করোনা রোধে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা/ রমণীকান্ত পাত্র

করোনা রোধে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা 

রমণীকান্ত পাত্র 

অতিমারি কোভিড ঢেউয়ে বেসামাল ভারত। এই মুহূর্তে হাসপাতালে বেড, ঔষধ, অক্সিজেন, টিকা সবেতেই আকাল। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই ঝুঁকে পড়েছেন - ঝাড়ফুঁক, মাদুলি, পুজো, গোবর মাখা, গোমূত্র সেবন প্রভৃতি অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। আর ডেকে আনছেন নিজেদের বিপদ। এ বিষয়ে আমার নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতা ও জানা কিছু তথ্য আপনাদের সাথে শেয়ার করি।

 জ্যোতি ফেলে করোনা নিরাময়: - করোনা জয় করে  বড়মা হাসপাতাল থেকে সবে বাড়ি ফিরেছি।ফোনে শুভেচ্ছা আর সৌজন্যের বন্যা। তার মধ্যে আমার এক নিকট আত্মীয়া ফোনে বলেন,'মামনির (আমার স্ত্রী ) অনুরোধে ,আমি তোমার উপর জ্যোতি ফেলে ছিলাম।ফলে তুমি সুস্থ হয়েছ।' কথা বলে জানলাম তিনি 'প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারী'র ভক্ত। সর্বদা' বাবা' ভাবে থাকেন ও নিজেকে 'সিদ্ধা' দাবি করেন। আমার স্ত্রীর দৃঢ় বিশ্বাস - আমি জ্যোতিতেই ভালো হয়েছি। তার এই ভ্রান্ত ধারণা আমি এখনও ভাঙতে পারিনি। সমাজে রোগ নিরাময়, অশুভ শক্তি বিনাশের জন্য ঝাডফুক, মাদুলি ইত্যাদির ব্যবহার আজও সমানে চলছে ।

মদ খেলে করোনা হয় না : -
করোনা সবে মাত্র উঁকি দিচ্ছে কলকাতা শহরে। লক ডাউন তখনও শুরু হয় নি।ঠিক সেই সময় আমি গিয়ে ছিলাম কাঁথি-৩ ব্লকে নর ভুঞাচক গ্রামে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে। আসলে কালিনগর খালের পাশ বরাবর প্রাকৃতিক দৃশ্য, গ্রাম্য পরিবেশে ও ওখানকার মানুষের সরলতা আমাকে টানে। বাইকে নিয়ে যাচ্ছিল রাজু। হঠাৎ ওর মুখ থেকে অ্যালকোহলের গন্ধ পেলাম। বললাম , ' বাবু,এই  অসময়ে নিজেকে অসুস্থ করে বাইক চালানো কি ঠিক হচ্ছে? 'ওর সলজ্জ উত্তর,' স্যার,সবাই বলছে, মদ খেলে করোনা হবে না। তাই  একটু আধটু।' এরপর আমাকেও ছোট্ট পরামর্শ - - । আমি তো অবাক! নিজের রাগ দমন করে বললাম এটা তোমার ভুল ধারণা। বরং মদ খেলে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দুর্বল হয় এবং তাতে জীবাণু আক্রমণের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। কে কার কথা শুনে? চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী।

মাদকাসক্তরা টিকা নিতে অনাগ্রহী : -
আমার এক মিষ্টি সম্পর্কের আত্মীয়, বাড়ি দীঘা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, বয়স ৪৫এর ঊর্ধ্বে। সে এখনও টিকা নেয়নি। তাকে কেউ বলেছে টিকা নিলে 'বিপিন বাবুর কারণ সুধা' কিছুদিন আর খাওয়া যাবে না।ফলে সে আর টিকাকেন্দ্র মুখী হয় না। ভাবুন কাণ্ড!

করোনা রোধে বাজারী ঔষধ
সে দিন একটি ফোন এলো। সুরেলা কণ্ঠ - ' স্যার,আমাদের কোম্পানি একটি হেলথ প্রোডাক্ট বাজারে লঞ্চ করেছে। ভারতে নাম্বার ওয়ান। করোনা প্রতিরোধ ও নিরাময়ে অব্যর্থ ঔষধ '।আমি বললাম হয়তো ওটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো,কিন্তু করোনা অব্যর্থ ঔষধ, তা মানতে পারলাম না। মানুষকে এক প্রকার ঠকানো হচ্ছে। ফোনটি করেছিল দিশা( পরিবর্তিত ) ফিজিক্সে এম.এস. সি .। বেকার। বেচারি দিশা ,-দিশা হীন। পেটের দায়ে তাকে এসব করতে হচ্ছে।

করোনায় দেবী পুজো : -
বাহিরে আধুনিক হলেও এখনও মনের মধ্যে বাসা বেঁধে আছে অন্ধ বিশ্বাস আর কুসস্কার। এই কুসস্কারে ভর করে করোনা মোকাবিলায় ইতিউতি চলছে , - ' করোনা দেবী ' পুজো। লবঙ্গ, এলাচ, ফুল, আর সাতটি লাড্ডু পেয়েই সন্তুষ্ট দেবী। আবার কোথাও চলছে ' মাশান কালী '  পুজো, যিনি অশুভ শক্তি ও মোড়ক থেকে সকল কে রক্ষা করেন।
সমাজতাত্ত্বিক মতে মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন ভগবানের উপর বিশ্বাস রাখে। আর বেশির ভাগ বিশ্বাসই কুসংস্কার হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসক দের মতে দেবী পুজো নয়,করোনা নিরাময়ে চিকিৎসার প্রয়োজন।

করোনা রোধে গোবর মাখা ও গোমূত্র পান : -
 অনেকেই বিশ্বাস করেন গোবর মাখলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, ফলে করোনা সংক্রমণ হয় না। গোমূত্র খেলেও নাকি করোনা হবে না। ধর্মান্ধ একদল মানুষ এই সব প্রচার করছেন,আর কিছু লোক তা মেনে চলার চেষ্টা করছেন।এগুলো ভন্ডামি ছাড়া কিছু নয়।
চিকিৎসকদের মতে এই করতে গিয়ে বাড়ছে বিপদ।ছড়িয়ে পড়ছে ' ব্ল্যাক ফাঙ্গাস' ও অন্যান্য কিছু রোগ। তাই করোনা প্রতিরোধে গোবর মাখা বা গো মুত্র সেবনে বারন করছেন চিকিৎসকরা।

বিজ্ঞান ও কুসংস্কার দুটোই মানব মনের ফসল। কিছু ভুল তথ্য,অবৈজ্ঞানিক প্রথা ও কুসংস্কারে বশে কিছু মানুষ ফুল পথে হাঁটছেন।এগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে,আসুন সবাই মিলে সচেতন হই,কোভিড বিধি মেনে চলি ও ডাক্তারে পরামর্শে থাকি।একদিন পৃথিবী করোনা মুক্ত হবে,বিজ্ঞানের জয় হবে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি