মিষ্টি কুইনাইন /প্রীতম সেনগুপ্ত

মিষ্টি কুইনাইন 

প্রীতম সেনগুপ্ত 

        ফোটোগ্রাফি- সৈয়দ স্নেহাংশু
                                                    
সিঙ্কোনা গাছের পাতায় হাত দিয়ে সংগ্রাম বলল, 'ইয়ে হ্যায় ও সিঙ্কোনা পউদে।' এক নতুন বিস্ময় আমাদের কাছে। অপর্ণা, সুমিতাভ ও আমি এই প্রথম সিঙ্কোনা গাছ দেখলাম। স্কুল জীবনে ভূগোল বইয়ে সিঙ্কোনার কথা পড়েছি। মংপু সিঙ্কোনা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। যে সিঙ্কোনা থেকে প্রস্তুত হয় ম্যালেরিয়ারোধী কুইনাইন। কিন্তু আমরা যেখানে সিঙ্কোনা গাছ দর্শন করছি, সেটা মংপু নয়। এটি ডুয়ার্সের এক প্রত্যন্ত অঞ্চল,দলগাঁও। ছবির মতো সুন্দর একটি পাহাড়ি গ্রাম। সংগ্রাম তাঁর কথা বলে চলেছে--' দলগাঁও এক সবসে পুরানা জায়গা হ্যায়, ব্রিটিশ টাইম মে,আ্যরাউন্ড এইট্টিন্থ সেঞ্চুরি মে হিয়া পর সিঙ্কোনা কা খেতি হো রাহা হ্যায়। সবসে পহলে মংপুমে ইয়ে কালটিভেশন শুরু কিয়া। বাদমে যাকে এইট্টিন থার্টি এইট মে ইহা পর, দলগাঁও মে শুরু কিয়া। তো ইহা কা সবসে স্পেশালিটি ইয়ে হ্যায় কি ব্রিটিশ টাইম সে ইহা সিঙ্কোনা কা খেতি চল রহা হ্যায়। অউর মতলব সেকেন্ড ওয়র্ল্ড ওয়ার কে টাইম মে ভি যো সোলজার কো যো ম্যালেরিয়া হুয়া থা তো উস টাইম এহিসে, আপকা সিঙ্কোনা কা ইয়ে যো দাবাই, হিয়া সে হি সাপ্লাই হুয়া থা। সিঙ্কোনা সে যো কুইনাইন নিকালতা হ্যায় তো উসকো বার্ক সে হি নিকালতা হ্যায়, ব্রিটিশ টাইম সে হি ইয়ে ট্রাডিশনাল ওয়ে মে, য্যায়সে কোই মেশিন ইউজ নেহি করতে, উসকো বার্ক নিকালকে উসকো ড্রাই করকে স্টোর করতা হ্যায়।' আমরা ওর কথা শুনতে শুনতে এগিয়ে চলেছি ভিউ পয়েন্টের দিকে। দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট।

     দলগাঁও এলাকাটি আদতে গৈরিবাস নামেই পরিচিত। এই গ্রামের মধ্য দিয়ে আপন ছন্দে বয়ে চলেছে গৈরিবাস নদী। পাহাড়ি নদী যেমন হয়, বড় বড় পাথরের বাধা টপকে বইছে তিরতির করে। এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি ঝলং, বিন্দু, সামসিং,পারেন,সুলতানেখোলা-- ধরার মাঝে একেক টুকরো স্বর্গ যেন। দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট এক পাগল করা জায়গা। এখান থেকে দেখা যায় একের পর এক সবুজে ঢাকা পাহাড়। দৃশ্যমান হয় ভুটান পাহাড়। ভুটান থেকে বয়ে এসেছে দে ছু নদী। বিন্দুতে এসে যা প্রবেশ করেছে ভারতে, নাম নিয়েছে জলঢাকা। এই গ্রামের মানুষ কৃষিজীবী। সিঙ্কোনা তো বটেই, তার সঙ্গে ইপিকাক ইত্যাদি নানাবিধ ভেষজ উদ্ভিদের চাষ হয়। এখন কফি চাষও হয়ে থাকে। আমরা অর্থাৎ আমি, আমার স্ত্রী অপর্ণা, পুত্র বিট্টু ও শ্যালক সুমিতাভ এসে উঠেছি সংগ্রামের হোম স্টে-তে। ভিউ পয়েন্ট যাওয়ার পথে দুধারে সবুজে সবুজ। নানা ধরণের উদ্ভিদের সমাহার। প্রকৃতি এখানে অকৃপণ। গোটা ডুয়ার্স জুড়েই তাই। দলগাঁওয়ের এই অংশটি ন্যাওড়া ভ্যালি সংলগ্ন। জঙ্গল কেটে তৈরি হয়েছে রাস্তা। একেবারে ভিউ পয়েন্টের গা ঘেঁষে ট্যুরিস্টদের থাকার জায়গা, নতুন ভিউ পয়েন্ট তৈরি হয়েছে। তবে সেসব জায়গা দেখলাম শুনশান, কোনও লোকজন নেই। সব ঠিকঠাক তৈরি হয়ে থাকার মতো হয়ে ওঠেনি বোধহয়। ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখা যায় সরু ফিতের মতো জলঢাকা। ভুটান পাহাড়। খেলনার মতো বাড়িঘর, গাড়ি চলাচল খুব অস্পষ্ট চোখে পড়ে। প্রকৃতি কত লীলাময়! স্তব্ধ বিস্ময় পরতে পরতে অপেক্ষা করে থাকে। যেদিন এখানে এসে পৌঁছলাম সেদিন থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। দুটো রুম নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি। একটিতে রয়েছি আমি আর সুমিতাভ, বিট্টু আর অপর্ণা আরেকটায়। এসে পৌঁছনোর আধঘন্টার মধ্যেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। এই হোম স্টে-তে অনেকটা জায়গা। যত্নে লালিত বাগান রয়েছে, একটি বেশ বড় দোলনা সেখানে। বিট্টু বেশ মজা পেয়ে যায়। বৃষ্টি জোরে পড়তে শুরু করলে পোষা মুরগি, বাচ্চাসমেত বারান্দায় রাখা প্লাস্টিকের টেবিলের নীচে এসে আশ্রয় নিল। বিট্টু স্বভাবতই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ির শিশুরা এসবে অনভ্যস্ত। বদ্ধ কারাগারের জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির আনন্দে এই উত্তেজনা। রুমের বড় জানালা খুলে দিলাম। সেখান থেকেও পাহাড়ের একাংশ চোখে পড়ে। জানালার ধারে একটি ঢালু জমি জঙ্গলাকীর্ণ,বেশিরভাগই লতানে গাছপালা। স্কোয়াশ গাছ চোখে পড়ল, স্কোয়াশ ফলে আছে। বাকি সবই অজানা, অচেনা। সবুজের ঘ্রাণ বুক ভরে নেওয়া যায়। 
                                           
   ২
   চব্বিশ পঁচিশ বছরের ছোকরা কুনাল। কুনাল সিং। দলগাঁওয়েরই ছেলে। সংগ্রামের বাড়ি থেকে কিছুটা আগেই ওর বাড়ি। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে কুনালই গাড়ি করে নিয়ে এল আমাদের। এমনই ব্যবস্থা ছিল। তবে নিউ মাল জংশন থেকেই দলগাঁও নিকটতর। জলপাইগুড়ি থেকে আড়াই তিন ঘন্টার পথ। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ঢোকার সময় থেকেই  হাতছানি দিয়ে ডাকে ডুয়ার্স পাহাড়। তিস্তা ব্রিজ পার হয়ে পাহাড়ের গায়ে সেবক কালীবাড়িতে একটু দাঁড়ায় কুনাল। জবাফুলের মালা কেনে। গাড়িতে মালা জড়িয়ে দেয় মা কালীর ফটোয়। এখানে ট্রাফিক জ্যাম, গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ছে মাঝে মাঝে। পাশে নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সুন্দরী তিস্তা। গাড়িতে অল্প ভলিউমে বেজে যাচ্ছে গান-- সাথিয়াঁ...। একটু একটু করে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে , আবার থামছে। রাস্তার ধারের কালভার্টগুলো পেরিয়ে চোখ চলে যাচ্ছে তিস্তার দিকে। শৈবাল সবুজ বর্ণের। একদিকে পাহাড়ের ঢাল অন্যদিকে তিস্তা। দুপাশেই অরণ্যানী, পাহাড়। চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ের ঢাল দিয়ে ধস নামলে ভোগান্তির একশেষ। শয়ে শয়ে গাড়ি সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে নট নড়নচড়ন অবস্থা হয়ে যায়। এই রাস্তায় ট্রাফিক বেশি। সিকিম, নেপাল যাওয়ার গাড়িগুলোও এখান দিয়ে যায়। ক্রমে ছুটে চলল গাড়ি। সবুজে মোড়া ডুয়ার্স, সুন্দরী ডুয়ার্স যেন ক্রমশই অবগুণ্ঠন উন্মোচিত করছে,মোহিত করে চলেছে। কুনাল স্পিড বাড়িয়েছে, চাপড়ামাড়ি জঙ্গলের পাশ দিয়ে চলেছি। সেই বিখ্যাত লেভেল ক্রসিংয়ে এসে দাঁড়াল। ট্রেন যাবে। ঐরাবত অধ্যুষিত এলাকা। ট্রেন লাইনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। এর জন্য সাইনবোর্ডে লেখাই আছে, আ্যলার্ট, আ্যনিমাল ক্রসিং। তা সত্ত্বেও অনেকসময় ট্রেনের ধাক্কা খায় না তা নয়। কাঞ্চনকন্যা চলে গেল। দূরে লাইনের পাশে দুটো ময়ূর চোখে পড়ে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলাম। লেভেল ক্রসিংয়ের গেট উঠে যায়, গাড়িতে উঠে পড়া গেল চটপট। আবার যাত্রা শুরু হয়। 

