আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৩৯/শ্যামল জানা

আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৩৯

শ্যামল জানা

দাদাইজম্-এর জন্ম

শুধুমাত্র শিল্পকর্ম নয়, বিশাল কর্মকাণ্ডের পরিধি নিয়ে দাদাইজম্ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটল৷ যেমন— প্রকাশ্য জমায়েত, নানা ধরনের শিল্প-প্রদর্শনী, ছবি সংক্রান্ত বই ও সাহিত্য সাময়িকপত্র প্রকাশ(ছবি-১)৷
 পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতি-রাজনীতির নানা আবেগপ্রবণ প্রচার, এবং এগুলিকে বিষয় করেই বিভিন্ন ধরনের সংবাদ মাধ্যমে আলোচনার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি নানা রকমের কর্মসূচি দাদাইস্টরা নিয়েছিলেন৷

    আর, সদস্য সংখ্যাও ছিল প্রচুর! তবে দাদাইস্ট আন্দোলনের মূল কাণ্ডারী যাঁরা ছিলেন, তাঁরা হলেন— জাঁ আর্প, জোহানেস বাদের, হুগো বল, মার্শেল দুশাম্প, ম্যাক্স আর্নস্ট, এলসা ভন ফ্রেট্যাগ-লরিঙ্গোভেন, জর্জ গ্রস্, রাওউল হাউসমান, জন হার্টফিল্ড, এম্মে হেনিংস, হান্নাহ্ হোচ্, রিচার্ড হুয়েলসেনবেক, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, ম্যান রে, হান্স রিখটার, কার্ট শ্চোইটার, সোফি টেউবার-আর্প, ত্রিস্তান জারা, এবং বিট্রিস উড(ছবি-২)৷
    শুধু কি তাই? এই দাদাইজম্-এর আন্দোলনের দর্শন এতটাই অন্যরকম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্বলিত ও ইতিহাস বহির্ভূত ছিল, যে, এঁদের দ্বারা শুধু একক মানুষ নয়, নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান, একাধিক দল, একাধিক ইজম্ও প্রভাবিত হয়েছিল৷ যেমন— ‘ডাউনটাউন মিউজিক মুভমেন্টস’, ‘সাররিয়েলিজম্’, নৌভেউ রিয়েলিজম্, পপ আর্ট এবং ফ্লুক্সাস৷

    আসলে, দাদাবাদ ছিল আক্ষরিক অর্থে আন্তর্জাতিক আন্দোলন, অথচ তা ছিল একেবারে আড়ম্বরহীন৷ আর, এই আন্দোলনে দেশ হিসেবে প্রথম শামিল হয় ইয়োরোপ ও উত্তর আমেরিকা৷ কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাব বা আঁচ প্রথম এই দুটি দেশেই সবচেয়ে বেশি লেগেছিল৷ এবং শুধু শিল্পীরা নন, বহু বহু সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন৷
    আশা করি আপনাদের মনে আছে, ’৩৬ নং’ কিস্তিতে আমরা আলোচনা করেছিলাম— আইনস্টাইন-এর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব(থিওরি অফ রিলেটিভিটি বা E=mc2)আবিষ্কার৷ সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর থিওরি অফ আনকনসাস মাইন্ড আবিষ্কার৷ আর, কার্ল মার্কস-এর মুনাফা ও শোষণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তথা কমিউনিজম্-এর ধারণা৷

  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ না ঘটলে এই তিনটি বিষয় হয়ত আদৌ তৈরি হত না! আর, এই তিনটি বিষয়ের সূত্রপাত হওয়ার পরই এত দিনের ‘এক তরফা আধুনিকতার’ সম্পূর্ণ বিপরীতে সাধারণ মানুষকে ঐতিহাসিকভাবে ভাবতে সাহায্য করল, যা আধুনিকতার সংজ্ঞাকে পৃথিবী জুড়ে একেবারে পাল্টে দিল৷ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভেলিউশনের পর কল-কারখানাকে কেন্দ্র করে যে বুর্জেয়াজির জন্ম হয়েছিল, যে পুঁজিপতির উদ্ভব হয়েছিল, ওই সব মালিকের বা পুঁজিপতির মুনাফাকে কেন্দ্র করে যে শোষণ, এবং ওই মুনাফা তথা পুঁজির আরও বেশি বৃদ্ধির জন্য যে আরও কল-কারখানার আয়োজন, আর, তার জন্য যে নগরায়ন— এই ক্রম-বর্দ্ধমান আধুনিকতা ছিল কোনো বিরোধিতা ছাড়াই এক তরফা৷ কারণ, তখন সাধারণ মানুষ বুর্জোয়া, মুনাফা, শোষণ, এই সব বিষয়ে তেমন কোনো ধারণাই করতে পারত না৷
  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তীকালে কার্ল মার্কস-এর সারপ্লাস ভ্যালু বা মুনাফা ও শোষণের বিজ্ঞান, ফ্রয়েড-এর মনোঃসমীক্ষণ তত্ত্ব— ‘থিয়োরি অফ আন-কনসাস মাইন্ড’৷ কোনো মানুষের সচেতন মনকে আসলে পরিচালনা করে তারই অসচেতন মন৷ আর, আইনস্টাইনের ‘থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি’৷ কোনো কিছুই স্থির বা নির্দিষ্ট নয়, সবই আপেক্ষিক৷ এই তিনটি বিষয় তৎকালীন সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনার দিককে, সামাজিক বিশ্লেষণকে, ঠিক-ভুল যাচাই করার ক্ষমতাকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল৷ সামগ্রিকভাবে পাল্টে গেছিল এক তরফা আধুনিকতার কনসেপ্ট৷
  ঠিক এই জায়গা থেকেই জন্ম হয়েছিল দাদাইজম্-এর৷ এবং প্রথম থেকেই তাঁরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন— এই মানুষ মারার যুদ্ধ, এই অমানবিক হিংস্রতা, এই উগ্র জাতীয়তাবাদ(এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো— ২০শতক হল জাতীয়তাবাদের মোহমুক্তি এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের  উন্মেষের সময়, যার পক্ষে তৎকালীন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অধিকাংশ মানুষেরা ছিলেন৷), এগুলির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি আমরা৷ এবং তাঁরা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁরা বামপন্থী৷ তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগ ছিল তৎকালীন “রাডিক্যাল লেফ্ট-উইঙ্গ(radical left-wing)” এবং “ফার-লেফ্ট পলিটিক্স(far-left politics)”-এর সঙ্গে৷
আর বললেন— মূলত এই বুর্জোয়াজির উত্থান, উপনিবেশবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ, তাদের কায়েমী স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধ বাঁধিয়েছে৷ শুধু তাইই নয়, এরা তৎকালীন সুস্থ সংস্কৃতি ও তা রক্ষার্থে বুদ্ধিজীবীদের যে স্বাভাবিক কাজকর্ম, তাও সর্বতোভাবে ব্যাহত করেছে৷ আমরা, দাদাইস্টরা এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি৷

  তবে, ফ্রান্সের বাইরে যাঁরা আভাঁ গার্দ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তাঁরাও কিন্তু খুব ভালো করেই জানতেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই প্যারিসেও এই শিল্প-আন্দোলন অনেকটাই দানা বেঁধেছিল৷ বিশেষত কিউবিস্টরা৷ তাঁরাও যুদ্ধ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রীতিমতো আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন একাধিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে৷ শুধু তাইই নয়, তাঁদের সাথে এই দাদাইস্টদেরও কেউ কেউ যোগদানও করেছিলেন৷ কিউবিস্টদের ওই সব প্রদর্শনীগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেগুলি—
  ১৯১২ সালে বার্সেলোনার ‘গ্যালারিস ডালমউ’-তে ও বার্লিনে গ্যালারি ‘দের স্ট্রাম’-এ৷ ১৯১৩ সালে নিউ ইয়র্কের ‘আর্মোরি শো’-এ৷ ১৯১৪ সালে প্রাগ-এর ‘এস ভি ইউ মানেস’-এ৷ ১৯১১ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলি প্রদর্শনী হয়েছিল মস্কোর ‘জ্যাক অফ ডায়মন্ড’ আর্ট গ্যালারিতে ও আর্মস্টার্ডম-এর ‘দে মর্ডানে কানস্টক্রিঙ্গ’ গ্যালারিতে৷ এঁদের সঙ্গে পরবর্তীকালের দাদাইস্টরাও(তখন দাদাইজম্ তৈরি হয়নি) আদর্শগতভাবে মিলিত হয়েছিলেন৷ বলতে গেলে তখনই এই শিল্পীরা মানসিকভাবে দাদাইজম্-এর বীজ বপন করেছিলেন৷ (ক্রমশ)

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি