ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -৬৫


সম্পাদকীয়,

ইংরাজি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারী রোমান দেবতা জেনাসের নাম থেকে এসেছে। খগেন্দ্র নাথ মিত্র একজন লেখক ও একই সঙ্গে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীও। কেরালায় স্বাক্ষরতার হার ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।  একি একি তোমরা রেগে যাচ্ছ কেন? তোমরাতো দেখছি স্কুল না গিয়ে গিয়ে পড়া শোনার কথা শুনলেই বিরক্ত হচ্ছো। অত অপূর্ব জায়গা কেরালায় ঘুরতে ঘুরতেও পড়া জিগ্যেস করেছি বলে সবচেয়ে বেশি রেগেছো। তাই না? আমি কি করব বলো?  এই নববর্ষ নিয়ে আরো অনেক জানা অজানার কথা বলেছেন মুক্তি জেঠু আর খগেন্দ্র নাথ মিত্রকে নিয়ে পীযূষ আঙ্কেল। বাদবদত্তা আন্টি ঘুরতে ঘুরতে কেরালার কত কত কথা বলেছে। এমনকি শ্রেয়সী দিদিও খুব প্রাঞ্জল ভাষায় অবনঠাকুরের প্রবন্ধটি লিখে পাঠিয়েছে। এতে দোষের কি আছে বুঝলাম না। যাক এবার মন ঘোরাতে শতদ্রু জেঠুর ছড়া আর দিলীপ জেঠুর পাখিদের দেশের গল্প পড়ে নেব। রতনতনু জেঠুর উপন্যাসে আবার বিলম্ব জেঠু হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে অনিচ্ছে ঠাকুমা তার রাধাগোবিন্দকে কথা শেখানোর জন্য মরিয়া। তারপর? না আর বলব না। এসো এবার চুপচাপ দেখি ছোট্ট বন্ধুদের আঁকা ছবি।  আর চুপিচুপি গাছের আড়াল থেকে পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র দেখে মুগ্ধ হই। এই মুগ্ধতা আমাদের উপহার দিয়েছে সুদীপ আঙ্কেল।-- মৌসুমী ঘোষ।


দেশে দেশে

মুক্তি দাশ

 
‘জেনাস’ নামে একজন রোমান দেবতা ছিলেন – যাঁর মাথার সামনে-পেছনে দু’টো মুখ। এবং ইনি হলেন দরজা বা প্রবেশ-পথের দেবতা। সুতরাং যে-মাসটির মধ্য দিয়ে একটি নতুন বছরে প্রবেশ করা হবে, সেই মাসের নামকরণ ওই দেবতার নামে উৎসর্গ করাই তো যুক্তিসম্মত। ইংরেজি বছরের প্রথম মাস ‘জানুয়ারি’ নামটি এসেছিল এভাবেই। জেনাস থেকে জানুয়ারি।

অবশ্য পয়লা জানুয়ারি থেকে নববর্ষ শুরু হওয়ার রীতি খুব পুরোনো নয়। মাত্র ষোড়শ শতাব্দ থেকে এই রীতির প্রচলন হয়েছে। জুলিয়াস সীজার তখন রোমের সম্রাট। তার আগে পয়লা মার্চ থেকে হতো বর্ষারম্ভ।

প্রাচীনকালে গ্রীকদের মধ্যে একুশে জুন তারিখটিকে নববর্ষ হিসেবে পালন করার রেওয়াজ ছিল। এছাড়া মধ্যযুগে প্রায় সমস্ত ইউরোপীয় দেশগুলিতে নতুন বছরের সূচনা হতো পঁচিশে মার্চ থেকে।

বর্তমান যুগেও বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে বছর শুরু করার প্রথা চালু আছে। ভিয়েতনামে নতুন বছর আরম্ভের তারিখটি হলো পয়লা ফেব্রুয়ারি। ইরানে একুশে মার্চ। আবার রাশিয়াতে চোদ্দ জানুয়ারি। অবশ্য এই তারিখটি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেব মেনে করা হয়।

ইম্দোনেশিয়াতে আবার বছরে দু’বার নববর্ষ পালিত হয়। চিনদেশেও তাই – বছরে দু’বার। একবার পয়লা জানুয়ারিতে। দ্বিতীয়বার একুশে জানুয়ারি থেকে ঊনিশে ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো একটি দিনে।

চিনদেশে আরও একটি মজার ব্যাপার চালু আছে। চিনারা যে বছরে দু’বার নববর্ষ পালন করে, প্রত্যেকবারই পালা করে তারা পূর্বনির্দিষ্ট বারোটি জীবজন্তুর নামে এক একটি বছরের নামকরণ উৎসর্গ করে থাকে। সেই বারোটি জীবজন্তু হলো – কুকুর, মোরগ, বানর. মেষ, অশ্ব, সাপ, ড্রাগন, খরগোশ, বাঘ, ইঁদুর, বরাহ এবং ষাঁড়। প্রবাদ আছে, ভগবান বুদ্ধ যখন কুশীনগরে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন, তখন তাঁর মৃত্যুশয্যাপার্শ্বে এই বারোটি জীব কোনো এক অজ্ঞাত কারণে উপস্থিত ছিল। সেই থেকে চিনদেশের লোকেরা এই দুর্লভ ভাগ্যের অধিকারী বারোটি জীবকে দেবতা-জ্ঞানে শ্রদ্ধা করে আসছে।


কাটাকুটি 
শতদ্রু মজুমদার 

কাঠ কাটে কাগজ কাটে 
আর কাটে সিঁথি 
বুড়োবুড়ি ছড়া কাটে 
সনাতন রীতি !
শূর্পণখার নাক
বেবুকে কাটে গাছ 
মূর্খরা টিপ্পনি কাটে 
কেউ কাটে মাছ !
সিঁদ কাটে সুড়ঙ্গ কাটে 
পোকায় কাটে ফুল 
সুর কাটে তাল কাটে 
নাপিতে কাটে চুল !
দীন দুঃখীর রজনী 
কভু কাটে না 
কচি মনেও দাগ কাটে 
কেউ জানে না !
দুধ যদি কেটে যায় 
হয়ে যায় জল 
কপালে ফোঁটা কাটে 
ভন্ডের দল !
কেটে যাবে মেঘ নবীন গরিমা 
কখন জানি না 
কবিতার বই হলে 
বাজারে কাটে না !
খাল কেটে কুমির আনে 
দিন কেটে মাস 
মজুরের বেতন কাটে 
ওঠে নাভিশ্বাস !
সময় কাটে সাঁতার কাটে 
কাটা -কুটি আরো 
মহাজন সুদ কাটে 
টাকা প্রতি বারো !
রবিঠাকুরের কাটা কুটি 
আহা কী বাহার 
ভুল -ভাল ছড়া কাটি 
আমি যে বেকার !!



ছোটগল্প-

টুনটুনির বুদ্ধি
দিলীপকুমার মিস্ত্রী
                                                         
 তিনবছর ধরে বুলবুলি তার একটি ছানাকেও  বাঁচাতে পারেনি। সবই গিয়েছে শয়তান একটা কাকের পেটে । তাই বুলবুলি একলা মনের দুঃখে ডেউয়াগাছের ডালে বসে কাঁদছে।   তার কান্না শুনে ছুটে এসেছে দোয়েল, শালিক, ফিঙে, ইষ্টিকুটুম এবং  টুনটুনি। সেখানে সবাই তাদের নিজের নিজের  দুঃখের কথা বলতে লাগল।
              দোয়েল বলল, ‘কয়েকবছর ধরে ঐ কাকটা আমার বেশ কয়েকটি ছানাকে খেয়েছে।‘  শালিক বলল, ‘ঐ বদমাইশ কাকটা তিন বছর ধরে আমার একটা ছানাকেও বাঁচতে দেয়নি। গত বছর তো শয়তানটা সব ডিমগুলোকেই  খেয়ে ফেলেছিল।‘  ইষ্টিকুটুম বলল, ‘বজ্জাত কাকটা গতবার আমার একটা ছানাকে খেয়েছিল। আরেকটাকে খেতে এলে আমি বাধা দিই। কাল্টুটা  তখন রাগে আমার পা-টাকেই ভেঙে দিয়েছে। দেখ, আমি আজও কেমন খোঁড়াচ্ছি।‘
            ফিঙে বলল, ‘ওর জন্যেই তো আমি এখানে বাসা বাঁধছি না। অন্য কোথাও যাব ভাবছি !‘  সব শেষে টুনটুনি বলল, ‘ভাই, আমি এই প্রথমবার বাসা বাঁধব। তোমাদের কথা শুনে,আতঙ্কে আমার বুক কাঁপছে। আমি তো খুবই পুচকে। ছানাদের রক্ষা করার মতো শক্তি কী আমার আছে ! তবে হ‍্যাঁ, তোমরা আমার একটা ছোট্ট  পরামর্শ শুনতে চাইলে আমি বলতে পারি  ?’   সবাই টুনটুনির পরামর্শ শুনতে খুবই আগ্রহ দেখাল। সকলে একসঙ্গে বলল, ’নিশ্চয়,অবশ্যই শুনব,তুমি বল বন্ধু।‘
            টুনটুনি  বলতে লাগল‌। ‘একথা ঠিক,আমাদের প্রত‍্যেকের আকৃতি কাকের চেয়ে ছোট। শক্তিও ওর চেয়ে ঢের  কম। কিন্তু আমি মনে করি,আমাদের সকলের মিলিত শক্তি কাকের চেয়ে কোনভাবেই কম নয়। তাই আমাদের একজোট হয়ে কাকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। আর সেই আক্রমণটা করতে হবে আচমকা এবং আমাদের বাসা বাঁধার আগেভাগে। ওই শয়তানটাকে  এলাকা ছাড়া করে,তবেই  আমাদের বাসা বাঁধার কথা ভাবা উচিত। আমার মন বলছে, কাকবাবাজী আমাদের মিলিত শক্তির কাছে  নিশ্চিতরূপে হার মানবে।‘ সবাই টুনটুনির কথায় রাজী হয়ে গেল।
               পরদিন ভোরে, কাকবাবাজী বুলবুলির বাসার কাছাকাছি আসতেই,তাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে, টুনটুনিরা সবাই একসাথে তাকে আক্রমণ করল। কাক দিশেহারা হয়ে কতক্ষণ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে বুঝতে পারল,এই জোটের  বিরুদ্ধে পেরে ওঠা তার একার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। এতোক্ষণে সে গুরুতর আহত হয়ে বেশ কাহিল। তাই  নিজের  প্রাণ বাঁচাতে সে দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেল। আর কোনদিন এদিকে ফিরে আসার সাহস দেখাল না ।
           বুলবুলি,দোয়েল, শালিক, ফিঙে, ইষ্টিকুটুম- সবাই ছোট্ট টুনটুনির বুদ্ধির তারিফ করল। তারা স্বীকার করল,একতা  শক্তির  সাহায্যে অনেক কঠিন যুদ্ধ সহজে জয় করা যায়। তারা সবাই ছোট্ট টুনটুনির বুদ্ধির তারিফ করল। 


ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস

রতনতনু ঘাটী

ফুলকুসুমপুর খুব কাছে ৩০


পরদিন সকাল হল যেন এক নতুন ভোরকে সঙ্গে নিয়ে। আজ আনন্দের স্রোতে ভাসতে-ভাসতে অনিচ্ছে ঠাকুরমা পুজোর ফুল তুলতে যেতে অনেক দেরি করে ফেললেন। গল্পকাকার পাড়ার ফুটবল মাঠে জগিংয়ে যাওয়া হল না ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল বলে। ইচ্ছেদাদুর সকালের চা খেতে কত বেলা হয়ে গেল। অনেক দিন ধরে সকালের চায়ের কাপটা মাধুরীজেম্মা দাদুর হাতে তুলে দেন। আজ দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার অপরাধে তিনি দাদুর সামনে আসতে রাজি হলেন না। বকুনি শোনার ভয় আছে না! চা দিতে দেরি হলে অন্য দিন দাদু মহাভারতের যুদ্ধ বাধিয়ে ফেলেন বাড়িতে। আজ দাদু একটিও কথা বললেন না এই দেরি নিয়ে। 

   অনিচ্ছে ঠাকুরমা চায়ের কাপটা দাদুর সামনে এগিয়ে দিতে-দিতে বললেন, ‘ইস, তোমাকে আজ চা দিতে বউমাদের বড্ড দেরি হয়ে গেল!’

   ইচ্ছেদাদুর মুখে সকালবেলার রঙিন রোদের মতো এক ঝলক রোদ-মাখা হাসি-খেলে গেল। হাসতে-হাসতে দাদু চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে মুখ তুলে বললেন, ‘দ্যাখো অনিচ্ছে, বউমাদের বলে দিও, এমন আনন্দের পর অমন একটু-আধটু দেরি কিন্তু মোটেও দোষের নয়।’

   বিলম্বদাদুকে সকাল থেকে হাঁকডাক করে কোত্থাও পাওয়া যাচ্ছে না। সেই নিয়ে ইচ্ছেদাদু বিচলিত। ঠাকুরমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিলম্ব তোমাকে কি কিছু বলে গেছে সে কোথায় যাচ্ছে? সকাল থেকে তিনি যে কোন মহাকাজে ব্যস্ত বুঝতে পারছি না। আমি তাকে কৃষিমেলার স্টলে একবার পাঠাব বলে কখন থেকে  বসে আছি। আমাদের হযবরল চিড়িয়াখানার মেম্বাররা সকলে ভাল আছে কিনা দেখে আসতে বলতাম।’

   ঠাকুরমা বললেন, ‘তুমি পরিপালনকাকুকে ফোন করলেই তো পার? কাল থেকে সে তো কৃষিমেলার স্টলেই আছে?’

   দাদু বললেন, ‘সে কি আর করিনি ভেবেছ? কিন্তু পরিপালনের ফোন নট রিচেবল বলছে সেই কখন থেকে।’

   চায়ের কাপ শেষ করে দাদু দোতলার বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। এমন সময় বিপদভঞ্জনস্যার নীচ থেকে হাঁক দিলেন, ‘কই গো ইচ্ছেকুমার! কী করছ? ঘুম ভেঙেছে তো?’

   দাদু ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘এসো, এসো বিপদভঞ্জন। উপরে এসো!’

   স্যারের জন্যে তখনই চা নিয়ে হাজির হলেন অনিচ্ছে ঠাকুরমা। ইচ্ছেদাদু ব্যস্ত হয়ে স্যারকে বললেন, ‘শুনেছ কি, আমাদের বিলম্ব সকাল থেকে কোথায় যে উধাও হয়ে গেছে, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! এ এক মহা মুশকিল কাণ্ড হল!’

   স্যার বললেন, ‘আমি এখনই তো পিচ রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এলাম বিলম্বকে।’

   ‘তুমি কি ঠিক দেখেছ বিপদভঞ্জন?’

   ‘হ্যাঁ, দেখেছি তো! বিলম্ব এসে ঢপাস করে আমাকে প্রণামও করল।’

   দাদু বললেন, ‘দেখা যাক, কখন উনি এসে বাড়িতে ঢোকেন! সেখানে যে ওঁর কী এমন মহাকাজ, কে জানে?’

   সূর্য এখন গাছপালার মাথার উপর উঠে পড়েছে। কাল সন্ধেবেলা টিভির খবরের পর ফুলকুসুমপুর গ্রামের অধিবাসীরা যারা ত্রিপাঠীবাড়িতে এসে শুভেচ্ছা জানাতে পারেনি, তাদের অনেকে আসতে শুরু করেছে। কারও হাতে ফুলের তোড়া, কারও হাতে মিষ্টির প্যাকেট। দাদু বাড়ির সমস্ত চেয়ার এনে বারান্দায় পেতে দিতে বললেন তিন্নির বাবাকে। তিনি বারান্দায় চেয়ার জড়ো করতে লাগলেন। কুয়াশামাসি বাড়িতে আসামাত্র তাকে দেখে অনিচ্ছে ঠাকুরমা অর্ডার করলেন, ‘তুমি এক্ষুনি বড় কেটলিতে করে অনেকটা চা বসাও। দেখছ না, কত লোকজন আসছে আমাদের বাড়িতে? তাদের অন্তত এক কাপ করে চা তো দিতে হবে? জয়তী, তুই কি একটা দিনও খানিক আগে-আগে আসতে পারিস না?’

   কুয়াশামাসি বাড়িতে ঢোকার মুখে ঠাকুরমার অমন মুখঝামটা শুনে মুখ ভার করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। যত লোকজন আসছে, মাধুরীজেম্মা, করবীকাকি আর বকুলকাকি মিলে পালাক্রমে চায়ের কাপ নিয়ে রান্নাঘর থেকে যাওয়া-আসা করছেন।

   বড়দের এত কোলাহলে ছোটদের ঘুম ভাঙতে শুরু করল। প্রথমে বিন্নি ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে হাতের তালুর উলটো দিক দিয়ে চোখ ঘষতে-ঘষতে ঘুম তাড়াতে লাগল। ততক্ষণে বুম্বা ঘুম থেকে উঠে বিন্নিকে জিজ্ঞেস করল, ‘বিন্নিদি, বাড়িতে অত হইহট্টগোল কেন রে? আমাদের বাড়িতে চোর-ডাকাত পড়েছে নাকি রে?’

   তিন্নিও উঠে চোখ ডলতে-ডলতে বলল, ‘দুর, চোর-ডাকাত পড়বে কেন? এ হল গিয়ে গিনেস রেকর্ড বুকে আমাদের বাড়ির নাম ওঠার প্রাথমিক আনন্দের প্রকাশ!’ 

   একে-একে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে জড়ো হল ওরা। এমন সময় বিন্নির ক্লাসের চিকলু সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এসে হাতছানি দিয়ে ডাকল বিন্নিকে, ‘একটু আয় না এদিকে!’

   বিন্নি তার কাছে এগিয়ে গেল। চিকলু নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কাল টিভিতে তোদের বাড়ির হযবরল চিড়িয়াখানার কথা খবরে দেখিয়েছে? সকালবেলা আমি ঘুম থেকে উঠতে বাবা বলল। আমি মেলা থেকে ফিরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই দেখতে পাইনি। একটু বল না রে, কী বলেছে?’

   বিন্নি গলায় গমগমে ভাব এনে বলল, ‘সে অনেক কথা। চট করে তোকে বলে শেষ করতে পারব না। শুধু এটুকু জেনে রাখ, আমাদের বাড়ির কথা মনে হয় গিনেস বুকে উঠে যাবে।’

   চিকলু অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, তোদের বাড়ির কথা গিনেস বইয়ে উঠবে কেন রে?’

   বিন্নি বলল, ‘সে অনেক কথা, স্কুলে গিয়ে সব বলব। শুধু জেনে রাখ, আমাদের হযবরল চিড়িয়ানার মতো পশু-পাখি আর মানুষ মিলে একসঙ্গে একটা বাড়িতে থাকার ঘটনা নকি সচরাচর দেখা যায় না। বাকিটা পরে শুনে নিস!’ বলে বিন্নি ভিড়ের মধ্যে আগে যে পজিশনে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

   ততক্ষণে নৈবেদ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেডমিস অরুণিমা সরকার চলে এলেন শুভেচ্ছা জানাতে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে আসতে দেখে ইচ্ছেদাদু উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন,  ‘এসো, এসো অরুণিমা!’

   অরুণিমা মিসের হাতে এক মস্ত বাহারি ফুলের তোড়া। তিনি ইচ্ছেদাদুর হাতে তুলে দিলেন শেই ফুলোর তোড়াটি। ঠিক তাঁর একটু পরেই এসে গেলেন অহেতুকপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান দিবানিশি নস্কর। আর ঠিক তার পর-পরই গল্পকাকার মোবাইলে শুভেচ্ছাবার্তা চলে এল কলকাতা থেকে ‘পশুক্লেশ নিবারণী সমিতি’র সেক্রেটারি অনুপম দে’র। 

   তক্ষুনি বাড়িতে খবরের কাগজ-দেওয়া কাকু আজকের তিনটে খবরের কাগজ দিয়ে গেলেন। ইচ্ছেদাদু একটা খবরের কাগজ, স্যার একটা কাগজ আর গল্পকাকা একটা কাগজ হাতে নিয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই তো, ফার্স্ট পেজে আমাদের হযবরল চিড়িয়াখানার স্টলের ছবি বড় করে ছাপা হয়েছে। সে ছবিতে বুম্বা, বিন্নি আর তিন্নি তো আছেই। সেই সঙ্গে ইচ্ছেদাদু আর অনিচ্ছে ঠাকুরমাকেও সে ছবিতে দেখা যাচ্ছে। ছবিতে বিংগো, মিঁউ, কুমি এবং রাধাগোবিন্দও আছে। 

   তক্ষুনি কোত্থেকে হন্তদন্ত চেহারায় বাড়িতে এসে ঢুকল বিলম্বদাদু। এসেই দাদুর হাতের খবরের কাগজে তার নিজের ছবি ছাপা হয়েছে কিনা উঁকি দিয়ে আঁতিপাতি করে খুঁজছিল। না দেখতে পেয়ে ইচ্ছেদাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘বড়বাবু, খবরের কাগজে কই আমার ছবি তো ছাপেনি? এই খবরের কাগজের লোকেরা বড্ড একচোখো!’

   দাদুর এতক্ষণের সব রাগ গিয়ে উপচে পড়ল বিলম্বদাদুর উপর। দাদু বললেন, ‘তুই এমন কী মহাকাজ করেছিস যে, খবরের কাগজে তোর ছবি ছাপা হবে? হনুমান কোথাকার! তার আগে বল, সকাল থেকে কোথায় ছিলি? দরকারের সময় তোকে কক্ষনো যদি পাওয়া যায়?’

   বিলম্বদাদু ঘাবড়ে গিয়ে থতমত মুখে দাঁড়িয়ে থাকল। অনিচ্ছে ঠাকুরমা বললেন, ‘যাক, এত লোকের সামনে ওকে অমন করে আর বোকো না তো!’ তারপর গলার সুর নরম করে ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিলম্ব, তুই কোথায় গিয়েছিলি? বিপদভঞ্জনস্যার বললেন, তুই নাকি পিচ রাস্তায় গিয়েছিলি?’

   বিলম্বদাদু বলল, ‘গিয়েছিলাম তো! সকাল থেকে কত-কত লোক আসছে মেলায় যাবে বলে। তারা আমাদের চিড়িয়াখানার স্টল দেখতে চায়। বাস থেকে যত লোক নামছে, তারা জনে-জনে জিজ্ঞেস করছে, ‘হ্যাঁ গো! হযবরল চিড়িয়াখানার স্টলটা কোথায় হয়েছে গো?’ আমি তাদের পথ না দেখিয়ে বাড়ি চলে আসি কেমন করে? তাদের পথ দেখিয়ে দিচ্ছিলাম, কোন দিকে গেলে মেলায় আমাদের চিড়িয়াখানার স্টল দেখতে পাবে।’

   তখনও একটুও রাগ কমল না দাদুর। তিনি বললেন, ‘হতভাগা, তুই যে সকলকে মেলার দিকে পাঠিয়ে দিলি, এখন কি মেলার গেট খুলেছে নাকি?’

   বিলম্বদাদু নিজের হাত দিয়ে কপাল চাপড়ে বলল, ‘আমার কপাল! সে খবরও শোনেননি বড়বাবু? সকাল থেকে এত-এত লোক আসছে দেখে মেলার গেট কখড় থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে ডি এম সাহেবের অর্ডারে।’

   ‘ও, তাই নাকি? পরিপালন তো ওখানে আছে। এ খবর ও তো কই আমাদের একবারও দিল না?’ 

   তড়িঘড়ি হঠাৎ ত্রিপাঠীবাড়ির সব ভিড় যেন ফাঁকা হয়ে গেল। সকলে ছুটলেন গ্রামীণ কৃষিমেলার দিকে। ইচ্ছেদাদুর সব রাগ ততক্ষণে গলে জল হয়ে গেল। শুধুকাকা, গল্পকাকা আর তিন্নির বাবাকে বললেন, তোরা সকলে এক্ষুনি মেলায় যা তো! আমিও বিপদভঞ্জনকে নিয়ে মেলার মাঠে যাচ্ছি।’ 

   তারপর বিলম্বদাদুর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় ইচ্ছেদাদু বললেন, ‘বিলম্ব, তুই বাবা বড়মার কাছ থেকে আমাদের সকলের জন্যে ব্রেকফাস্ট নিয়ে চলে আয় মেলার মাঠে। দেখিস, কোত্থাও দেরি করিস না যেন! তোর যা ভুলো মন! সকাল থেকে আমাদের কারও তো ব্রেকফাস্টই হয়নি। অযথা পথে বিলম্ব করিস না যেন!’ তারপর বুম্বা, বিন্নি আর তিন্নিকে বললেন, ‘তোরাও আমার সঙ্গে চল! গিয়ে দেখি মেলার মাঠে কী কাণ্ড হচ্ছে।’

   সকলে মেলার মাঠে গিয়ে দেখলেন, লোকে থইথই করছে মেলাপ্রাঙ্গণ। সমস্ত ভিড় উপচে পড়ছে হযবরল চিড়িয়াখানার স্টলের সামনেই। সে খবর ফের পৌঁছে গেল কেমন করে টিভির অফিসে আর খবরের কাগজের অফিসে। একটু পরেই টিভির ওবি ভ্যান ছুটে এল। সেদিন সন্ধেবেলা আবারও ফলাও করে টিভিতে দেখানো হল ফুলকুসুমপুর গ্রামীণ কৃষিমেলার খবর। হযবরল  চিড়িয়াখানার ছবিও অনেকক্ষণ ধরে দেখাল। 

   এভাবে আরও একটা দিন হয়ে হইহই করে কৃষিমেলা শেষ হয়ে গেল। আশপাশের কত গ্রামে যে ছড়িয়ে পড়ল হযবরল চিড়িয়াখানার খবর। সব স্টল ভেঙে গুটিয়ে নেওয়া হল। হযবরল চিড়িয়াখানার সব মেম্বারকেও নিয়ে আসা হল ত্রিপাঠী বাড়িতে। পরিপালনকাকু রাধাগোবিন্দ, বিংগো, মিঁউ আর কুমিকে স্নান করিয়ে ভাল করে খাইয়ে তারপর বাড়ি গেলেন।

   ইচ্ছেদাদু পরিপালনকাকুকে বললেন, ‘তুমি বাবা কালকের দিনটা ছুটি নাও। তোমার অনেক ধকল গেল স্টল দেখতে।’

   এ কথা শুনে গল্পকাকা আর শুধুকাকা বললেন, ‘বাবা, তুমি ঠিকই বলেছ। পরিপালন তিনদিন ধরে খুব খেটেছে। ওর বিশ্রাম দরকার।’

   তিন্নির বাবা বললেন, ‘একটা দিন আমরা বিংগো-মিঁউ-কুমিদের সঙ্গে ভালভাবে কাটাই।’

   অনিচ্ছে ঠাকুরমা বললেন, ‘আমার রাধাগোবিন্দকে তোদের দেখতে হবে না। আমি একাই দেখতে পারব। আর আমার সঙ্গে শুধু একা বুম্বা থাকলেই হবে।’

   তারপর বুম্বার দিকে ফিরে ঠাকুরমা বললেন, ‘তুই আমার রাধাগোবিন্দকে আরও ছোট-ছোট দু’-একটা কথা বলা শিখিয়ে দিবি তো!’

   বুম্বা জিজ্ঞেস করল, ‘কী কী কথা ঠাকুরমা?’

   ‘এই যেমন ধর, ‘আপনি ভাল আছেন তো?’---‘আবার আসবেন’—এরকম। কেউ মাস্ক না পরে এলে রাধাগোবিন্দ যেন বলতে পারে—‘ মাস্ক পরেননি কেন?’---এই কথাটাও শিখিয়ে দিস।’

   ঘাড় নাড়ল বুম্বা। বলল, ‘তুমি কিচ্ছু ভেবো না ঠাকুরমা! আমি রাধাগোবিন্দকে ঠিক ও কথাগুলো শিখিয়ে দিতে পারব। ও আমার কথা খুব শোনে আর চটপট মনেও রাখতে পারে।’ বলে চলে গেল রাধাগোবিন্দর কাছে। সেই কবে থেকে রাধাগোবিন্দ ঘরের ভিতর খোলাই থাকে। এখন ঠাকুরমার টিয়াপাখিটা চুপচাপ বসে আছে বারান্দা রেলিঙে। ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখছিল। বুম্বা বলল, ‘কাল সকাল থেকে আমার কাছে তোর কথা শেখার ক্লাস হবে! পরিপালনকাকার আসার আগেই ঠাকুরমা খেতে তোকে সকালে খেতে দেবে। ততক্ষণে আমারও ব্রেকফাস্ট হয়ে যাবে। তারপর শুরু হবে তোর-আমার কথা বলার ক্লাস?’

   রাধাগোবিন্দ কী বুঝল কে জানে। বলল, ‘ট্যাঁ-টাও, ট্যাঁ-টাও!’

   ওর কথা শুনে ঠাকুরমা হেসে-হেসে বললেন, ‘দেখলি তো? তোর কথা শুনে আমার রাধাওবিন্দ বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে!’ 

   বুম্বা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। অবাক হয়ে ঠাকুরমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বড়রা ঠাকুরমার মুখে রাধাগোবিন্দর প্রশংসা শুনে হেসে চলে গেলেন। 

   তখনও ঠাকুরমার মুখের হাসিটা পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। বুম্বা বারান্দা থেকে বাইরে ছাতিমগাছের দিকে তাকাল। দেখল পাতার ফাঁক দিয়ে পিটপিট করে রাধাগোবিন্দর দিকে তাকিয়ে আছে রুপোর থালার মতো গোল চাঁদটা!

(আগামী সংখ্যায় শেষ) 


   

   


ধারাবাহিক ভ্রমণ (কেরালা)

কলমে - বাসবদত্তা কদম

পর্ব ২ 


আলেপ্পি বা আলাপুZhআর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে অনেক ছোট ছোট খাল আর এই খালগুলোর মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো জমি। নারকেল গাছের তো কথাই নেই। যেখানে সেখানে নারকেল বন। খালগুলোর দুপাড়ে নারকেল গাছের সারি। আর সেসব গাছে ঝুলে আছে প্রচুর নারকেল। আমাদের দেশের নারকেলের ফলনের একটা বেশ বড় অংশ কিন্তু আসে কেরালা থেকে। ধর তুমি যাবে তোমার মাসি বা পিসির বাড়ি, মায়ের রান্না তরকারি পৌঁছাতে। দুটো রাস্তা পরেই সেই বাড়ি। তুমি আমি হলে সাইকেলটা বার করবো আর কেরিয়ারে বেঁধে চলে যাব। তরকারিটা পৌঁছে দিয়ে চলে আসব। ওরা কি করে বলত? বাড়ির সামনে বাঁধা নৌকোটা খুলে বৈঠা হাতে বসে পড়বে আর ও বাড়ির ঘাটে গিয়ে টুকুস করে তরকারির বাটিটা পৌঁছে দেবে। খালের আশে পাশে মাঝখানের ঐ চৌখুপী জমিগুলোতে ধান হয় প্রচুর। সবুজ থেকে সোনা রঙে মাঠগুলো বদলে যাচ্ছে দেখা যায় নৌকায় যেতে যেত্র। কেরালায় অবশ্য রবার এবং মশলাও হয় প্রচুর। চা কফি দুটোই হয় কেরালার পাহাড়ি অঞ্চলে। সেসব তো আমরা কেরালা ঘুরতে ঘুরতেই দেখতে পাব তাই না! তবে একটা খুব জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে রাখো, আলাপুZhআ শুধু নয় পুরো কেরালায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা অথবা অনুপাত দুটোই পুরো ভারতবর্ষের শীর্ষে। আলাপুZhআ আবার কেরালা রাজ্যেও শিক্ষায় বেশ ওপরের দিকে নিজেকে ধরে রেখেছে। কেরালায় গড়ে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা একশো জনের মধ্যে ৯৬.২। আমাদেরই দেশের একটা রাজ্যে এত এত শিক্ষিত মানুষ! কি ভালো একটা তথ্য তাই না! আমার শুনেই মন ভালো হয়ে গেছিল।

আলাপুZhআ স্টেশনে যখন আমরা নামলাম, তখন সকাল সাতটা। এই স্টেশন থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমরা রওনা হলাম হাউসবোটেদের স্টপেজের উদ্দেশ্যে। একটা ছোট্ট ব্রিজ পেরিয়ে সে ট্যাক্সি চলেছে অনেকটা একটা পোকার মত গুটিগুটি। সামনে এলো একটা ব্রিজ, বেশ পাতলা পলকা চেহারা। ট্যাক্সির জানলা দিয়ে নীচে তাকিয়ে দেখি অনেকগুলো ছইঢাকা ময়ূরপঙ্খি নৌকা। ঠিক যেন ঠাকুরমার ঝুলি থেকে উঠে এসে ব্রিজের নীচে দাঁড়িয়েছে একটু নিঃশ্বাস নেবে বলে। আমি তো গলা খুলে চিৎকার করে উঠেছি, -ওই দেখ, কতগুলো ময়ূরপঙ্খি নাও। আমাদের ট্যাক্সিওয়ালা দাদা দেখি ধমকে উঠল -Those are houseboats madam. 

যাব্বাবা বাংলাও জানে নাকি! কেরালার মানুষজন শিক্ষিত, এই মন ভালো করা খবর জেনেই এসেছি; কিন্তু তাবলে সে বাংলাও জানবে! সংশয়ও সেই কাটালে, শুনলাম বাঙালি ট্যুরিস্টের সংখ্যা এত প্রচুর, দু চারটে শব্দ শিখে গেছে সেও। তার মানে আমার মত ময়ূরপঙ্খি ভ্রম… আরো অনেকেরই হয়!

ব্রিজটা পেরিয়ে ট্যাক্সি নামল একখানা ঢালু পথে। ট্যাক্সি সে পথে গড়গড়িয়ে নামছে। সামনে আর বাঁদিকে জল, ডানদিকে কত ক—ত যে হাউসবোট। একতলা, দোতলা, আড়াইতলা; আর কি যে তাদের বাহার। ট্যুরিস্টরা তাতে উঠবে কি ফটো তুলেই কুল পাচ্ছে না। ট্যাক্সি থামতেই আমি ট্যুরিস্টেরও একই অবস্থা। 

তা-র-প-র তো আমাদের জন্য বরাদ্দ হাউসবোটখানায় চড়লাম। 

আমাদের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেছে নৌকায় প্রবেশ করে তখন (ক্রমশঃ) এটা একটা নৌকো! কি নেই এর মধ্যে সেটাই গবেষনার বিষয় হয়ে উঠল আমাদের কাছে। যেখান দিয়ে উঠলাম সেটা এ বোটের ডাইনিং স্পেস আবার বসার জায়গাও বটে। খাবার টেবিল, ছখানা চেয়ার, তিনখানা বেতের সোফা, টেবিল। আর খাবার টেবিলের উপর অপূর্ব সুন্দর ভাবে সাজিয়ে রাখা ফল। ঢুকতেই অভ্যর্থনা মিলল ডাবের জল দিয়ে (ক্রমশঃ)



অবন ঠাকুর ও ব্রতকথা
শ্রেয়সী মুখোপাধ্যায়
দ্বাদশ শ্রেণী, হাবড়া উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তর ২৪ পরগণা

খ্যাতিমান ভারতীয় বাঙালি চিত্রশিল্পী , নন্দনতাত্ত্বিক এবং লেখক হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ঠিক ১৫০ বছর আগে ১৮৭১ সালে ৭ই আগস্ট এই মহান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। তার পিতা গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা ছিলেন সৌদামিনী দেবী

তিনি গভর্মেন্ট কলেজ অফ আর্ট এন্ড ক্র্যাফট এবং সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা লাভ করেন। 'Honorary doctor of the university of calcutta'  পুরস্কার লাভ করেন। 

পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  অনুপ্রেরণায় তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত । তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা আনুমানিক ২৬ টি এবং প্রকাশিত রচনা সংখ্যা প্রায় ৩৭০ টি। তাঁর সাহিত্য কর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি লেখা হলো -- রাজকাহিনী ,শকুন্তলা ,ক্ষীরের পুতুল, ভূত পত্রীর দেশ, নালক, বুড়ো- আঙলা আপন কথা ঘরোয়া ,বাংলার ব্রত প্রভৃতি । 

বাংলা তথা ভারতের হাজার বছর ধরে চলে আসছে ব্রত পালন । এসকল ব্রতকে মাথায় রেখে  অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন তাঁর গ্রন্থ বাংলার ব্রত । তাঁর গ্রন্থের আলোকে এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি। 

লোকের মধ্যে হিন্দু ধর্মের জটিল অনুষ্ঠান এবং নানা দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের  উদ্দেশ্যে তন্ত্র পূরাণ কে ব্রতের ছাঁচ দিয়ে রচনা করেছেন । অবন ঠাকুর বাংলার ব্রতকে কয়টি ভাগে ভাগ করেছেন  যথা শাস্ত্রীয় ব্রত নারী ব্রত এবং কুমারী ব্রত তবে কিছু শাস্ত্রীয় ব্রত কুমারী ব্রত রূপেও প্রচলিত রয়েছে, যেমন সূর্য স্তবঃ

নমঃ নমঃ দিবাকর ভক্তির কারণ , 
ভক্তি রূপে নাও প্রভু জগত কারণ। 
ভক্তিরূপে প্রণাম করিলে কৃপা পায়,
 মনোবাঞ্ছা সিদ্ধ করেন প্রভু দেবরায়। 

হিন্দু ধর্মের বিবর্তনের সঙ্গে লৌকিক ব্রতের চেহারা  এমন অদল বদল হয়ে গিয়েছে যে এখন যতগুলি খাঁটি অবস্থায় পাওয়া যায় তা অতি অল্প এবং দু-চারটি ছাড়া সেগুলিও খন্ড অসম্পূর্ণ অবস্থায় পাই। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে যে যে দশায় বিপর্যয় ঘটছে সেগুলিকে খাবার ইচ্ছে এবং চেষ্টা থেকেই  ব্রতের উৎপত্তি। বিচিত্র অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে মানুষের বিচিত্র কামনা সফল করতে যাচ্ছে এই হল ব্রত। পূরাণের চেয়ে নিশ্চয়ই পুরনো, বেদের সমসাময়িক কিংবা আরো পূর্বেকার মানুষদের অনুষ্ঠান 

একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ব্রতের নাম হল 'লক্ষ্মীব্রত' আমাদের দেশের মেয়েরা প্রধানত তিনটি বড় লক্ষ্মীব্রত করে থাকেন ,ফাগুনের বীজ বপনের পূর্বে। চাষিরা ব্রত পালন করে থাকেন রবিবারে এবং বৃহস্পতিবারে। এভাবেই মানুষের প্রয়োজন থেকে জন্ম নিয়েছে হাজারো ব্রত। 

মেয়েলি ব্রতগুলি সবকটি খাঁটি অবস্থায় পাওয়া যায় না। কালে কালে এত ভাঙচুর, অদল-বদল উল্টোপাল্টা হয়ে যায় যে কোনটা পুজো আর কোনটা বার করতে হলে আদর্শ ব্রতের লক্ষণ গুলির সাথে না মিলিয়ে দেখলে সমস্যায় পড়তে হয়। এ ধরনের ব্রতগুলি বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান, মন্ত্র উচ্চারণ এবং সবশেষে ব্রতকথা শোনার মাধ্যমে শেষ হয়। 

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার ব্রত গ্রন্থে এমনই শাস্ত্রীয়, নারী, কুমারী ,আঞ্চলিক ইত্যাদি ব্রতের সকল আচার বিধি, ব্রতকথা, মন্ত্র সবকিছু উল্লেখ করেছেন। ব্রত কথার মাঝে শিবহ-পার্বতী, গ্রামের নর-নারী, বালক-বালিকা কথোপকথনে স্থান পেয়েছে। অবনীন্দ্রনাথের এই বইতে কি করে এসকল ব্রতের আল্পনাতে আঁকতে হবে ,কি কি রীতিনীতি পালন করতে হবে সেগুলোও উল্লেখ্য। 

বাংলা তথা ভারতবর্ষের রীতিনীতি সংস্কৃতি র একটি বড় অংশ জুড়ে আছে এই ব্রত আর সেই ব্রতকথার ব্যাপারে আমার জ্ঞান আরত বেশি সুদৃঢ় হয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বই পাঠ করে  হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি  আমার জ্ঞান এতটা বৃদ্ধির জন্য আমি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।




স্মরণীয় (খগেন্দ্র নাথ মিত্র)
কলমে - পীযূষ প্রতিহার

খগেন্দ্রনাথ মিত্র ১৮৯৬ সালের ২ জানুয়ারী কলকাতার নীলমণি মিত্র লেনের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শৈলেন্দ্রনাথ ছিলেন শিলাইদহ ঠাকুর এস্টেটের মোক্তার। ছোটবেলায় শ্যামপুকুরের এক পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। সেখানে পড়া শেষ করে চলে যেতে হয় কুষ্টিয়ায় ঠাকুরদার কাছে। কুষ্টিয়ায় পড়ার সময় তাঁর খেলাধুলা ও অভিনয় সকলের কাছে প্রসংশিত হয়। যৌবনে বাঘা যতীনের স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কলকাতায় সিটি কলেজে পড়ার সময় অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে বি এ পরীক্ষা দিলেন না। পরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিদ্যালয় ( যার সরকারি স্বীকৃতি ছিল না) থেকে বি এ পাশ করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা পর্বে তিনি যোগ দিয়েছেন ও কারাবরণ করেছেন। প্রথমদিকে নানা ধরনের পেশায় যুক্ত থাকলেও পরে সাহিত্যের সেবায় নিয়োজিত হন।
     তাঁর প্রথম বড় রচনা 'আফ্রিকার জঙ্গলে' প্রকাশিত হয় ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে। এর পর 'ভোম্বল সর্দার', 'বাগদি ডাকাত', 'পাতালপূরীর কাহিনী', 'ঝিলে জঙ্গলে' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য শিশু সাহিত্য রচনা। পাশাপাশি বড়দের জন্য লিখেছেন- 'গড় জঙ্গলের কাহিনী', 'ঠাকুরদার বুনো গল্প', 'ডাকাতের ডুলি', 'গনেশচন্দ্রের অশুভ যাত্রা', 'সুন্দরবনের পথে' প্রভৃতি। মৌলিক সাহিত্য রচনার পাশাপাশি অনুবাদের কাজও করেছেন। 'এ টেল অব টু সিটিজ', 'আঙ্কল টমস কেবিন' গোর্কির 'মা' তাঁর করা উল্লেখযোগ্য অনুবাদ। তাঁর রচিত 'শতাব্দীর শিশু সাহিত্য ১৮১৮-১৯৬০' বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সাহিত্য রচনার সঙ্গে সঙ্গে 'নতুন মানুষ', 'ছোটদের মহুল', 'বাঁশরী', 'সপ্তডিঙা', 'মানিকমালা', ও 'বার্ষিক শিশুসাথী' প্রভৃতি পত্রিকাগুলো সম্পাদনা করেছেন।
       শিশুসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ১৯৭৫ সালে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হলে বিশেষ কারণে সেই পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেন। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য 'গিরীশ রৌপ্যপদক', কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ভুবনেশ্বরী পদক' ও 'মৌচাক সাহিত্য পুরস্কার' লাভ করেন।
      ১৯৭৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এই প্রথিতযশা শিশু সাহিত্যিক কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


পাঠ প্রতিক্রিয়া 
(জ্বলদর্চি ছোটবেলা ৬৪ সংখ্যাটি পড়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া দিল পশ্চিম মেদিনীপুরের জওহর _নবোদয় বিদ্যালয়ের  অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ভানুপ্রিয়া মাহাত) 
        
শোন শোন সুধীজন 🦻
  শোন দিয়া মন ,❤️
জ্বলদর্চি ৬৪ সংখ্যা 🙂
  আজ করিব বর্ণন ।🗣️
প্রথমে বলি ঋপন দাদার 1️⃣
   তোলা ছবিখানি , 📸
আমার সঙ্গে ওই মেয়েটার,👩🏻
   মিল অনেকখানি । 🤞
রাগ করলে আমিও কিন্তু 😠
    এমনটাই করি , 😄
জানলা দরজা বন্ধ করে 🚪
  একলা বসে থাকি । ☹️
মৌসুমী ম্যামের সম্পাদনার 👵
   তারিফ যতই করি , 🗣️
তাও যেনো মোর মনে হয় 🤔
 কম পড়ে যাই সবি ।😊
বানীয়া দিদি,পৃথা,মধুরিমা আর 😗
স্নেহার আঁকা দেখে , 👁️‍🗨️
আমার বড়ো মন করছে 💟
তাদের মতো আঁকতে । 🎨
এমন সুন্দর ছবি তারা 😍
কেমন ভাবে আঁকে ?? 👩‍🎨
তোমরা যদি জেনে থাকো  ☺️
প্লিজ বলবে আমাকে ।🙏

   ‼️ তারপর আসি‼️

জয়তি আন্টির বাড়ির 🏡
 ক্রিসমাস সেলিব্রেশন, 🎉
গল্পখানা পড়ে আমার 📜
ভালো লাগল ভীষণ । 😇
ছড়াখানি অমিতাভ আঙ্কেলের 👨🏻‍🦱
 জায়গা নিল মনে , 💘
আমিও এখন ক্রিসমাসের স্মৃতি 🎄
ভাবছি ঘরের কোণে।  🏡
লেখা পড়ে অদিতি আন্টির 👩🏻
 আড্ডার আসর দেখে ,👀
আমারও মনে জাগছে আশা 💖
 তাদের কাছে যেতে । 🥰
সমাদৃতা দিদির লেখা 🖋️
 ছড়াখানি পড়ে, 📃
দেবদূতকে করি প্রণাম 🙏
 আমিও হাত জড়ো করে । 🤲

      ‼️ আবার নাকি ‼️

হযবরল চিড়িয়াখানার স্টল 🏪
 বসেছে ফুলকুসুমপুরে , 😳
তাই দেখে মোর মেলায় যেতে 🎡
ইচ্ছা জাগে এই মনেতে ।❣️
বাসবদত্তা আন্টির সঙ্গে 👩🏻
 এবার ভ্রমণ জলের দেশ , 🌊
চলো যাই (কেরালা) পড়ে📃
 লাগল আমার ভারি বেশ । 😇

      ‼️সবার শেষে ‼️

পীযূস আঙ্কেলের লেখা 🖊️
 স্মরনীয় পড়ে , 📄
অনেক কিছু জানতে পারলাম 🙃
 সত্যেন্দ্রনাথ বসু সম্বন্ধে । 🙏

সবমিলিয়ে ৬৪ সংখ্যা 🤩
 লাগল আমার ভারি বেশ , 🥰
কাব্যখানি আজকে আমি 📝
 করলাম তাই এখানেই শেষ ।।  🪄

আরও পড়ুন 

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া