     সংগ্রামের হোম স্টের কাছাকাছি চলে এসেছি। কুনাল দেখাল ওর বাড়ি। 'ইয়ে মেরা ঘর হ্যায়।' পাহাড়ের গায়ে বাড়ি। তার একটু আগে ওর বাবার সঙ্গে দেখা হল রাস্তায়। এখানে সিঙ্কোনা চাষের ব্যবস্থা  সরকার পরিচালিত। ফলে এই কালটিভেশনে যুক্ত যারা তারা সরকারি কর্মচারী। কুনালের বাবা -মা দুজনেই তাই। আরেকটু উপরে উঠে সংগ্রামের হোমস্টে। মালপত্তর নামানো হল। কুনালই যাবে আমাদের সঙ্গে সাইট সিয়িংয়ে। তবে আপাতত বিশ্রাম। দুপুরের খাওয়া সেরে একটা ঘুম। বাকি সব পরে ভাবা যাবে। 

     ৩
   বিন্দুতে পৌঁছে কুনাল গাড়ি থেকে নামার আগে পইপই করে বলে দিল জলে নেমে ছবি না তুলতে। কিছুদিন আগেই নাকি একটি ছেলে জলঢাকার স্রোতে ভেসে গিয়েছে ! ভুটানে প্রবাহিত দে ছু নদী ভারতের এখানেই জলঢাকা নাম নিয়ে প্রবেশ করেছে। একদিকে ভুটান, অন্যদিকে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ। আগে এখানকার ব্রিজটা পেরিয়ে ভুটানে সহজে যাওয়া যেত। এখন কড়াকড়ি হয়েছে। জলঢাকা এখানে তীব্র স্রোতে বয়ে চলেছে । ভুটান সীমান্তে ভারতের দিক থেকে সর্বশেষ গ্রামটি হল বিন্দু। জলঢাকা নদী ও পরিপার্শ্বের নিসর্গ অতুলনীয়। বিন্দুতে তিনটি নদী এসে মিশেছে এবং শেষমেশ সেটিই জলঢাকা নাম নিয়ে বইছে। তিনটি নদী বিন্দুখোলা, দুধ পোখরি এবং জলঢাকা--যা সিকিমে একটি ছোট গ্লেসিয়াল লেক কুপুপ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। জলঢাকা নদীর উপর রয়েছে ড্যাম, বিন্দু ড্যাম। আমরা একেবারে সেই ড্যামের সামনে দাঁড়িয়ে। ঝলংয়ে অবস্থিত জলঢাকা বিদ্যুৎ প্রকল্পে জল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে ড্যাম। ভুটানে যেতে এই ড্যামের সেতু পার হয়ে যেতে হয়। আগে পায়ে হেঁটে যাওয়া যেত, এখন স্টিল ব্রিজ হয়েছে। সেটা দিয়ে হালকা ওজনের গাড়ি পারাপার করতে পারে। বিন্দু থেকে বেরিয়ে ঝলংয়ে বিদ্যুৎ প্রকল্পটি দেখিয়ে দিল কুনাল। প্রবল, আসুরিক জলশক্তিকে পোষ মানিয়ে কীভাবে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয় তা দেখার মতো। বিন্দুতে পাহাড়ের তলদেশে গুটিকয় দোকান আছে, সেগুলোর একটাতে বসে মোমো খাওয়া গেল। যেহেতু পাশেই ভুটান সীমান্ত তাই এই অঞ্চলে ভুটানি মদ পাওয়া যায়। ওই দোকান থেকেই কিনে নেওয়া হল, অচেনা মদ্যের স্বাদ কেমন সেই আগ্রহে। অপর্ণার বারণ সত্ত্বেও সুমিতাভ ও আমার সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে এল। এদিকে টাকা তুলতে হবে এ টি এম থেকে। কুনাল জানাল ঝলংয়ে এ টি এম  আছে সাকুল্যে দুটো। ওখান থেকে টাকা তুলতে হবে। সুতরাং সেইদিকেই গাড়ি চলে। পথে নামে বৃষ্টি। বৃষ্টিস্নাত উন্মুক্ত প্রকৃতির ডুয়ার্স রহস্যময়তায় ঘেরা। ছোট্ট গ্রাম  পারেনের ভিতর দিয়ে চলেছি । মনে হয় নেমে যাই গাড়ি থেকে, এই পাহাড়ি গ্রামে ছোট্ট কুটির বানিয়ে চিরকালের জন্য বাস করি। কিন্তু সে হওয়ার নয়,কতশত বাস্তবের বোঝা...! ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না। কোনও এ টি এম- য়েই ক্যাশ নেই। এখানকার মানুষ এই সমস্যায় অহরহ পড়ে। সেদিন আর টাকা তোলার গল্পে গেলাম না। পরের দিন 'টাকাসমেত' এ টি এম পাওয়া গেল, অনেকটা পথ পেরিয়ে মালবাজারে! সংগ্রামের হোম স্টে-তে চায়ের স্বাদ অপূর্ব! সংগ্রামের স্ত্রী বলে দেয় কোথায় পাওয়া যায় এই চা। সেটি হল মালবাজারের একটি পেট্রোল পাম্পে। কুনাল চেনে। সেখান থেকে চা কেনা হয়। তবে পাহাড়ে ঝর্ণার জলে এই চায়ের স্বাদ আর কলকাতার জলে স্বাদের আকাশ পাতাল প্রভেদ। কলকাতায় ফিরে সেটা মালুম হয়। 

   সংগ্রাম খুব ধীর স্থির গোছানো ছেলে। বিনয়ী, ভদ্র। স্বামী-স্ত্রী দুজনে অক্লান্ত পরিশ্রমে হোম স্টে-টি দাঁড় করিয়েছে। সরকার পরিচালিত কোর্স করেছে দুজনেই, হসপিটালিটির উপর। ডাইনিং স্পেসে সেসবের সার্টিফিকেট ল্যামিনেট করে টাঙিয়ে রেখেছে। খুব যে পর্যটকের ভিড় হয় এখানে তা নয়। ডোকলাম সীমান্ত কাছেই ,তাই মাঝেমধ্যেই সেনা শিবির হয় ভিউ পয়েন্ট এলাকাতে। সেনা ক্যাপ্টেনরা পরিবার নিয়ে এলে এখানেই  ওঠে। সংগ্রামের হোম স্টে-তে। আমরা থাকতে থাকতেই সেনা ছাউনি গাড়তে দেখলাম। চিনকে সামলাতে সীমান্তে প্রায়ই এই নজরদারি চালাতে হয় ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগকে। পর্যটনের ভাষায় দলগাঁও নিশ্চিতভাবে ভার্জিন প্লেস। যতদিন এমন ভার্জিন থাকে ততদিনই ভালো ! পবিত্র, নির্জন, সুন্দর এমন স্থানটি এমনই থাকুক। স্বার্থপরের মতো বলতে হয়, নাই বা এল ট্যুরিস্টরা! 

                                                           
 ঝুলন্ত ব্রিজ টপকাতে বেশ মজা  পেল বিট্টু। চারিদিকে গভীর জঙ্গল। পাহাড়। তির তির করে বইছে পাহাড়ি নদী--খোলা, সুলতানেখোলা। সরকারি লজ আছে এখানে। ডানপিটে জঙ্গল এবং লোকালয়বিহীন জায়গা। দিনের বেলাতেই থমথমে,  রাত কাটাতে বুকের পাটা লাগে। এখানে পাথরে বসে ছবি তোলার ধুম লেগে যায়। অবশ্য এর চেয়েও বেশি রকি আইল্যাণ্ডে। মূর্তি নদীতে। একে একে সামসিং, মূর্তি, আ্যপেলস রক দেখা আর গাড়ি থামিয়ে অপূর্ব সব নিসর্গের মুখোমুখি দাঁড়ানো, এই সবই অদ্ভুত তৎপরতায় সম্পন্ন হল কুনালের দৌলতে। কুনাল অবশ্য এখানে বেশিদিন আর থাকবে না। ও দুবাই যেতে চায়, অল্প বয়স --প্রচুর অর্থ আয় করে বাড়ি ফিরবে। ওর দুচোখে এখন দুবাইয়ের স্বপ্ন। পাহাড়িদের সঙ্গীতপ্রীতি সহজাত। কুনাল ভালো গান গায়। ওদের একটা গানের দল আছে। সংগ্রামও আছে এই দলে। গাড়িতে নিজের গাওয়া গান চালিয়ে দিল কুনাল। অ্যালবাম বেরিয়েছে। বেশ লাগল। 

    বিট্টু দুর্গা পূজা মিস করছিল ভীষণ। আমরা বড়রা কলকাতার ভিড়ভাট্টা এড়াতে এখানে সেখানে চলে যাই,ছোটরা দুর্গাপুজোর মতো আনন্দে ভেসে যাওয়ার সুযোগ হারায়। কি আশ্চর্য! 

   সংগ্রামের বাড়ির পাশে মূর্তি আনিয়ে, প্যান্ডেল খাটিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছে। প্রতি বছরই হয়। গোটাটাই মহিলা পরিচালিত। পাহাড়ি মেয়েরা স্বাধীনচেতা। এখানে সাধারণ মানুষের জীবনের মান উন্নত। ছোট ছেলেমেয়েরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। স্কুলে পড়াশোনা করে সবাই। পোশাক আশাক হাল ফ্যাশনের। এইসব কচিকাচারা এসে চাঁদাও তুলে নিয়ে গেল। বিল হল বিট্টুর নামে। ওর ভালো নাম  শিবায়ন। ওরা বেশ টেনে টেনে  উচ্চারণ করে, শি... বা... য়... ন। পুজো মণ্ডপে বাচ্চাকাচ্চাদের সঙ্গে মিশে গেল বিট্টু। পাহাড়ের এই পুজোর আচার ভিন্ন। মূর্তিও। বহু জায়গায় মোষ বলি হয়। নবমীর দিন দুপুরের খাওয়া সেরে বিদায় নেওয়ার পালা। পাহাড়ি রীতিতে সংগ্রাম দম্পতি আমাদের বিদায় দিল। রীতি নীতি, আচার আচরণে এই দম্পতি নিখুঁত,আন্তরিক। সুমিতাভ এখানকার লোকজনদের সঙ্গে বেশ ভাব জমিয়ে নিয়েছিল। মিশুকে ছেলে। বকবক করতে ভালোবাসে। আমরা যখন কুনালের গাড়িতে উঠে বসেছি, গাড়ি  আস্তে আস্তে এগোচ্ছে, মণ্ডপের লোকজন এসে দাঁড়িয়ে গেল। হঠাৎই সিক্স সেভেনে পড়া একটি ছেলে ছুটে এসে ডেকে উঠল শি... বা... য়... ন-- ওর হাতে ডেয়ারি মিল্ক চকোলেট। বিট্টুর জন্য। গাড়ির জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে পরম মমতায় ধরিয়ে দিল বিট্টুর হাতে। গাড়ির স্পিড বেড়েছে। ঝির ঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বিদায় জানাতে দাঁড়িয়ে থাকা বড় মানুষগুলিকে দেখে মনে হল সেই কবে থেকে তারা এমন করেই দাঁড়িয়ে আছে,ওই অনাদি অনন্ত কালের সিঙ্কোনা বৃক্ষগুলির মতো।
 
  কচিকাচাগুলো ওদেরই দেহমনজাত- -মিষ্টি, ভারী মিষ্টি-- মিষ্টি কুইনাইন !

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া