আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৫৪/ শ্যামল জানা

আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৫৪

শ্যামল জানা

সাররিয়েলিজম্-এর উল্লেখযোগ্য চিত্র-প্রদর্শনীগুলি


দশক হিসেবে ধরলে, তিরিশের দশক থেকেই ঠিকমতো সাররিয়েলিজম্-এর শীর্ষে অবস্থানের সময়৷ স্বাভাবিকভাবেই এই সময় থেকেই শুরু হল তাদের গুরুত্বপূর্ণ চিত্র-প্রদর্শনীগুলি৷ তবে, বিশের দশকের মাঝামাছি সময় থেকে কয়েকটি প্রদর্শনী সাররিয়েলিস্টরা করেছিলেন, যেগুলি তত গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সূত্রপাত হিসেবে উল্লেখযোগ্য৷ এখানে বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, সাররিয়েলিস্ট শিল্পীরা দলগত প্রদর্শনী বা গ্রুপ এগজিবিশন করার আগেই কিন্তু প্রথমে এককভাবে প্রদর্শনী করেছিলেন তিরিশের দশকের আগেই৷ সেই প্রদর্শনীর পর, তিরিশের দশকের আগেই, ১৯২৫ সালে প্রথম সাররিয়েলিস্ট গ্রুপ এগজিবিশন হয়েছিল প্যারিসের ‘পিয়েরে লোয়েবস্ গ্যালারি’তে৷ ওখানে, যাঁদের কাজ দেখানো হয়েছিল, তাঁরা হলেন— জর্জিও ডি চিরিকো, হান্স আর্প, ম্যাক্স এর্নস্ট, পল ক্লে, ম্যান রে, আন্দ্রে ম্যাসোঁ, হোয়ান মিরো, পাবলো পিকাসো এবং পিয়েরে রয়৷

১৯২৮ সালে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে, একটি প্রশ্নচিহ্নের (Does Surrealism really exist?)উত্তরে, সেই প্রশ্নকে সাথে নিয়েই সাররিয়েলিস্টদের একটি অভিনব দলগত প্রদর্শনী হল প্যারিসের আর্ট গ্যালারি, “Au Sacre du Printemps”-এ৷ অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন— ম্যাক্স এর্নস্ট, আন্দ্রে ম্যাসো, হোয়ান মিরো, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া এবং ইভেস ট্যাঙ্গে৷ এরপর ১৯৩১ সালে প্রথম আমেরিকার কোনেকটিকাট রাজ্যের রাজধানী শহর ‘হার্টফোর্ড’-এ অবস্থিত ‘ওয়াডস্ওয়ার্থস অ্যাথেনিয়াম’ আর্ট মিউজিয়াম-এ সাররিয়েলিস্ট এগজিবিশন হল৷

    এরপর তাঁরা পাঁচ বছর ধরে সব দিক থেকে নিজেদের প্রস্তুত করার পর ট্রায়াল গেমের মতন একটি দুঃসাহসিক ড্রাইভ দিলেন৷ তাঁরা প্রথম উদ্দেশ্যমূলক ও বিষয়ভিত্তিক সাররিয়েলিস্ট প্রদর্শনীর কথা ভাবলেন, এবং করেও ফেললেন! ১৯৩৬ সালে প্যারিসের চার্লস র‍্যাটো(Charles Ratton)গ্যালারিতে৷ "Exposition surréaliste d'objets"  শিরোনামে একটি প্রদর্শনী করলেন৷ যেখানে তাঁরা নির্দিষ্টভাবে একটি দর্শনকে বা লক্ষ্যবস্তুকে সবচেয়ে বেশি জোর দিলেন ছবি আঁকার প্রশ্নে(Valued object art)৷ অত্যন্ত সচেতনভাবে তাঁরা তাঁদের ছবিতে তৎকালীন সমাজের চরিত্র বোঝাতে গিয়ে, বা প্রতিবাদ অর্থে, বা বিশেষ কোনো দর্শনকে উপস্থাপন করতে গিয়ে, মূলত ব্যবহার করলেন— “প্রিমিটিভিজম্”, “সেক্সুয়াল ফেটিসেস” এবং “ম্যাথামেটিক্যাল মডেলস”৷ প্রিমিটিভিজম্ নিয়ে আমরা আগে, পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পী পল গগ্যাঁ-র ছবি প্রসঙ্গে পূর্ণ আলোচনা করেছি৷ আদিম যুগের মানুষেরা বেঁচে থাকার প্রশ্নে যে সব ঘটনা ঘটাতেন, সেই ঘটনাগুলিকে আধুনিক দর্শন ও মননের সাহায্যে অনুকরণ বা পুনর্মূল্যায়ন করা ক্যানভাসে৷ বা, স্বাভাবিকভাবে যা কামজ বিষয় নয়, যৌনসহবাস বা যোনি-সংক্রান্ত কোনো কিছু নয়, যা অনেকটা অযোনিজ, অথচ অপ্রাণী বা দেহের অন্য অংশের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করা, যা মানসিক ভারসাম্যহীনতা থেকে আসে, সেই সব বিষয়কে ক্যানভাসে উপস্থাপনা করা৷ বা অংকের গ্রেট মাস্টারদের সৃষ্টি করা যে সব ম্যাথামেটিক্যাল মডেল আছে, সেগুলিকে ক্যানভাসে পেন্টিং হিসেবে ব্যবহার করা(ছবি-১)৷

 এবং এই শক্ত হার্ডলটা সাররিয়েলিস্টরা পেরোতে সক্ষম হলেন৷ এতৎসত্ত্বেও বলতে হবে, এতদিন ধরে ঘটা এই প্রদর্শনীগুলিতে কোনো আন্তর্জাতিক তকমা ছিল না৷

তিরিশের দশকে(১৯৩০) আন্তর্জাতিক তকমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিত্র-প্রদর্শনী হিসেবে প্রথম সূত্রপাত ঘটল— “লন্ডন ইন্টারন্যাশনাল সাররিয়েলিস্ট এগজিবিশন” থেকে৷ ১৯৩৬ সালের ১১ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত লন্ডনের ‘নিউ বার্লিংটন গ্যালারিস’-এ লন্ডনেরই শিল্প-ইতিহাসবিদ হারবার্ট রিড-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই চিত্র-প্রদর্শনী৷ যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লিখেছিলেন আন্দ্রে ব্রেতোঁ৷

ওই, ১৯৩৬ সালেই, নিউ ইয়র্ক সিটির মিডটাউন মানহাটন-এ “মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট”(MoMA) একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী করেছিল৷ যেখানে ফ্যান্টাস্টিক আর্ট, দাদাইজম্ এবং সাররিয়েলিজম্— এই তিনটি বিষয়কে এক জায়গায় এনে এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল৷

এর ঠিক দুবছর পর সাররিয়েলিস্ট শিল্পীদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক বিশালায়তন প্রদর্শনীটি হল ১৯৩৮ সালে৷ Exposition Internationale du Surréalisme.৷ প্রদর্শনীতে যেগুলি প্রদর্শিত হবে, সেগুলি তো মানুষ দেখবেই৷ কিন্তু, তার বাইরে আমাদের এই প্রদর্শনীকে এমনভাবে সৃষ্টিশীলতা দিয়ে উপস্থাপন করা হবে, প্রদর্শনীটি নিজেই যেন স্বতন্ত্র একটি প্রদর্শনী হয়, যা পৃথিবীতে আগে ঘটেনি, এই ভাবনায় তাঁরা আলাদা করে পরিকল্পনা করলেন৷ অভিনবত্ব আনার ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিল্পীদের আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হল৷

প্রদর্শনীটি সামগ্রিকভাবে সংগঠিত করলেন সাররিয়েলিস্ট মহাগুরু আন্দ্রে ব্রেতোঁ৷ তাঁর সঙ্গে সহযোগী হিসেবে ছিলেন সেই সময়ের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কবি পল এলুয়ার৷ প্রদর্শনীটি চলেছিল এক মাসের ওপর— ১৯৩৮ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি৷ অংশগ্রহণ করেছিলেন ষাট জন সাররিয়েলিস্ট শিল্পী৷ যেখানে প্রদর্শিত হয়েছিল তিনশোরও বেশি পেন্টিংস, অবজেক্টস, কোলাজ, ফোটোগ্রাফস এবং ইনস্টলেশনস৷

অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্যারিসের সেই সময়ের সবচেয়ে নামকরা, আধুনিক ও সুসজ্জিত Galérie Beaux-Arts-এ, জর্জেস ওয়াইলডেনস্টেন-এর পরিচালনায়৷ যিনি ছিলেন সেই সময়ের শিল্প জগতের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী মানুষ৷ যিনি একাধারে ফরাসি আর্ট গ্যালিরর মালিক, আর্ট ডিলার, আর্ট কালেক্টর, আর্ট জার্নাল-এর এডিটর এবং আর্ট হিস্টোরিয়ান৷ মার্শেল দুশাম্প ছিলেন এক অদ্ভুত ভূমিকায়৷ প্রদর্শনীটি পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্দ্রে ব্রেতো ও পল এলুয়ারের মধ্যে যাতে কোনো মতবিরোধ না ঘটে, সেজন্য তাঁকে মধ্যস্থতাকারি বিচারক হিসেবে রাখ হয়েছিল৷ সালভাদোর দালি ও ম্যাক্স এর্নস্ট ছিলেন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইসর৷ ম্যান রে ছিলেন হেড লাইটিং টেকনিশিয়ান৷ উল্ফগ্যাং পালেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন প্রদর্শনীটির প্রবেশপথ ও মূল হলঘরটির ডেকরেশন-এর, তা এমন হবে, যেন আগে কখনো হয়নি, এই শর্তে৷ তিনি তা যথাযথ পালনও করেছিলেন৷ তিনি ও দুশাম্প মিলে প্রবেশপথটিকে একটি পরিপূর্ণ গুহার রূপ দিয়েছিলেন৷ এটা করতে গিয়ে তাঁরা ১২০০ কয়লার বস্তা সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন৷ আর, গা ছমছমে ব্যাপারটা আনার জন্য একটিমাত্র বাল্ব জ্বালানো হয়েছিল৷ মেঝের অংশটা ছিল একেবারে ভেজা ও কর্দমাক্ত৷ তার ভেতরে মাঝে মাঝে জলের ব্যবহার করে, ছোটো ছোটো ঝরনা ও গাছপালা(water and foliage)করে দেওয়া হয়েছিল! সে এক আশ্চর্য ও অভিনব একটা ব্যাপার হয়েছিল৷ মূল প্রবেশপথে ঢোকার মুখে সালভাদোর দালির একটি অদ্ভুত ইনস্টলেশন রাখা হয়েছিল৷ যার নাম ছিল “রেইনি ট্যাক্সি”(ছবি-২)৷


 আস্ত একটি পুরোনো কালো রঙের ট্যাক্সি৷ যার জানালা দিয়ে তাকালে, ভেতরে দেখা যাবে ইলশেগুঁডির মতো ঝিরঝিরে বৃষ্টি ক্রমাগত হয়ে যাচ্ছে৷ একটি হাঙরমাথা প্রমাণ মাপের পুতুল ড্রাইভারের সিটে বসে আছে৷ পিছনের অংশে সোনালি চুলের এক ম্যানিকুইন ওই ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে শামুকের চলার মতো করে অতি ধীরে চলাফেরা করছে(ছবি-৩)৷ গাড়ির ওপরে অভিবাদনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল স্তনওলা বিশাল নারী শরীরের একটি মূর্তি(ছবি-২)যার পরনে বৈকালিক পোশাক৷


প্রদর্শনীস্থানকে তিনভাগে উপস্থাপন করা হয়েছিল৷ যেখানে পেন্টিংস ও অবজেক্টগুলো প্রদর্শিত হবে, সেই ঘরের ডেকরেশন একরকম ছিল৷ যেখানে অন্যগুলি ছিল, তার ডেকরেশন ছিল আর এক রকম৷ যে রাস্তা বা লবি দিয়ে দর্শকেরা প্রদর্শনীকক্ষে যাবে, সেটি ছিল বেশ দীর্ঘ, সেই লবির একপাশে রাখা হয়েছিল অনেকগুলি ম্যানিকুইনস৷ তাদের গায়ে নতুন সব পোশাক পরানো হয়েছিল৷ সেই পোশাকগুলো বানিয়েছিল সাররিয়েলিস্ট আর্টিস্টরা৷ এক-একজনের পোশাক এক-একজন বানিয়েছিল৷ সেই পোশাকগুলোর নাম রাখা হয়েছিল “সাররিয়েলিস্ট ড্রেস”৷ এবং ওই দীর্ঘ লবিটির নামকরণ করা হয়েছিল “সাররিয়েলিস্ট স্ট্রিট”৷ সামগ্রিকভাবে যে উপস্থাপনাটা করা হয়েছিল, তা সারা পৃথিবীতে প্রদর্শনীর ইতিহাসে আগে কখনও হয়নি৷ এই অভিনবত্বকে এক কথায় তাঁরা বলেছিলেন— Holistic presentation.৷

এই প্রদর্শনীতে যাঁরা পৃষ্ঠপোশকতা করেছিলেন, তাঁদের শিল্পকর্মগুলি দেখতে যেন এতটুকু অসুবিধা না হয়, সেজন্য তাঁদের প্রত্যেককে আলাদা করে ফ্ল্যাশলাইট দেওয়া হয়েছিল৷ ওই বিশাল প্রদর্শনীকক্ষের মাঝখানে, যেখানে দর্শকদের সাধারণত যাওয়ার দরকার পড়ে না, সেখানে উল্ফগ্যাং পালেন ছোটো আকারের একটি হুবহু কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করেছিলেন৷ যেখানে জল মাটি ঘাস সবই ছিল৷ 

আর, গোটা প্রদর্শনীকক্ষের বাতাসে ধূপের মতন আলাদা করে পোড়া কফির গন্ধ ছাড়া হয়েছিল৷ যেন, সব সময় পোড়া কফির গন্ধে প্রদর্শনীকক্ষের বাতাস ম ম করে! এই প্রদর্শনীটা পরিকল্পনামাফিক ঠিকমতো সফল করতে পেরে সাররিয়েলিস্টরা যারপর নাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন৷ প্রত্যেকদিনই ভীড় উপচে পড়ত৷ আর, সবটা মিলিয়ে শিল্পের ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা অছে৷ তবে, একটাই বিষয় তাঁদের পক্ষে যায়নি৷ সেটি হল, সেই প্রদর্শনী যাঁরা দেখেছিলেন, সেই সব দর্শকদের একাংশ মনে করেছিলেন, এই ঢক্কানিনাদে তাঁরা সাবলীলভাবে শিল্পকর্মগুলিই দেখতে পাননি৷                                                  (ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া