যেতে যেতে পথে /রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে

রোশেনারা খান
পর্ব ৩ 
       

আমাদের বাড়ির পাশেই নেশারনদাদি থাকত তার একমাত্র  ছেলে ইউনুসকাকাকে নিয়ে। আমরা নেশারনদাদিকে ইনুশদাদি বলতাম। কিছু ধানজমি ছিল। তাতে সংসার খরচ চলত না। তাই দাদির স্বামী গফুর মিয়াঁ গরুরগাড়ি ভাড়া খাটাত। একবার ভাড়া নিয়ে জয়রামবাটী গেছল, ফেরার পথে রাত্রিবেলা চমকাইতলার জঙ্গলে ডাকাতের হাতে পড়ে।  ডাকাতরা ভেবেছিল গাড়িতে বউ-ঝি আছে, সোনাদানা পাওয়া যাবে। কিছু না পেয়ে ওরা গফুর মিয়াঁর ভাড়ার  পয়সা কেড়ে নিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে গরুরগাড়িতে তুলে  দেয়। ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই গফুর মিয়াঁ মারা যায়। সেই থেকে মায়ে-ছায়ে থাকে। দুই মেয়ের আগেই বিয়ে হয়ে গেছল। এসব আমার জন্মের অনেক আগের ঘটনা। সেই সময় এই শ্রেণির মানুষদের খুব অভাব অনটনে দিন কাটত। দাদির একজোড়া হালের বলদ ছাড়া বাছুর গরুও ছিল। তখন ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়া এত সহজ ছিল না। সময়ে পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাঙ্কের লোক বাড়ি থেকে জিনিসপত্র তুলে নিয়ে যেত। দাদিরও তাই হয়েছিল। কৃষিঋণ শোধ করতে না পারায় ওরা দাদির বলদ খুলে নিয়ে গেছল। দাদির উঠোনে গড়াগড়ি দিয়ে সে কী কান্না! দাদির গরুর সঙ্গেই কেন এমনটা হত বুঝতাম না। ১৯ শতকের ৬ এর দশকে সেচের এত সুব্যবস্থা ছিল না। বাবা খিড়কি পুকুরের উচু পাড় কেটে নালা তৈরি করে আমাদের দূরের জমিতে সেচের ব্যবস্থা করেছিলেন। পুকুর পাড়ের ওখানটিতেই মাঠে গরু নিয়ে যাওয়ার ও মানুষ চলাচলের রাস্তা ছিল। তাই যাতায়াতের জন্য ভারি পাটাতন পেতে দেওয়া হয়েছিল। তারই পাশ দিয়ে দাদির একটি বাছুর ঘাড় বেঁকে নিচে পড়ে গিয়ে আর বের হতে পারেনা। দাদি তো কান্না জুড়ে দেয়। বাছুরের মাথা আর ল্যাজ একদিকে হয়ে যাওয়ার কারণে বের হতে পারচ্ছে না। অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে তাকে শেষপর্যন্ত বের করা  সম্ভব হয়।

            সাবান নামক বস্তুটি তখন গরিবদের নাগালের বাইরে ছিল। তারা সোডা দিয়ে জামাকাপড় পরিস্কার করত। দাদির গোয়ালের পাশে পুকুরপাড়ে বেশকিছু কলাগাছ ছিল। কলা হলে বিক্রি করত। এই কলাগাছের শুকনো বাকলের ছাই দিয়ে দাদি কাঁথা-কাপড় সিদ্ধ করত। দাদি একা নয়, অনেকেই ছাই দিয়ে কাপড় সেদ্ধ করত। জঙ্গল থেকে জ্বালানির পাতা নিয়ে আসত। ওরা জানত কোন পাতার ছাইয়ে খার আছে। সেই ছাই ফাটা মাটির কলসিতে তুলে রাখত কাঁথা-কাপড় সেদ্ধ করার জন্য। অভাব থাকলেও, ইনুসদাদি খুব হুজুগে মানুষ ছিল। -কি লো, বলখেলা দেকতে যাবি? সে খেলা হোক বা যাত্রা পালা, দাদি পাড়ার অল্প বয়সি মেয়েদের জুটিয়ে নিয়ে হাজির হত।  তখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল এইরকমই। আর একটা ছোট্ট ঘটনা আজও ভুলতে পারিনি। আবুকাকার জমি-জিরেত কিছু ছিলনা। অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। উনি কোনও কাজও করতেন না। বারিদবরণের মত প্রভাবশালী লোকেদের পেছনে ঘুরতেন। এর ওর দালালি করে যা পেতেন, তা দিয়ে সংসার ঠিকভাবে চলত না। তাই বড় ছেলেকে অন্যের বাড়িতে গরু চরানোর কাজে লাগিয়ে দিয়ে ছিলেন। অভাবের কারনে তিন ছেলে মেয়ের কেউই প্রাইমারি পাশ করেনি। কাকি তখন পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে। ওই বড়ছেলে একদিন একটা আধুলি হারিয়ে ফেলেছিল, তারজন্য কাকি আর বড় ছেলেকে কি মারটাই না মেরেছিলেন।
                 
              আমাদের খিড়কী পুকুরে প্রচুর মাছ হত। পুকুরের অংশীদার জ্ঞাতি-গুষ্টি সবাই। নিতাইকাকা(জেলে)মাছ চাষ করত। শোলার ভেলায় চড়ে মাঝপুকুরে তাই অর্ধেক মাচ্ছ সে নিয়ে বাকি মাছ সবার মধ্যে ভাগ করে দিত। মায়ের ভীষণ হাঁস পোষার শখ ছিল। প্রথমে মুরগী পোষা হত, মুরগির ডিম পাড়া শেষ হলে যখন সে তায়ে বসত, তখন হাঁসের ডিম কিনে তার তায়ে দিয়ে দেওয়া হত। কাকের মত মুরগিও বুঝতে পারত না সে অন্যের ডিমে তা দিচ্ছে। মুরগির ডিম থেকে তিন সপ্তাহে, মানে ২১ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। হাঁসের সময় লাগে একমাস। এই একমাসের মাঝখানে মা ছোট গামলায় জল নিয়ে আস্তে করে ডিমগুলো জলে ছেড়ে দিতেন। নষ্ট ডিমগুলি ডুবে জলের তলায় চলে যেত। আর যেগুলিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে।  সেগুলি ভাসতে থাকত এবং মাঝে মাঝে নড়ে ওঠত।  তখন ভালো ডিমগুলিকে আবার মুরগির তায়ে দেওয়া হত। তিরিশদিন পর হাঁসছানারা যখন ঠুকরে ডিমের খোসা ভেঙ্গে ঠোঁট বের করে, তখন আটার লেই  পালকের ডগায় করে খাওয়ানো হত। আমরা এই কাজটি পরম উৎসাহে করতাম।  ডিম ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা হাঁসেরছানা দেখতে খুব সুন্দর হয় ।  হলুদ আর কালো রোঁয়ার মত নরম পালকে ঢাকা শরীর,  কি সুন্দর হলুদ রঙের পায়ের পাতা! ওদের কয়েকদিন পর ভেজানো  ক্ষুদ খেতে দেওয়া হত।  তারপর পুকুর থেকে শামুক তুলে এনে পাথরে বা কাঠে ছেঁচে ওঁদের খাওয়ানো হত । শামুক  তোলার জন্য পুকুরে তালপাতা ফেলে রাখা হত। স্নানের সময় তালপাতা তুলে দেখা যেত অজস্র শামুক জড়িয়ে রয়েছে।  এই সময়, মানে বেড়ে ওঠার সময় যখন ওদের নতুন পালক গজাতে সুরু করে,তখন হাঁসের ছানাগুলো দেখতে বিশ্রী লাগে। ৬ মাস বয়সে সব পালক  গজিয়ে হাঁস পূর্ণ বয়স্ক হয়ে ওঠে।  অ্যান্ডণ্ডারসনের ‘কুৎসিত হাঁসের ছানা' গল্পের কথা মনে পড়ে। বাচ্চারা যখন ছোট থাকত, তখন উঠোনে চৌবাচ্চা কেটে তাতে জল ভরে হাঁসছানাদের ছেড়ে দেওয়ে হত। ছোট ছোট পায়ে ওদের সাঁতার দেখতে খুব মজা লাগত। মাঝে মাঝে কাক বা চিল বাচ্চা নেওয়ার জন্য ছোঁ মারত।  কখনো বাচ্চা নিয়ে গিয়ে  তাল গাছে বসত, কখনো ছাড়া হয়ে যেত। সেই জ্ঞান হারানো ছানার মাথায় জলদিয়ে মা চাল মাপার বেতের সের বা কটোরা চাপা দিয়ে ওপরে চার আঙ্গুলদিয়ে বাজাতে থাকতেন। ওই আওয়াজে ধিরে ধিরে বাচ্চার জ্ঞান ফিরে আসত।

                আমাদের যে বাড়িটাতে খড়ের ছাউনি দেওয়া ছিল, তাতে প্রচুর চড়াইপাখি তা বানয়ে ডিম দিত, ডিম থেকে বাচ্চা হত। আমি মাঝে মাঝে মই এ চড়ে ওদের তায়ে হানা দিতাম। বাচ্চাদের হাতে নিয়ে দেখতাম। ছোট্ট আটার গুলির মত ছানাগুলোর অনেকেরই তখনো চোখ ফুটত না, গায়ে পালক গজাত না। শুধু হলুদ ঠোঁটের মস্ত হাঁ ফাঁক করে খেতে চাইত। এই পাখিরডিম, পাখিরছানা দেখার নেশায় একবার জবা কাকির জন্য সাপের ছোবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। পাখির ডিমের খোঁজে ছোট্ট একটা কঞ্চি হাতে নিয়ে বাবুইমাঠে ঘুরছিলাম। কয়েকদিন আগেই বাবুই কেটে নেওয়া হয়েছে। বাবুই কেটে নেওয়ার পর অতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সেই নতুন গজানো বাবুইঝাড়ে ছোট ছোট কয়েকটা ডিম দেখতে পেলাম।  হাতের কঞ্চি দিয়ে নাড়তেই একটা ডিম ভেঙ্গে গিয়ে কেঁচোর মত বাচ্চা বেরিয়ে এল। ভেবে পেলামনা কীসের ডিম! হঠাৎ কোথা থেকে মাঝিপাড়ার জবাকাকি আমার হাতটা ধরে টেনে নিয়ে বলে, এ কী করচ তুমি? সাপের ডিম ভাঙ্গচ? চল, বাড়ি চল। আমার হাত ধরে টানতে টানতে মায়ের সামনে হাজির করে বলে, দিদি তোমার বেটি বাবুই মাঠে সাপের ডিম ভাঙ্গচিল। ওখেনে একটা গোখরোসাপ আছে, আমাদের পাড়ার অনেকেই দেকেচে।  সাপটা এসে গেলে কী সব্বনাস হত বল দিকিনি?  সেদিন মা খুব বকা দিয়েছিল।

                গ্রীষ্মকালে যখন মর্নিংস্কুল হত তখন স্কুলঘরের চারপাশটা খুব সুন্দর ভাবে সেজে উঠত। প্রায় মাটি ছুয়ে থাকা মস্ত ছাতার মত বট গাছটার সব পাতা ঝরে গিয়ে কচি পাতায় ভরে থাকত। গাছের তলা বিছিয়ে ঝরে থাকত বকুলফুল। কি সুন্দর গন্ধ! পাশের বাবুই ক্ষেত থেকে বাবুই ছিঁড়ে বকুল ফুলের মাল গাঁথতাম, সুচসুতোর দরকার হতনা। এইসময়ই জঙ্গলে ঝকমকে ডানার কাঁচপোকা পাওয়া যেত। এই কাঁচপোকা দিয়ে আমরা  চরকি বানাতাম। জুতোর খালি বাক্সে কাঁচপোকা পুষতাম, ওরা কুচফলের সাইজের সাদা সাদা ডিম দিত। মা  জানলে বকবে জেনেও কাঁচপোকার নেশায় জঙ্গলে ঢুকে পড়তাম, কিন্তু দেখা পেতাম না। ওরা গভীর জঙ্গলে থাকত।
                                                                                  (ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া