আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৫৫/ শ্যামল জানা




আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৫৫

শ্যামল জানা

সাররিয়েলিজম্-এর উল্লেখযোগ্য চিত্র-প্রদর্শনীগুলি

    ১৯৩৮ সালে প্যারিসে ওই অভিনব চিত্র-প্রদর্শনীটি সফল হওয়ার পর, তার পরের দশক অর্থাৎ চল্লিশের দশকে এসেও সাররিয়েলিস্টরা এই অভিনবত্ব বজায় রাখলেন৷ প্যারিস-এর এই প্রদর্শনীটির পরেরটাই হল আমেরিকার নিউ ইয়র্ক-এ ১৯৪২ সালে৷ নাম— “ফার্স্ট পেপারর্স অফ সাররিয়েলিজম্”৷ এ বারেও প্রদর্শনীটির সামগ্রিক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আন্দ্রে ব্রেতোঁ ও প্রযুক্তিগত দায়িত্ব দেওয়া হল মার্শেল দুশাম্পকে৷ অবশ্যই অভিনব কিছু করার জন্য৷ সালটা দেখে নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ(১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ – ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫)একেবারে মধ্যগগনে৷ ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার ভেতরে দিন কাটাচ্ছে মানুষ৷ ওই অবস্থায় এ রকম বিশাল, অভিনব, এবং অত্যন্ত সফল প্রদর্শনী করা প্রায় অসম্ভব বলা যায়৷ সাররিয়েলিস্টরা এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন শুধুমাত্র যোগ্যতা দিয়ে, অভিনবত্ব দিয়ে৷ এত বড় বিশাল মাপের প্রদর্শনী এর আগে আমেরিকাতে হয়নি৷

ম্যানহাটন-এর ৪৫১, ম্যাডিসন অ্যাভিনিউর “হোয়াইট-ল রেইড ম্যানসন” নামের বিখ্যাত বাড়িটির তৃতীয় তলে এই প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ চলেছিল ১৪ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর, ১৯৪২ সাল৷ আর, এই যে প্রদর্শনীটির নাম— “ফার্স্ট পেপারর্স অফ সাররিয়েলিজম্”— এ রকম অদ্ভুত হল কেন? এর পিছনেও একটি করুণ ইতিহাস আছে৷ এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ সাররিয়েলিস্টরা, বিশেষ করে যাঁরা মূল চালিকাশক্তি, যেমন আন্দ্রে ব্রেতো, মার্শেল দুশাম্প, ম্যাক্স এর্নস্ট প্রমুখরা কেউই আমেরিকার নাগরিক ছিলেন না৷ এঁরা ছিলেন ইয়োরোপের বাসিন্দ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এঁরা এত বেশি ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন, যে, তাঁরা ইয়োরোপ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন৷ এই প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করেই তাঁরা ইয়োরোপ ছেড়েছিলেন৷ ফলে, তাঁদের প্রথম কাজ ছিল আমেরিকায় স্থায়ী নাগরিকত্বের জন্য প্রশাসনের কাছে দরখাস্ত(Immigrant's application) করা৷ এর জন্য তাঁদের যে প্রয়োজনীয় নথী(Papers) জমা দিতে হয়েছিল, ওটাই ছিল প্রদর্শনীর প্রথম(First) কাজ৷ এই সূত্র থেকেই নাম হল— First Papers of Surrealism.৷

এই প্রদর্শনীতে যে সব সাররিয়েলিস্টদের ছবি, ভাস্কর্য বা ইনস্টলেশন ছিল, তাঁদের সঙ্গে ব্রেতোঁ চুক্তি করে নিয়েছিলেন যে, এই প্রদর্শনীতে যে লাভ হবে, তার পুরোটা দিয়ে দেওয়া হবে coordination council of French emergency aid societies-কে৷ যদিও এই চুক্তির আওতা থেকে সালভাদোর দালিকে বাদ রাখা হয়েছিল৷ যে কোম্পানী এই প্রদর্শনীকে স্পনসর করেছিল, তার অফিসিয়াল ছিলেন এলসা শ্চিয়্যাপারেল্লি৷ তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন— তোমরা যতই অভিনব ভাবনা ভাবো না কেন, আমাদের পক্ষে বেশি খরচ করা সম্ভব নয়৷ ফলে, এটা মাথায় রেখে মার্শেল দুশাম্প সম্পূর্ণ অন্যভাবে ভাবনা চিন্তা করলেন৷ তিনি দড়ি কারখানার একজনকে পাকড়াও করলেন৷ তাঁর সাহায্যে তিনি বেশ সস্তায় মোটা ধরনের একটি দড়ির বাণ্ডিল কিনলেন৷ যাতে দড়ি ছিল ১৬ মাইল বা ২৫.৭৫ কিলোমিটার বা ২৫,৭৫০ মিটার৷ কারণ তিনি ঠিক করেছিলেন প্রদর্শনীকক্ষটি যেন পরিত্যক্ত, এরকম বোঝাতে দড়ি দিয়ে তিনি মাকড়সার জাল তৈরি করবেন৷ এটি করতে তিনি একটি অভিনব পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন৷ প্রথমে তিনি বাণ্ডিল থেকে দড়ি বার করে, ২.৫০০ মিটার করে টুকরো করে করে তারপর আবার তাদের বেঁধে বেঁধে মাকড়শার জালগুলি তৈরি করেছিলেন৷ যাতে মাকড়সার জালের বাহুগুলি প্রত্যেকটির মাপ ও একটির সঙ্গে আর একটির দূরত্ব সমান হয়৷ এই কাজে দুশাম্প-এর সঙ্গে হাত লাগিয়েছিলেন স্বয়ং ব্রেতোঁ, তাঁর স্ত্রী জ্যাকুইলিন, ম্যাক্স এর্নস্ট, আলেকজান্ডার ক্যালদের ও ডেভিড হেয়ার৷ দুশাম্প ওই দড়ি দিয়ে প্রচুর মাকড়সার জাল তৈরি করে পুরো প্রদর্শনীকক্ষটিকে মুড়ে দিয়েছিলেন৷ শুধু তাইই নয় ওই জাল প্রদর্শনীকক্ষের ভেতরেও চলে গেছিল৷ ওইভাবেই দড়িতে ঝুলেছিল প্রদর্শিত ছবিগুলি৷ ওই দড়ির মাকড়সার জাল দিয়ে এমনভাবে প্রদর্শনীকক্ষটি ঘেরা ছিল, যে যাঁরা প্রদর্শনীটি দেখতে আসবেন, তাঁরা প্রথম দৃষ্টিতে মাকড়সার জাল ছাড়া প্রায় কিছুই দেখতে পাবে না৷ মাকড়সার জাল ভেদ করে ভেতরে কী আছে? কী আসবাব, কী ছবি? কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারবে না (ছবি-১,২)৷





মানুষকে একেবারে হতচকিত করে দিয়ে প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়েছিল৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাঁরা সুন্দর বৈকালিক পোশাক পরে এসে দেখেন যে দড়ির মাকড়সার জাল দিয়ে প্রদর্শনীকক্ষটি সম্পূর্ণ ঘেরা৷ ওই বাউন্ডারি লাইন ধরে ক্যারল নামের একটি এগারো বছরের ছেলে দড়ি দিয়ে স্কিপিং করতে করতে ঘুরছে আর ঘুরতে ঘুরতে ঘোষণা করছে— শিল্পী মার্শেল দুশাম্প আমাদের এখানে খেলা করতে বলেছেন৷ আর, সত্যি সত্যি এক ডজন ছেলেমেয়ে খেলার পোশাক পরে ফুটবল হ্যান্ডবল খেলতে শুরু করে দিয়েছিল৷ আর, তারা তখন জানিয়েছিল— আর্ট ডিলার সিডনি জেইনস্-এর সঙ্গে তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে৷ যতক্ষণ না তিনি আসছেন তারা খেলা চালিয়ে যাবে৷ আবার, যেহেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন মার্শেল দুশাম্পই, তাই, আসল বিষয়টি ঠিক কী, তা জানার জন্যে যখন সবাই তাঁর খোঁজ করছেন, যথারীতি তিনি তাঁর নিজস্ব ধারা অনুযায়ী উপস্থিত ছিলেন না৷ সে একেবারে ভয়ঙ্কর ঘাবড়ে দেওয়া বিস্ময়কর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল৷










এই বিশালাকার প্রদর্শনীতে পেন্টিং, স্কাল্পচার, ইনস্টলেশন, পুতুল, নানা ধরনের প্রতিমা, দেশীয় মানুষদের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা নানা রকমের মুখোশ ইত্যাদি মিলিয়ে ১০৫টা প্রদর্শিত বস্তু ছিল৷ আর অংশহগ্রণ করেছিলেন তৎকালীন বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা— হান্স আর্প, লেওনোরা ক্যারিংটন, যোশেপ কর্নেল, ইস্তেবান ফ্রান্সিস, দাভিদ হেয়ার, রবার্ট মাদারওয়েল, হোয়ান মিরো, পাবলো পিকাসো, বারবারা রেইস, কে সাগা, কার্ট সেলিংমান এবং লরেন্স ভেইল৷ এ ছাড়াও বেশ কিছু কালজয়ী বিশ্ববিখ্যত পেন্টিং এই প্রদর্শনীতে ছিল৷ যেমন— উইলিয়াম বাজিওতেস-এর The Butterflies of Leonardo da Vinci (ছবি-৩), ম্যাক্স এর্নস্ট-এর Surrealism and painting(ছবি-৪)  আর affolée La Planète, গর্ডন অনস্লো ফোর্ড-এর First Five Horizons(ছবি-৫), আন্দ্রে ম্যাশো-র There Is No Finished World(ছবি-৬)  আর  Meditation on an Oakleaf, রোবের্তো মাট্টা-র The Earth Is a Man(ছবি-৭).৷ সেই সময়ের অ্যাকশন পেন্টিংখ্যাত জ্যাকশন পোলককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ওই প্রদর্শনীতে অংশ নেবার জন্য৷ কিন্তু তিনি প্রত্যাখান করেন৷ তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে তিনি সাররিয়েলিস্টদের পছন্দ করেন না, কারণ তিনি মনে করেন তারা অ্যান্টি-আমেরিকান৷          (ক্রমশ)    


জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি