শুদ্ধতার অন্বেষণের দিকেই বলিষ্ঠ কব্জি /শংকর চক্রবর্তী

শুদ্ধতার অন্বেষণের দিকেই বলিষ্ঠ কব্জি 

শংকর চক্রবর্তী

প্রায় চল্লিশ বছর আগে যখন পরিচয় হয়, তখন তো তাকে কবিতার মাধ্যমেই এক দিকবদলের কবি হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলেছিলাম। চিঠির আদান প্রদান শুরু হয় সত্তরের প্রথম থেকেই। এবং এই মাধ্যমটি তার গদ্যের সঙ্গে আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেইসব চিঠিপত্রে থাকত কিছু আন্তরিক কথাবার্তা, ছোটো পত্রিকার খবরাখবর বা লেখালেখি সম্পর্কিত কিছু তথ্য। কিন্তু সেই স্বল্প পরিসরে সাহিত্যের সঙ্গে সরাসরি সেতুবন্ধ না হলেও গদ্যের ওই নিরন্তর সাবলীলতায় কখনও অর্ধমনস্কতার সুযোগ ছিল না। আসলে, তখন থেকেই আমার এ উপলব্ধি হয়েছিল যে, একজন প্রকৃত ভালো কবি নিঃসন্দেহে গদ্যেও মুনশিয়ানা দেখাতে সক্ষম। এই মুহূর্তে এমন সার্থক উদাহরণ প্রচুর। এই ভিড়ে তার নামটিও সংযোজিত হবে স্বাভাবিক নিয়মে। তবে এ ব্যাপারে শ্যামলের নিজস্ব দর্শন অজানা থাকলেও, আমার ব্যক্তিগত ধারণা, নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে নিজের অপরিহার্যতা ও একধরনের ঔদাসীন্য তাকে নিয়মিত গদ্য লেখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। যা মোটেও কাম্য নয়। কেননা তার গদ্যের মাধুর্যে আমরা সর্বদাই অনাবিল প্রফুল্লতায় ডুবে থাকতে চাই।

স্বনামে ও ছদ্মনামে বহু গল্প লিখেছে শ্যামল। তাতে কিশোরপাঠ্য যেমন আছে, বড়োদের জন্যেও। ফিচারধর্মী গদ্য লিখেছে অনেক। সম্প্রতি দুটি দৈনিকে সত্যজিৎ রায় ও সন্তোষকুমার ঘোষকে নিয়ে একধরনের ব্যক্তিগত গদ্য পাঠক মহলে চাঞ্চল্য ফেলেছিল। এছাড়া প্রথম দিকে বহু প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের অসাধারণ সব সাক্ষাৎকার নিয়েছিল সে। আমি জানি, এই ধরনের গদ্য লেখার অনুরোধ সে পায় নিয়মিত। যেখানে তার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারটি সীমাহীন। কিন্তু বলাবাহুল্য, তার এই অনীহা বা আলসেমি আমাকেও পাঠক হিসেবে হতাশ করে।

যখন ‘কবিসম্মেলন' পত্রিকাটি আমরা প্রতি মাসে নিয়মিত প্রকাশ করার তোড়জোড় শুরু করি, তখন তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলাম আমি। এবং লক্ষ্য করেছি তার একধরনের আবেগ-আকুলতাও। এবং ওই কাল্পনিক পত্রিকাটি ঘিরে ঘিরে প্রতি মুহূর্তে পরিকল্পনার নানা বুদবুদ ছড়িয়ে দিত আমাদের মধ্যে। আমরাও তখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করতাম। সেই স্বপ্নেরই বাস্তব রূপায়ণ হল ‘কবিসম্মেলন'। শ্যামল তখন সদ্য 'আনন্দমেলা' থেকে অবসর নিয়েছে। আমরা কেউ কেউ তখনও চাকরি করছি। ফলে তার কর্মদক্ষতা ও বৈশিষ্ট্যগুণেই সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পাদকমণ্ডলীর নেতা অর্থাৎ সম্পাদক-এর মর্যাদা পায়। এতসব উল্লেখ করার কারণ একটিই, যা হল, সেই থেকে, সম্পাদকীয় লেখার দায়িত্বটুকুও তার ওপর বর্তায়।

‘কবিসম্মেলন'-এর প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় শুরু হল এইভাবে,

“অজস্র কবি, অঢেল কবিতা। বহুবর্ণ সব কবিতায় আকীর্ণ হয়ে আছে হাজার হাজার সাদা পাতা। বিপুল কবিতা আমাদের সঙ্গে দিনরাত কথা বলছে, জাগিয়ে রাখছে প্রতিদিন ...।"

দ্বিতীয় সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ছিল তার অননুকরণীয় ভঙ্গিতে লেখা প্রথম সংখ্যা প্রকাশ-অনুষ্ঠানের বর্ণময় বিবরণ। সেই শুরু। এবং কত সাবলীল। আসলে যতই বাস্তবতার বিকাশ ঘটুক না কেন, শব্দ ও বাক্যের মাধ্যমে যে মায়ার সৃষ্টি হয় সেটাই পাঠকের পরম প্রাপ্তি। এ যাবৎ লিখিত তার যাবতীয় সম্পাদকীয়, তা বিষয়ের বিচারে মুখ্য হলেও, গদ্যভঙ্গির মায়াজালে আনুষঙ্গিক সবকিছুই তার গুরুত্ব হারায়। তৃতীয় সংখ্যায় শ্যামল তার নিজস্ব ভঙ্গিতে লেখে,

•... আমরা বাংলা কবিতার মোহান্ত বা মাতব্বর নই। এইসব প্যাচপয়জার আমরা করতে পারব না। আমরা কবিতা ভালোবাসি।... আমরা চাই, একশোবার চাই, নতুন কবিরা এই পত্রিকায় দশহাতে লিখুন। এটা তাঁদেরই কাগজ। ভিজে, মিয়োনো, স্যাঁতসেঁতে কবিতা নয়, নতুন কবিদের আরও নতুন তীব্র কবিতায় রঙিন হয়ে উঠুক 'কবিসম্মেলন।

এভাবেই একটি বছর নিয়মিত। তারপর বর্ষপূর্তি সংখ্যার সেই তুখোড়, দলবদ্ধ হাতের ইঙ্গিতবাহী সেই লেখা,

 “আমাদের পায়ের নীচে কোনো মজবুত মাটি নেই, মাথার ওপর নেই কোনো ছাতা বা তাঁবুর
সেই ঠাণ্ডা ছায়া। অভাব আর দারিদ্র্যে মাঝে-মাঝে তছনছ হয়ে গেছে সব অঙ্ক। ভুল অপমান একেকদিন আমাদের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। যখন-তখন আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে বিদ্রূপের তির। মনখারাপ হয়েছে বটে, কিন্তু আমরা ভেঙে পড়িনি, হতাশ হইনি। শিরদাঁড়া সোজা করে আবার নতুন ভাবে ঝলসে উঠছি।..."

আমি লক্ষ্য করেছি যে কোনো লেখার শিরোনাম ঠিক করার ব্যাপারে সে কতখানি দক্ষ সে কবিতাই হোক বা এলেবেলে গদ্য। স্রেফ শিরোনামের জোরে কোনো সাধারণ লেখাতেও অন্য মাত্রা সংযোজিত হয়। আজ পর্যন্ত শ্যামল ঠিক কত লেখকের কবিতা বা গদ্য গ্রন্থের নামকরণ করে দিয়েছে তার হিসেব শ্যামলের নিজের কাছেও নেই নিশ্চিত। তার সম্পাদিত অসংখ্য গ্রন্থগুলিই নিঃসন্দেহে উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এসবই প্রমাণ করে বাংলা ভাষা ও শব্দ করায়ত্ত করার আধিপত্যে শ্যামলের উষ্ণীষ এখনও উজ্জ্বল। কখনও বিশুদ্ধ সংস্কৃত শব্দ কখনও বা একান্ত আটপৌরে, তার বাক্যবিন্যাসের মাধ্যমে ভঙ্গিটিও আমাদের শুদ্ধতার অন্বেষণের দিকে পৌঁছে দেয়। আসলে কবিতায় আদ্যন্ত ডুবে থেকে গদ্যের এই নির্মাণ শ্যামলের কাছে নেহাতই কোনো অলংকারবহুল খেলা নয়, সমগ্রতায় দেশীয় রীতির সঙ্গে সে সম্পৃক্ত। ফলে তার গদ্যের সাবলীলতাটুকুও প্রখর চেতনাবান করে তোলে আমাদের।

শ্যামলের কবিতায় যে রহস্য, চিত্রকল্প ও শব্দের মায়াজাল এবং গদ্যভঙ্গির যে মুনশিয়ানা, তাতে একজন গল্প লেখকের সমস্ত গুণই তার মধ্যে স্পষ্ট হয়। তবু সে গল্প লেখে না। কেন যে লেখে না! শুধু কি অপর্যাপ্ত সময়ই এর প্রধান কারণ ? নাকি এক ধরনের ঔদাসীন্য সর্বক্ষণ মেঘের ছায়ার মতো ঘিরে থাকে শ্যামলকে ? এসবই সত্য। একটি গল্পের কাগজে সঙ্গেও আমি যুক্ত আছি। বারবার শ্যামলের কাছে একটি লেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। আশা ছাড়িনি এখনও। এই লেখাটির মাধ্যমে আরও একবার দুহাত পেতে অপেক্ষায় রইলাম।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া