কিছু স্মৃতিময়তা/দেবলীনা চক্রবর্তী

কিছু স্মৃতিময়তা

দেবলীনা চক্রবর্তী


ছোটবেলায় একধরনের স্টিকার পাওয়া যেতো যেগুলো জলে ভিজিয়ে কোন কাগজ বা গায়ের চামড়ার ওপর উল্টো করে চেপে ধরলেই ওপরের সাদা কাগজটি উঠে আসতো আর মূল ছবিটি ফুটে উঠতো অবিকল।ঠিক সেইরকমই আমার ছোটো মফস্বলে জন্ম ও বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে সেঁটে আছে দেদার ভালোলাগা, আনন্দ আর আবেশ যা অবিকল জলছবির মতো আজও আমার কাছে স্পষ্ট।

মনে পড়ে প্রতিটি পাড়া বা দুটো তিনটি শুরু গলির শেষ প্রান্তে কালো রংয়ের টিনের গুমটি দোকান যেখানে সামান্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যেত সহজেই আর সেই দোকানের অত জিনিসের মধ্যে আমার চোখ আটকে থাকতো ১০ পয়সা দামের পিপারমিন্ট লজেন্সের ওপর, কোন ক্রমে যদি হাতে পয়সা পেতাম এক ছুট্টে ওই লজেন্স কিনেই কেমন সব পেয়েছির দেশে আমিই যেন সব মনে হতো।

আবার মনে পড়ে বাড়ির উঠোন জুড়ে নানা ফুল ফল আর অনাদরে বেড়ে ওঠা আগাছার জঙ্গল তবু ওই বুনো গন্ধ মেখে আমি হেলায় কাটাতাম ভোরের আলতো বেলা বা ছাই গাদায় লুটোপুটি ভর দুপুর, আজও আমি হাতড়ে বেড়াই সেই বুনো গন্ধ কোন না কোন প্রান্তিক জনপথে।

এরপর বলি আমার সেই অদ্ভুত অনুভব শক্তি বা ভাবাবেগের কথা।আমি কি ভাবে যেন বাবার পায়ের শব্দ শুনে ফেলতাম বহু দূর থেকে, না পায়ের শব্দ বলা ভুল হবে বুটের শব্দ.. ঠিক চিনে ফেলতাম এমনকি গভীর ঘুমের মধ্যেও নাকি মাকে ডেকে তুলতাম " বাবা আসছে দরজা খোলো "।

আসলে বাবা রেলওয়েতে রানিং স্টাফ (পাইলট ছিলেন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন তাই রাত বিরেতে  তাকে ফিরতে হতো ডিউটি সেরে। আমাদের বাড়ির সামনে বেশ কিছুটা উঠোন তারপর ছিলো খিড়কি দরজা কাঠের খিল আঁটা থাকতো আর বিশেষ কৌশলে সেটি খোলা যেত বাইরে থেকে একটি লোহার বেকানো শিখ দিয়ে এই বেবস্থা বাবার জন্যই ছিল একমাত্র বাবার ফেরার কথা মাথায় রেখে, আর আমি ওইটুকু ছোট্ট মেয়ে কীকরে বুঝে যেতাম খিড়কি দরজা খোলার আগেই মাকে বলা শুরু করতাম ঘরের দরজা খোলো বাবা আসছে !

এই জন্য কতদিন মা আর বাবার কাছে কতো বকুনি খেয়েছি কিন্তু আমি তো ভোলার পাত্রী নয় আমি অনেক সময় নিজেই ঘরের দরজা হাট করে খুলে বাইরে চলে আসতাম এক উন্মাদনায় বাবাকে হয়ত দেড় দিন বা দুদিন পর দেখবো বলে বা এই কদিনের কত মনের প্রাণের কথা জমা আছে যা বাবার কোলে বসে পরম নির্ভরতায় - নিশ্চিন্তে উগড়ে দেবো বলে।

আর এর মাঝে যেদিন বাবার রেস্ট ডে থাকতো বাবা আমাদের দুই বোনকে নিয়ে সাইকেলে চড়ে ঘুরতে নিয়ে যেতো আবার আমরা রিক্সা চড়েও বেড়াতে যেতাম মায়ের কোলে আমি আর বাবার কোলে দিদি বসে মনের পসরা সাজিয়ে লুটে নিতাম দুরন্ত সুখী পরিবার বেলা।

আজ সেই নাফ্যথলিনের ফ্রেগারেন্স জড়ানো স্মৃতিগুলোর নিপাট ভাঁজ খুলে ওলটপালট করে দেখলাম এক ঝলক।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি