আমার অনুভবে রবীন্দ্রনাথ/আবীর ভট্টাচার্য্য

আমার অনুভবে রবীন্দ্রনাথ

আবীর ভট্টাচার্য্য

এক যন্ত্রণাময় যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা।রাজ্য, দেশ, পৃথিবী জুড়ে এক অজানিত মারণব্যাধির আক্রমণ ; দিকে দিকে সুস্থ মননশীল চিন্তায় আঘাত ; স্বাস্হ্য নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই, খাদ্য নেই, সচেতনতার পাঠ নেই.... মানুষ আজ বড়ো অসহায়,বড়ো একলা! এই আশ্রয়হীনতায় ভরসা  যোগায় কে?যন্ত্রনাবিদ্ধ মানুষগুলিকে আশ্রয়ই দেয় কে? প্রকৃতি? দেবতা না অন্য কিছু? শূন্য করে ভরে দেওয়া যার খেলা, তার অপেক্ষা, অপেক্ষায় কাটে দিন, সকলবেলা.....
  বড়ো ব্যথা,বড়ো অসহায়তা! এই সর্বগ্রাসী অসহায়তা উত্তরণে আমরা বারবার একমাত্র যাঁর দুয়ারে আশ্রয় নিতে পারি, কবিতায়,গল্পে, জীবনবীক্ষায় যাঁর গানের ঝরণাতলায় আমাদের চিত্তশুদ্ধি, অবগাহন, তিনি রবীন্দ্রনাথ, তিনি আমাদের চিরপথের সঙ্গী। আমাদের প্রভু, আমাদের প্রিয়, আমাদের একমাত্র ঠাকুর।
ছোট্টবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের পরম আশ্রয়, তাঁর সুরে, গানে নিষিক্ত বাঙালীর মধ্যবিত্ত আকিঞ্চন জীবন। 'আমারে যদি জাগালে তুমি নাথ, যেওনা ফেলে চলে'.. নিশীথ রাতে চাঁদের আলোয় ভেসে যায় চরাচর,শালমহুলের বনে,আগাছাভরা ডোবায়, অন্ধকারে পদ্ম ফুটে থাকে, রোদনভরা বসন্তেও কার বীনা যে বাজে মনোমাঝে, পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু শিশিরকণা ঝরে শেষরাতে, তৃপ্ত বৈশাখে অথবা অঝোর বাদলবেলায়...... নিঃসঙ্গ প্রহরে,'একলা ঘরে চুপে চুপে, সুরের রূপে', তিনি আসেন, ডাক দিয়ে যান ইঙ্গিতে, অনেক দিনের গান আমাদের সে সুরে ভেসে যায়,এক অসামান্য দ্যোতনায় অনুভব করি, তিনিই আমাদের পরম আশ্রয়,পরাণসখা। যত বিপদ-বাধা,ক্ষয়-লয় আসুক,মনে মনে  থাকে প্রত্যয়...."যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
      সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
 যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
      যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
 মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
      দিক্‌-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা—
 তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
      এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।" তাঁর অমৃতআশীষে হাতে হাত রেখে পার হয়ে যাই দুঃখপথ, প্রেরণা পাই নতুন লড়াইয়ে। পুত্র,প্রিয়,প্রেমিক, পিতা হয়ে  আসেন বারবার, জীবনের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র ছুঁয়ে যান,ভরসাপ্রার্থী আকুল মন কাঁদে,ওগো, তুমি কিছু দিয়ে যাও, 'ফুলের গন্ধে,ব্যথার তানে'.... তিনি দিয়ে যান অপরিমেয় সম্পদ।তাই হয়তো 'তাঁর চরণধ্বনি হৃদয়ে গণি'...'সে আসিবে' আমার মন বলে সারাবেলা, অনন্ত অপেক্ষায় থাকে প্রাণ, আমিত্বের সমস্ত তুচ্ছতা ভুলিয়ে তাঁর আহ্বানে নিবেদন করি আপনারে, 'আমি তোমার ভুবন-মাঝে লাগি নি, নাথ, কোনো কাজে;শুধু কেবল সুরে বাজে   অকাজের এই প্রাণ'!আর তাই 'যাহা কিছু আছে সকলই ঝাঁপিয়া, ভুবন ছাপিয়া, জীবন ব্যাপিয়া'.....তাঁর গানে আনন্দ নেমে আসে আমাদের মাটির পৃথিবীতে, ত্রিভুবনেশ্বর মেলেন,মেলান আমাদের তাঁর অমিত প্রেমময় কল্যাণশক্তিতে, তারায় তারায় দীপ্তশিখায় আলো জ্বলে, খন্ডিত ক্ষুদ্র আমি হয়ে উঠি দেবোপম,'আমারে তুমি অশেষ করেছ,এমনি লীলা তব'... সংরাগে, নিবেদনে তৃপ্ত হই...... 'তাই ফুরায় যবে মিলনরাতি, তখনও তিনি থাকেন সাথের সাথী',জীবনভ'র ফুরায় না তাঁকে পাওয়া ...এক অনিঃশেষ পুলকবেদনা নিয়ে কেটে যায় আমাদের জন্ম জন্মান্তর, এ জীবনের ক্ষয়-ক্ষতি তুচ্ছ মনে হয়, নতুন যুগের শুভ সূচনায় 'মাতৃমন্দির পূণ্য-অঙ্গনে' শুভ শঙ্খ বাজে, ধ্রূবতারা হয়ে এই ঘনায়মান অন্ধকারে তিনি আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে থাকেন, সারা আকাশ জুড়ে তাঁর অমৃতকন্ঠ যেন বেজে ওঠে,'নাই,নাই ভয় হবে হবে জয'.. পেরিয়ে তাই আঁধারের পথ, নতুন আশায় শুভকর্মপথে ধরি নির্ভয়গান।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি