এশিয়া (জাভা)-র লোকগল্প / চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প-- এশিয়া (জাভা)

চিন্ময় দাশ 

দেখতে ছোট বুদ্ধিতে বড় 

(মাউস ডিয়ার : স্তন্যপায়ী প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত, পায়ে খুরওয়ালা ছোট্ট একটি জীব। মুখটি একেবারে ইঁদুরের মত, শরীরের বাকি অংশ হরিণের। সেকারণেই, এর ইংরেজি নাম-- মাউস ডিয়ার। ছোট প্রাণী, ওজনে বড় জোর সের দুয়েক। খরগোশের মত দেখতে হয় পরিণত বয়সে। চেহারায় ছোট হলেও, বুদ্ধিমান প্রাণী হিসাবে খ্যাতি আছে মাউস ডিয়ারের। ইন্দোচীন, মায়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, জাভা ইত্যাদি দেশের বনাঞ্চলে এখনও কিছু টিকে আছে এরা। বাংলাদেশে এদের বলে-- ফইট্টা। ভারতের কোন কোনও হিন্দীভাষী এলাকায় নাম-- পিসুরী। আমরা একে 'হরিণ' নামেই উল্লেখ করেছি এখানে। 
আমাদের আজকের এই গল্পটি জাভায় বহুল প্রচলিত।)

বনের ফল আর গাছগাছাড়ির মূল-- ওই খেয়েই পেট ভরাতে হয় বেচারাকে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। একঘেয়ে খাবার খেয়েই দিন কাটে মাউস ডিয়ারের। অন্য কিছু খাবার খেতে ভারী লোভ হয় তার। কিন্তু জুটবে কী করে? 
খানিক দূরে আছে এক চাষির খেত। কিন্তু ঢুকতে সাহস হয় না। ধরা পড়ে যায় যদি। লোভ সামলাতে না পেরে, একদিন চলেই গেল সেখানে। অমনি চোখ জোড়া গেল কপালে উঠে। পলক পড়ছে না তার। এ সব কী দেখছে সামনে? বিশ্বাস করতেই পারছে না। 
সারি সারি সবজি লাগানো খেতটাতে। এক সারিতে রসালো শশা। পাশের সারিতে ঝকঝকে হলুদ রঙা গাজর। মিষ্টি রাঙাআলু মাটির ভিতর থেকে মাথা উঁচিয়ে উঁকি মারছে তার পাশেরটায়। লোভ সামলানো যায় না কি? 
এদিক ওদিক একবার দেখে নিয়ে, সুড়ুৎ করে ভিতরে ঢুকে পড়ল হরিণ। আর, এমনই পোড়া কপাল বেচারার! আঁক-- কিসে যেন পা গিয়েছে আটকে। 
আসলে, চাষি ভালো মতোই জানে, বনের লাগোয়া জমিতে সবজির খেত বানানো মানেই বিপদের একশেষ। চুরি করে সবজির বাগানে ঢুকে পড়তে পারে, এমন অনেক জীবই আছে বনের ভিতর। তাই বেড়ার গা-লাগোয়া করে ফাঁদ পেতে রেখেছে বাগানের মালিক। তাতেই ধরা পড়ে গেছে হরিণ।
পা-টাকে টেনে, ছিটকে, হাজারো চেষ্টা হাজারো কসরত করতে লাগল বটে হরিণ, ফল কিছুই ফলল না। বুঝতে বাকি রইল না আর, আজ হরিণের মাংস দিয়েই দুপুরের আহার করবে লোকটা। 
একসময় হরিণের চোখে পড়ল, মালিক লোকটা আসছে ক্ষেতের দিকে। অমনি চট করে মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল তার। টুক করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। মড়ার মত পড়ে রইল চোখ বুজে।
হরিণটাকে দেখে, চাষি তো আহ্লাদে আটখানা। -- আহা, কী সৌভাগ্য আজ আমার ! হরিণ ফাঁদে পড়েছে। ভালোই ভোজ হবে আজ। কিন্তু ... একটু থমকে গেল লোকটা-- এটা তো মরে গেছে মনে হচ্ছে।
পা দিয়ে একটু ঠেলা দিল সে। কিন্তু শরীর তো শক্ত কাঠ করে রেখেছে হরিণ। নড়ন-চড়ন হল না তেমন। 
চাষী বলল-- ও বাবা, এ যে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে দেখছি। কী জানি, কখন থেকে মরে আছে। খাওয়াটা ঠিক হবেনা। 
মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল চাষির। কিন্তু কিছুই তো আর করার নাই। ফাঁদ থেকে ছাড়িয়ে, দূরে ছুঁড়ে দিল হরিণটাকে। ধুপ করে একটু শব্দ হল কেবল। উঠে দাঁড়িয়েই, লম্বা এক ছুটে সোজা বনের ভিতর ঢুকে পড়ল হরিণ।
ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল চাষি। আসলে, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে লোকটা। বলল-- আরে হতচ্ছাড়া, বুদ্ধু বানিয়ে দিলি আমাকে?
চলে যেতে যেতে কথাগুলো কানে গিয়েছে হরিণের। সে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিল-- চাষী তুমি চালাক বটে। কিন্তু জেনো, বুদ্ধি বেশি আমার ঘটে।।

ক'দিন কেটে গেল তার পর। বেঁচে পালিয়ে আসতে পেরেছে, এ নিয়ে বেশ একটা গর্ব হরিণের মনে। কিন্তু একটা সবজিও দাঁতে কাটতে পারেনি সেদিন। এটা মনে পড়লেই, ভারী কষ্ট হয় তার। খেদটা মন থেকে যাচ্ছে না কিছুতেই। 
আহা, কী বড় বড় সব ঝিঙে! আর, লোভনীয় কতো মিষ্টি আলু-- ভাবতে ভাবতে একদিন চলেই এলো আবার। বেড়ার কাছে এসে একটু থমকে যেতে হল তাকে। ওরে বাবা, এটা আবার কী? একেবারে নতুন জিনিষ দেখছি। আস্ত একটা মানুষের মত। কিন্তু একেবারে নড়- চড়ন নাই। মাথাটা দেখি আস্ত একটা ঝুনো নারকেল যেন। শরীরটাও তো রাবারের মনে হচ্ছে।
-- আরে, এ তো একটা কাকতাড়ুয়া দেখছি। এক গাল হেসে, হরিণ মনে মনে বলল-- চাষি ভেবেছে ভয় পাইয়ে দেবে আমাকে। কতটা ভীতু আমি, দেখাচ্ছি আজ ব্যাটাকে।
সোজা কাকতাড়ুয়াটার সামনে গিয়ে হাজির হল হরিণ। আমাকে বোকা বানানোর কারসাজি? এই বলে, সামনের পা দিয়ে ঝেড়ে এক লাথি কষাল হাসতে হাসতে। অমনিই বিপদ। কাকতাড়ুয়ার সারা গায়ে যে রাবার গাছের আঠা মাখিয়ে রেখেছে চাষি, সেটা ঠাওর করতে পারেনি হরিণ। আর, তাতেই গেল ফেঁসে। পা-টা আটকে গেছে কড়া আঠায়।
-- আরে, আরে, করছোটা কী? পা ছাড়ো বলছি। 
কিন্তু পা কি আর ছাড়ে? তখন খুব রাগ হল তার। সামনের আর একটা পা দিয়ে আবার লাথি মারল হরিণ। তাতে সেটাও গেল আটকে।
হরিণ চিৎকার করে বলল-- এখনও বলছি, পা ছেড়ে দাও ভালোয় ভালোয়।
কিন্তু কে শুনবে তার কথা? আর, পা-ই বা ছাড়বে কে? এবার পিছনের জোড়া পায়ের লাথি কষাল যেই, অমনি পুরোপুরি আটকে গেল বেচারা। নড়াচড়া করবার ক্ষমতাও রইল না তার।
সারা দিনটা এভাবেই কেটে গেল। বিকেলও যায় যায়, এমন সময় চাষি এসে হাজির। অনেক ভেবেও কোন ফন্দি এল না হরিণের মাথায়। তবে ভালোই বুঝে গেল, আজ আর রেহাই নাই।
--আরে, আরে-- চাষি বেশ আহ্লাদের গলায় বলল-- কী সৌভাগ্য আজ আমার। তুই ব্যাটা ফিরে এসেছিস। 
হরিণটাকে ছাড়িয়ে, বাড়ি নিয়ে এল চাষি। মুরগির একটা খাঁচা খালি পড়েছিল অনেক দিন। সেটার ভিতর ঢুকিয়ে রেখে দিল হরিণটাকে। বলল-- আজকের রাতটা ঘুমিয়ে নে শেষ বারের মতো। কাল মাংসের ভোজ হবে তোকে দিয়ে। 
শেষ পর্যন্ত এভাবে জীবনটা দিতে হবে? ভেবে ভেবে সারা রাত ঘুম এলো না হরিণের চোখে। ভোরের দিকে চোখ জোড়া একটু বুজে এসেছে, কার যেন গলা শোনা গেল-- আরে, হরিণ ভায়া যে। 
একটা কুকুর ছিল চাষির। কুকুরটা বাড়ি ফিরে, খাঁচায় হরিণকে দেখতে পেয়েছে। সে বলল-- তাহলে, আমার মালিক শেষ পর্যন্ত পাকড়াতে পেরেছে তোকে? 
কথাগুলো কানে যেতেই, চিড়িক করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল হরিণের মাথায়। সে বলল-- মালিক পাকড়েছে মানে? কী বলছো তুমি? মালিক তো আমাকে ধরে আনেনি।
-- তাহলে, তুই খাঁচায় কেন?
-- তুমি ছিলেটা কোথায় কাল সারাদিন, সেইটা আগে বলো, শুনি? তোমাকে কত খোঁজাখুঁজি করল মালিক। শেষমেষ তো আমাকে গিয়ে ডেকে আনলো।
কুকুরটা একটু ঘাবড়ে গেল এমন কথা শুনে। বলল-- ব্যাপারটা কী, একটু খুলে বল তো, শুনি।
হরিণ বুঝলো, কাজ হয়েছে। হাসি মুখে বলল-- তুমি জানো না, আজ তো এ বাড়িতে মহাভোজের আসর। তাই তো তোমাকে না পেয়ে, আমাকে ডেকে আনল, প্রধান অতিথি হিসাবে। বাড়িতে জিনিসপত্র ডাঁই হয়ে আছে। পা ফেলবার জায়গাটিও নাই। তাই আমাকে এখানে থাকতে দিয়েছে। তবে বাপু, মালিক তোমার মানুষটি ভালো। এটা মানতেই হবে। এভাবে বাইরে এক'এ খাঁচায় থাকত হচ্ছে বলে, অনেক অনুরোধ-টনুরোধ করে, দুঃখ প্রকাশ করল আমার কাছে। আমিও ভাবলাম, কাজের বাড়িতে অমনটা সকলেরই হয়। ঘরে জিনিসপত্র ডাঁই করা। কোথায় বিছানা করবে অতিথির? তাছাড়া একটাই তো রাত। দিব্বি কাটিয়ে দিলাম।
এসব শুনে, মাথা ঘুরতে লাগল কুকুরের। গরগর করে উঠে বলল-- এটা কেমন বিচার হল? আমি এতদিন একনাগাড়ে সেবা করে গেলাম মালিকের। আর অনুষ্ঠানের সময় প্রধান অতিথি করে নিয়ে এল বাইরের লোককে! তা-ও আবার যে কি না একটা চোর!
-- ঠিকই বলেছ, বন্ধু। এই সম্মান তোমারই পাওয়ার কথা। তুমিই যোগ্য লোক। তুমি থাকতে আমাকে ডাকা কেন? সত্যিই তো, এত লোকজনের সামনে তোমার মাথা হেঁট হয়ে যাবে তাতে। না ভাই, আমি যাই। তোমার সম্মান তুমিই নাও।
হরিণের কথায় কুকুর বেশ উৎফুল্ল।  বলল-- ঠিক বলছো তুমি? কিছু মনে করবে না তো? 
-- আরে, এতে মনে করবার কী আছে? সম্মান উপযুক্ত লোককেই দিতে হয়। কোথায় তুমি, আর কোথায় আমার মত একটা ছিঁচকে চোর! যাই বলো ভাই, মালিকের তোমার বিচারটা ঠিক হয়নি। তবে, একটু বাদে, তোমাকে আমার যায়গায় দেখলে, খুশিই হবেন তিনি।
কুকুর বলল-- চুরি করো আর যাই করো, তুমি মানুষটা তো দেখছি মন্দ নয় হে। বলতে বলতে এগিয়ে এসে খাঁচা খুলে দিতে, হরিণ বাইরে বেরিয়ে এলো। কুকুর গিয়ে ঢুকে পড়ল ভিতরে। অমনি টুক করে খাঁচার আগল টেনে দিল হরিণ। বলল-- ধন্যবাদ। ভালো করে ভোজসভা উপভোগ করো, বন্ধু। আমি ঘরে যাই। 
যেতে যেতে মালিকের গলা কানে এলো হরিণের। লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। খাঁচার ভিতর কুকুরকে দেখে, চেঁচিয়ে উঠেছে-- ওরে হতভাগা। বোকার বেহদ্দ কোথাকার। হরিণটাকে ছেড়ে দিলি তুই? 
হরিণ বুঝতে পারল, আজ ভোজ খেতে হলে, পালংশাক আর গাজরের ঘন্টই খেতে হবে লোকটাকে।
পালাতে পালাতে মনটা আবার ভালো হয়ে গেল। গান চলে এলো হরিণের গলায়-- মাথায় আমার বুদ্ধি ভরা, ভালোই পারি দৌড়তে। যতই কেন চেষ্টা করো, পারবে নাকো ধরতে।।
গান গাইতে গাইতে বনের ভিতর ঢুকে পড়ল হরিণ। বুদ্ধির জোরে, বড় জোর বাঁচা গেছে আজ।

পেজ-এ লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি