে ফেলে। সঙ্গে চাইনিজ কালিতে ডায়াগ্রাম এঁকে দিত। পর পর 'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' পত্রিকায় প্রকাশিত হল তাঁর প্রবন্ধগুলো। 

'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' অফিস থেকে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য পোষ্ট কার্ডে একটি চিঠি দিয়েছিলেন সূর্যেন্দুকে― কলকাতা এলে যেন তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করে। চাক্ষুষ দেখা না হলেও শ্রদ্ধেয় গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনেক বই পড়ে আপ্লুত সূর্যেন্দু। শ্রদ্ধায় শির আপনাআপনি ঝুঁকে পড়ত অজ্ঞাত বিজ্ঞানীর চরণ কমলে। নিয়তির কী পরিহাস! বিজ্ঞানী স্বয়ং আজ তার চক্ষুর সম্মুখে। সেই তিনি পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে।
তীব্র ঘোরের মধ্যে সে উদ্ভিদবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের সঙ্গে পৌঁছে গেলেন প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ল্যাব‍রেটরিতে। ঘোর ভাঙার আগে অধ্যাপক বসু সহাস্যে বললেন― 
'ফিজিক্সই তোর লাইন, ডাক্তারি পড়ে কী করবি?'
কী উত্তর দেবে― কিংকর্তব্যবিমূঢ় সূর্যেন্দুবিকাশ।
'দেখ, জ্ঞান-বিজ্ঞানে তোর আর্টিকেলগুলো সব পড়েছি। আর যাই হোক, ডাক্তারি তোর মিশন নয়। ফিজিক্সই তোর একমাত্র পথ। মাস্টার্সে ফিজিক্স নিয়ে ভর্তি হয়ে যা'― বললেন অধ্যাপক বোস। 
জমিদারির হাল তখন পড়তির দিকে। বাপ-ঠাকুর্দা নেই। অনেক দিন হল গত হয়েছে। আর্থিক সংকট তীব্র। তায় বাড়ির বড় ছেলে সে। একান্নবর্তী পরিবারের হাল ধরতে চিকিৎসক হওয়া ব্যতীত দ্বিতীয় অপসন নেই। মা-ভাইরা সেটাই চায়। কী উত্তর দেবে― খানিক ইতস্তত করে সূর্যেন্দু।
'দ্যাখ, ডাক্তারি পড়ে চিকিৎসক হলে চটজলদি অঢেল পয়সা-কড়ি উপার্জন করবি। হক কথা। কিন্তু মন ভরবে কি?'―বোঝায় প্রফেসর বসু।
কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এসে খানিকটা হাঁফ ছাড়ে সূর্যেন্দু। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। সরেজমিনে পুরো পরিস্থিতি যাচাই করে দেখে। একদিকে নিজের উচ্চ শিক্ষা, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি; অন্যদিকে পরিবারের বেহাল দশা।
'প্রফেসর বোস যখন বলছেন, সেটাই তোমার মেনে চলা উচিত। না বুঝে সুঝে উনি কোনও ছাত্রকে এমন পরামর্শ দেন না'― গোপালচন্দ্রের অভিমত।
কলকাতায় বসে একদিন ভাববার সময় চেয়ে বাসায় ফিরে আসে দু'ভাই―সূ্র্যেন্দুবিকাশ আর নির্মলেন্দুবিকাশ। জমিদারির ভগ্ন দশার হাল ধরতে রাজি হয় অনুজ নির্মলেন্দু। মত বদলে ফেলল সূর্যেন্দু। এম এস সি পড়া মনস্থির করল। পরের দিন গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য্যকে খুলে বলল সে-কথা। একটা দরখাস্তের ফর্ম পূরণ করে দেখা করল অধ্যাপক বসুর সঙ্গে। বলল―
'ফিজিক্সই পড়তে চাই।'
অধ্যাপক বসু ফর্মটা ছাত্রের হাত থেকে নিয়ে বাঁ দিকে কোণায় ওপরে বড় বড় অক্ষরে লিখে দিলেন 'Admit'; তার নিচে সই করলেন 'শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ বসু'। কাউন্টারে ভর্তির ফর্ম দেখে বিষ্মিত হয় অ্যাকাউন্ট্যান্ট। কারণ ভর্তির বিজ্ঞপ্তি কবেই শেষ হয়ে গেছে। এমন সময় ভর্তির আর্জি নিয়ে উপস্থিত সূর্যেন্দু। ফর্মে শ্রী বসুর দস্তখত দেখে বিনা বাক্য ব্যয়ে ভর্তি করে নেন। সূর্যেন্দু জিজ্ঞেস করল―
'কত টাকা?'
'যার ফর্মে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সিগনেচার থাকে, তার ফি'জ লাগে না'― অ্যাকাউন্ট্যান্ট ভদ্রলোক হাসিমুখে প্রত্যুত্তর দেয়। 
প্রেসিডেন্সি ও রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ দুটোতেই এম এস সি পড়ানো হত। দু'জায়গা থেকে ভর্তি হওয়ার জন্য চিঠি এল। ভর্তি হলেন সায়েন্স কলেজে। সেখানে তখন ফিজিক্সের দুই দিকপাল পণ্ডিত― সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ উজ্জ্বল করে মধ্য গগনে বিরাজমান। এম এস সি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে 'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি চলছে। থাকতেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় হোস্টেলে। বিনা সিটরেন্টে। কোনও জনহিতকর প্রতিষ্ঠান ছাত্রাবাসটি পরিচালনা করত। এ হেন সূর্যেন্দু'র শৈশব কেটেছে নিতান্তই গ্রাম্যপরিবেশে। সেখানে সন্ধ্যা নামলে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে দিনযাপন নিত্যসঙ্গী। রেড়ির তেল রাত্রির অমানিশা সাময়িক দূর করত। সেই অজ পাড়া-গাঁ থেকে তাঁর উত্থান রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। গাঁয়ের শত শত তরুণ-তরুণীর অনুপ্রেরণা তিনি।

দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলার মোহনপুর তালুকের অন্তর্গত এক প্রত্যন্ত গ্রাম সাউটিয়া। ঐতিহাসিক দণ্ডভুক্তি রাজ্যের কেন্দ্রশহর দাঁতন থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে। আলপথে পনেরো কিমি। ব্যস্ত শহর এগরা থেকে তিরিশ কিমি। স্বাধীনতার সামান্য আগে-পরে এতদ অঞ্চলের কথ্যভাষা ছিল উড়িয়া। বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল না বললেই চলে। অনেক পরে মোহনপুর সহ দাঁতনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল যখন পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন বাংলা কথ্যভাষার স্বীকৃতি লাভ করে। যদিও আঞ্চলিক মানুষজনের কথাবার্তায় উড়িয়া টান এখনও বিশেষরূপে লক্ষণীয়। 
মোহনপুর সেরেস্তার জমিদার ছিলেন চৌধুরী উদয় নারায়ণ কর মহাপাত্র। তিনি ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ। তাঁর সুযোগ্য পুত্র শ্রী কিশোরীরঞ্জন কর মহাপাত্র অবিভক্ত মোহনপুর অংশের (তখন মোহনপুর থানা তৈরি হয়নি) প্রথম গ্র্যাজুয়েট। সেটা ১৯২০ সাল। কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বিএ (B.A.) পাশ করে গ্রামে ফিরলেন যুবক কিশোরীরঞ্জন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ডেপুটি মেজিস্ট্রেটের চাকুরি অফার করে। পিতার ইচ্ছানুসারে মুক্ত-মনা কিশোরীরঞ্জন প্রত্যাখ্যান করলেন সে-চাকুরি। তার বদলে সাউটিয়ায় নিজ জমিদারি এস্টেটের ম্যানেজার নিযুক্ত হয়ে জমিদারির দেখভাল করতে থাকেন। অবশ্য কেবল শিক্ষা-দীক্ষা না, শিল্প-সংষ্কৃতি ছিল তাঁর মজ্জাগত। একজন গুণী সংগীতবোদ্ধা হিসাবে তাঁর খুব খ্যাতি ছিল। ভালো গান গাইতে পারতেন। নতুন নতুন তাল তৈরি করতেন। রীতিমত যাকে বলে ওস্তাদ। তবলা, বেহালা, জলতরঙ্গ, খোল, পাখোয়াজ, এস্রাজ, বীণা, মৃদঙ্গ প্রভৃতি ধ্রুপদী বাদ্যযন্ত্রে সুরের তুফান তুলতে পারতেন তিনি। ঘটনাচক্রে ১৯২৩ সালে যখন দাঁতন হাই-ইংলিশ স্কুল (Santan H. E. School) স্থাপিত হয়, রাজপরিবারের নির্বাচিত সদস্য হিসাবে দাঁতন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক মনোনীত হন তিনি। অবশ্যই সর্বসম্মতিক্রমে। অবশ্য তিন বছর পরে ১৫/০৩/১৯২৬ তারিখে তিনি প্রধান শিক্ষক পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন।

সাউটিয়ার এ হেন প্রখ্যাত জমিদার কিশোরীরঞ্জন কর মহাপাত্র এবং তাঁর সুযোগ্য অর্ধাঙ্গিনী হিরণময়ী দেবীর কোল আলো করে জন্ম নিল তাঁদের জেষ্ঠ্যপুত্র (দ্বিতীয় সন্তান) সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র। ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পয়লা তারিখে। শিশুকাল থেকে ছোট্ট সূর্যেন্দু অত্যন্ত মেধাবী। পিতার নিকট তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়। গ্রামের আর পাঁচটা ছেলের মতো প্রাইমারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা। তৎকালে মোহনপুর থানায় কোনও হাইস্কুল ছিল না‌, মাইনর স্কুলও না। সবচেয়ে কাছের স্কুল ছিল দাঁতন অথবা এগরায়। তেমন স্কুলে পড়তে গেলে থাকতে হবে হোস্টেলে। হিরণময়ী দেবী এত কম বয়সে ছেলেকে হোস্টেলে দিতে চাননি। অগত্যা পিতার অদম্য উৎসাহ আর প্রচণ্ড পরিশ্রমে বাড়িতে চলল পড়াশুনা। পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। বাঁধাধরা সিলেবাস ভিত্তিক পঠনপাঠন নয়, যাকে বলে সম্পৃক্ত পাঠ। পাঠ্য বিষয় ছিল গৌরীশংকর দে'র পাটিগণিত, নেসফিল্ডের গ্রামার, আই সি চক্রবর্তীর ইংরেজি ট্রান্সলেশন বই ইত্যাদি। এছাড়া বাড়ির লাইব্রেরিতে বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি লেখকের সব বই গোগ্রাসে গিলত ছোট্ট সূর্যেন্দু। সেজন্য বাংলা ভাষায় যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে ওঠে। ইংরেজ আমলে অখণ্ড দাঁতন ব্লকে তখন হাতেগোনা দু-একটি বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। দাঁতন হাই-ইংলিশ স্কুল তার মধ্যে অন্যতম। ১৯৩৬ সালে মাত্র বারো বছর বয়সে পিতার হাত ধরে গরুর গাড়িতে চেপে কিশোর সূর্যেন্দু পা রাখলেন দাঁতন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে। ভর্তি হলেন সপ্তম শ্রেণীতে। সেবছরই B.T. পাশ করে পুনরায় প্রধান শিক্ষক পদে দাঁতন স্কুলে যোগ দিয়েছেন প্রবল প্রতাপশালী শ্রী কেদারনাথ প্রধান। ১২―১৪ জন শিক্ষক আর দুজন শিক্ষাকর্মী নিয়ে চলছে বিদ্যালয়।
বাড়ি থেকে স্কুল বেশ খানিকটা দূরে। নিত্যদিন যাতায়াত করা অসম্ভব। বাধ্য হয়ে মেধাবী সূর্যেন্দু রইলেন বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে। তখন একজন আবাসিক ছাত্রের প্রদেয় মাসিক বেতন প্রায় আট টাকা বারো আনা। হোস্টেল চার্জ ৫ টাকা, স্কুলের বেতন ৩ টাকা, সিটরেন্ট ৪ আনা, টিফিন চার্জ ৪ আনা আর পুওর ফান্ড ১ আনা। মাসিক ৫ টাকায় হোস্টেলে হপ্তায় চারদিন মাছের পদ, মাসে একদিন খাসির মাংস রান্না হত। বাকি দিনগুলি নিরামিষ ব্যাঞ্জন। হাই-স্কুলে তখন সংষ্কৃত বাধ্যতামূলক ছিল। এগরা স্কুলে  সংস্কৃতের হেড পণ্ডিত সুরেন্দ্রনাথ কাব্যতীর্থ ছিলেন গ্রামে সূর্যেন্দুর প্রতিবেশী। ছুটিছাটায় তিনি প্রায়শই গ্রামে আসতেন। স্কুল হোস্টেল থেকে কিশোর সূর্যেন্দু ছুটিতে বাড়ি এলে ওই পণ্ডিতের কাছে সংষ্কৃত পড়তে হত। জানকী নাথ শাস্ত্রীর 'Help to the study of Sanskrit' বইটি আদ্যোপান্ত এমন রপ্ত করিয়েছিলেন পণ্ডিত মশায় যে সংষ্কৃত লিপিতে লেখা কালিদাস গ্রন্থাবলীতে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিল সে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করে বিদ্যালয়ের পরিবেশকে স্বর্গীয় সুন্দর বৈচিত্র্যময় করে তুলত। বিদ্যালয়ের নাটকের দলে নাম লিখিয়েছেন সূর্যেন্দু। তাঁর নিজের কথায়― 'আমাদের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ-এর প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন হেড-মাস্টার কেদারবাবু নিজে। বিতর্ক, আবৃত্তি, শ্রুতিনাটক প্রভৃতি অনুষ্ঠান স্কুলে প্রায় লেগেই থাকত। এসব আমি কেদারবাবুর কাছেই শিখেছি। আমি ও রমেশ পতি আলেকজাণ্ডার ও পুরুর কথোপকথন ইংরেজিতে আবৃত্তি করতাম, কেদারবাবু তাঁর এক্সেণ্ট, উচ্চারণ, Posture বার বার দেখিয়ে দিতেন। স্কুলে বার্ষিক পুরস্কার-বিতরণী সভায় এই পিস-টি আবৃত্তি করে বাহবা কুড়িয়েছিলাম।' 
তিনি আরও বললেন―'সেবার মেদিনীপুরের জেলা জজ স্কুলে অতিথি হয়ে এসেছেন। তাঁর সামনে স্কুলের ছেলেরা ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করল ― আমি বললাম Analysis of human life। মানুষের জীবনে সব কিছুই সন্, Tion, Sion প্রভৃতিতে ভরা― অন্নপ্রাশন, Celebration থেকে Staphylococcous infection-এ মরার পর Cremation পর্যন্ত সবকিছুই 'সন্'ময় ― এই হল লেখাটির বিষয়বস্তু। প্রচুর হাততালি পেলাম। জজসাহেব তো অনুষ্ঠান শেষে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।' 

সূর্যেন্দুর সহপাঠী নয়াগ্রাম অঞ্চলের হলধর মাহাতো ছিল বাংলা ও ইংরেজি দুটোতেই চৌকস। দুজনে মিলে ১৯৩৮―১৯৩৯ সালে হাতে লেখা পত্রিকা 'আহরণী' প্রকাশ করেছিল। ঘটনাচক্রে, দাঁতন স্কুল থেকে প্রকাশিত, শিক্ষার্থীদের দ্বারা সম্পাদিত 'আহরণী' পত্রিকা ছিল দাঁতনের ইতিহাসে প্রথম হাতে লেখা পত্রিকা। শুধু সংষ্কৃতি চর্চা নয়, ১৯৩৯-এ দাঁতন হাইস্কুলের ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র। বেলদা গঙ্গাধর অ্যাকাডেমি, কন্টাই হাইস্কুলসহ প্রতিবেশী স্কুলগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা প্রায়ই লেগে থাকত। টানটান উত্তেজনায় ম্যাচ অনুষ্ঠিত হত। এভাবে গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে সুন্দর কেটে যাচ্ছিল বিদ্যালয়ের দিনগুলি। ১৯৪০―১৯৪১ সনে মেট্রিক পরীক্ষায় বসলেন। প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করলেন মেধাবী সূর্যেন্দু। তারপর বিজ্ঞান নিয়ে ইন্টার-মিডিয়েট পড়তে রওনা হয়ে গেলেন মেদিনীপুর। বি এস সি কোর্সে ভর্তি হলেন মেদিনীপুর কলেজে। এখানে পড়া চলাকালীন 'রবীন্দ্র-শরৎ পরিষদ' নামে একটি কালচারাল ইউনিট গড়ে তোলেন। উদ্দেশ্য শরৎ ও রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে নিখাদ আলোচনা। সাহিত্যের ষোলোআনা আনন্দ চেঁটেপুটে ভাগ করে নেওয়াই লক্ষ্য। একবার কলেজের সাধারণ সম্পাদকও (G.S.) নির্বাচিত হয়েছিলেন। দুর্দান্ত কবিতা লিখতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে কবিতা লেখার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল তার। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত প্রায় কুড়িটির মত কবিতা লিখেছেন তিনি। সে সব কবিতাগুলি 'মেদিনী বাণী', 'প্রভাত', 'আর্যদর্পণ' প্রভৃতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কবিতাগুলির অধিকাংশই অধ্যাত্মমূলক অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। বাংলা ১৩৪৯ সনে (ইংরেজি ১৯৪২ সাল) 'আবীরাবীর্ম এধি' শীর্ষক একটি দীর্ঘ  মৌলিক কবিতা লিখলেন তিনি। কবিতাটি 'উদ্বোধন' পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ইতিমধ্যে বাবা কিশোরীরঞ্জন গত হয়েছেন ১৯৪৩ সালে। ১৯৪২-এ পিতা কিশোরীরঞ্জন ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাউটিয়ায় একটি লাইব্রেরি চালু করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পাঠাগারের নাম বদলে 'সাইটিয়া কিশোরী রঞ্জন স্মৃতি পাঠাগার' রাখা হয়। ১৯৬২ সালে সেটি গ্রামীণ পাঠাগারে উন্নীত হয়। তারপরে ১৯৮০ সালে তা সিটি লাইব্রেরির সম্মান লাভ করে। এ হেন শহর পাঠাগারটি ২০১৯ সালে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সেরা লাইব্রেরির সম্মান অর্জন করে। এমন সম্মান পাওয়ার পশ্চাতে দীর্ঘদিনের গ্রন্থাগারিক শ্রী কৌশিক কর মহাপাত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সম্পর্কে ইনি শ্রদ্ধেয় বৈজ্ঞানিকের ভ্রাতুষ্পুত্র। বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত। তবুও নিয়মিত গ্রন্থাগারে হাজির হন। পাঠাগারে প্রিয় কাকার ব্যবহৃত অজস্র দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সম্ভার পরিচর্যা হেতু। 
তো, ইন্টার-মিডিয়েটে সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাড়িতে নেমে এল শোকের ছায়া। ঠাকুর্দা উদয় নারায়ণ প্রয়াত হলেন। আর্থিক টানাপোড়েনের মাঝে পড়াশোনায় সাময়িক ছেদ পড়ার উপক্রম হল। অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করে এসময় থেকে। নামেই জমিদার। জমিদারির ছিটেফোঁটা নেই তখন। অগত্যা ডাক্তারি পাশ করে পরিবারের হৃতগৌরব, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য। সেজন্য চিকিৎসক হওয়া মনস্থির করলেন তিনি। প্রথমবার চললেন কলকাতা। সে-কাহিনী প্রথমে ব্যক্ত করা হয়েছে।

সায়েন্স কলেজে চলছে ফিজিক্সে মাস্টার ডিগ্রি। একদিন কলেজের জেনারেল ল্যাবে একটি প্র্যাক্টিক্যালে মগ্ন সূর্যেন্দু। প্যান্ট-কোট পরিহিত একজন ভদ্রলোক ছাত্রটির কাঁধে হাত দিয়ে ছাত্রের প্র্যাকটিক্যাল করা দেখছেন। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর চলে যাওয়ার আগে ছাত্রটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন―
'তুমি একবার আমার অফিসে দেখা করবে। এক্ষুনি।'
সূর্যেন্দু অবাক। কে ভদ্রলোক? কেন তাকে দেখা করতে বললেন? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ল্যাব-অ্যাটেন্ডেন্টের দিকে তাকাতেই একগুচ্ছ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সেও―
'কী? এক্সপেরিমেন্টে ভুল করেছ? খামোখা স্যারকে ডাকতে গেলে কেন? আমাকে বললেই তো পারতে! এখন বোঝ ঠ্যালা! উনি কে জানো?' 
নেতিবাচক মাথা নাড়ে সূর্যেন্দু। ল্যাব-অ্যাটেন্ডেন্ট বলে চলে― 'উনি হচ্ছেন প্রফেসর মেঘনাদ সাহা। ভুল করলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেন। উনি বলেন এম এস সি দুবছরে সম্পূর্ণ হয় না, চার বছর দরকার। খুব কড়া। ভুল করেছ কি মরেছ! এবার ঠ্যালা সামলাও। যাও, স্যার ডেকেছেন।' এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে কথাগুলো।
ভয়ে ভয়ে স্যারের কক্ষে পৌঁছয় সে। যেন আসামি। মহামান্য ধর্মাবতার এক্ষুনি ফাঁসি কাঠে ঝোলাবেন তাকে। তাকে দেখেই অধ্যাপক সাহা নির্দেশ দিলেন―
'কাল থেকে তুমি আমার ল্যাবে প্র্যাকটিক্যাল করবে।'
বিনা বাক্য ব্যয়ে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে সে। ড: মেঘনাদ সাহা তখন মডার্ন ফিজিক্স ও নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে স্পেশাল বিষয়ে ক্লাস নিতেন। আরেকদিন সিলেবাস শেষ হওয়ার পর তিনি ক্লাসে ছাত্রদের সেমিনার লেকচার দিতে বললেন। ছ'জন ছাত্র রাজি হল লেকচার দিতে। বাকি সকলে নিমরাজি। ছ'টি ভিন্ন ভিন্ন বিষয় পছন্দ করে তাদের বক্তৃতা দিতে বলা হল। ছ'জন ছাত্রের বক্তব্য শেষ হতে হতে ছ'দিন অতিক্রান্ত। 
তখন এম এস সি'র ফাইনাল রেজাল্ট বের হয়নি। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে বন্ধুরা সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছে। প্রফেসর সাহা হঠাৎ সেখানে ঢুকে পড়লেন। সূর্যেন্দুকে জিজ্ঞেস করলেন― 
'তুমি আমাদের এখানে কাজ আরম্ভ করছ না কেন?'
'পরীক্ষার ফল তো বেরোয়নি!'
'আজকে বেরোবে'― উনি বল্লেন।
১৯৫২ সালের মার্চে সাহা ইনস্টিটিউটে প্রফেসর মেঘনাদ সাহার অধীনে সাইক্লোট্রোন গ্রুপে গবেষণার কাজে যোগ দিলেন। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কোনও বেতন নেই। রটে গিয়েছিল বড়লোকের ছেলে সূর্যেন্দুর অর্থের প্রয়োজন নেই। জমিদারির আয় আছে। অথচ টিউশন পড়িয়ে কোনও রকমে কলকাতার খরচ উঠত তাঁর। এবার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটল। ওই বছর সেপ্টেম্বরে বোস ইনস্টিটিউটে একটি বিজ্ঞাপন বের হল। অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের ট্রেসার টেকনিক প্রকল্পে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট চেয়ে। তার ডিরেক্টর তখন ড: দেবেন্দ্রমোহন বসু। কাউকে না জানিয়ে আবেদন করে বসলেন তাতে। যারপরনাই ক্ষিপ্ত ড: মেঘনাদ সাহা। ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন সূর্যেন্দু। ড: সাহার হস্তক্ষেপে মাসিক দেড় শত টাকা স্থায়ী রিসার্চ ফেলোশিপের ব্যবস্থা হল। থেকে গেলেন সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার সায়েন্সে। অপরদিকে প্রফেসর ডি. এম. বসু রাগে অগ্নিশর্মা। তিনি হুইপ জারি করলেন―কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও ছাত্রকে তাঁর প্রতিষ্ঠানে পিএইচডি করতে দেবেন না। যদিও অনেক পরে সায়েন্স নিউজ অ্যাসোসিয়েশনের হয়ে সায়েন্স অ্যান্ড কালচারালের চিফ এডিটর হিসাবে শ্রী বসুর সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলেন। সম্ভবত আগের সব ঘটনা তিনি ভুলে গেছেন। 
সাহা ইনস্টিটিউটে সাইক্লোট্রোন গ্রুপে আংশিক সময়ের জন্য তাঁর কাজ নির্দিষ্ট ছিল। বাড়তি কাজ যুক্ত হল, নিজের পিএইচডি'র জন্য একটি মাস-স্পেকট্রোমিটার তৈরি করা। ১৯৫৫ সালে ছোট একটি মাস-স্পেকট্রোমিটার তৈরি করলেন। তা দিয়ে হালকা মৌলের আইসোটোপ পৃথক করা যাচ্ছিল। ভারতে তখন এই বিষয়ে কেউ গবেষণা শুরু করেনি। এসময় প্রফেসর সাহার উৎসাহে তিনি 'প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ' বৃত্তির জন্য থিসিস জমা দিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শর্ত অনুসারে একটি বড় আকারের ওই যন্ত্র তৈরির প্রকল্প জমা দিলেন। রেডিও ফিজিক্সের প্রফেসর শিশির মিত্র ছিলেন থিসিসের পরীক্ষক। মৌলিক উদ্ভাবনের জন্য তিনি জিতে নেন বৃত্তি। 

থিসিসের প্রকল্পটি সফল করতে পেল্লাই সাইজের মাস-স্পেকট্রোমিটার যন্ত্র বানাতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন প্রায় দু'টন ওজনের একটি ডিজাইনার চুম্বক। এত ভারী চুম্বককে ভারটিয়া ইলেকট্রিক স্টিল থেকে ঢালাই আর গার্ডেনরীচ ওয়ার্কশপে মেশিনিং করতে খুব পরিশ্রম করতে হয়। তায় আবার আনার বিশাল ঝক্কি! গার্ডেনরীচ থেকে ক্রেনে করে আনাতে হয়। এর সঙ্গে যন্ত্রের অন্যান্য অনুষঙ্গ যেমন আয়রন সোর্স, ডিটেক্টর, হাইভোল্টেজ পাওয়ার-সাপ্লাই ইত্যাদি তৈরি করতে হয়েছে। শেষমেশ ওই মাস-স্পেকট্রোমিটার যন্ত্রটি সফল ভাবে কাজ সম্পন্ন করেছে। প্রকল্পটির সফল রূপায়ণের জন্য তিনি 'মোয়াট স্বর্ণপদক' পান। পরবর্তী কালে সাইক্লোট্রোনের সাহায্যে নিউক্লিয়ার বিশ্লেষণে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ পৃথকীকরণ করতে মাস-স্পেকট্রোমিটার যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয়। বৈজ্ঞানিকের রচিত 'ভরের বর্ণালী' পুস্তকে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিত ব্যক্ত করা আছে। এই মাস-স্পেকট্রোমিটার যন্ত্রের সৌজন্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি জোটে। ১৯৬০ সালে বিখ্যাত অধ্যাপক এইচ ই ডাকওয়ার্থ তাঁকে কানাডায় আমন্ত্রণ জানান। ফ্রান্সের ওরস শহরে আইসোটোপ সেপারেটরের উপর একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স বসে। ১৯৬২ সালে। ফ্রান্সে ORSAY গবেষণাগারের ড: রেনে বার্নাস সেখানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। ফ্রান্সে পৌঁছলে অনেক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে পরিচয় হয়। আর্মস্টারডমের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাটমিক অ্যান্ড মলিক্যুলার ফিজিক্সের ডিরেক্টর কিস্তিমেকার, নেলসন, এহ্বাল্ড প্রভৃতি বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে তথ্যের আদানপ্রদান ঘটে। সম্মেলনের সূত্রে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেশ কিছু ল্যাব‍রেটরি দেখার সৌভাগ্য হয়। প্রচলিত ধারণার ব্যাপ্তি উন্নত হয়। গবেষণায় গতি আনতে বার্নেসের সহায়তায় সে দেশ থেকে বড় আইসোটোপ সেপারেটর কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৭০ সালে বসানো হয় সে-যন্ত্র।

তাঁর আবিষ্কৃত নতুন প্রযুক্তি মাইক্রোচিপ তৈরিতে কাজে লাগে। খুলে গেল পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার নতুন দিগন্ত। গবেষণার পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখি চলল সমানতালে। 'কণাত্বরণ' আর 'ভরের বর্ণালী' বইদুটি নিজের গবেষণালবদ্ধ অভিজ্ঞতা বিষয়ে লেখা। 'মহাবিশ্বের কথা', 'পদার্থ বিকিরণ রহস্য', 'সৃষ্টির পথ', 'মেঘনাদ সাহা জীবন ও সাধনা', 'প্রগতি পরিবেশ পরিণাম' বইগুলি মূলত নিউক্লিয়ার বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পরিবেশ নিয়ে লেখা। ছোটদের জন্য লিখেছেন 'পরমাণু থেকে বোমা ও বিদ্যুৎ'। 'সৃষ্টির পথ' পুস্তকের জন্য ১৯৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাছাড়াও বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের সঙ্গে আজীবন যুক্ত ছিলেন। ১৯৮১―১৯৮২-তে পরপর দুবার এই পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় 'নরসিংহ দাস পুরস্কার' প্রদান করে। 

নির্ধারিত সময় ১৯৮৪ সালে ষাট বছর বয়সে তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। কিন্তু সাহা ইনস্টিটিউট ফিউশন গবেষণার জন্য জাপান থেকে একটি টোকোম্যাক যন্ত্র ক্রয় করে। যন্ত্রটি বসাতে বিশেষজ্ঞ বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন। সেজন্য বাড়তি দুবছর উষ্ণ প্লাজমা প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন তিনি। যন্ত্রটি বসানোর পর ১৯৮৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। 

সাউটিয়ায় বিজ্ঞানীর উদ্যোগে ১৯৮২ সালে গ্রামীণ বিজ্ঞান মেলা শুরু হয়। মেলায় মডেল, যন্ত্রপাতি, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী হত। ছয় সজ্জার সাউটিয়া হাসপাতাল, সাউটিয়া হাইস্কুল গড়ে তুলতে তাঁর অবদান ভোলার নয়। মোহনপুর ব্লক থেকে কংগ্রেসের ব্লক প্রেসিডেন্টের জন্য শ্রদ্ধেয় বৈজ্ঞানিককে একবার নমিনেশন দেওয়া হয়েছিল। বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে জিতিয়ে আনাই ছিল লক্ষ্য। উদ্দেশ্য বিজ্ঞানের আলাদা মন্ত্রক তৈরি করে দায়িত্ব দেওয়া হবে বৈজ্ঞানিক সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্রকে। তখন মোহনপুর ব্লক থেকে জিতে ফুড মিনিস্টার হয়েছেন বিধায়ক চারুচন্দ্র মহান্তি। মূলত তার বিরোধীতা এবং বৈজ্ঞানিকের অনিচ্ছায় সে প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। 
সাহা ইনস্টিটিউটে থাকাকালে স্ত্রী শান্তিলতা দেবীকে নিয়ে প্রথমে বেহালা এবং কিছুদিন ৮/B সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় রোড এলাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন। তারপর বৈশাখীর কাছে সল্টলেকে BG-39, সেকটর-2 এলাকায় পাকাপাকি বসবাস করতে থাকেন। দুই ছেলে― বড় ছেলে ফাল্গুনী কর মহাপাত্র আই আই টি'র আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার এবং ছোট ছেলে শান্তুনু কর মহাপাত্র কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক। প্রথম থেকে বেদ, উপনিষদের ভূমিকা বিজ্ঞানীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এক সময় তিনি শ্রী শ্রী নিগমানন্দজী মহারাজের ভাবাদর্শে দীক্ষা নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, 'শ্রী শ্রী নিগমানন্দ-জন্মশতবার্ষিকী কেন্দ্রীয় কমিটি'র সম্পাদক হয়েছিলেন। বাংলা ১৩৮৭ সনে শ্রী শ্রী নিগমানন্দ-জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর নেতৃত্বে। 

শেষমেশ, ২০০৭ সালের মার্চ মাসের তেইশ তারিখে আমরা হারিয়েছি এই মহান বিজ্ঞানীকে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ হেন বিজ্ঞানীকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম এবং অকৃপণ ভালোবাসা জানাই।

তথ্য সহায়তা :
কৌশিক কর মহাপাত্র, সমীর কর মহাপাত্র, সুরেশ দাসের সাক্ষাৎকার, বিজ্ঞানীর লেখা বিভিন্ন বই।
'ঐতিহ্যের স্কুলবাড়ি' ― সন্তু জানা, 'মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা'― ভাস্করব্রত পতি, আনন্দবাজার পত্রিকা।

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

  1. মাননীয় বৈজ্ঞানিক মহোদয়ের উদ্যোগে সাউটিয়ায় ১৯৮২ সালে গ্রামীণ বিজ্ঞান মেলা শুরু হয়,ওখানে উনার সঙ্গে সাক্ষাতেরও সুযোগ ঘটে।উনি আমাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছিলেন।আমার অর্বাচিন প্রশ্ন ছিল বিজ্ঞান এবং প্রকৃতি-র মধ্যে আগে কে?উত্তরে বলেছিলেন তুমি যে বিজ্ঞান বই পড়ে মাধ্যমিক পাশ করলে তার নাম কি?বললাম প্রকৃতি বিজ্ঞান।বললেন উত্তর পেলে।
    এইখানে একটা ঘটনা উল্লেখ করলাম।উনি সরকীসমাঠ গ্রামের ত্রিলোচণ নন্দী-র(আমার জ্যেঠু)ছাত্র ছিলেন সেটা সম্ভবত প্রাইমারীতে।উনার বাড়ির সামনে প্রতিবছর রাসোৎসব হোত এবং আজও হয়,তখন দেখতাম ঐ মেলায় আমার জ্যেঠু গেলে এবং উনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হোলে উনি জ্যেঠুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন।আমরা অবাক হোতাম,এতবড় বিজ্ঞানী তিনি এঁকে প্রণাম করছেন।উপলব্ধি করতাম একারনেই উনি স্বন্মাখ্যাতা বিজ্ঞানী।আমি উনার স্কুলেরও ছাত্র।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল