মে মাসের ডায়েরি / মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনীয়া

মে মাসের ডায়েরি 

মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনীয়া

হাওয়া উঠল এক ঝলক আর উচ্ছল হাসির মত বিজ্ঞাপন ভেসে উঠল হাওয়ায়। পরদিনই বাসি হয়ে যাবে জেনেও পাকা ফলের শাঁসভর্তি কাহিনি হাওয়ার রঙিন ডালপালায় সেজে উঠল। দ্রুত খুব দ্রুত এই চলমান ছবি আমায় দিশেহারা করে।হাবলার মত তাকিয়ে দেখি ঝকঝকে কথাদের আর চমকে উঠে ঝলসে যায় চোখের শরীর। তাহলে পানির মতোই সহজ নাকি সত্যি?সত্যি বলতে কি যতই ঘুরে যাক ডিসপ্লে করাএই ভার্চুয়াল দুনিয়া,ম‍্যানিকুইনে যতই বিদ্যুৎ চমকাক, বাতাসে ভেসে থাকা ঝকমকে হোর্ডিং আমায় পড়তে পারে না।একটা সময় আসে বিশেষ করে লাল রঙের গাঢ় রোববারে  ওয়ার্ডের কাচের দরজা পেরিয়ে সিগারেট ধরাবার মত করে আমি মৃত্যুর দিকে তাকাই। যেন ওটুকুই অবসর অথচ আঙুলের ফাঁকে পুড়ে যাচ্ছে অন‍্যমনস্ক উত্তাপ, বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টায় যা মুহূর্তের অনন্ত হয়ে ওঠে।
  মামুলি কথার ফাঁকে হারানো কোনও দেশ থেকে ছুটে আসে আপেলের টুকটুকে গন্ধ আর পাথরের অনেক নীচে আছড়ে পড়ে দৃষ্টি।
     নীলচে তার ফেনায় জমে ওঠা গভীর ভেসে যাবে বলে ততক্ষণে আরও বেশি অতল,তবু বেড়াতে বেরিয়ে তাকে স্বচ্ছতা মনে করে বরাবর ভুল করি আর ক‍্যামেরা উঁচু করে বোকা বনে যাই।ক'বছর আগেওতো আরও উঁচু ছিল হে এই জোছনার টিলা আর শাঁখপাহাড়! ভাবো তবে, ভাবো আর হেঁকে ওঠো,আগেরকার সময় কতোইনা সস্তাগন্ডার বাজার ছিল,টাটকা শাকপাতির গায়ে জাঁকিয়ে পড়ত শীত এমনকি ছায়ারাও ঢের লম্বা ছিল  বলে চালাকি করে চাপা দাও বেজুবান হুতাশ,বেঁটেখাটো স্বপ্ন আর আক্রার দিনে আক্ষেপের গায়ে গায়ে বেড়ে ওঠা ফালতু সব ইচ্ছে।
    অথচ দ‍্যাখো বছরের পর বছর গোল হয়ে ঘোরে নির্জন কমলালেবু আর আলো নিভে এলে আমরাতো কেবল চাই মাথা রাখবার জন‍্য একখানা কাঁধ,বুকের সব ভার খসানোর নিরালা একখানা বুক আর সমানে  ঘুরে যাওয়া সেই মঞ্চ নিদেন চওড়া সেলাই দেওয়া শাদা কোনও পর্দা  যাকে
 আমাদের রুপোলি বলে ভাবতে শিখিয়েছিল  কেউ আর এখন দেখি উৎসব ভবনের তলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রাংতার মধ্যে পড়ে থাকে চাপা মনখারাপ।
      ততদিনে সিনেমা হল থেকে মন উঠে গেছে আমাদের।মিলনী হল ভেঙে তৈরি হয়েছে নতুন বিল্ডিং আপাতত ভাড়া খাটে বিয়ে-বউভাতে। গেটে Saheli weds Ritam ঝোলে আর জরির ময়ূর থমথম করে ঘুমে ঢুলতে থাকা ক‍্যামেরার চোখের সামনে।কেননা দিনের পর দিন আমাদের ভেতর চোখইতো সবচেয়ে ক্লান্ত থাকে বলো।
     যেমন লিখতে গেলেই চাপা আর্তনাদে কেঁপে ওঠে আঙুল। চোখ মটকে হাসে কাচের দরজা।মর্গের জানলায় মেঘ করে এলে রোগীদের দেহাতী আত্মীয়স্বজন জড়সড় হয়ে বসে বকুলতলায়।ঘনিয়ে আসে বেঁচে থাকার তাগিদ ও শোক।
        ভাবি,করোনা কাল কেটে ফিরে এসেছে চমৎকার হাওয়া।ঘুরতে যাওয়ার মত সিনেমা দেখতে গেলে বেশ হোত কোনও এক ছুটির বিকেলে।লেখারাও ফিরে আসতো নিশ্চয়ই সন্ধের পরপর। 
   আমাদের ঘিঞ্জি আর কাদামাখা মফস্বলে অনেক বছর আগে টর্চ হাতে সিট নাম্বার দেখাতো যে অনিলকাকা, হলে ঢুকেই গমগমে কাটিং শোএর মধ্যে ঢালু মেঝেতে হোঁচট খেয়ে সামলে নিতে নিতে দেখতাম অন্ধকারের মধ্যে এদিক ওদিক ঘুরছে তার বাদামি সরু আলো।
     নীল জানলার ফ্রেম এত চমৎকার আর রুপোলি আর সুন্দর সব লেখা  আজকাল,এত ঝকঝকে  কবিতা-গল্প-উপন্যাস-গদ‍্য,আমি অবাক হয়ে যাই শুধু ধারণার আগেই তারা সরে সরে যায়।
    যেন পুরনো এক বায়োস্কোপওলা হ‍্যান্ডেল ঘোরাচ্ছে আর সুন্দর সব ছবি- মুখ - কথারা ঘুরে যাচ্ছে চোখের সামনে।ভালো করে বিশ্বাস করার আগেই এসে যাচ্ছে আরও নতুন।সত্যি এত চমক প্রতিভার,মেধার এত  ঝলসানি আমি হকচকিয়ে দেখি আর অবাক হই।শুধু বাঁশবনে কানা এই ডুমিনির সঙ্গে ভুতগ্রস্ত কোনও কুয়াশার সঙ্গে দেখা হয় না নিজের স্বভাব না ভাগ্যের দোষে কে জানে।
    কাজের জায়গা থেকে যতবার বাড়ি যাই,থুত্থুরে কোলকুঁজো অনিলকাকার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।সন্ধের পর বাড়ি থাকতে পারে না কাকা। টর্চটা হারিয়েছে হলটাও উঠে গেছে।তবু  ভাঙাচোরা শহরের প্রান্তে, পোড়ো সন্ধেবেলায় মিলনী হলের শেষ রো থেকে উঠে আসে বাদামি টর্চের আলো। ঘুমের পর্দায় ঘোরাফেরা করে মায়াময় ফ্ল‍্যাশব‍্যাক।
মা,ওমা আমি রাত্রি পারি না বলে,বসি আলো-ছায়ার মাঝমধ‍্যিখানে তোমার ভুলে যাওয়া গানের লাইনে অন্ধকারের দলা হয়ে বসি, অনিলকার পাশে বসে থাকি ভাঙা টর্চের মায়া হাতে করে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি