আবৃত্তির পাঠশালা-১৭/শুভদীপ বসু

আবৃত্তির পাঠশালা-১৭

শুভদীপ বসু

বিষয়-ছন্দ(দ্বিতীয় পর্যায়)

৪)ছেদ ও যতি-আবৃত্তির সময় বাক্যে অর্থানুসারে ছেদ ছাড়াও চেতনানুভূতি অনুসারেও বিরতি ব্যবহার করা হয়। অর্থানুসারে বিরতি হলো logical pause, এর সঙ্গে বুদ্ধির সম্পর্ক। চেতনানুভূতিজাত রসভাব সমন্বিত বিরতিকে psychological pause বলে। এর সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক, অনুভূতি সম্পর্ক।
ছেদ কত প্রকার?
ছেদ মূলত দুই প্রকার--১)হ্রস্ব বা লঘু ছেদ ও২)পূর্ণচ্ছেদ।এই হ্রস্ব বা লঘু ছেদকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়-ক)হ্রস্ব বা লঘু ছেদখ) মধ্যচ্ছেদ বা অর্ধচ্ছেদ।
ক)হ্রস্ব বা লঘু ছেদ-কোন প্রকার আংশিক অর্থকে বোঝাবার জন্য কিছুক্ষণের জন্য যে বিরতি সেই বিরতিকে হ্রস্ব বা লঘু ছেদ বলে। কমা তারকা চিহ্নের মধ্য দিয়ে আমরা এটাকে বোঝাতে পারি। যেমন- আমরা আরম্ভ করি,
খ) মধ্যচ্ছেদ বা অর্ধচ্ছেদ-কোন বাক্যে যখন অনেকটা অংশের অর্থ প্রকাশ করা হয় তখন একটু বেশি সময় থামতে হয় সেটি হল মধ্য বা অর্ধচ্ছেদ। যেমন-
আমরা আরম্ভ করি শেষ করি না;
২)পূর্ণচ্ছেদ-যখন কোন বাক্যের সমস্ত অংশের অর্থ প্রকাশিত হয় এবং শেষে পূর্ণভাবে থামা হয় তখন পূর্ণচ্ছেদ হয়।যেমন-
আমরা আরম্ভ করি,শেষ করি না; আড়ম্বর করি,কাজ করি না।
যতি কত প্রকার?
যতি বা ছন্দযতি দু প্রকার।১)হ্রস্ব বা লঘু যতি ও২)পূর্ণযতি।এই হ্রস্ব যতি দুপ্রকার-ক)হ্রস্ব বা লঘু যতি ওখ)মধ্যযতি।
এ জগতে হায়/সেই বেশি চায়# আছে যার ভুরি/ভুরিll
/-হ্রস্ব বা লঘু যতি
#-মধ্যযতি
ll-পূর্ণযতি
ছেদ ও যতি এই দুটি হল উচ্চারণের বিরতি। কবিতায় ছেদ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার একটি অর্থ প্রকাশ পাবে যদি অর্থ প্রকাশিত না হয় তবে ছেদ হবে না।জ্যোতি পরে সুনির্দিষ্ট কালের ব্যবধানে তার কোন পরিবর্তন হয় না আর যদি পরিবর্তন হয় তবে ছন্দ পতন ঘটবে।
কে মেরেছে/কে ধরেছে/কে দিয়েছে/গাল।-এখানে যদি আমি পড়ি-কে মেরেছে কে/ধরেছে/কে দিয়েছে গাল, তবে ছন্দের কোন তরঙ্গ সৃষ্টি হয় না এবং শুনতেও ভালো লাগে না।
  একটু সতর্কভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়-ছেদের যখন বিরতি হয় তখন জিভ বিশ্রাম লাভ করে, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ থাকে,ধ্বনি প্রবাহ অল্পক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যতির যখন বিরতি হয় তখন জিভ বিশ্রাম লাভ করে তবে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস প্রক্রিয়া বন্ধ হয়না ও ধ্বনি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
৫)পর্ব-হ্রস্ব যতি দ্বারা যখন ধ্বনি প্রবাহ খণ্ডিত হয় তখন সেই খন্ড ধ্বনি প্রবাহকে পর্ব বলে। ইংরেজিতে একে foot বা bar বলে।
 রাত পোহালো/ফর্সা হলো/ফুটলো কত/ফুল।।
এই পর্ব মূলত তিন প্রকার-ক)পূর্ণ পর্বখ)প্রান্তিক পর্বগ)অতিপর্ব
পূর্ণ পর্ব কবিতার চরণে শুরু থেকে প্রথম হ্রস্ব যতি, প্রথম হ্রস্ব যতি থেকে পরের হ্রস্ব যতি পর্যন্ত হয়। প্রান্তিক পর্ব চরণের শেষে অবস্থান করে ও চরণের সমাপ্তি ঘোষণা করে। অতিপর্ব সচরাচর চরণের শুরুতে থাকে ও চরণটি কে একটি গতি দেয়।
(ওরে) প্রাণের বেদনা/প্রাণের আবেগ/রুধিয়া রাখিতে/নারি।।
পূর্ণ পর্ব-প্রাণের বেদনা/প্রাণের আবেগ/রুধিয়া রাখিতে/
প্রান্তিক পর্ব-নারি
অতিপর্ব-ওরে
পর্বাঙ্গ-কবিতা পড়ার সময় কণ্ঠস্বরে যে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে তাতে কবিতার প্রতিটি চরণে পর্ব দুটি, তিনটি ছোট ছোট বিভাগে বিভক্ত হয়ে যায় যদিও এই বিভাগ স্পষ্ট নয়।এই একেকটি বিভাগকে বলা হয় পর্বাঙ্গ বাbeat.
রাত পো:হালো/ফর্সা:হলো/ফুটলো:কত /ফুল।।
রাত পোহালো একটি পর্ব তার দুটি পর্বাঙ্গ হল রাতপো ও হালো।
৬) পদ ও চরণ-অর্ধ যতির দ্বারা নির্দিষ্ট বিভক্ত ধ্বনি প্রবাহকে পদ বলে।ও একের বেশি পর্ব নিয়ে গঠিত হয় কবিতার চরণ ।
'প্রিয়াকে আমার/কেড়েছিস তোরা#ভেঙেছিস ঘরবাড়ি'।।
এই পুরোটাই একটা চরণ যার মধ্যে পদ আছে দুটি-প্রিয়াকে আমার/কেড়েছিস তোরা ও ভেঙেছিস ঘরবাড়ি।
৭) পঙক্তি ও স্তবক-পংক্তি হোল প্রণালীবদ্ধ পদের সমাবেশ। তবে পংক্তি মানেই যে চরণ তা সব সময় নয়। একটি চরম কে যদি এক লাইনে লেখা হয় তবে তা একটা পংক্তি হবে।যদি চরণ কে পর্ববিন্যাস করে অর্থাৎ ভেঙে ভেঙে লেখা হয় তাহলে পর্ব অনুসারে 2,3,4 পঙক্তি হতে পারে।
'বাঙালির হিয়া/অমিও মথিয়া/ নিমাই ধরেছে/কায়া'-এটি এক লাইনে লিখলে একটি পংক্তি কিন্তু যদি ভেঙে ভেঙে দুটি বা তিনটি লাইনে লেখা হয় তবে দুই বা তিন পংক্তি।
স্তবক-কবিতার চরণ গুলিকে নিয়ে একটি সুশৃংখল ছন্দ গ্রন্থি রচিত হলে তাকে স্তবক বলে।
বৈশিষ্ট্য-১. স্তবক গঠিত হয় একাধিক চরণ নিয়ে। ২. বিভিন্ন স্তবকে বিভিন্ন ভাব ব্যক্ত হয়ে থাকে।৩. নানা স্তবকের একত্রে সমাবেশ হলে কবিতাটি মালার মতো আকার নেয়।
৮)লয়-কবিতা পাঠ করার সময় উচ্চারণের গতির মধ্যে যে সুর তৈরি হয় তাকে লয় বলে।লয় তিন প্রকার-ক) ধীরলয় খ)দ্রুতলয় গ)মধ্যম বা বিলম্বিত লয়।
৯) মিল -মিল হলো ধ্বনি সাম্য।কোন কবিতার এক বা একের বেশি পর্ব অথবা পদের কিংবা চরণের শেষে যে ধ্বনি তার সঙ্গে পরের এক বা একের বেশি পর্ব বা পদের শেষ ধ্বনির যে সাম্য স্থাপিত হয় তাকেই বলে মিল। এই মিল পর্বান্তিক,পদান্তিক,চরণান্তিক হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি