করোনার পজিটিভ নেগেটিভ/ বিজন সাহা


করোনার পজিটিভ নেগেটিভ 

বিজন সাহা 


এক বছরের বেশি হল করোনা ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর পথে পথে। রাশিয়ায় যখন করোনা জেঁকে বসেছিল তখন এ নিয়ে কয়েকটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম টিভি, ইন্টারনেট ইত্যাদি উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। সেই সঙ্গে ছিল বন্ধুদের ম্যাথেমাটিক্যাল মডেলিংএর রেজাল্ট। তবে সে সবই পড়া বা শোনা কথা। আমার সেই অভিজ্ঞতার  গ্যাপ পূরণ করার জন্যই হয়তো এ বছরের শুরুতে করোনা দেবী সুপ্রসন্ন হয়ে আমার ঘরে আসে। তাই এখানে ফার্স্ট হ্যাণ্ড অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দু কলম লেখার প্রয়াস। 

  শুরুতেই বলে নিই অসুখের সাথে আমার সব সময়ই সুখের ঘর। শরীরকে তাই ঠাট্টা করে বলি রোগালয়। ওরা যখনই অসুস্থ হয়ে পড়ে, বিনা দ্বিধায় আমার শরীরে আশ্রয় নেয় রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য। রাশিয়ায় মানুষের জীবনী লেখা হোক আর নাই হোক রোগের ইতিহাস লেখা হয়। আমার রোগের ইতিহাস এখন ফুলে ফেঁপে কলাগাছ, বলা যায় ছোটোখাটো এক মহাভারত। করোনার কল্যাণে তার কলেবর এবার আরেকটু বৃদ্ধি পেল। সে গল্পই আজ করব এখানে। 

  করোনার প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই চেষ্টা করেছি হাসপাতালমুখী না হতে। রাশিয়ার নামকরা ও জনপ্রিয় ডাক্তারদের একজন ডঃ আলেক্সান্দার মিয়াস্নিকভ পারলে হাসপাতাল এড়িয়ে চলতে বলেন, কেননা সাধারণত মারাত্মক ভাবে অসুস্থ লোকজন সেখানে যায়। তাই হাসপাতাল থেকে সংক্রামিত হলে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মনে হয় তিনি একাই নন, অনেকেই এটা বিশ্বাস করে। প্রতি বছর  কম করে হলেও একবার আমাকে সাত থেকে দশ দিনের জন্য হাসপাতালে যেতে হয় এক বেলার জন্য। এ সময় ইসিজি, ইকো, ফিজিও থেরাপি, ব্যায়াম, ম্যাসেজ ইত্যাদি করা হয় আর থাকে কয়েকটা করে স্যালাইন। এটা আমাকে কম করে হলেও ছয় মাসের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। এবার করোনা কারণে বার বার ডেট পিছিয়েছি। কিন্তু যখন ব্যথাটা ঘাড়ে বসে পা দুলাতে শুরু করল তখন ক্লিনিকে ফোন করলাম। আমার ল্যাবরেটরির ডাক্তার বললেন, "যদি জানতাম করোনা এক মাস বা দু মাস পরে থাকবে না, আপনাকে বাসায় বসে থাকতে বলতাম। সেই সম্ভাবনা যেহেতু নেই, আপনি বরাবরের মতই সকালে হাসপাতালে আসুন।" কিছুই করার ছিল না। ভর্তি হয়ে গেলাম। তবে এবার আগের মত সহজ নয় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। প্রথমেই দিতে হল করোনার অ্যান্টিবডি টেস্ট। সেখান থেকে গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে তবে ভর্তি। আমার ইসিজি ওদের পছন্দ হল না। করল হল্টার। আর তার ভিত্তিতে পাঠাল ৬০ কিলোমিটার দূরের শহর দ্মিত্রভের কারডিও-ভাস্কুলার সেন্টারে। সেটা ২৯ ডিসেম্বর। নববর্ষের মাত্র দুদিন আগে। এ সময় রাশিয়ার ঘরে ঘরে নতুন বছরকে বরণ করার নানা আয়োজন। ডাক্তাররাও বাদ যায় না। কাজেকর্মে ঢিলেঢালা ভাব। তাই জিজ্ঞেস করলাম নতুন বছরে যাওয়া যায় কি না। দুবনায় ডাক্তাররা কোন রকম দেরী করার পক্ষে মত দিলেন না। বন্ধুর সাথে চলে গেলাম দ্মিত্রভ। ওখানে ডাক্তার বললেন, "আপনি জানেন কি জন্যে এসেছেন? আমরা আপনার এঞ্জিওগ্রাম করব। যদি কোন রকমের সমস্যা ধরা পড়ে, সাথে সাথে অপারেশন করব। অপারেশন কঠিন নয়, তবে সব অপারেশনেই রিস্ক  আছে। আপনি যদি রাজী থাকেন, কাগজে সই করেন। নইলে দুবনা ফিরে যান।" এটা অনেকটা আল্টিমেটাম। কোলকাতায় ডাক্তার দাদাকে ফোন করে রাজী হয়ে গেলাম। অল্প সময়েই মধ্যেই আমি স্থানীয় সিস্টারদের আদরের লোক বনে গেলাম। আসলে এদেশের লোকজন উপমহাদেশের কাউকে পেলেই রাজ কাপুর বা শশী কাপুরের আত্মীয় স্বজন বলে মনে করে, বিশেষ করে সেটা যদি ছোট কোন শহর হয়। স্ট্রেচারে করে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল অপারেশন থিয়েটারে।  সেখানে ডাক্তার বেশ হাসিখুসি। আমার পরিচয় জেনে বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করলেন। আসলে তত্ত্বীয় কসমোলজির উপর কাজ করলেও যখনই কেউ শুনে যে আমি দুবনার জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা জেআইএনআর-র কাজ করছি সবাই ভেবেই নেয় এটা নিশ্চয়ই পারমানিবিক বোমা টোমার  সাথে জড়িত। দুবনা সোভিয়েত আমলে ছিল বদ্ধ শহর, এমন কি সোভিয়েত নাগরিকদেরও সেখানে যেতে বা থাকতে স্পেশাল পারমিশন লাগত। আমাদের ইনস্টিটিউটেই বিভিন্ন সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিয়্যাক্টর ছিল। এখনও এখানে বিভিন্ন নতুন নতুন মৌলিক কণা (এলিমেন্টারি পারটিকল) সংশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু এখানে কখনোই অস্ত্র তৈরি করা হয়নি। দুবনা শহরের বাম দিকে (এই শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ভোলগা নদী। নদীর ডান দিকে আমাদের ইনস্টিটিউট) দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে জার্মানি থেকে ফ্রাউ-২ তৈরির পুরো কারখানা  উঠিয়ে এনে স্থাপন করা হয়। অনেক জার্মান বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে তাদের সহযোগিতায়ই এখানে সী টু সী মিশাইল তৈরি করা হয়। এ কারণেই শহর ছিল দুর্গের মত। সেখান থেকেই আমাদের ইনস্টিটিউটের এই যুদ্ধংদেহী রূপ অন্যদের চোখে। যাহোক, প্রায় আধঘণ্টা পর ডাক্তার বললেন কোন ব্লক নেই,  তাই স্টেন্টিং করার প্রয়োজন নেই। আমি তো খুব খুশী। জিজ্ঞেস করলাম, ট্যাক্সি ডেকে বাসায় ফিরতে পারব কিনা। তার উত্তর আমাকে হতাশ করল। আরও কয়েকদিন থাকতে হবে। এই প্রথম আমি হাসপাতালে রাত কাটাবো। 


১৯৮৩ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে আসি আমার ওজন ছিল মাত্র ৪৩ কেজি। আমার বাংলাদেশী  ইয়ারমেটরা সবাই ওভারশিওর ছিল যে আমাদের মধ্যে একজনকেও যদি হাসপাতালে যেতে হয় সেটা হব আমি। সব বন্ধুর মুখে ছাই দিয়ে আমি এতদিন পর্যন্ত হাসপাতালকে পাশ কাটিয়ে গেছি। সোভিয়েত দেশে আসার ৩৭ বছর পরে ৫৬ বছর বয়সে জীবনে প্রথম হাসপাতালে রাত কাটাতে যাচ্ছি। সোভিয়েত আমলে হাসপাতালে গেছি বন্ধুদের আর দেশ থেকে আসা কমিউনিস্ট পার্টি বা বাম দলগুলোর নেতাকর্মীদের দেখতে। দেশ থেকে আসা ডেলিগেটরা থাকতেন বিশেষ হাসপাতালে। তাদের আদর যত্ন ছিল ভিন্ন ধরনের। তবে ছাত্ররা থাকত সাধারণ হাসপাতালে, যেখানে তারা ছাড়াও সোভিয়েত আম জনতা চিকিৎসা পেত। সে সময়ের চিকিৎসার মান খারাপ বলব না তবে অন্যান্য ব্যবস্থা ছিল চলনসই। বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে সারা বিশ্বের সাথে রাশিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থাও নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে টিভিতে প্রায়ই একটির পর একটি হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার খবর শোনা যেত। আসলে সোভিয়েত আমলে কোন কারখানা বা ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে  বিভিন্ন ছোট ছোট শহর গড়ে উঠত। নতুন রাশিয়ায় জীবিকার সন্ধানে লোকজন বড় বড় শহরে চলে গেলে এসব শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালানো সরকার অর্থনৈতিক ভাবে সমীচীন মনে করে না। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে সোভিয়েত আমলে কেউ চাইলেই যেখানে খুশি সেখানে দীর্ঘ দিন বসবাস করতে পারত না। প্রতিটি নাগরিককে কোন একটা নির্দিষ্ট ঠিকানায় রেজিস্টার করা হত আর সে শুধু সেই এলাকায়ই থাকার বা কাজ করার অনুমতি পেত। ফলে চাইলেই একজন নিজের শহর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারত না। সেটা করলে তার জেল পর্যন্ত হতে পারত। নতুন রাশিয়ায়ও সবাইকে কোন এক নির্দিষ্ট ঠিকানায় রেজিস্টার করতে হয়। অবে যে কেউ যেকোনো জায়গায় কাজ করতে পারে, এ জন্যে তাকে সেই জায়গায় সাময়িক ভাবে রেজিস্টার করতে হয়। এটা দরকার যাতে সে এই এলাকায় শিক্ষা, চিকিৎসা এসব সুযোগ সুবিধা পায়। 

  রাশিয়ায় একটা কথা আছে। সুখ ছিল না, দুঃখ সাহায্য করল। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়ার উপর একের পর এক এম্বারগো আরোপ করে যাচ্ছে ইউরোপ আমেরিকা আর এর ফলে এখানে রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে, ফসলের উৎপাদন সোভিয়েত উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে। আগে ইউক্রাইন থেকে বিশেষ করে রুশ সামরিক বিমান ও অস্ত্রের জন্য বিভিন্ন পার্টস আসত, এখন সব এখানেই তৈরি হয়। করোনার আগমন একই ভাবে এদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছে। হাসপাতাল বন্ধ করা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন নতুন করে তৈরি হচ্ছে হাসপাতাল। রুশ আর্মিই প্রায় গোটা তিরিশ নতুন হাসপাতাল তৈরি করেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এগুলো করা হয়েছে রেকর্ড সময়ে। তবে ১০০ বছরের গ্যারান্টি দিয়েছে। সেখানে বর্তমানে করোনা চিকিৎসা হলেও পরবর্তীতে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করবে। গত বছর আমি লিখেছিলাম দরকারে তিন মাসে হাসপাতাল তৈরি করা যায়, কিন্তু এত কম সময়ে স্পেশালিষ্ট তৈরি করা যায় না। বিভিন্ন প্রোফাইলের ডাক্তারদের করোনা চিকিৎসার প্রশিক্ষন দিয়ে কাজ করানো যায়, তবে সব  মানুষই একটা সময়ে ক্লান্ত হয়। যন্ত্রের মত তারা বছরের পর বছর অক্লান্তভাবে কাজ করে যেতে পারে না। তাই করোনা নিয়ন্ত্রণে সময় একটা বড় ফ্যাক্টর। দ্রুত ভ্যাকসিন আবিষ্কার না করতে পারলে, করোনাকে কন্ট্রোলে আনতে যথেষ্ট পরিমাণ বিশেষজ্ঞের অভাব সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।   

দ্মিত্রভে আমি ছিলাম ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কেননা ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত কোন ডাক্তার থাকবে না নববর্ষ বলে। এ সময় সাধারণত অরদিনাতর মানে যারা ইনস্টিটিউট শেষ করে প্রাক্টিক্যাল করছে তারা দায়িত্বে থাকে। যেহেতু আমার এখানে কোন চিকিৎসা হবে না, তাই ভাবলাম ৩১ তারিখেই বাসায় ফিরব। এর মধ্যে করনারোগ্রাফি বা এঞ্জিওগ্রাম করতে গিয়ে যেসব ওষুধ শরীরে ঢোকানো হয়েছিল স্যালাইন দিয়ে তা নিউট্রিলাইজ করা হয়ে যাবে। তবে এটা করতে হলে আমাকে ডিনায়াল লেটার লিখতে হবে এই মর্মে যে আমি স্বেচ্ছায় চিকিৎসা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ি ফিরছি। ওখানে এক রুমে আমরা ছিলাম পাঁচ জন। সবাই বয়স্ক। দুজন বলতে গেলে বৃদ্ধ। সবাই খুব হেল্পফুল। যেহেতু করোনার জন্য বলতে গেলে কাউকেই ওয়ার্ডের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না, বা বলা যায় রোগীরা বাইরে ঘোরাফেরা করুক সেটা কেউ পছন্দ করে না, তাই সময় কাটে শুয়ে বসে। প্রতিটি বেডের সাথেই কলিং বেল, প্লাগ পয়েন্ট। এসব প্লাগ পয়েন্ট নতুন আমদানি। লোকজন এখন আর স্মার্টফোন ছাড়া আসে না। তাদের যাতে ফোন চার্জ করতে দূরে কোথাও যেতে না হয় তাই এই ব্যবস্থা। হাসপাতালও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। তাছাড়া গল্প তো আছেই। যদি অপেক্ষাকৃত ইয়ং লোকজন বর্তমান রাজনীতি নিয়ে কথা বলে বৃদ্ধরা প্রায়ই ফিরে যান সোভিয়েত আমলে। এমন কি বর্তমানে হাসপাতালে সার্ভিস অনেক উন্নত হওয়ার পরেও  সোভিয়েত আমলেই চিকিৎসা ভাল ছিল বলে তাদের অনেকেই মনে করেন। বলতেই হবে এই কারডিও-ভাস্কুলার সেন্টার একেবারে নতুন। চার তলা এই বিল্ডিঙের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায়  (এ দেশে গ্রাউন্ড ফ্লোরকে একতলা ধরা হয়, তাই চার তলা মানে থার্ড ফ্লোর) এখনও কন্সট্রাকশনের কাজ চলছে। সব ঝকঝকে তকতকে। নতুন সমস্ত যন্ত্রপাতি। সব কিছুই কম্পিটারাইজড। রুমের সাথে লাগানো টয়লেট। কয়েক ঘণ্টা পর পর লোক এসে ঘর পরিষ্কার করে যাচ্ছে। এটা মনে হয় করোনার জন্য। চার বার খাবার এনে দিচ্ছে ঘরে। ব্রেকফাস্ট সাধারণত পরিজ, দুপুরে সুপ, ভাত, আলু বা গ্রেচকা আর মাংস বা মাছ, চারটের দিকে হালকা খাবার আর ৭ টায় ডিনার। আমার ধারণা করোনা না হলে সবাই ডাইনিং রুমে খেতে যেত। সব মিলিয়ে মনে হয়েছে এটা যত না হাসপাতাল, তার চেয়ে বেশি রেস্ট হাউজ। ৩০ তারিখে আমার পাশের বেডের বৃদ্ধের ৩৮ সেঃ জ্বর। কাঁপতে শুরু করলেন। আমারা তাকে নিজেদের কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলাম। নার্স ডাকলাম। জানি না, ওখান থেকেই করোনা লাফিয়ে আমার ঘাড়ে চেপেছিল কিনা। এটাও একটা কারণ ছিল তাড়াহুড়ো করে বাসায় ফেরার।      

  ৩১ ডিসেম্বর বাসায় ফিরে দেখি নববর্ষের আয়োজন চলছে। ক্রিস্টমাস ট্রি আগেই সাজানো হয়েছিল। ওটা সাধারণত আমরা সাজাই ২৫ ডিসেম্বর আমার জন্মদিনে। চলছে পুরানো বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজন। ৩১ তারিখে সারাদিন বিভিন্ন রকমের রান্না বান্না হয়। টেবিল সাজানো, বাসায় ছোট বাচ্চা থাকলে তাদের সাজানো।  সাধারণত রাত ৯ টার দিকে শুরু হয় খাওয়া দাওয়া। শ্যাম্পেন বা ওয়াইন দিয়ে টোস্ট করে পুরনো বছরকে বিদায় জানানো হয়। অন্য সব বছর অনেক ভাল ভাল কথা বলা হলেও এবার বলার তেমন কিছু ছিল না। করোনা আক্রান্ত ২০২০ কে বিদায় দিতে পারলেই সবাই যেন বেঁচে যায়। খাওয়া দাওয়া চলতে থাকে ধীর গতিতে। টিভিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। রাশিয়ায় এ উপলক্ষ্যে কিছু কিছু পুরানো সিনেমা দেখানো হয়। এদের একটা "স লগকিম পারম ইলি ইরনিয়া সুদবি" বা "ভাগ্যের বিড়ম্বনা"। গত ৩১ বছর ধরে এই ছবি মানেই নববর্ষ। এসব দেখতে দেখতে সবাই অপেক্ষায় থাকে কখন রাত ১১.৫৫ বাজবে, ক্রেমলিন থেকে দেশের নেতা জনগণকে অভিনন্দন জানাবেন আর ক্রেমলিনের ঘন্টায়  ১২.০০ বাজার সাথে সাথে সবাই শ্যাম্পেন হাতে নতুন বর্ষ বরণ করে নেবে। গত ৩৭ বছরে একবারই এর ব্যতিক্রম ঘটেছিল, যখন ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান আর ভ্লাদিমির পুতিনকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এর আগে আমার দেখা আন্দ্রপভ, চেরনেঙ্কো, গরবাচভ, ইয়েলৎসিন যদিও অভিনন্দন বাণী পড়তেন বসে, পুতিন সেটা করেন খোলা আকাশের নীচে ক্রেমলিনের ভেতরে একটা ক্রিস্টমাস ট্রির পাশে দাঁড়িয়ে। এবারও ব্যতিক্রম ছিল না। তবে এবার বর্ষবরণ ছিল ভিন্ন রকমের। মনে হয় সারা পৃথিবীর মানুষের একটাই কামনা ছিল, নতুন বছর যেন করোনা মুক্ত হয়।  

  ১ লা জানুয়ারি বরাবরের মতই হাঁটতে গেলাম ভোলগার ধারে বন্ধু ভিক্তরের সাথে। গণিত, পদার্থবিদ্যা, রাজনীতি, ধর্ম, করোনা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে দু ঘণ্টা কেটে গেল। তাপমাত্রা ছিল মাইনাস পাঁচের মত। এ সময়ের জন্য গরম বলা যায়। কিন্তু বাসায় যখন ফিরলাম, মনে হল ঠাণ্ডা লাগলে লাগতেও পারে। পরের দিন ছিল ছোট ছেলে সেভার জন্মদিন। ওরা মস্কোয়। তাই বলে আমাদের কেক কাটতে তো মানা নেই। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম স্টেশনে কেকের জন্য। পরের দুদিন কাটল একটু অস্বস্তির মধ্যে। ইলেকট্রনিক থার্মোমিটার তাপমাত্রা ৩৭ এর নীচে দেখালেও মনে হচ্ছিল কোথায় যেন কি একটা ভুল হচ্ছে। শরীরে ব্যথা ছিল। তবে আমার ধারণা ছিল এটা করনারোগ্রাফী করতে গিয়ে ধমনী একটু কাটার ফলেই এ ব্যথা। ৫ তারিখে ইন্ডিয়া থেকে এক বন্ধু জানাল প্রফেসর ভ্লাদিমির গেরদত করোনায় মারা গেছেন। উনি কম্পিউটার আলজেব্রা আর কোয়ান্টাম কম্পিউটিঙ্গের নামকরা বিশেষজ্ঞ। আমাদের অফিস পাশাপাশি। প্রায়ই ভুল করে একে অন্যের রুমে চলে যাই। কখনও রাতের বেলা এক সাথে বাসায় ফিরি। উনি আমাদের ল্যাবরেটরিতে হাতে গনা কয়েকজন লোকের একজন যার সাথে আমি কথা বলে আনন্দ পেতাম। তাই মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। ঘুরতে গেলাম বনে বউকে সাথে নিয়ে। কিন্তু কিছুতেই ভ্লাদিমিরের স্মৃতি মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। রাতের দিকে গুলিয়া (বউ) বলল ওর কেমন যেন শীত শীত করছে। দু'দিন তেমন কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। ৮ তারিখে গেলাম ক্লিনিকে। এখনও নববর্ষের ছুটি চলছে। তাই সেখানে ছিলেন দায়িত্বরত ডাক্তার। দেখে বললেন, ফুসফুস মনে হছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে সোমবারের আগে এক্সরে বা এ জাতীয় কিছু করা যাবে না। আন্টিবাইওটিক দিচ্ছি না। আপাতত অন্য ওষুধ। সোমবার সকালে আসবেন। বিভিন্ন টেস্ট করে তারপর ওষুধ দেব।" শনিবার রবিবার গুলিয়ার অবস্থার অবনতি ঘটলেও ও ইমারজেন্সি কল করতে দিল না। মস্কো থেকে ফোন করে ছেলেমেয়েরা বুঝাল। কিন্তু সে অনড়। সোমবার আমি আবার ডাক্তারের কাছে গেলাম। সাথে সাথে এক্সরে করালেন। পরের দিন করোনা টেস্ট আর ব্লাড টেস্টের স্যাম্পল দিতে হবে। মঙ্গলবার এসব টেস্টের স্যাম্পল দিয়ে বাসায় ফিরতে না ফিরতেই ক্লিনিক থেকে ফোন এল "ডাক্তার আসবে আপনার বাসায়, অপেক্ষা করুন।" দেখা গেল আমার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৬, গুলিয়ার ৯২। তাপমাত্রা  যথাক্রমে ৩৮, ৩৮.৫। তবে করোনা টেস্টের রেজাল্ট এখনও আসেনি। তবুও ডাক্তার বললেন, আমরা যেন হাসপাতালে ভর্তি হই। এরমধ্যে বড় ছেলে আন্তন চলে এল মস্কো থেকে। ওর বন্ধু সেরগেই কাজ করে তালদম শহরের করোনা হাসপাতালের রেড জোনে। ওর সাথে যোগাযোগ করল আন্তন। সেরগেই বলল, দেরী না করে আমরা যেন চলে আসি, ও আমাদের জন্য সব আরেঞ্জ করবে। অনেক বলে কয়ে গুলিয়াকে রাজি করান গেল। বৃহস্পতিবার আমরা চলে গেলাম তালদম। এই শহরটি দুবনা থেকে ৫০ কিলোমিটার মত। যে হাসপাতালে আমরা যাচ্ছি সেটা তিরিশ বছরেরও বেশি আগে সোভিয়েত আমলে তৈরি শুরু হয়। তারপর কাজ এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এখানে প্রসূতি হাসপাতাল জাতীয় কিছু একটা করা হবে। করোনা এর ভাগ্যে আমুল পরিবর্তন আনে। এখন এটা যাকে বলে ওয়েল ইকুইপড হাসপাতাল। এই মুহূর্তে এর একাংশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। করোনার পরে এখানে শুধু প্রসূতি হাসপাতালই হবে না, হবে এক পরিপূর্ণ হাসপাতাল যেখানে সিটি স্ক্যান, এমআরআই  থেকে অনেক সুযোগ সুবিধা থাকবে।  

  আমরা ১৪ জানুয়ারি দুপুর দুটোর দিকে তালদম পৌঁছলাম। সেরগেই অপেক্ষা করছিল। কিছু ফর্মাল ব্যাপার ছিল। তা অতি দ্রুত শেষ করে ফেলল। কিন্তু এর মধ্যেই আরও কয়েকজন রোগী এসে পৌঁছুল। বোঝা গেল করোনার বিস্তার বেশ দ্রুত গতিতেই হচ্ছে। এরপর নিয়ে গেল সিটি স্ক্যান করাতে। গুলিয়ার ফুসফুস ২৫% এফেক্টেড, আমার ২০%। সেখান থেকে আমাদের নিয়ে গেল রেড জোনে। এটা এই বিল্ডিঙেই। এক তলায়। ইলেকট্রনিক চাবি দিয়ে সেরগেই খুলল বিশাল দরোজা। আমাদের পেছনে সেটা বন্ধ হয়ে গেল। বুঝলাম, এখন আর এখান থেকে নিজের ইচ্ছায় বেরুনোর কোন উপায় নেই। বেরুনোর দুটো উপায়, হয় সুস্থ্ হয়ে নয়তো লাশ হয়ে। আমার জন্য একটাই অপশন - ভাল থাকা। ভাল থাকার কোন বিকল্প এখনও খুঁজে পাইনি, যদিও জানি প্রবাবিলিটি থিওরি অনুযায়ী সেটার সম্ভাবনা ৫০/৫০। তবে আমি জীবনের এই রাশান রুলেটে সব সময়ই ভাল থাকার পক্ষেই বাজী ধরি। 

 আমাদের রাখা হল দুই বেডের এক রুমে। প্রতি বেডের সাথে অক্সিজেন নেওয়ার ডিভাইস আর ইনহেলার। ছোট ডাইনিং টেবিল, জিনিসপত্র রাখার শেলফ, স্মার্টফোন চার্জ করার প্লাগ পয়েন্ট। টয়লেট ঠিক আটাচড না হলেও একেবারে রুমের সাথেই। ভোর ছয়টায় এসে সিস্টার ঘুম ভাঙ্গায়। সাধারণত ব্লাড দিয়ে আর স্যালাইন নিয়ে দিন শুরু হয়। সাড়ে সাতটার দিকে আসে ব্রেকফাস্ট। সাধারণত বিভিন্ন রকমের পরিজ আর চা। খেয়েই ঘন্টা খানেক  অক্সিজেন নিই। এরপর  ডাকে ইনহেলেশনের জন্য। চাইলে রুমেও নেওয়া যায়, চাইলে হলে যাওয়া যায়। হলেই যাই। অন্যদের সাথে দেখা হয়। আমরা দুজন এক সাথে থাকার ফলে সুবিধা ছিল  যে একে অন্যকে সাহস যোগাতে  পেরেছি। অনেক সময় গুলিয়ার শ্বাস কষ্ট হয়েছে। পিঠে একটু হাত রাখলেই সেটা কমেছে। আসলে এমন অবস্থায় পাশে থাকা, হাতে হাত রাখা - এসব ছোটোখাটো ঘটনা মনে সাহস যোগায়। মাইনাস হল, অন্যদের সাথে যোগাযোগ তেমন হয়নি। হাসপাতালে বিভিন্ন জায়গার, বিভিন্ন পেশার মানুষ আসে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে। এদের সাথে কথা বললে অনেক কিছু জানা যায়, শেখা যায়। দুপুর দুটোর দিকে আসে লাঞ্চ। সুপ, সালাদ, আলু বা গ্রেচকা মাংস বা মাছ দিয়ে। গত কয়েকদিন মুখে রুচি বলতে কিছু ছিল না। হাসপাতালের খাবার মূলত সেদ্ধ, তাও আবার মশলা ছাড়া। কিন্তু সব চেটেপুটে খেয়েছি। একদিন এমনকি মাছের সুপ পর্যন্ত খেয়েছি। এই খাবার এত পছন্দ হয়েছে যে বাসায় ফিরে সেদ্ধ খাবার প্রায়ই তৈরি করছি। বিকেল চারটের দিকে আসে হালকা খাবার, চায়ের সাথে বিস্কুট বা ফল। রাতের খাবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে। যারা খাবার সার্ভ  করে, সবাই হাসিখুশি। দিনের মধ্যে কতবার যে ঘর পরিষ্কার করছে তার ইয়ত্তা নেই। খাবারের মতই রুটিন করেই দিনে তিন বা চার বার দেওয়া হচ্ছে স্যালাইন। সকালে বিকালে বিভিন্ন ট্যাবলেট, ক্যাপসুল। এক কথায় ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলছে সব। দুদিন পরেই বুঝতে পারছি শরীরের অবস্থার উন্নতি ঘটছে।   

  আমাদের পাশের রুমেই ছিলেন এক বৃদ্ধ। বয়সে বৃদ্ধ হলেও দুর্বল নন মোটেই। প্রায়ই দরোজায় দাঁড়িয়ে সিস্টারদের ডাকতেন "আউ" করে। কখনও গুলিয়া, কখনও আমি তাকে ডায়াপার পরতে সাহায্য করতাম। আমার অনেক সময় মনে হত আমরা আছি কোন সাবমেরিনে অথবা প্লেনে, যেখানে আমাদের প্রতিটি মানুষের ভালমন্দ নির্ভর করছে প্রতিটি মানুষের আচরণের উপর।  এখানে সবাই খুব ভালনারেবল বা দুর্বল, পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। যাকে বলে আমরা যাত্রী একই তরণীর। এই বোধ অন্যদের প্রতি সহমর্মী  হতে শেখায়। এমনকি অপরিচিত মানুষকেও মনে হয় অনেক দিনের চেনা। একদিন দেখি ওই বৃদ্ধ সিস্টারদের ডাকছেন। আমি তাকে বসতে বলে নিজে গেলাম সিস্টারদের ডাকতে। আমাদের রেড জোনে ৫০ জনের উপর রোগী। সবার দিকে দৃষ্টি রাখতে হয়। সিস্টাররা সারাদিন চরকির মত ঘুরে। তারপরেও কেউ ডাকলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসে। আমার কেন যেন মনে হল এই উত্তেজনাই ভদ্রলোকের কাল হবে। পরের দিনও দুপুরের পরপর ওনার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। সন্ধ্যায় সিস্টার বললেন ভদ্রলাক মারা গেছেন রক্ত জমাট বেঁধে। এরপর আর কেউ হৈচৈ করত না, দরোজায় দাঁড়িয়ে সিস্টারদের ডাকত না। এত কাছ থেকে মৃত্যু খুব একটা দেখা হয়নি।  

  সময় পেলেই কথা বলি নার্স, খাবার পরিবেশনকারী বা যারা ঘর পরিষ্কার করছেন তাদের সাথে। অনেকেই স্থানীয়। ওরা কাজ করে দুদিন অন্তর অন্তর দুদিন করে। সেই সেপ্টেম্বর থেকে এক নাগাড়ে  কাজ করে যাচ্ছে। গত মার্চ এপ্রিলে করোনার প্রথম ওয়েভ আসে রাশিয়ায়। তখন দিনে ম্যাক্সিমাম ১১-১২ হাজার মানুষ করোনা পজিটিভ হত। এরপর আসে গ্রীষ্ম। এদেশে বলতে গেলে সেপ্টেম্বর থেকে মে পর্যন্ত সূর্যের দেখা তেমন মেলে না। তাই গ্রীষ্মের মাসগুলোয় সবাই যায় দক্ষিণ সাগরে শুধু সমুদ্র নয়, রৌদ্র স্নান করতেও। শীতে পাখিরা যেমন যায় আফ্রিকা আর দক্ষিণ এশিয়ায়, গ্রীষ্মে মানুষ তেমনি যায় ক্রিমিয়া, তুরস্ক, মিশরসহ বিভিন্ন দেশে। এবার অবশ্য বিদেশ যাওয়া ছিল খুব প্রব্লেম্যাটিক, তাই মূলত সবাই গেছে ক্রিমিয়া, সচি এসব এলাকায়। এর ফলাফল যে ক্যাটাস্ট্রফিক হবে সেটা সরকার বা ডাক্তারদের জানা ছিল। অক্টোবর থেকেই  শুরু হয় সেকেন্ড ওয়েভ আগের চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপে। কোন কোনদিন তিরিশ হাজারের কাছাকাছি মানুষ করোনা পজিটিভ হয়। ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও রেজিস্টার্ড হলেও গণ হারে সেটা তখনও ব্যবহৃত হচ্ছিল না। ফলে প্রচন্ড চাপ পড়ছিল স্বাস্থ্য কর্মীদের উপর।  সিস্টাররাই বলছিল "দ্বিতীয় দিন কাজ শেষে যখন বাসায় ফিরি  কোন রকমে বিছানায় যাওয়ার শক্তি থাকে। সারাদিন কাটে ঘুমিয়ে। পরের দিন কাপড়চোপড় ধুয়ে, রান্না করে বাড়ির লোকদের খাইয়ে আবার হাসপাতালে দৌড়ুতে হয়।" "কখনও এসব ছেঁড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে না?" "আমরা না করলে কাউকে না কাউকে তো করতে হবেই। আমরা তো স্বেচ্ছায় এই পেশা বেছে নিয়েছি। তবে খুব করে চাইছি আমাদের লোকজন যেন রাস্তাঘাটে আরও সতর্ক হয়। কেননা এ ভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ইচ্ছে থাকলেও আমরা আর সাহায্য করতে পারব না। আমরা তো রবোট নই। করোনা কেটে গেলে মনে হয় ছয় মাস একটানা ঘুমুবো।" হ্যাঁ, ডাক্তার, নার্স সহ সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করছে রোগীদের সাহায্য করতে। তবে তাদের চোখে মুখে ক্লান্তির দাগ। করোনার কাছে হার না মানলেও তারা পরাজিত হচ্ছে নিজেদের ক্লান্তির কাছে। ইতি মধ্যে করোনা বৃদ্ধির হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তবে এটাও ঠিক, যতদিন না শেষ রোগীটা সুস্থ্য হয়ে ফিরছে ততদিন এ যুদ্ধ শেষ হবে না। 

  প্রতিদিন সন্ধ্যায় সূর্য উঁকি দেয় জানালায়। দুবনার দক্ষিণ পাড়ের চতুর্দিকে নদী। ভোলগা, দুবনা আর সেস্ত্রা চারিদিক থেকে একে ঘিরে রেখেছে। ফলে দুবনাকে বলা চলে দ্বীপ। এখানে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত এক রকম । অন্যদিকে তালদম মনে হয় স্তেপভুমি। ফলে এখানকার সূর্যাস্ত একেবারেই ভিন্ন। বারবার অনুভব করেছি ক্যামেরার অভাব। তবে এটাও ঠিক ক্যামেরা থাকলেও শুধু জানালার ভেতর দিয়েই ছবি তুলতে হত। স্মার্টফোন এ ক্ষেত্রে কম কিছু নয়। এ সময়ে প্রচুর বরফ পড়েছে। প্রতিদিন ফেসবুকে দেখছি দুবনার বন্ধুদের ছবি আর মনে হয়েছে ইস কী আবহাওয়াই না মিস করলাম। 

  দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে যাবে। আবার একটা সিটি স্ক্যান করা হবে। ইতিমধ্যে ফুসফুস ড্যামেজ প্রায় ১৫% কমে এসেছে। গুলিয়ার ১০% আর আমার ৫%। তাই ডাক্তার বললেন বাসায় গিয়ে বাকি চিকিৎসা করতে। গত এক বছরে বিভিন্ন খবর দেখে, শুনে আর সেটা এনালাইসিস করে যেটা বুঝেছি, করোনামুক্ত হবার পর শুরু হয় আসল পরীক্ষা। ফলো আপটা প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ। করোনা মানুষের ইমিউনিটি নষ্ট করে ফেলে, যার ফলে অন্য যেকোনো অসুখ ফাটাল হয়ে উঠতে পারে।  আমার বেশ কয়েকজন বন্ধুর সাথ এমনটা ঘটেছে। ভ্লাদিমির গেরদত তাদের একজন। সেরগেই বারবার বলে দিয়েছে যদি সামান্যতম ডিসকমফোর্ট ফিল কর সাথে সাথে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করো বা ০৩ ফোন করে কনসাল্ট করো। অনেকেই সেটা বুঝতে চায় না, এক আধটু ডিসকমফোর্ট হালকা ভাবে নেয় এই ভেবে যে এমনিতেই সেরে যাবে। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে এমনকি মারা পর্যন্ত যায়। তাই বাসায় ফিরেই পালসো-অক্সিমিটার কিনলাম ব্লাডে অক্সিজেনের স্যাচুরেশন দেখতে। সাথে ছিল শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম। খিদে বেড়ে গেল প্রচুর। ডাক্তার রিকমেন্ড করেছেন অল্প হাঁটাচলার, তবে কয়েকদিনের মধ্যেই আমি সেটাকে ৫-৬ কিলমিটারে নিয়ে এলাম।  এখন বেশ ঠাণ্ডা। গত দিন পনের তাপমাত্রা মাইনাস ১৫ থেকে ২০, তবে সেটা এমনকি মাইনাস ৩০ পর্যন্ত অনুভুত হয়। তবে রুশরা বলে "প্রকৃতির কখনও খারাপ আবহাওয়া থাকে না, এটা আমাদের থাকে উপযুক্ত পোশাকের অভাব।" এই প্রথম মাস্কের নতুন ব্যবহার দেখলাম। মাস্ক শুধু করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা করে না, শীতের হাত থেকেও বাঁচায়।  করোনায় আরও যেটা খেয়াল করলাম, তা হল বেশ কিছু পুরনো ব্যধি ফিরে এসেছে - যেমন গলায় কফ আটকে থাকা, নাক দিয়ে রক্ত পড়া যা বছর দশেক আগে আমাকে ছেঁড়ে চলে গেছিল। তবে এসব মনে হয় ওষুধের কারণে। আমার সাধারণত হাই প্রেসার। এখন সেটা লো হয়ে গেছে, অন্তত সাময়িক ভাবে হলেও। তার মানে কোন কোন ক্ষেত্রে আমি প্রায় বছর দশেক পিছিয়ে মানে ইয়ং হয়ে গেছি। আবার হাঁটতে গেলে প্রথম এক কিলোমিটার মত খুব কষ্ট হয়, মনে হয় আমি যেন বার্ধক্যে পৌঁছে গেছি। সেট আমাকে ভবিষ্যতে নিয়ে যায়। প্রায়ই খেতে ইচ্ছে করে আবার কোন কাজেই দীর্ঘ সময় মনোযোগ রাখতে পারি না। কনসেন্ট্রেশনের অভাব। তাই রিসার্চের কাজ বলতে গেলে করতেই পারছি না। সময় কাটছে গল্পের বই পড়ে। এ সুযোগে অবশ্য অনেক বই পড়া হয়েছে। আলেক্সান্দার ব্লকের একটা কবিতায় আছে, "হে ব্যর্থতা, তোমাকে আমি গ্রহণ করছি, সাফল্য তোমাকেও আমার শুভেচ্ছা।" হ্যাঁ, জীবনের সব অবস্থাকেই উপভোগ করা - এটাই আমার জীবন দর্শন। তাই অনেক প্রতিকুলতার পরেও করোনা পজিটিভ হওয়া আমি পজিটিভ অভিজ্ঞতা বলেই মনে করি। আরও একটা শিক্ষা, জীবনের সব লড়াই দিনের শেষে নিজেকেই লড়তে হয়, বিশেষ করে অসুখ বিসুখ। তাই বিশ্বাস রাখতে হয় নিজের উপর আর বিজ্ঞানের উপর, মানে ডাক্তারের উপর। রুশরা বলে, ওদের শুধু দুজন বন্ধু, আর্মি আর নৌবাহিনী। জীবন যুদ্ধেও শুধু দুজন বন্ধু, ব্যাক্তি মানুষ নিজে আর বিজ্ঞান। 

  এ লেখাটা আমি শেষ করেছিলাম ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১। আজ ০৩ জুলাই ২০২১। এর মধ্যে অনেক জল বয়ে গেছে ভোলগা দিয়ে। শুরু হয়েছে তৃতীয় ওয়েভ। এ নিয়ে বলার আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিসংখ্যান দেখা যাক তুলনার সুবিধার জন্য।

  ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাশিয়ায় ৪.১৫ মিলিয়ন করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে, ৩.৭ মিলিয়ন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে, ৮৩ হাজার মানুষ মারা গেছে, ৩৭২ হাজার এখনও চিকিৎসাধীন। টোটাল টেস্ট হয়েছে ১০৮,৭ মিলিয়ন। আজ পর্যন্ত প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন লোককে টিকা দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় ৬৪০ হাজার দুটো ডোজই পেয়েছে। এখনও পর্যন্ত টিকা নিয়ে কোন জটিলতার কথা শোনা যায়নি।  আমার পরিচিত যারা টিকা নিয়েছে, তারাও সামান্য জ্বর, মাথা ব্যথা ছাড়া জটিল কোন সমস্যায় পড়েনি। আমাদের ইনস্টিটিউট থেকে টিকা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু নিজে করোনা পজিটিভ ছিলাম বলে এই মুহূর্তে আমার টিকা নেওয়া হচ্ছে না, যদিও প্রথম সুযোগেই নেব বলে ঠিক করেছি।    

  এটা ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিসংখ্যান। ৩০ জুন আমরা কী ছবি পাই? টোটাল করোনা পজিটিভ ৫.৫ মিলিয়ন (৫৫১৪৫৯৯), সুস্থ্য হয়ে ফিরে এসেছে ৫ মিলিয়ন (৫০০০৩৯৩), মারা গেছে ১৩৫২১৪ জন। টোটাল  টেস্ট হয়েছে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন (১৪৯৬৪১৭০৯)। অর্থাৎ গত ৪ মাস ১০ দিনে আরও ১.৩৫ মিলিয়ন করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে আর মারা গেছে আরও প্রায় ৫২ হাজার মানুষ। আজ ২ জুনের হিসেবে এ পর্যন্ত রাশিয়ায় করোনা ভাইরাসে  আক্রান্ত ৫৫৬৮৩৬০ জন, এর মধ্যে  ১৩৬৫৬৫ জন মারা গেছে। আর গত আজই ৬৭৯ জন। এটা এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার। অর্থাৎ এখন সংক্রমণের হার যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুর হার। এক কথায় দিন দিন অবস্থা ভয়াবহ হচ্ছে। যতক্ষণ না ৭০% জনগণ ভ্যাক্সিন নিয়ে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তুলছে এর হাট থেকে রক্ষা পাবার সম্ভাবনা কম। 

  

৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্বে টোটাল করোনা পজিটিভ প্রায় ১৮২ মিলিয়ন, মৃত্যু ৪ মিলিয়ন। এটা হচ্ছে বেশ কতগুলো ভ্যাক্সিন বাজারে আসার পরে। ভ্যাক্সিনের আগমন মানুষের মধ্যে প্রথম দিকে যে প্যানিক ছিল এখন সেটা নেই, তবে সমস্যা যে সমাধান থেকে অনেক দূরে এটাও সবাই অনুভব করতে পারছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষার পরে  বেশ কিছু ভ্যাক্সিন বাজারে এসেছে। এই ভ্যাক্সিন নিয়ে রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক যুদ্ধ - দুই চলছে তীব্র বেগে। পশ্চিমা ভ্যাক্সিন, বিশেষ করে আস্ট্রজেনিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আসছে। সেক্ষেত্রে রাশিয়ার স্পুটনিক ৫ বেশ ভালো বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বে সংবাদের ক্ষেত্রে যতটা ট্র্যানপারেন্সি আছে, রাশিয়ায় সেটা আছে কি? আবার অন্য দিকে স্পুটনিক ৫ শুধু রাশিয়ায় নয়, অন্যান্য দেশেও দেওয়া হচ্ছে, সেখানেও তো ফলাফল ভালো বলেই মনে হচ্ছে। এক কথায় আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত মান নির্ণয়ের একক কোন  প্রতিষ্ঠান না থাকায় সত্য  মিথ্যা এসবই আজ হয়েছে দলীয়। অবজেক্টিভ রিয়্যালিটির স্থান দখল করেছে সাবজেক্টিভ রিয়ালিটি। ফলে মানুষ হচ্ছে বিভ্রান্ত। ইউরোপের মানুষ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার ভ্যাক্সিন নিতে পারছে না। উল্টোটাও ঘটছে। রাশিয়ায় অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন রাশিয়ার বাজার ইউরোপ, আমেরিকার ভ্যাক্সিনের জন্য খুলে দেওয়া দরকার। রুশ ভ্যাক্সিন সরকার বিনে পয়সায় দিচ্ছে। ওগুলো হবে কমার্শিয়াল ভিত্তিতে। তাতে যেসব মানুষ রুশ ভ্যাক্সিনের উপর আস্থা রাখতে পারছে না বা রাখছে না, তারা চাইলে ওসব ভ্যাক্সিন নিতে পারবে। এতে আর যাই হোক, সার্বিক ভাবে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই লাভবান হবে। 

  রাশিয়ায় বর্তমানে করোনা প্রতিরোধে ৪ টি ভ্যাক্সিন এসেছে। সর্বপ্রথম এসেছিল স্পুটনিক ৫ যা ইতিমধ্যে যথেষ্ট সুনামের সাথে করোনার সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এরপর এসেছে এপিভাককরোনা, কোভিভাক আর স্পুটনিক লাইট।  

  স্পুটনিক ৫ – এটা ভেক্টর টাইপের ভ্যাক্সিন। এর মধ্যে থাকে পুনরুৎপাদনে অক্ষম আডনোভাইরাসভাইরাস ভেক্টর। এটা শরীরে করোনভাইরাস এস-প্রোটিনের জিন সরবরাহ করে। একবার টিকা দেওয়ার পরে দেহের কোষগুলি এই প্রোটিন উৎপাদন শুরু করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ধারণা করা হয় যে এই প্রোটিনের অ্যান্টিবডিগুলি নিরপেক্ষ, যা সংক্রমণ রোধ করে। ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে দুটো ডোজের মাধ্যমে স্পুটনিক ৫ নিতে হয়। 

  এপিভাইকোরোনা একটি পেপটাইড ভ্যাকসিন। স্পুটনিক ৫ এর মত  এটি কোনও জৈবিক এজেন্ট বহন করে না। এতে কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত ভাইরাল প্রোটিনের (পেপটাইডস) ছোট ছোট টুকরা রয়েছে যার মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা শিখে ফেলে এবং পরবর্তীকালে ভাইরাসকে সনাক্ত করে তাঁকে নিউট্রালাইজ করে। স্পুটনিক ৫ এর মত এক্ষেত্রেও দু ডোজের মধ্যে ব্যবধান ৩ সপ্তাহ। 

  কোভিভাক হল তথাকথিত পুরো ভাইরাস টিকা। এর মূলে রয়েছে SARS-CoV-2 করোনাভাইরাস,  যা বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ফলে এই করোনাভাইরাস তাদের সংক্রামক বৈশিষ্ট্যগুলি হারিয়ে ফেলে তবে একই সাথে দেহে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি করে। এটি শুধু এস-প্রোটিন বা এর উপাদানগুলির নয়, করোনভাইরাসের সমস্ত প্রোটিনের জন্য একটি জটিল প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। কোভিভাকের দুই ডোজের মধ্যে ব্যবধান হল দুই সপ্তাহ। 

   স্পুটনিক লাইট হল মানব অ্যাডেনোভাইরাস ভিত্তিক একটি ভেক্টর ড্রাগ যা SARS-CoV-2 করোনভাইরাস থেকে জিনগত তথ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্পুটনিক লাইট হল স্পুটনিক ৫ ভ্যাক্সিনের প্রথম উপাদান এবং এক্ষেত্রে দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োজন হয় না। 

  এখন প্রশ্ন হচ্ছে এত তাড়াহুড়ো করে ভ্যাক্সিন তৈরি করার পরেও কেন যথেষ্ট পরিমাণ মানুষকে ভ্যাক্সিন দেওয়া যাচ্ছে না। একটা কথা ঠিক যে নিজেদের ভ্যাক্সিন তৈরি করা রাশিয়ার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। অর্থনৈতিক কারণ হিসেবে বলা যায় এর ফলে বিশাল ভ্যাক্সিন মার্কেটের একাংশ তারা পাবে। টেকনোলোজির দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এখানকার প্রায় সমস্ত শিল্পই ধ্বংসের পথে এগুচ্ছিল। মাত্র ২০১৯ সালে তারা ভাইরাস ও এপিডেমি নিয়ে কাজ করত এমন প্রায় ৪০% গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ করে দেয় অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের কথা চিন্তা করে। করোনার কারণে বিজ্ঞানের এ সমস্ত শাখা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এটাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও তারপরে পদার্থবিদদের স্তালিনের রোষ থেকে বেঁচে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। উল্লেখ করা যেতে পারে সে সময় বুর্জোয়া বিজ্ঞান বলে ইকোলজি ও জেনেটিক্স সহ বিজ্ঞানের অনেক শাখা শুধু বন্ধই করা হয় না, এসব বিজ্ঞানীদের দেশ ও জাতির শত্রু বদনাম দিয়ে নির্যাতন, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হয়। এ সময় কারালিওভের মত ইঞ্জিনিয়ার, লান্দাউয়ের মত পদার্থবিদগণ কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। কিন্তু আমেরিকার পারমনাবিক বোমা সম্পর্কে জ্ঞাত হবার পরে স্তালিন এসব বিজ্ঞানীদের মুক্তি দেন। এখন বিজ্ঞানীরা স্তালিনের গুলাগে না গেলেও রাশিয়ার ভাইরাস সংক্রান্ত সমস্ত অর্জন হারিয়ে যেতে যেতে করোনার কৃপায় বেঁচে যায়। তাছাড়া নিজেরা ভ্যাক্সিন তৈরি না করলে বাইরে থেকে সেটা কিনতে গিয়ে শুধু যে অর্থনৈতিক ভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হত তা নয়, যেখানে বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ এমনকি নিজেদের পরীক্ষিত বন্ধুদের ভ্যাক্সিন দিতে গড়িমসি করছে সেখানে রাশিয়ার জনগণের জীবন যে সুতায় ঝুলত সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তারপরেও মানুষ ভ্যাক্সিন নিতে তেমন আগ্রহী নয়। বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যে লটারি সহ বিভিন্ন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের ইনস্টিটিউটে গত ডিসেম্বর থেকে ভ্যাক্সিন দেওয়া শুরু হলেও এ পর্যন্ত ভ্যাক্সিন নিয়েছে ২০% এর মত এমপ্লই। ৭০% কর্মচারী ভ্যাক্সিন না নিলে ইনস্টিটিউট সম্পূর্ণ খোলা হবে না বলে ঘোষণা দিলেও কেউ তেমন গা করছে না। এমনকি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে যারা সেপ্টেম্বরের আগে ভ্যাক্সিন নেবে তাদের ৪ হাজার রুবল করে দেওয়া হবে, তবুও কারও তেমন গরজ দেখা যাচ্ছে না। আমি অবাক হয়ে ভাবি কেন এমন হয়। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভ্যাক্সিনের পেছনে অনেক পলিটিক্স কাজ করছে। তবে এটা তো ঠিক যে রাজনীতিবিদরা ভ্যাক্সিন তৈরি করেনি, করেছে বিজ্ঞানীরা। এদের অনেকেই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী। তারা কি তাদের রেপুটেশন নিয়ে কোন রিস্ক নেবেন? এখানে আছি ১৯৮৩ থেকে। বিজ্ঞানী কমিউনিটিকে জানি ভেতর থেকে। তাই ভ্যাক্সিনের ব্যাপারে সন্দেহ নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই হয়তো ভাবছে ভ্যাক্সিন পরবর্তী দুঃসংবাদ (যদি থেকে থাকে) সঠিক ভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে আমার পরিচিত অনেকেই ভ্যাক্সিন নিয়েছে, কারও কোন জটিল সমস্যা হয়েছে বলে শুনিনি। আবার এটাও ঠিক, ভ্যাক্সিন নেওয়ার পরে কেউ যদি অন্য কোন কারণেও অসুস্থ হয় বা মারা যায়, লোকজন আঙ্গুল তোলে ভ্যাক্সিনের দিকেই। তাই এখানেও মনে হয় কিছু অবিশ্বাস আছে। আজ ৩০ জুন প্রেসিডেন্ট পুতিন অনলাইনে জনগণের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তাতে নিজে বাধ্যতামূলক ভ্যাক্সিনেশনের বিপক্ষে মত প্রকাশ করেন ১৯৯৮ সালে গৃহীত একটা আইনের উল্লেখ করে। সমস্যা হল, ভ্যাক্সিন স্বেচ্ছামূলক বা ভলেন্টিয়ারি হলে তাতে একদিকে যেমন নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো হয়, অন্যদিকে তেমনি কোন রকম দুর্ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে দায়দায়িত্ব এড়ানোর পথে খুলে  যায়। ভ্যাক্সিন বাধ্যতামূলক হলে দায়দায়িত্ব সরকারের কাঁধেই পড়ত। ফলে এ প্রশ্নটা অনেকের মনেই জাগে, বিশেষ করে আমার কলিগদের। এছাড়া আগেই বলেছি রাশিয়ার অনেকেই এখন ইউরোপ আমেরিকার পণ্যে বেশি আস্থা রাখে, ফলে স্পুটনিক ৫ বা অন্য যেকোনো স্থানীয় ভ্যাক্সিন নিতে আগ্রহী নয়। আর সে কারণেই অনেকেই ওসব ভ্যাক্সিন রাশিয়ায় আনার পক্ষপাতী। আর সেখানে কাজ করে অন্য পলিটিক্স। যতক্ষণ ইউরোপ আর আমেরিকা এদের ভ্যাক্সিনের জন্য নিজেদের মার্কেট খুলে দিচ্ছে এরাও ওদের ভ্যাক্সিনের জন্য রুশ মার্কেট খুলবে না। ইতিমধ্যেই ইউরোপ থেকে অনেকেই ভ্যাক্সিন ট্রিপে রাশিয়া আসছে। এক কথায় ভ্যাক্সিন শুধু রোগ প্রতিষেধক নয়, রাজনৈতিক মারণাস্ত্র।

  আগেই বলেছি করোনা মুক্ত হয়ে আমরা হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরি ২২ জানুয়ারি। এরপর দেখা দেয় বিভিন্ন অনুসর্গ। উচ্চচাপের সমস্যা আগেই ছিল। করোনার পরে রক্তচাপ ওঠানামা করতে শুরু করে। ফলে মার্চে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে গিয়ে চেক আপ করাতে হয়, নতুন ওষুধ নিতে হয়। টুকিটাকি অন্য সমস্যাও দেখা দেয়। সবচেয়ে বড় হল ক্লান্তি। হুট করেই পাঁচ সাত দশ মিনিটের জন্য ঘুমিয়ে পড়া। ফলে প্রায় পাঁচ মাস পরেও রিসার্চের কাজে ঠিকমত ফিরে যেতে পারছি না। খুব দ্রুতই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ডাক্তারদের বললে বলে এসব পোস্ট-করোনা সিনড্রোম। কিন্তু কতদিন সেটা চলবে কেউই জানে না। তাছাড়া এখন এটা মনে হয় সাইকোলজিক্যাল সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যাই হোক সব করোনার কাঁধে চাপানো। আগে মানুষ নিজেদের সব সমস্যা ভগবানের কাঁধে চাপিয়ে হাওয়া খেয়ে ঘুরে বেড়াত, এখন করোনা ভগবানকে তাড়িয়ে তার স্থান দখল করে বসেছে। শুনেছি ভারতে নাকি করোনা দেবীর মন্দির পর্যন্ত তৈরি হয়েছে। একেই বলে ভাগ্য। ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীরা জীবন পণ যুদ্ধ করে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারছে না, আর এই করোনা বিবি লাখ লাখ মানুষ মেরে দেবতা বনে গেছে। 

   তবে ভ্যাক্সিনের সাথে সাথে অন্য ব্যবসাও শুরু হয়েছে – পয়সার বিনিময়ে ভ্যাক্সিন নেবার সার্টিফিকেট কেনা। এটা এক অর্থে মানুষ টাকা দিয়ে নিজের মৃত্যু কিনছে। সে ভ্যাক্সিন না নিয়ে রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে  এসব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর পরে যদি অসুস্থ হয় সবাই বলছে ভ্যাক্সিন নেবার পর মানুষ অসুস্থ হচ্ছে। এ এক বহুমুখী সমস্যা। মানুষ কেন যে ভুলে যাচ্ছে টাকা দিয়ে সব কিছু কেনা যায় না, আর গেলেও সেটা পরিণামে ক্রেতাদের দুর্দশা ডেকে আনে?     

   করোনা ও করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন নিয়ে বিভিন্ন রাজনীতি চলছে। এমনকি বন্ধু দেশগুলো একে অন্যকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে চাইছে না। কিছুদিন আগেও উন্নত দেশগুলোর চাইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো করোনা মোকাবিলায় অনেক বেশি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে কিছুদিন আগে ভারতে করোনার তাণ্ডব সব হিসেব উল্টিয়ে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশও দ্রুত করোনার খপ্পরে পরে নাকানিচুবানি খাচ্ছে। বর্তমান যুগে যেমন প্রায় প্রতিদিনই বিজ্ঞানীরা নিত্যনতুন বিভিন্ন ডিভাইস আবিষ্কার করছেন, ঠিক তততাই দ্রুততার সাথে করোনাও নিত্যনতুন মিউটেশনের মাধ্যমে ক্রমাগত মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে যেতে চাইছে। এক কথায় করোনা বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে যতটা না ঐক্যবদ্ধ করেছে তার চেয়ে বেশি একে অন্যের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ইউনিটি থ্রু ডাইভারসিটি  বা বৈচিত্রের মধ্যেই ঐক্য এই  ফর্মুলা এখানে ফেল করেছে। তবে এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। বিজ্ঞানীরা রেকর্ড পরিমাণ কম সময়ে ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেছেন। পারবে কি রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার দম্ভ ও আর্থিক লাভ-লোকসানের কথা ভুলে নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় আসতে, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে? এই বিপদ থেকে মানুষ যে বেরিয়ে আসবে সে ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, তবে সে জন্যে কত প্রাণ বলিদান করতে হবে সেটা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের সুবুদ্ধি আর সাধারণ মানুষের সচেতনতার উপর।  

  আমি তো বটেই, বন্ধুদের অনেকেই ইতিমধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়েছে। এদের কেউ এখনও পৃথিবীর বুকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, আবার কেউ কেউ পাড়ি দিয়েছে মহাবিশ্বের মহাকাশে। যারা নেই, তাদের কথা বলতে পারব না, তবে যারা আছে রোগের মাত্রা যাই হোক না কেন তাদের প্রায় সবাই করোনা পরবর্তী বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। কারও সমস্যা দেখে গেছে অসুখের পরপরই, কারও মাস খানেক পরে আবার কারও বা ৪ থেকে ৬ মাস পরে। এক কথায় করোনা শব্দ করেই আসুক আর নিঃশব্দেই আসুক দু দিন আগে হোক আর দু দিন পরে হোক সবাইকে তার আগমনী বার্তা জানিয়ে দিচ্ছে। তাই আমার ব্যক্তিগত মতামত, ভ্যাক্সিন যদি ১% গ্যারান্টিও দেয় ভবিষ্যতে কোন ফর্মেই করোনা না হওয়ার, আমাদের উচিৎ ভ্যাক্সিন নেওয়া। এটা অনেকটা সীট বেল্টের মত। সীট বেল্ট অ্যাকসিডেন্ট থামাতে পারে না, তবে দুর্ঘটনার পরেও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়। তারপরেও ভ্যাক্সিন নিয়ে ভয় থেকেই যায়। রাশিয়ায় গণহারে ভ্যাক্সিন দেওয়া শুরু হয়েছে  গত ডিসেম্বরে। মাঝে করোনার প্রকোপ দীর্ঘদিন বেশ কম ছিল। ফলে হাসপাতাল তুলনামূলক ভাবে ফাঁকা ছিল, ডাক্তার নার্সদের উপর চাপ ছিল কম। কিন্তু তখন কেউ ভ্যাক্সিন নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। শহর বা গ্রাম গঞ্জের বিভিন্ন ক্লিনিক বাদেও সুপার মার্কেটে ভ্যাক্সিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষ তেমন সাড়া দেয়নি। এখন যখন নতুন করে করোনার তৃতীয় ওয়েভ শুরু হয়েছে, এসেছে ডেল্টা প্লাস নামে করোনার নতুন ভার্সন, আক্রান্ত হচ্ছে ইয়ং জেনারেশন, রোগীতে ভরে যাচ্ছে  হাসপাতাল – সবার টনক নড়েছে, লোকজন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভ্যাক্সিন নেওয়ার জন্য। এতে এক দিকে যেমন দেশের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি সম্ভাবনা বাড়ছে অন্য দিকে বাড়ছে অন্য রকম ভয়। যদিও ভ্যাক্সিনের পর ছোটোখাটো সমস্যা, যেমন জ্বর, মাথা ঘোরা এসব অস্বাভাবিক কিছু নয়, অনেকের মনে প্রশ্ন যদি জটিল কিছু হয় তখন কী করা? এখন তো করোনার রোগী দিয়ে হাসপাতাল ভর্তি, ভ্যাক্সিনের জটিলতায় তারা কি সাহায্য পাবে? এ ছাড়াও আছে ইন্টারনেটে ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রোপ্যাগান্ডা। সব মিলিয়ে মানুষ বিভ্রান্ত। সবাই এখন নিজের অধিকার সচেতন, অন্যের অধিকার নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যথা নেই। আমার অধিকার আছে ভ্যাক্সিন না নেওয়ার, একই ভাবে অন্যের অধিকার আছে আমার কারণে অসুস্থ না হওয়ায়। কিন্তু ভোগবাদী মনোভাব আমাদের অন্যের অধিকার নিয়ে ভাবায় না, ফলে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠছে না। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্পেসিফিক ইন্টারপ্রিটেশন করোনা সহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি দমনের লড়াইয়ের অগ্রগতি ব্যহত করছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি গণতান্ত্রিক অধিকার মানে সবার অধিকার। একার অধিকার – এটা একনায়কতন্ত্র।   

  তবে বিভিন্ন ভ্যাক্সিনের (যেমন আস্ট্রজেনিকা) সাইড এফেক্ট দেখে মনে হয় ভ্যাক্সিন নেওয়াটাও অনেকটা শাখের করাতের মত, মানে নিতেও ভয় আবার না নিলেও করোনা দেবীর হাতে নাস্তানাবুদ হওয়ার সম্ভাবনা। তবে কমবেশি  একটা জিনিস বলা যায়, ভ্যাক্সিনের পরে যারা অসুস্থ হচ্ছে তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হাল্কার উপর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে তাদের পোস্ট-করোনা সিনড্রোম নিয়ে কোন তথ্য অন্তত আমার জানা নেই। 

  করোনা আরও যে শিক্ষাটা আমাদের দিয়েছে তা হল অনেক দেশের সরকারই গ্লোবাল চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত নয়। ধনী দরিদ্র প্রায় কোন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই এ ধরণের সমস্যার জন্য প্রস্তুত নয়। এটা অনেকটা বন্যার মত। বানের জল যখন আসে মানুষ চেষ্টা করে এখানে এক বস্তা বালি, ওখানে দুটো ইট দিয়ে জল থামাতে। কিন্তু যখন কোথাও ভাঙ্গন দেখা দেয় তখন আর তাকে থামানো যায় না। তাই দরকার আগে থেকেই আশ্রয়স্থল তৈরি করা যেখানে প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ মাথা গুঁজতে পারে। তবে খুব কম দেশই সেটা করতে পেরেছে। যখন প্রয়োজন রাজনৈতিক, আদর্শগত দ্বিমত ভুলে বিশ্বের সমস্ত দেশের এক হয়ে  করোনার মোকাবেলা করা সেখানেও বিভিন্ন দেশ বিশ্ব মানবতার চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, বিশেষ করে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে করোনার কারণে মানুষ নিজেদের কিছুটা হলেও বদলাবে বলে আশা করা যায়। বিশেষ করে আমাদের মত দেশের লোকজন হাইজিনের গুরুত্ব অনুধাবন করবে। একই সাথে তারা প্রাইভেসির ব্যাপারেও সচেতন হবে বলে আশা করা যায়। অনেকেই করোনা ভাইরাস ম্যান মেইড বলে মনে করে। তাদের ধারণা কোন কোন দেশ বা কিছু কিছু সরকার চক্রান্ত করে বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বৃহৎ পুঁজি এই সময়ে যতটা লাভবান হয়েছে তাতে অনেকেই এটাকে সত্য মনে করে। আবার চীন থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি এবং অতি দ্রুত চীন সরকারের করোনা পরিস্থিতি কন্ট্রোলে আনার কারণে আমেরিকা প্রথম থেকেই চীনের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। প্রযুক্তিগত ভাবে ল্যাবরেটরিতে ভাইরাস উৎপাদন অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের সমস্যা অন্য জায়গায়। এমনকি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ কমবেশি একটি সীমিত এলাকা রেডিও একটিভ করে যদিও সেটার প্রতিক্রিয়া দীর্ঘ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে যেমনটা আমরা দেখি হিরোশিমা, নাগাসাকি বা চেরনোবিলে। কিন্তু করোনার মত বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের উপর মানুষের কন্ট্রোল একেবারেই নেই বললে চলে। সবচেয়ে বড় সমস্যা এসব অস্ত্র সেলফ-রেপ্লিকেটিং।  আর বর্তমানে বিশ্ব যখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে এই অস্ত্র কোন একটা জায়গায় লোকালাইজ করা অনেক বেশি প্রব্লেম্যাটিক। তাই কেউ স্বেচ্ছায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব জুড়ে এটা বিশ্বাস করা কষ্ট, আর যদি সেটা করেও থাকে তবে যেসব দেশ বাইয়লোজিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিল, করোনার পরে তারা দু বার ভাববে এ ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করার আগে। এক কথায় বলতে গেলে করোনা শুধু আমাদের জন্য সমস্যাই নিয়ে আসেনি, শিক্ষাও নিয়ে এসেছে। তবে তা গ্রহণ করা বা না করা নির্ভর করে মানুষের শুভ বুদ্ধির উপর। 

  ৩০ জুন পর্যন্ত রাশিয়ায় ন্যুনতম এক ডোজ ভ্যাক্সিন নিয়েছে ২২৯৩৯১৮২ জন। এটা জনসংখ্যার ১৫.৬৯% আর দেশের হার্ড ইমিউনিটি গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ৩৩.২৫%। তবে এ পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৭৩৮৬৮৯৯ জন মানুষ মানে জনগণের ১১.৮৯% বা প্রয়োজনের ২৫.২% দুটো ডোজই নিয়েছে। সর্বমোট ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে ৪০৩২৬০৮১ টি। গত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ভ্যাক্সিন নিয়েছে ৩১৯৮৩১ জন মানুষ, এটা জনসংখ্যার মাত্র ০.২২%। এই টেম্পে চলতে থাকলে ৭০% মানুষকে ভ্যাক্সিন দিতে সময় লাগবে ২৪৯ দিন। ১৫৮ ও ২০৪ দিন সময় লাগবে যথাক্রমে ৫০% ও ৬০% মানুষকে ভ্যাক্সিন দিতে। একই টেম্পে ৬০% প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষকে ভ্যাক্সিন দিতে সময় লাগবে ১৪৫ দিন।    

  ২ রা জুলাই সে হিসেবটা এরকম 

  ন্যুনতম এক ডোজ ভ্যাক্সিন নিয়েছে ২৪৪২৫৫৪৫ জন। এটা জনসংখ্যার ১৬.৭১% আর দেশের হার্ড ইমিউনিটি গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ৩৫.৪%। তবে এ পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৭৬৪৫৫৫৫ জন মানুষ মানে জনগণের ১২.০৭% বা প্রয়োজনের ২৫.৫৭% দুটো ডোজই নিয়েছে। সর্বমোট ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে ৪২০৭১১০০ টি। গত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ভ্যাক্সিন নিয়েছে ৩৫১৮৪৩ জন মানুষ, এটা জনসংখ্যার মাত্র ০.২৪%। এই টেম্পে চলতে থাকলে ৭০% মানুষকে ভ্যাক্সিন দিতে সময় লাগবে ২২৪ দিন। ১৪১ ও ১৮৩ দিন সময় লাগবে যথাক্রমে ৫০% ও ৬০% মানুষকে ভ্যাক্সিন দিতে। একই টেম্পে ৬০% প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষকে ভ্যাক্সিন দিতে সময় লাগবে ১২৯ দিন।   

  এ দুটো টেবিল থেকে বোঝা যায় সব কিছুর পরেও মানুষ এখন ভ্যাক্সিনকেই করোনা প্রতিরোধের একমাত্র না হলেও অন্যতম উপায় বলে মনে করছে। ভয় থাকবে। ভয় থাকা ভালো। ভয় সন্দেহের জন্ম দেয়, প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর প্রশ্ন করাই বিজ্ঞানমনস্কতা। এটাই আধুনিকতা। প্রশ্ন করেই মানুষ সত্য খুঁজবে, বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার পথ বের করবে – এটাই তো হওয়া উচিৎ বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাজের মূলমন্ত্র।  

  তবে সব কিছু যথেষ্ট প্রব্লেম্যাটিক। যেমন মস্কোয় হোটেল রেস্টুরেন্টে ঢোকার জন্য কিউআর কোডের ব্যবস্থা করা হয়েছে অথচ মেট্রো চলছে। প্রতিদিন মস্কো মেট্রো ব্যবহার করে ৭ মিলিয়ন মানে ৭০ লাখ মানুষ অথচ গত সাত দিনে রেস্টুরেন্টের জন্য কিউআর কোড দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫ লাখ লোককে। এর অর্থ মেট্রো খোলা রেখে রেস্টুরেন্টের জন্য কড়াকড়ি করলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হবে অথচ লোকজনের চলাচল কমানো যাবে না। কিন্তু এমন কোন উপায় নেই যাতে সবাইকে খুশি করা যায়। লোকজন ঘরে বসে থাকলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, ট্যাক্স কম আসবে। এই যে চেইন রিয়াকশন তাতে দিনের শেষে সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই সরকার ভ্যাক্সিন নেওয়ার জন্য জনগণকে এত ভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কেননা বিনে পয়সায় ভ্যাক্সিন দিতে যত খরচ, একজন লোককে চিকিৎসা দেওয়ার খরচ অনেক অনেক বেশি। এটা তো গেল সরকারের সরাসরি ক্ষতি। কিন্তু কলকারখানা যদি পূর্ণ শক্তিতে কাজ না করে দেশের সমগ্র অর্থনীতির উপরই তার নেগেটিভ এফেক্ট পড়বে। রাশিয়ার সরকার প্রথম থেকেই সে ব্যাপারে সচেতন ছিল বলেই চেষ্টা করেছে সামগ্রিক ভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে। এরা বার বার প্রমাণ করেছে শুধু যুদ্ধের জন্যই নয় শান্তির সময়ও আর্মি এক বিশাল শক্তি, যাকে কাজে লাগাতে হবে। তাইতো করোনার প্রারম্ভেই তাদের দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একের পর এক হাসপাতাল। বন্যা, বনে অগ্নিকাণ্ড – এসব ক্ষেত্রেও আর্মি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানে আমাদের সব দেশে সরকারের ভূমিকা বেশ সমালোচিত হয়েছে। আসলে করোনার বিরুদ্ধে মানব জাতি এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধে যেমন ফ্রন্ট থাকে তেমনি থাকে রিয়ার। যদি রিয়ার থেকে সাপ্লাই না থাকে ফ্রন্টে সৈনিকরা যুদ্ধে জয়ী হতে পারে না। করোনা যুদ্ধে ফ্রন্ট লাইনের সৈনিক ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী, আর রিয়ারের যোদ্ধা গোটা জাতি, যারা মাস্ক পরে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এই যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করবে। যখন শহরে লকডাউন ঘোষণা করা হয়, লাখ লাখ মানুষ ফিরে যায় গ্রামে, যেখানে কোন রকম ইনফ্রাস্টাকচার নেই। চাইলেও মানুষ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা তাদের জীবন ধারণের কোন উপায় নেই। তাই তারা রিস্ক নিতে বাধ্য হয়। প্রতিটি নতুন ওয়েভের সাথে বাড়ে রোগীর পরিমাণ আর আমাদের অসহায়ত্ব। তাই এই সার্কিট থেকে বেরুনোর একটাই উপায় – বিজ্ঞানে বিশ্বাস। কোন করোনা দেবী, কোন ঈশ্বর আপনার সহযোদ্ধা নয়। একমাত্র আপনিই নিজেকে সাহায্য করতে পারেন। আর সেজন্য বিজ্ঞানে বিশ্বাস করতে হবে, ভ্যাক্সিন নিতে হবে। এমনকি কিছু মানুষ যদি এতে বাঁচতে নাও পারে, সেটা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাদের আত্মত্যাগ। আত্মত্যাগ ছাড়া কোন দিন কোন যুদ্ধে কেউই জয়লাভ করেনি, করোনার বিরুদ্ধে করা যাবে ন। ভ্যক্সিন নিন, সাবধানে থাকুন, নিজের অধিকারের পাশাপাশি অন্যের অধিকারের কথা মাথায় রাখুন। সমগ্র মানব জাতি একত্র হয়ে লড়াই করেই  শুধু এই যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারবে।  ভাল থাকুন। সুস্থ থাকুন। সুস্থ রাখুন।   

দুবনা, ০২ জুলাই ২০২১ 

লেখক – গবেষক ও শিক্ষক
জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ, দুবনা
গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, মস্কো, রাশিয়া 

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

https://www.jaladarchi.com/2020/06/blog-post_16.html


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া