চিনি : পারিবারিক রসায়নে মিষ্টতার ছোঁয়া /রাকেশ সিংহ দেব

চিনি : পারিবারিক রসায়নে মিষ্টতার ছোঁয়া

রাকেশ সিংহ দেব
 
পরিচালনা: মৈনাক ভৌমিক
অভিনয়: অপরাজিতা আঢ্য, মধুমিতা সরকার, সৌরভ দাস, পিঙ্কি বন্দ্যোপাধ্যায়।
মুক্তি - ২৪ ডিসেম্বর ২০২০
রেটিং – 3/5


ছবির শুরুতেই নাম চরিত্র চিনির গলায় শোনা যায় “আমাদের গল্প রোমকম নয়, ফ্যামিলি ড্রামা নয়, রীতিমতো হরর স্টোরি….”। যদিও ছবিতে এক মধ্যবিত্ত মা-মেয়ের সম্পর্কের গল্প বলেছেন পরিচালক মৈনাক ভৌমিক। মিষ্টি (অপরাজিতা আঢ্য) আর তার মেয়ে চিনির (মধুমিতা সরকার) সম্পর্কটা আর পাঁচটা বাঙালি মা-মেয়ের চেয়ে একটু আলাদা। আর সেই সম্পর্কের গোড়ায় থাকা মানুষটি গত হলেও তার অদৃশ্য উপস্থিতি এখনও ছায়ার মতো লেপটে সারা বাড়িতে। যে বাড়ি তার বাবার অত্যাচারে নরকে পর্যবসিত। দমবন্ধ সেই বাড়িতে থাকতে পারেনা চিনি। পেশায় শ্যেফ সুদীপের (সৌরভ দাস) সঙ্গে লিভ-ইন করে চিনি। অফিসে বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন লেখে, বসের বাঁকা কথা শোনে, থেরাপিস্টের কাছে কাউন্সেলিং করাতে যায়। আসলে চিনির জীবনে শান্তি নেই দু’দণ্ড। এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পরেও তার অত্যাচারের আতঙ্ক থেকে মানসিক মুক্তি না পেলেও চিনির মা মিষ্টিও ভাল থাকার পথ খুঁজে নিতে চাইছে নিজের মতো করে। মায়ের সঙ্গে মেয়ের বিরোধ মৃত বাবাকে নিয়ে। বাবার গার্হস্থ্য অত্যাচার মা কেন মুখ বুজে সহ্য করত? সেটা মেয়ে চিনি কখনই বুঝে উঠতে পারেনি। বাবা চলে যাবার পরও মা আবার কেন ভোগে একাকীত্বে, এটাই মেয়ের অনুযোগ। আর এখান থেকেই দু’জনের সংঘাত শুরু। প্রাত্যহিক জীবনের পাশাপাশি সেই বিরোধ ঢুকে পড়ে চিনির পেশায় এবং প্রেমিক সুদীপের সাথে সম্পর্কেও। 

‘চিনি’র চিত্রনাট্য মৈনাক ভৌমিক সাজিয়েছেন টক-ঝাল-মিষ্টির মিশেলে। মধ্যবিত্ত জীবনের চেনা দুঃখ, চেনা সুখই তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। দুই প্রজন্মের পরিচিত বিরোধগুলিকেও হাত ধরাধরি করে হাঁটাতে চেয়েছে পরিচালক। আলো-আঁধারিতে লগ্নজিতার কন্ঠে “তোমার চোখের শীতলপাটি…” গানটির চিত্রায়ণ চোখে  আর সুর হৃদয়ে লেগে থাকে। ছবির টেকনিক্যাল দিকগুলোও বেশ ঝকঝকে, টানটান, ক্ষিপ্র গতিময়। তবে ক্যামেরা চার দেওয়ালের বাইরে তেমন বেরোয়নি, যা একটু ক্লান্তিকর। গল্পে চিনি কেন্দ্রীয় চরিত্রটির প্রতি সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার করা হয়েছে, তবে মিষ্টি পঞ্চাশের দশকে একজন যত্নবান মায়ের অভিনয় করেছেন  - এমন এক মহিলা যাকে মনে হয় তার অত্যাচারী স্বামীর মৃত্যু ডানা গজিয়ে দিয়েছিলো। নিজের মতন করে বাঁচতে শিখিয়ে ছিলো, নিজ পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়ে ছিলো, শোক-ভয় কাটিয়ে সামনে এগুতে শিখেয়েছিলো। মুভিতে অপরাজিতা আঢ্য হয়েছে মা মিষ্টি। তার চেনা রূপে পাওয়া গিয়েছে ছবিতে, যা ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চকিত। মধুমিতা সরকার আবেগের দৃশ্যগুলিতে ভাল, অন্য জায়গায় সামান্য ওভারস্মার্টনেস ছাপিয়ে গিয়েছে তাঁর সহজাত অভিনয়ক্ষমতাকে। তুলনায় সুযোগ কম পেলেও সাবলীল অভিনয়ে নজর কাড়েন সৌরভ দাস। ভাল লেগেছে প্রায় সানাইয়ের ‘পো’ হয়ে ওঠা বেলা মাসির চরিত্রে পিঙ্কি বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সামগ্রিকভাবে, “চিনি” সমস্ত বয়সের একটি পারিবারিক বিনোদনমূলক মুভি। মুভিটি দেখতে চাইলে দেখে ফেলুন হইচই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। 


রেটিং

5 – অসাধারণ
4 – বেশ ভালো
3 – ভালো
2- দেখতে পারেন
1 – না দেখলেও চলবে

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া