নাস্তিকের ধর্মাধর্ম --- পর্ব--(১৫)/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

নাস্তিকের ধর্মাধর্ম --- পর্ব--(১৫)

সন্দীপ কাঞ্জিলাল

ধর্মে ঈশ্বরের প্রবেশ

এবার একটু আলোচনা করা যাক, বিভিন্ন ধর্ম সৃষ্টি সম্বন্ধে কি বলে।

পৌরাণিক হিন্দু ধর্মে এবং বৌদ্ধ ধর্মে মোটামুটি একই রকম সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের কল্পনা আছে। মনুস্মৃতি, মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থে হিন্দুধর্মের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের যে হিসেব পাওয়া যায়, তা সংক্ষেপে এরকম। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই চার যুগ আর তাদের সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ মিলিয়ে মোট বারো হাজার বৎসর। মানুষের চার যুগের এই বারো হাজার বৎসরে দেবতাদের এক যুগ। দেবতাদের এরকম এক হাজার যুগে ব্রহ্মার এক দিন। ব্রহ্মার এক দিনের শেষে মহাপ্রলয় আসে এবং তখন মহাবিশ্ব পরমব্রহ্মে লয় হয়ে যায়। ব্রহ্মার রাত্রি বা নিদ্রাবস্থাও দিনের সমান, এবং তখন মহাবিশ্ব সৃষ্টিহীন লয়াবস্থাতেই থাকে। রাত্রির শেষে ব্রহ্মার জাগরণে আবার সৃষ্টি আরম্ভ হয়। চার যুগ এবং মহাপ্রলয়ের মধ্যে মহাযুগ, মন্বন্তর, কল্প, মহামন্বন্তর প্রভৃতি আরো বিভাগ আছে। প্রতিটি কালের বিভাগের শেষেই মহাবিশ্বে এবং পৃথিবীতে কিছু পরিবর্তন আসে। কালের বিভাগ যত দীর্ঘ, পরিবর্তনের মাপও তত বেশি। এভাবে ছোট-বড় সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় বিশ্বপ্রকৃতিকে অনিবার অনন্তকাল ধরে ঘটে চলেছে। শেষ পর্যন্ত এসব কাল্পনিক হিসেব যেন প্রায় মানুষের কল্পনা শক্তিকেও অতিক্রম করে যায়।

  বৌদ্ধ ধর্মের স্থিতি প্রলয়ের কল্পনাতেও হিন্দু ধর্মের কল্পনা থেকে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। কোন কোন বিশেষজ্ঞের মতে এই চিন্তাধারা হিন্দু ধর্মের আগেই বৌদ্ধ ধর্মে পূর্ণতা লাভ করেছিল। তেমনি ভাবে অনন্ত অসংখ্য বিশ্বলোকের কল্পনাও হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের, বিশেষত বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব লাভ করেছে। বৌদ্ধ ধর্ম যদিও ঈশ্বরে অবিশ্বাসী, তথাপি সহস্র সহস্র বিশ্বলোকে বুদ্ধ বারে বারে জন্মগ্রহণ করেন, এই বিশ্বাস বৌদ্ধরা পোষণ করেন। হিন্দু ধর্মের অদ্বৈতবাদী ধারায় অবশ্য তাত্ত্বিক দিক থেকে সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে, পরমাত্মা ও জীবাত্মার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু সৃষ্টি শুধুমাত্র স্রষ্টার মায়া বা মূর্ত আত্মপ্রকাশ হলেও অবিদ্যায় বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করেছে। তাছাড়া হিন্দু ধর্মের দ্বৈতবাদী শাখারও দার্শনিক এবং ব্যবহারিক গুরুত্ব কম নয়। সবচেয়ে বড় কথা, দর্শনের খোলস ছাড়া ব্যবহারিক হিন্দু ধর্মে অন্য অনেক ধর্মের মতই নিরাকার ব্রহ্ম বাস্তবে বিশ্বপিতা বা আদিপুরুষ রূপে কল্পিত হয়ে থাকেন। ঋকবেদের কাল থেকেই একথা সত্য। 

  দার্শনিক তত্ত্বের ধোঁয়াশায় অনাবৃত সরল ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব পাওয়া যায় প্রধানত ইহুদি-খ্রিস্টান-ইসলাম ধর্মের কল্পনায়। এই তিন ধর্মই বাইবেলের "বুক অফ জেনেসিস" এ বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাস করে। এই সৃষ্টিতত্ত্ব বলছে যে প্রথমে পৃথিবী ছিল নিরাকার, জলময় ও অন্ধকার। তারপর ঈশ্বর "আলো হোক" এই বলে আলো সৃষ্টি করলেন। আলো থেকে অন্ধকার আলাদা করলেন, দিন ও রাত্রির প্রভেদ সৃষ্টি করলেন। এই ছিল তার প্রথম দিনের কাজ। দ্বিতীয় দিনে তিনি নিচের জল থেকে উপরের আকাশকে আলাদা করলেন। তৃতীয় দিনে জল থেকে মাটি সৃষ্টি করলেন, এবং মাটিতে তৃণলতা তরুগুল্ম সব সৃষ্টি করলেন। চতুর্থ দিনে তিনি দিন ও রাত্রির অধীশ্বর রূপে যথাক্রমে সূর্য ও চন্দ্রকে সৃষ্টি করলেন, আর পৃথিবীতে আলো দেবার জন্য নক্ষত্রদের সৃষ্টি করলেন। পঞ্চম দিনে জলের প্রাণী এবং আকাশের পাখিদের সৃষ্টি করলেন। ষষ্ঠ দিনে প্রথমে গবাদি পশু সহ অন্য সব মনুষ্যেতর প্রাণী সৃষ্টি করলেন। তারপর সেদিনই নিজের আকৃতির মত করে মানুষ তৈরি করলেন, এবং সমস্ত তরুলতা এবং পশুপাখির উপর মানুষের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করলেন। এভাবে ছয় দিনে সব কিছু সৃষ্টি করে সপ্তম দিনে তিনি বিশ্রাম নিলেন। 
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাইবেলের এই সৃষ্টিতত্ত্ব ইহুদি খ্রিস্টান ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষেরা গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। শুধু তাই নয়, ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্ট প্রথম দম্পতি আদম ও ইভ থেকে শুরু করে মানবজাতির যে ধারাবাহিক বংশপরিচয় বাইবেলের " বুক অফ জেনেসিস" দেওয়া আছে, তা থেকে হিসেব করে খ্রিস্টান পণ্ডিতেরা স্থির করলেন ঠিক কত সালে ঈশ্বর ছয় দিনে মানুষ ও তার ভোগের জন্য বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ, সপ্তদশ শতাব্দীতে আয়ারল্যান্ডের আর্চবিশপ জেমস আশার (১৫৮১-১৬৫৬) এভাবে হিসাব করে দেখিয়েছিলেন যে ঈশ্বর খ্রিস্টপূর্ব ৪০০৪ সালে, অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ছয় হাজার বৎসর আগে এই সৃষ্টিকর্ম সম্পন্ন করেছিলেন। পরবর্তী আরেক পন্ডিত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ লাইটফুট আরও সূক্ষ্ম হিসেব করে দেখিয়েছিলেন যে ওই বৎসর ২৩ শে অক্টোবর সকাল ন'টায় ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। লাইটফুটের এই সূক্ষ্ম হিসেব সম্বন্ধে বিশ্বাসী পণ্ডিতপ্রবরদের মধ্যে কিঞ্চিৎ মতপার্থক্য থাকলেও জেমস আশারের হিসেব পরবর্তী দুশো বছর ধরে বিশ্বাসীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত ছিলো, এবং বর্তমানকালেও মৌলবাদী ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য। 

  হিন্দু ধর্মে মানুষের উৎপত্তি সম্বন্ধে কিছু পরস্পরবিরোধী উক্তি আছে। ঋকবেদের পুরুষসূক্তে বলা হয়েছে যে আদি পুরুষকে সৃষ্টির প্রথম যজ্ঞে খন্ড খন্ড করে কেটে ফেলা হলে তার মুখ ব্রাহ্মণ, বাহুদ্বয় ক্ষত্রিয়, উরূদেশ বৈশ্য এবং পা দুটি শূদ্রে পরিণত হলো। কিন্তু অনেকেই এই পুরুষসূক্তকে পরবর্তী কালের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রক্ষিপ্ত সংযোজন বলে মনে করেন। ভগবতগীতায় শ্রীভগবান বলেছেন মহদব্রহ্ম বা প্রকৃতিরুপি যোনিতে তিনি গর্ভাধান করেছেন, এবং তার ফলেই সমস্ত জীবজগৎ সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে কয়েকটি পুরাণে বলা হয়েছে যে চুরাশি লক্ষ হীনতর জন্মের পরেই মনুষ্যজন্ম সম্ভব হয়েছে। আর মীন অবতার, কূর্ম অবতার, বরাহ অবতার, নৃসিংহ অবতার, বামন অবতার প্রভৃতি পৌরাণিক অবতারের কল্পকাহিনী থেকে অনেকে অনুমান করেছেন যে এই অবতার কাহিনীগুলোর মধ্যে আধুনিক বিবর্তনবাদের দূরদৃষ্টি প্রচ্ছন্ন ছিল।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া