আন্তর্জাতিক নারীদিবসের ভাবনা/রোশেনারা খান

আন্তর্জাতিক নারীদিবসের ভাবনা
রোশেনারা খান

আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালনের পশ্চাতে যে ইতিহাস রয়েছে তা হল, ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সুতো কলের মহিলা শ্রমিকরা সমকাজে সমমজুরি, কাজের সময় ১৬ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টা করার, কাজের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ইত্যাদির দাবিতে পথে নেমেছিলেন।সরকারের লেঠেলরা সেই মিছিলের ওপর নির্বিবাদে লাঠি চালিয়েছিল। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশালিস্ট উইমেন্স কনফারেন্সে আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনের নেত্রী ক্লারা জেটকিন বিশ্ববাসীর কাছে  ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারীদিবস হিসেবে পালন করার আবেদন রাখেন। ইনিই ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে মহিলাদের সমানাধিকারের বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেছিলেন। এর ফলে সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।

   বিশ্ব নারীদিবস পালন করা শুরু হয় ১৯১১ সালের ৮ মার্চ থেকে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার মহিলা শ্রমিকেরা অত্যাচারী জারের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। স্বৈরাচারী জার সেদিন কিছুটা হলেও নারীর ক্ষমতা অনুভব করতে পেরেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবসে প্রায় ৮০ হাজার নারী শ্রমিক নগরের পথে শোভাযাত্রা বের করেছিলেন। ১৯৬০ সালে  বিশ্বনারী সঙ্ঘের উদ্যোগে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালন করা হয়েছিল।

   গত এক শতাব্দীতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবশ্যই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলে গেছে। বিশ্বায়নের সাথে সাথে এখন নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিও বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী নারী ও পুরুষ সমান অধিকারের দাবিদার। কিন্তু কাগুজে আইনকে আজও পুরোপুরিভাবে সমাজ ও পরিবারে প্রতিষ্ঠা  করা সম্ভব হয়নি। আজও একটি ছেলে বা মেয়ের পরিচয় জানতে তার বাবার নাম জিজ্ঞেস করা হয়। একজন পূর্ণ বয়স্ক নারীর ক্ষেত্রেও তাঁর স্বামীর নাম জানতে চাওয়া হয়। কোনও পুরুষের পরিচয় জানতে কিন্তু তাঁর মা বা স্ত্রীর নাম জানতে চাওয়া হয় না। বহু পরিবারে শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে পুত্র সন্তানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আমাদের দেশে সাম্যের অভাবে মেয়েদের ভীষণভাবে লিঙ্গ বৈষম্য ও শ্রেণি বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। শিক্ষা, স্বনির্ভরতা, রাজনীতি, খেলাধুলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে খুবই সামান্য সংখ্যক নারী পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠতে সক্ষম হলেও বেশি সংখ্যক নারীই আজও সম্পূর্ণভাবে পুরুষনির্ভর। বাবা-মায়ের কাছে এরা সন্তান হিসেবে নির্ভরযোগ্য নয়। আমাদের রাজ্যে, তথা সারা দেশে আজও পুরুষের তুলনায় নারীর আনুপাতিক হার কম।

    ১৯৯৫ সালের বেজিং এ অনুষ্ঠিত নারী সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত রিপোর্টে  বলা হয়েছিল, ‘বিশ্বের ১.৩ মিলিয়ন দরিদ্র মানুষের মধ্যে ৭০% মহিলা। সমস্ত কাজের  দুই তৃতীয়াংশ মহিলারা করে থাকলেও আয় করেন মাত্র এক দশমাংশ। এটা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না’। আজ ২০২১ শে পৌঁছে মহিলাদের খুব  বেশি পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না।
    বাল্যবিবাহ রুখতে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ২০১৩ সালের ৮ মার্চ কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু করেছিলেন, প্রথম দিকে ভাল কাজ হলেও বাল্যবিবাহ বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। স্কুলের দীর্ঘ ছুটিতে বাবা-মা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। লকডাউনের সেই পথকে আরও অনায়াস করেছে। বহু নাবালিকা স্কুল ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। কেউ কেউ চালাকি করে কন্যাশ্রী ও রূপশ্রীর টাকা আদায় করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। বেড়ে চলেছে নারী ও শিশু পাচার, ধর্ষণ। নারী ও শিশুর বড়ই সুরক্ষার অভাব। প্রতি বছর আজকের দিনে যদি নারীর কোনও একটি সমস্যা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এবং তা কার্যকর করা হয়, তাহলে এই দিনটি পালন করা সার্থক হয়ে উঠবে।

    মহিলাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার খুবই অভাব। নিজের শারীরিক  সমস্যার কথা সহজে প্রকাশ করতে চায়না। যখন অসুস্থতা  বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌছায় তখন বাড়ির লোক জানতে পেরে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে অনেকসময়ই কিছু করার থাকে না। অকালে প্রাণ হারাতে হয়। তবে এটাও হয়, অনেক পরিবারে মহিলাদের অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়না।বলতে  গেলে স্বামী শাশুড়ি কাজে ফাঁকি দেওয়ার  অজুহাত বলে দু’চার কথা শুনিয়ে দেন। তাই ভয়ে অনেকে নিজের অসুস্থতার কথা বলেন না। এঁরা গর্ভবতী মায়েরও যত্ন নেয় না।শাশুড়ি পরের মেয়েকে,মানে ঘরের বউকে জব্দ করতে গিয়ে গর্ভের সন্তানের ক্ষতি করে থাকেন। জানেন না,বা বোঝেন না,মা সময়মত খাবার না খেলে গর্ভের সন্তানটিও উপবাসে থাকবে। মা পুষ্টিকর খাবার খেলে তবেই গর্ভস্থ সন্তানের শরীর সুস্থ,সবলভাবে বেড়ে উঠবে।

   নিজেদের অসহয়তার কারণে দরিদ্র বাবা মা অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়েই থাকেন। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে ছেলে মেয়েরা বাবা মাকে লুকিয়ে কোনও মন্দিরে গিয়ে ঠাকুরের সামনে মালাবদল করে, ঠাকুরের পায়ের সিন্দুর বালিকার সিঁথিতে লাগিয়ে দিয়ে বিয়ে করে নিচ্ছে। এসব হল বোকাবাক্স ও সেলফোনের কু-প্রভাব। এই নেশা মদ গাঁজার থেকে কোনও অংশে কম নয়। বর্তমান প্রজন্মের ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সব ছেলেমেয়ের হাতেই এখন সেলফোন দেখা যায়। একবার একটি সমীক্ষায় জানা গেছল, গ্রামাঞ্চলে শৌচাগারের থেকে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা বেশি। এখন আবার অনলাইনে পড়াশোনা চলছে। এই জায়গায় নিয়ন্ত্রণের খুবিই প্রয়োজন।

   শিশুধর্ষণ রুখতে হলে পরিবার ও প্রতিবেশীদের খুবই সচেতন থাকতে হবে। শিশুরা যেন তাদের শরীরের বিশেষ কিছু অংশে কাউকে স্পর্শ করতে না দেয়। কেউ জোর করে স্পর্শ করে থাকলে তা যেন মা বা বাড়ির লোককে জানায়। এই বিষয়টি ওদের ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। আন্তরিকতার সঙ্গে যদি  এই সমস্ত বিষয় নিয়ে কাজ করা যায়, তবেই নারীদিবস পালন বিশেষ মাত্রা পাবে।

পেজ-এ লাইক দিন👇
                   
 আরও পড়ুন   
                           

Comments

  1. খুব ই সুন্দর লেখা, constructive

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি