ইন্দোনেশিয়ার লোকগল্প /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- ৪৮


টিকটিকি-র ঘুম-- বালি (ইন্দোনেশিয়া) 
চিন্ময় দাশ 

মাঝরাতের দিকের ব্যাপার। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর, সবে ঘুম এসেছে লোকটার চোখে। একটু বাদে নাকও ডাকবে তার। কিন্তু কপাল মন্দ। হঠাৎই শব্দটা বেজে উঠল-- টিক-টিক, টিক-টিক।
প্রায় একেবারে কানের কাছেই যেন হোল শব্দটা, মনে হল। বিছানা থেকে নেমেছে, অমনি আবার সেই আওয়াজ। জানালার কাছে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে, একটা টিকটিকিকে চোখে পড়ল। 
কাঁচা ঘুম ভেঙে গিয়েছে। তবুও মনের বিরক্তি বাইরে না দেখিয়ে, লোকটা বলল-- হোলটা কী? এই মাঝরাতে কানের কাছে এসে ঝামেলা করছিস কেন? একটু ঘুমোতে দিবি না? এখন এই এত রাতে, ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন? যা, ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।
-- আরে, ঐ ঘুমের জন্যই তো তোমার কাছে আসা। ঘুমোবার কি উপায় আছে আমার? টিকটিকি জবাব দিল। 
-- কেন, উপায় নাই কেন? 
-- তাহলে আর বলছিটা কী? হতভাগা জোনাকিগুলোর জ্বালায় ঘুমোবার উপায় আছে? অতো জায়গা থাকতে, দল বেঁধে ঠিক আমার ঘরে গিয়ে হাজির। টিকটিকি বিরক্ত গলায় বলতে লাগল-- ফরফর করে উড়ে বেড়াচ্ছে গোল হয়ে। আর, তাদের ওই ভুতুড়ে আলোটা! জ্বালাচ্ছে আর নেভাচ্ছে, নেভাচ্ছে আর জ্বালাচ্ছে। এতে কারও ঘুম হয়? তুমিই বলো। 
লোকটা গম্ভীর হয়ে বলল-- তাই না কি?
 টিকটিকি বলল-- তুমি হলে গাঁয়ের মোড়ল। তুমিই কেবল বিহিত করতে পারো। ওদের ডেকে একটু সমঝে দাও তুমি। কোনদিন যেন আমার ঘরে গিয়ে ঝামেলা না করে। 
মোড়ল বলল-- ঠিক আছে, আমি ওদের ডেকে বলে দেব। যা, এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।
মোড়ল জোনাকিদের বকে দেবে বলেছে। খুশি হয়ে ঘরে ফিরে গেল টিকটিকি। তার টিক-টিক শব্দগুলো মিলিয়ে যেতে, মোড়লও জানালা ছেড়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে মোড়ল জোনাকিদের ডেকে বলল-- হ্যাঁরে, তোরা কাল সারারাত টিকটিকিকে জ্বালাতন করেছিস? 
--আমরা কেন ওকে জ্বালাতন করতে যাব?
--কাল রাতে তোদের আলো জ্বলছে আর নিভছে, নিভছে আর জ্বলছে। সে বেচারা ঘুমাতেই পারছিল না।
--এটা তো আমাদের করতেই হয়, মোড়ল।
--কেন, কেন? করতেই হয় কেন?
এবার জোনাকিরা বলল-- গাঁয়ের মহিষগুলোর কথা জানো না তুমি? সারাটা দিন ঘুরে ঘুরে বেড়াবে। গাঁয়ের পথঘাটগুলোকে গোবরে ঢেকে ফেলবে একেবারে। আমরা আলো না দেখালে, লোকেরা আসা-যাওয়া করবে কী করে? গোবরে পা পিছলে, আছাড় খেতেও পারে। তাই তো আমরা আলো দেখাই।
বকে দেবে কী, মোড়ল খুশি হয়ে বলল-- বাহ্, কী ভালো মন রে তোদের। কী মহৎ ভাবনা! ঠিক আছে, যা করছিস, ওটাই করে যাবি। কারও কথায় কান দেওয়ার দরকার নাই তোদের।
সেদিনও তখন প্রায় মাঝরাত। সবে ঘুমটা এসেছে মোড়লের। আবার সেই শব্দ-- টিক-টিক,  টিক-টিক। 
মোড়ল জানালায় গিয়ে বলল-- জ্বলাতন করিস না তো আমাকে। ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।
-- তুমি জোনাকিদের বকে দেবে বললে। কই? তারা তো আজও এসে জ্বালাতন করছে। কী করে ঘুমাবো?
মোড়ল বলল-- জোনাকিদের ওটা করতেই হবে।
-- কেন, কেন? করতেই হবে কেন?
--গাঁয়ের মহিষগুলো সারা দিন ধরে গোবর ছড়িয়ে ফেলে রাস্তাঘাটে। জোনাকিরা আলো না দেখালে, আঁধার রাতে চলাফেরা করা যাবে কী করে? তাই তো আলো জ্বেলে পথ দেখায় আমাদের।
টিকটিকি ভারী খুশি এ কথা শুনে। বলল-- তাহলে তো ঝামেলা মিটেই গেল। তুমি মহিষদের ডেকে একটু বকে দাও। তুমি হলে মোড়ল, গাঁয়ের সকলের মাথা।
--ঠিক আছে, এখন বাড়ি যা। সকাল হোক। আমি মহিষদের সাথে কথা বলব।
মোড়ল মহিষদের বকে দেবে বলেছে। খুশি হয়ে ঘরে ফিরে গেল টিকটিকি। তার টিক-টিক শব্দগুলো মিলিয়ে যেতে, মোড়লও জানালা ছেড়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে মহিষদের ডেকে, মোড়ল লল-- হ্যাঁরে, তোরা না কি কাল সারা দিন গাঁয়ের রাস্তায় গোবর বিছিয়ে রেখেছিলি? টিকটিকি এসে আমাকে বলল, সেজন্য জোনাকিরা খুব জ্বালাতন করেছে ওকে।
মহিষরা বলল-- তাতে ঐ পুঁচকে টিকটিকিটার গায়ে লাগছে কেন? ও তো থাকে ঘরের ভিতর। ওকে তো আর রাস্তায় নামতে হয় না।
-- সারা রাস্তা গোবর বিছানো থাকলে, অন্ধকারে লোকে পা পিছলে পড়ে যাবে। তাই তো জোনাকিরা আলো দেখায় রাতের বেলা। এদিকে রাতে তাদের আলো জ্বলছে আর নিভছে, নিভছে আর জ্বলছে। টিকটিকি বেচারা ঘুমাতেই পারছে না। তোরা এই গোবর ছড়ানো বন্ধ কর।
--এটা তো আমাদের করতেই হবে, মোড়ল।
--কেন, কেন? করতেই হবে কেন?
মহিষেরা বলল-- গাঁয়ের রাস্তাঘাটগুলো তুমি দেখোনি? ছোট-বড় গর্তে ভরা। লোকে হোঁচট খেতে পারে। আছাড়ও খেতে পারে কেউ। তাই তো গোবর ছড়িয়ে সেগুলো ভরে দিই আমরা। 
-- তা প্রতিদিন গোবর ছিটাবার দরকারটা কী? একবার ভরে দিলেই তো ঝামেলা মিটে গেল।
-- ঝামেলা কি আর আমরা করি, মোড়ল? ঝামেলা তো করে বৃষ্টি। নিজে থাকে আকাশে। নিচে এসে জল ঢেলে ঢেলে গর্তগুলো ধুয়ে সাফ করার কী দরকার মেঘের! তুমিই বলো? তাই তো নিত্যদিন আমাদের আবার গোবর ছিটাতে হয়।
শুনে মোড়ল আবার ভারী খুশি। বলল-- বাহ্, ভারী উঁচু মন তো তোদের। ঠিক আছে। এখন থেকে যা করছিস, করে যাবি। কারও কথায় কান দিবি না। 
রাতের বেলা সেদিন আবার একই ঘটনা। মাঝরাতে আবার সেই টিক-টিক শব্দ। মোড়ল জানালায় এসে দাঁড়াল। সে কিছু বলবার আগেই, টিকটিকি বলল-- তুমি যে বললে, মহিষদের বকে দেবে? কথা বলোনি ওদের সাথে? রাতের পর রাত আমার যে ঘুমই হচ্ছে না !
-- নারে, মহিষদের ডেকে কথা বলেছি। মোড়ল টিকটিকিকে সব কথা খুলে বলল। শেষে বলল-- বৃষ্টি এসে ভরাট গর্তগুলো পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। তাই তো মহিষদের আবার গোবর ছড়াতে হয়। 
এ কথায় টিকটিকি ভারী খুশি-- ঝামেলা তো তাহলে মিটেই গেল। তুমি বৃষ্টির সাথে কথা বলো। আকাশের লোক সে। মাটিতে নেমে গর্ত সাফ করে কেন? ঝামেলা পাকাবার দরকারটা কী তার?
-- ঠিক আছে। কাল কথা বলব আমি। এখন ঘরে যা। নিজে ঘুমো, আমাকেও একটু ঘুমোতে দে।
মোড়ল বৃষ্টিকে বকে দেবে বলেছে। এবার ঝামেলা শেষ-- আনন্দে ডগমগ হয়ে ঘরের পথ ধরল টিকটিকি। মোড়লও শুয়ে পড়ল।
পরদিন। বৃষ্টিকে ডেকে আনল মোড়ল। বলল-- হ্যাঁহে, এ তোমার কেমন বিচার? প্রতিদিন ঝরে পড়ছো? 
বৃষ্টি অবাক হয়ে বলল-- তাতে কার কী হল? বৃষ্টি নিয়ে কিসের অভিযোগ?
মোড়ল তাকে সব কথা খুলে বলল। বৃষ্টি হলে, রাস্তার গর্তগুলো ধুয়ে সাফ হয়ে যায়। তাতে লোকে হোঁচট খেতে পারে। তাই মহিষেরা সারাদিন গোবর ছড়ায় গাঁয়ের রাস্তাগুলোতে। এদিকে সেই গোবরে যাতে কারো পা না পিছলে যায়, তাই মৌমাছিরা আলো দেখায় সারা রাত।
-- বাহ্, এ তো বেশ ভালো কথা। বৃষ্টি জানতে চাইল-- কিন্তু তাতে তোমার কী অসুবিধা হল? আমাকে ডাকলে কেন তুমি?
মোড়ল বলল-- আমার আবার কিসের অসুবিধা? অসুবিধা হয়েছে টিকটিকির। জোনাকিদের আলো জ্বলছে আর নিভছে, নিভছে আর জ্বলছে। সে বেচারা ঘুমোতে পারে না সেই আলোর জ্বালায়। 
শুনে, মেঘ তো হেসে আকুল। গড়াগড়ি খেতে লেগে গেল। মোড়ল অবাক হয়ে বলল-- হোলটা কী তোমার? এত হাসি কিসের?
-- বলো কী তুমি! হাসব না? আরে, ঐ বেকুব টিকটিকির কথা ভেবেই তো প্রতিদিন জল ঝরাতে হয় আমাকে।
এবার মোড়লের অবাক হওয়ার পালা। বৃষ্টির কথার এক বর্ণও ঢুকল না তার মাথায়। সে জানতে চাইল-- ব্যাপারটা কী। একটু খুলে বলো তো আমাকে।
মুখের হাসি মুছে, বৃষ্টি বেশ দেমাক দেখিয়ে বলল-- শোন, তাহলে। বৃষ্টি না হলে, রাস্তার গর্ত সাফ হয়ে যাবে না, এটা ঠিক। গর্ত সাফ না হলে, মহিষদের গোবর ছড়াতে হবে না। এটাও ঠিক। গোবর না ছড়ালে, জোনাকিদেরও আলো দেখাতে হবে না আর। ঘুমের ব্যাঘাত হবে না বেকুবটার। মিটে গেল ঝামেলা। 
মোড়লের একটু রাগ হল এ কথা শুনে। সে গম্ভীর হয়ে বলল-- সব ঠিক আছে। ঝামেলাও মিটে যাবে। কিন্তু তুমি টিকটিকিকে বেকুব বললে কেন? নিজের অসুবিধার কথা মোড়লকে বলেছে, এটা তার দোষ? 
হায়, ভগবান! তুমিও দেখছি সেই দলে। তাহলে ভেঙেই বলি। বৃষ্টি খোলসা করে বলতে লাগলো-- যদি জল না ঝরে আকাশ থেকে, তাহলে নদী-নালা, খানা-খন্দের অবস্থা কী দাঁড়াবে? ঠিক আছে নদী-নালা বড় ব্যাপার। ওটা ছেড়ে দিলাম। খানা-খন্দের কথাটাই ধরো। সব শুকিয়ে ফুটিফাটা হবে। জল থাকবে না এক ফোঁটাও। কিন্তু জল না থাকলে, মশা জন্মাবে কোথায়? আর, মশা যদি না -ই জন্মায়, টিকটিকি ব্যাটা খাবেটা কী? ঘুমের কথা ভাবছে হতভাগা। কিন্তু না খেতে পেলে, কী দাঁড়াবে তখন? জানে সেটা? সাধে কি আর বেকুব বললাম পরের ছেলেকে!
এবার মোড়লের মাথায় ঢুকল ব্যাপারটা-- আরে, তাই তো। 
--একটা কথা বলি তোমাকে মোড়ল। সত্যি বলতে কী, ওই হতভাগা টিকটিকিটার কথা ভেবেই, বৃষ্টি নামাতে হয় আকাশ থেকে। নইলে না খেতে পেয়ে শুকিয়ে বেঘোরে মরতে হবে ওকে। 
-- মহৎ, অতি মহৎ ভাবনা তোমার। মোড়ল বলল-- তুমি ধন্যবাদের অনেক ওপরে। যাও তুমি, ভাই। নিজের কাজ, যেমনটি চলছে, চালিয়ে যেও চিরকাল।
একই কাণ্ড সেদিন রাতেও। আবার ঘুম ভেঙে গেল মোড়লের। আবার টিকটিকি এসে হাজির হয়েছে-- কী হোল, মোড়ল? বৃষ্টি তোমার কথা রাখলো না বুঝি? 
-- বৃষ্টির কথা ছাড়। তুই আমার কথা শোন মন দিয়ে। যদি বৃষ্টি না ঝরে, তাহলে জলও জমবে না খানা-খন্দে। আর জল না জমলে, মশাও জন্মাবে না। মশা না থাকলে, পেট চলবে কিসে তোর? সেটা ভেবেছিস কখনো?
কথাগুলো বেশ মনে ধরল টিকটিকির। বৃষ্টি না হলে, গর্ত বলো, খানা-খন্দ বলো, থাকবে না পথেঘাটে। মহিষরাও তখন আর গোবর ছড়াবে না। তাতে আর পা পিছলানোর ভয় থাকবে না কারও। আলো জ্বেলে জ্বেলে ঘুরে বেড়াবে না জোনাকিরা। ঘুমও হবে ভালো। কিন্তু মশা-ই যদি না থাকল, তখন খাবোটা কী? বাঁচব কী করে? 
মোড়ল বলল-- বিধাতা পুরুষ তোর আমার মত বেকুব নয়, বুঝলি। যা কিছু গড়েছে, বিধান দিয়েছে যা কিছুর, সবই প্রয়োজনের জন্য। অ-দরকারে কিছুই গড়েনি, কিছুই না। দুনিয়ার সব কিছুই, একটা আর একটার সাথে জোড়া। কোন কিছুতেই অসহিষ্ণু হতে নাই আমাদের। কিছু কিছু জিনিষ  সয়ে নিতে হয় আমাদের। এখন যা, ঘুমিয়ে পড় গিয়ে। 
মুখে কথাটি নাই, ঘরে ফিরে গেল টিকটিকি। 
চারদিকে জোনাকিরা উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের আলো জ্বলছে-নিভছে, নিভছে-জ্বলছে। চোখ দুটি বুজে শুয়ে পড়ল টিকটিকি। এ দুনিয়ায় কোনও কিছুই অ-দরকারে গড়া নয়। সবকিছুরই যোগ আছে একটার সাথে আর একটার... যদি বৃষ্টি না ঝরে... যদি... 
গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল বিধাতার হাতে গড়া ছোট্ট জীবটা।

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি