দীর্ঘ কবিতা (নিঃসঙ্গ প্রোফাইল)/ মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া

দীর্ঘ কবিতা 
নিঃসঙ্গ প্রোফাইল 

মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া

চায়ের দোকানে পোড়া তাওয়ায় ডিমপাউরুটির
সাথে খিদের কেমিস্ট্রি মেলাতে চাইছি যত
ঝনঝন গড়িয়ে যাচ্ছে খুচরো পয়সা-রূপেয়া-কয়েন
মাটিতে পড়লেই সিলমোহর!
চাকার ছাপ আঁকা!
বিশ্বাস করুন দাদা,নেশা করিনি একটুও
কাল থেকে বলে নিকোটিন লেভেলই
নেমে যাচ্ছে ফাঁকা পকেটের দরুন
মুখভর্তি ওয়াটারব্রাশ যেন খুলে গেছে ক্ষতমুখ
আর লালায় হড়কা বান টপকাচ্ছে
ভুখ কম করনেওলা দাওয়াই আভিতক  মিলা নেহি
যত্ত ঢ‍্যামনামো আর ভাল্লাগে না দাদা

তবু দেখছি অসংখ্য টায়ারের ছাপ ফেলে
গড়িয়ে যাচ্ছে চাকা শাদা শূন্যের দিকে
হিমনীল মুক্তবর্ণ চরাচর
আধমরা জোয়ার খেত ঝলসে দিচ্ছে মধ‍্যদিন
অরণ্যবেলা,গভীরতর শূন্যতায় ডুবে আছে
হিমানী নিস্পত্র খা খা উদ্ভিদ
চাক্কীপেষায় ছিটকে উঠছে আগুনদানা
অথচ নক্ষত্র লোক সৃষ্টির পরে
নবীনতর সৃজনে আগ্রহী ছিলেন ঈশ্বর!

টিউশানি ধরা ফালতু বেকার
হাড়হাভাতে দিন কাটছে  ছাইপাশ লেখা খুঁড়ে খুঁড়ে
সাইকিডেলিক যত খুঁজছি ব্লাক আর্ট
শেকড় বাকড়ের যাদুটোনা
এইসব তুকতাক যাতে করে
নিতান্ত চেনা মুখের সাউখুড়ি প্রশংসা
মিনিমাম ছাপা অক্ষরে নামটাম

তত উঠে আসছে পাখিটানা রথের খেলনা
গজসিংহমুখ দেবতার কঙ্কাল
পাথরের বজ্রে ধ‍্যানমগ্ন অনার্য ঈশ্বর
লতাগুল্মঢাকা ভাঙা দেউলের অভিমান
দীর্ঘতর বাতাস বয়ে যায় সভ‍্যতার উল্টো দিকে

রঙচটা এনামেল চাঁদ ধুয়ে দিচ্ছে শীর্ণ দুধনদী
এখানে ব‍্যপ্ত নভোতট
সমকাল পেরিয়ে যাচ্ছে ঘুমমাখা জনপদ
ময়ূরের পায়ে পায়ে আলো ঘুরছে
বুকে ভর করে পেরিয়ে যাচ্ছে
নেপথ্য জোছনা ও অন্ধকার
নিভে আসা চিতাকাঠ থেকে
ডানায় আগুন ধরে গেছে তার
মৃতনর্তকীর পাত্র থেকে
গড়িয়ে পড়ছে তীব্র আরক

বিকেলের মুখে টলমল করে আসে
তিন ছাত্রীর কুয়াশাজড়ানো মুখ
ক্লাস নাইন,অল সাবজেক্ট  বারোশো
অত সিন্ধুনীল টাইগ্রিসে
কত পার্সেন্ট রিপোর্টে প্রোগ্রেস?

উর্মিমুখর চির প্রনম‍্য ইচ্ছে তবু
পাহাড়ের ধাপে ধাপে
ইতিহাসের পাতা উল্টে ফেলছে
কত বছরের নিচে চমকায় লাপিসলাজুলি?
আদিম চিহ্নের মতো কোনও গান
হাড়ের গয়না থেকে প্রাচীন ভাস্কর
ছুঁড়ে দিলো জ‍্যান্ত প্রজাপতি
পাথরের আলোয় বিস্তীর্ণ আয়ু ও অহংকার
লুপ্ত শস্যাগার ঘেমে উঠছে পাকা ফসলের গন্ধে
এখানে নাবিকহীন নৌযান ডুবে গেছে
জলের তলায় প্রবালহাড়ে গাঁথা প্রাচীর
সমুদ্রের কঙ্কাল উঁচু হয়ে ওঠে যত
বালুঝড়ে আঁধি নেমে আসে

ঘুমের ভেতরে যদি উড়ে যায় তাঁবু?
অরণ্য উজাড় যাজকগোষ্ঠীর ঘুমন্ত চোখে
রঙ পাল্টায় মুহূর্মুহু অলৌকিক মেঘছায়া
দেয়া থেকে ঘন ও বিপন্ন কল্পদৃশ্যে
ঝুরঝুরে বালির অক্ষরে বক্ষতল অবধি
বৃষ্টি লিখে লিখে পাথরে কুঁকড়ে আছে জল
জলের ভেতর নিঃসঙ্গ ডুবো পাহাড়
বহুকাল ধরে জীর্ণ হয়ে আসা তারাদের মর্মর
গোপন জাদুমন্তরে ঘুরে ঘুরে যায়

মাকড়জালের মতো এই সেই জোছনাবাস্তব
লম্বা স্পেলে সুপার ইমপোজড আগুনের লালামাখা ওড়না
পাশে বাতাসতাড়িত ঈশ্বর ফিসফিস করে বলছে
লোথাল সমুদ্র থেকে মায়া সভ‍্যতার দীর্ঘ বয়নশিল্প
এলাচের বনে থামে বাদাম কাঠের জোড়বাঁধা নৌবহর
নোনা হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে ওঠে সোনালি বালুর দিন
ভুকম্পপ্রবন প্রত্নছায়া থেকে উঠে আসে ইনকা লাঙল
ফলায় চাপ চাপ মাটি,শুকনো হরিণের মাংস,শান্ত মহাকাশ
নুনে জারানো প্রাচীন মিথ আর
লৌকিক গানেভরা টাটকা আবাদ
রাতের তলায় যবের খেতের ধারে চামড়ার ছাউনিতে
সুরসুন্দরী  উঁচু করে পানপাত্র,কলসের গড়ন
পাথুরে আকাশের চাঙরে ছড়ানো নির্জন সুর
অল্প বিচ্ছুরণে তুলে ধরে প্রাচীন প্রদীপ
পেতলের সামান্য কলঙ্কলাগা গর্ভে ধাতুগান
চাকায় চাকায় অক্ষৌহিনী ক্ষুরের শব্দ
চাপা পড়ে যাচ্ছে মেঘলা  অচেতন
করোটিতে ভারি অস্ত্রের আর্তনাদ
কুয়োর পাশে ছড়ানো শুকনো ঘোড়ার হাড়গোড়

শাদা হাড়ে বাতাসের নিরালোক জোছনা
যুদ্ধ শেখেনি!শেখেনি? কেন?
শুধুই কৃষি ও বানিজ্যসমৃদ্ধ নগরপত্তন?
কী লিখেছিল তবে সবুজ তাম্রলিপি
বার্কগাছের ছালে বর্ণবান অক্ষরের প‍্যাপিরাস?
নুয়ে পড়া গমশীষ,তারাদের দিকনির্ণয়
সেতুহীন নদী ও মরুর  দীর্ঘশ্বাস নাকি
আদিম বানজারার মেঘজর্জর কোনও উন্মাদগীতি?

অথচ ধ্বংসের আগেও বৃন্দ গান গাইছিল কারা
রাতের পানশালায়
জোনাকির বাতিঘরে টিপটিপ জল ঝরছিল
পাতা ও বিষন্ন নাবিকের পোশাকে ধুলো উড়ছিল সময়ের
বাতাসের বেদী থেকে নেমে আসছিল শ্রবনা ও অরুন্ধতী
কারও ভিতু চোখের পাতায় শ‍্যামরেখা এঁকেছিল
অস্তাচলমুখী পৌর্ণমাসী তিথি…

এ মাসেও ছদিন কামাই!
খামভর্তি কথা বুকপকেটে নিয়ে ব্রিজের ওপরে দাঁড়াই
গোছা গোছা কালো পিঁপড়েরা ভিড় জমাচ্ছে
সব্জিমান্ডি,সিনেমা ও কাফেটেরিয়াতে
পিঁপড়েরা মিশে যাচ্ছে ধুধু রঙ বাঁকানো বিষুবে
ধোঁয়া উঠছে শব্দহীন বাতাসে বাতাসে
লিচুর শাঁসের মতো ধোঁয়ারঙ আকাশের গায়ে
আরও  আকাশ জুড়ে নেমে এল
বর্ষায় ভেজা নীলাভ বেতসলতা
নীল রঙ এ চারণভূমিতে পশুদের নিয়ে
দৌড়ে যাচ্ছে রাখালছেলেরা
বিদ‍্যুতে ঝলসে ওঠে আঙুরের খেত
মেষপালকের  পিঠে আছড়ে পড়ছে সোনার সাপ
চাকার আবর্তে বেঁধে নিচ্ছে শেকলের ঝনঝন
কলোনীয়াল জিঞ্জির দাদা,কাঁটামারা চাবুকের
হিসহিস শব্দে আঁশটে রক্তগন্ধ  ব‍্যা-পক!

প্রথম থেকে তৃতীয় পৃথিবীর বোবা ও অন্ধ
সব বাতাস কাঁধে করে এনেছে
আজকের এই নিউক্লিয়ার সন্ধে
হিয়েরোগ্লিফিক্স,খরোষ্ঠীলিপি
পাথরে খোদাই কত মন্দার ফুলের সংকেত
আজও অনুবাদ হয়নি প্রাজ্ঞ পিতামহ?
ইতিহাস ক্লাস কেটে ফাটিচার মাতাল আমিও কি
পুঁথিপাঠ ও খোয়াবের ঘোরলাগা আসর থেকে
উঠে এসে সারসার পিঁপড়ের সাথে
ঢুকে পড়ছি না নিঃসঙ্গ প্রোফাইলে ?
এই আমাদের দেহাতি ঈশ্বর
ইশারা দেন ব‍্যক্তিগত ব‍্যক্তিগত
যেসব গুনাহ জন্মদাগের মত ফরজের সওয়াব হয়ে
আয়নার উল্টোদিকে ছবি তুলে ধরে আর
ছেঁড়া জেব থেকে যে ছুঁড়ে দেয় ভাঙাথালা

ফুটো থাল থেকে আসমানে আলো চুঁইয়ে পড়ে
কত কত নীল রাতের দোসর হয়ে
চাঁদের গায়ে লাগা সেই সব অসংখ্য চাঁদ
উঁচু নিচু গল্পের ফ্রেম ভাঙে আমার মতই
গুস্তাকি মাপ কিজিয়ে জনাব
হররোজ যো পাপা কহতে হ‍্যায়
কেয়ামত সে কেয়ামত তক
অপরাধপ্রবণ ঘোলাটে অরবিটে ঘুরে ঘুরে
এ গ্রহের বিষনীল ছায়াবৃত্তে বরাবর
ভাঙা সাইকেলে একা প‍্যাডেল ঘোরাই
চাকা ঘিরে...
ঘুম আসে কত জন্ম ধরে
গ্রামীণ জড়োসড়ো ঈশ্বর
সার্কাসের সামনে বসে দ‍্যাখে
কত শীতকাল জুড়ে
শূন্যে উঠে যায় সাইকেল আ্যরেনায়
কত কল্পকাল আমি এই আবর্তে
একলা অভিমন‍্যু  হই…

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 


              

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া