পদ্মপাতায় শিমুল-৪/সীমা ব্যানার্জী রায়

পদ্মপাতায় শিমুল-

সীমা ব্যানার্জী রায়

মায়ার খেলার অংশ

কখনও কখনও মনে হয় এখনো কিশোরীবেলা অতিক্রম করিনি আমি। কাটিয়ে উঠতে পারিনি মেয়েবেলা। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বরাবরই আমার কিশোরীকাল। সুখ-দুঃখের আলো-আঁধারিতে মাখা অদ্ভুত এক সময়। আসন্ন বর্ষায় যখন আকাশ ছেয়ে যেত পুঞ্জ পুঞ্জ কালো মেঘে, গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে শুকনো মাটি জল পিপাসায় হা-পিত্যেশ করত, আকাশে জমে ওঠা মেঘ দেখে আনন্দ উল্লাসে প্রকৃ্তির মতো, গাছপালার মতো ফেটে পড়তে চাইত তখন আমার বালিকা মন। মেঘ জমা আকাশের তলায় বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে এইরকম একদিন বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিলাম আমি। সঙ্গে ছিল বাল্যসহচরী শেলু। আমরা অপেক্ষা করেছিলাম, বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাটি কার মাথায় পড়ে। কী অদ্ভুত এক নেশা।

মনে নেই, কার মাথায় পড়েছিল। ঘটনাটিও ভুলে গেছি আজ। মনে পড়েছে বুচ কেনেডির এই গান শুনে “রেন ড্রপস ফল অন মাই হেড।” গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাটি যেন আমার মাথায়ই পড়েছে।

-আমাদের দেখতে পেয়ে “গুড-মর্ণিং!” বলে হাত নেড়ে পেছনের বাড়ির বয়স্ক ভদ্রলোক গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করলেন। তাঁর কুকুর হঠাৎ আমাদের দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ শব্দে চীৎকার করে উঠল। তিনি গ্রাহ্য করলেন না, এগিয়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুললেন।

কুকুরটার ঘেউ ঘেউ থেমে গেল। সে লেজ নেড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোকের চারপাশে বার বার ঘুরে তাঁর গাড়িতে চড়ে বসল। মানুষ শখ করে কুকুর পোষে। আর তাকে সন্তানের মতনই স্নেহ করে। কুকুরগুলো তখন শকে শাক্যং সমাচরেৎ। আদরে ওরা খুব ভিতু হয়ে পড়ে। আদরে গোবর বলে না, ঠিক সেইরকম। আমার খুব ইচ্ছে হয় -কুকুর পুষি, কিন্তু বড্ড ভীতু যে আমি। আর তোমার তো কোন শখ-ই নেই।

-- তুমি পারো বটে শিমুল। এর মধ্যে আবার কুকুর!

--গুড-মর্নিং! মিস্টার কুপার। দুজনেই উইশ করল। ওনারা স্বামী স্ত্রী থাকেন আমাদের ঠিক পেছনের বাড়িতে। মেয়ে বিয়ে হয়ে চলে গেছে। মাঝে মেঝেলে বাবা মা এর কাছে আসে।

তখন একটু বেলা হবে বলে সূর্য সাজগোজ, মেকাপ সারছে। পুব দিকে লাল হয়ে উঠেছে। ঠিক মনে হচ্ছে একপেশে একটা টকটকে গাঢ় লাল চাদর পাতা রয়েছে। শিমুলের মন স্মৃতিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে কম্পিউটার টেবিল, চেয়ার, বিছানা আর প্রিয় ব্যালকনির দুনিয়া ছেড়ে। উত্তরে যেতে গিয়ে থমকালো খানিক। উত্তুরে হাওয়া তখন গায়ে কামড় দিচ্ছে, কিন্তু সে তো পাহাড়ের উচ্চতা অতিক্রম করতে চায়নি। সে দক্ষিণে যেতে গিয়েও থামল। পবিত্র নদী কিছুই নেয়না। ফিরিয়ে দেয় লোনা বাতাস, সে বাতাসে খালি দু:খ মিশে থাকে। বেলাশেষের ভায়োলিনে এমনিতেই নুন মিশে থাকে, আর কি হবে অতিরিক্ততায়। সারাটা পশ্চিম জুড়ে নিরুক্ত মরুভূমি। এ নিদাঘ তৃষ্ণায় আরও আর্তি? অসম্ভব। তাই পশ্চিমেও যাওয়া হয়ে উঠল না। পূবে তখন হীরক দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছে সূর্য । পাপবিদ্ধ মধ্যবয়স্কর মতোই মন রওনা দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। কে যেন আসছে কুয়াশা গায়ে মেখে। কে? কে আসছে? দ্রুত চলাচল, চোখে দেখা যায় না এ কুয়াশায়, মুখে কি তাচ্ছিল্যর হাসি? তাই তো মনে হচ্ছে।

--হুম! ফিকশন রিভিলস ট্রুথ দ্যাট রিয়ালিটি অবসকিয়োরস। ভীষণ ভালো লাগছে শুনতে। বিশ্বাস করো। একঘেয়েমি নেই। একটু অন্যরকম। আমি বেশি বাংলা বই পড়ি নি। অনেক কিছু জানতে পারব আশা রাখছি। পলাশ শিমুলের গায়ে ঠেস দিয়ে বলে উঠল। আমি একঘেয়ে নভেল পড়তে ভালোবাসি না। সেই বাড়িতে অশান্তি শাশুড়ি বা শ্বশুর-কে নিয়ে নয়ত স্বামী-স্ত্রীর বচসা, সন্তানের জন্য হাহাকার। ধ্যুস! ভালো লাগে না ওসব আর। তবে তোমারটায় অভিনবত্ব আছে।

--স্মৃতিচারণ! স্মৃতিচারণ! দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছে সে। মন তার বসবার আসন বিছিয়ে দিয়েছে। বুঝলে মশাই,”- শিমুল এইরকম মাঝে মাঝেই পলাশ-কে এই নামে ডাকে।

--নাআআআ, না:! স্মৃতিচারণ আসেনি, ওরা আসে না। ওরা ভাবায়। আমার তো তাই মনে হয় শিমুল। এরা মনখারাপের দিস্তা এনে সামনে ঝপাৎ করে ফেলে দেয়। আর আড়াল আবডাল থেকে লক্ষ্য করে, আমরা ওদের ফাঁদে পড়েছি কি পড়ি নি। বেশ মজার, তাই না?

--আসলে প্রকৃত এ মায়া দর্পণে...মাঝে মাঝে বিছানার বালিশকে টেবিল, টেবিলকে করি বনসাই, আর বনসাইকে বিছানা বানিয়ে উঠে আসি সোওওজা ব্যালকনিতে সক্কালবেলা। আমার মায়ামাখানো স্বপ্নরাজ্যের ব্যালকনিতে। আকাশ তখন ডাক দেয়। হাত মিলিয়ে দি। ডাকে, “আয় আয় মন! ঠান্ডা হবে আয়।” ভাবি, ডানা জুড়ে গেলে ভালো হত। মানুষ কিন্তু প্রকৃত মনপাখিই। দাঁড়ে বসে নড়াচড়া করে, তারপর একদিন পাখি হুউস… ল্যাটিচুড বা লঙ্গিচুড এক রেখে, চলে যাবার আগে বনসাইকে স্পর্শ করে লিখে ফেলে টেবিল, বিছানা বা বনসাই-এ জীবন আর কিছু না, আসলে মায়া। এটা আমিও ভাবি যে, সত্যি! স্মৃতিচারণ আসেনা। এরা মায়ার খেলার অংশ হিসেবে সে নিজেও কিছুটা প্রাকৃত, অপ্রাকৃত। আর মায়া হয়ে গেল, অংশত।

আসলে চরম বলে কিছু কোথাও কখনো ছিল না। সব কিছু মাইক্রোজোম। না... না ক্রোমোজোম। আস্বাভাবিক সব কিছু। চড়াই -উৎরাই এর পথ ধরে আসতে আসতে যখন পিছনের শৈশব-কৈশোর আর যৌবনের দিকে তাকিয়ে দেখি, ভাবি কতদূর পথ এসে গেছি হিপ-হপ খেলতে খেলতে। আসলে আমি ভাবি জীবন অংক আর কেমিস্ট্রির ফর্মুলায় চলে। ভুল করেছ কি সব নস্যাৎ!

--তুমি এক নিঃশ্বাসে কত মনোবিজ্ঞানের কথা বলে গেলে। আচ্ছা! তুমি এত জানলে কিভাবে? সে রকম বই ও তো নেই বাড়ীতে। আমার সত্যি অবাক লাগে তোমাকে দেখে। ফিলজফি নিয়ে পড়লে অনেক নাম করতে।

--এখানকার কলেজে তো ফিলজফি পড়তে হয়েছিল। খুব ইন্টেরেস্টিং বিষয়। নিজের মুখে বলছি দারুণ স্কোর করতাম। জানো নিশ্চয় যে, সকালে গীতা পাঠ করি রোজ। এটা আমার খুব ছোট বেলার অভ্যাস। আর এই গীতাপাঠের সময় শরীরে আর মনে এক আশ্চর্য শিহরণ খেলে যায়। রক্ত সঞ্চালিত হয়, ঢেউ ওঠে। মনে হয় এইটাই তো ভাবছিলাম, এর ব্যাখ্যাই লেখা আছে গীতায়। কাজেই যার গীতাপাঠের উপলব্ধি নেই, সে বুঝবে না। আর কি জানো? মানুষের এই জানার ব্যাপারটা হল ঘড়ির মতন। যতই দম থাক মাঝে মাঝে ঘড়ির কাঁটা একদম থেমে যাবে। আবার দম দিতে হয়। ইট মাস্ট। পরে যা থাকবে তার হিসেব করা ভুল।

আমি ইংরাজি একটা উপন্যাসে পড়েছিলাম যে, উপন্যাস কখনই সফল হবে না যতক্ষণ না ফিলজফি তার ছায়া ফেলছে সেই উপন্যাসে। আমেরিকা এমন একটা দেশ যেখানে কলেজে মেজর সাবজেক্ট পড়লেও চারটে অতিরিক্ত(Core)বিষয় নিতেই হয়। আমি নিয়েছিলাম ইতিহাস, ভূগোল, ফিলজফি, সোসিওলজি। আর নিতে হয় যে কোন ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ, স্প্যানীশ এর সাথে বাংলা ভাষার অনেক মিল আছে তাই, স্প্যানীশ নিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল ফিলজফি নিয়ে পড়ার কিন্তু সায়েন্স-টাকে আমি বেশিরকম ভালবাসি। মনে হয়, আমাদের সব কিছুতেই সায়েন্সের প্রভাব আছে। যদিও এই যান্ত্রিক যুগে, ইচ্ছা থাকলে, কোন কিছুর অভাব বলে কিছু থাকে না।

এই মধ্যবয়সে বিশাল বাড়িতে দেখো তুমি আর আমি ছাড়া আজ কেউ নেই। আর আমি যখন একা থাকি, তখন সেই পিছনের ছোট ছোট ছবিগুলো মাঝে মাঝে এসে “পিক্কা বু উউউ” খেলে যায়। পারি না তো তখন তাদের বলতে যে, এখন আর খেলার বয়স নেই রে। তারা বলবে জানা আছে, 'বয়স নেই তো কী। দেখতে তো বাধা নেই।' তাই দেখি, ছোট ছোট সব পাল তোলা নৌকা। ভেসে ভেসে একবার উঠছে আবার একবার নামছে। ঠিক কাগজের নৌকোর মতন গা ভাসিয়ে হেলেদুলে বেড়াচ্ছে। ডুবছে না কিন্তু।

--আমরা কি দোলনায় বসব শিমুল? অনেকক্ষণ তো দাঁড়িয়ে আছি। পা -টা ব্যথা করছে। যদি অনুমতি দাও অবশ্য। কথার মাঝখানে ফস করে বলে বসল পলাশ।

--পা ব্যথা করবে না? হাঁটো না মোটেও। চলো চলোও। দোলনার সামনে একটা কাঁচের টী টেবিল এ লেবু, দারচিনি গুঁড়ো ও মধু সহযোগে গ্রীণ টী আর দুটো লেমন কেকের পিস শিমুল আগেই রেখে গিয়েছিল। দুজনে পাশাপাশি বসল প্রভাতের ফর্সা ফুটফুটে সাদা দিনের দিকে তাকিয়ে... রঙিন প্রজাপতিদের ফুলে ফুলে 'হ্যালো -হাই-ওলা' করা তাকিয়ে দেখছে শিমুল। মেঘ সরে গেছে এখন। ঝকঝকে আকাশ।

--জানো তো প্রজাপতি হতে ইচ্ছে হয়। ওদের তো কোন ঘর থাকে না। ওদের কিন্তু বাসা বা ঘর বলতে এই সুন্দর সব রঙের ফুল। তাই তো শীতকালে এদের দেখা যায় না।

--কি সব ভাবো রাতদিন বলো তো? শিমুলের পিঠে একটা হাত আরেকটা হাত ওর হাতের মধ্যে গুঁজে বলে উঠল পলাশ। দোলনা মৃদু দোল খাচ্ছে। পাখিগুলোর কিচিরমিচির যেন এক একটা গানের সুর, তান, লয় হয়ে চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।

--ভাবি না তো, কিচ্ছু ভাবি না। তবে ভাবায় একাকীত্ব! এটা একটা সায়েন্টিফিক এক্সপিরিয়েন্স। কেমন করে এতগুলো বছর হামাগুড়ি দিয়ে পেরিয়ে এলাম। জিগজ্যাগ খেলতে খেলতে কেমন করে পূর্বদিকের ওঠা সূর্যের সাথে সাথে সারাদিনের ক্লান্তি মেখে কিভাবে পশ্চিমদিকে হেলে পড়ছি ...তাই না গো।

 ম্যাগ্নোলিয়া জীবন

তুমি জিজ্ঞেস করছিলে, না:? কি ভাবছি? হুম... ভাবছি আজ থেকে একটু একটু করে “ম্যাগনোলিয়া লাইফ”-এর গল্প বলি। সামান্য সেই ম্যাগনোলিয়া জীবনের গল্প। কিন্তু যদি অন্য দিক থেকে দেখো, ভাববে কত জটিল, কত ইকুয়েশন এ ভরা হয় মানবজীবন। কত রকম মানচিত্রে এই সব আনকমন ইকোয়েশনদের স্থান। শোনো না, মনটা তাহলে একটু হালকা হয়। পলাশের হাতে হাত রেখে ছলছল চোখে বলে উঠল শিমুল। আর তো কারুকে শোনানো যাবে না। কেই বা শুনবে আমার আলুকশালুক কথা। মেয়েরা তো বিয়ের পর আলাদা হয়ে যায়। ভাই বোন সবাই তখন পাড়া পড়শি। আজ বুঝি মা বাবাই হয় একমাত্র কাছের মানুষ। অনেক আগে থেকে আমি তো সেই থেকেও বঞ্চিতা । একটা কাঁপা গলায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিমুল পলাশের দিকে তাকিয়ে বলল। চোখের কোলে কাঁচের মত জল টলটল। সকালের রোদ্দুর একটু একটু করে সাদা হচ্ছে, ফার গাছগুলোর ছায়া পড়ে একেবারে মায়াবী পরিবেশ তৈরী করেছে।

--বেশ তো বলো না...শুনি। গান ধরল পলাশঃ “তোমার খোলা হাওয়ায়, আমি ডুবতে রাজি আছি-আমি ডুবতে রাজি আছি।” মন খারাপ না করে আমায় বলো। এই সময় তো তাই সাথির দরকার হয় আর আমি তোমার সেই সাথি, যা আজীবন থাকব। কিছু মানুষ আছে বোকা, তাই তারা এই মধ্যগগনে এসে সাথি পালটায়। পলাশ এবার একটা হাত দিয়ে শিমুলের কপালের কোঁকড়ানো চুলগুলো সরিয়ে দিল। 'ডু ইয়োর বেস্ট ডিয়ার।' সকালের রোদের আলো শিমুলের মুখে এসে কেমন যেন একটা গোলাপি আভা ছড়িয়ে দিল সারা গাল জুড়ে। এখনও পলাশের স্পর্শে শিমুল রঙ্গিন হয়।

পলাশ উঠে শিমুল-কে বলল: “চা তো খাওয়া হয়ে গেল, এইবার চলো সামনের ব্যালকনিতে গিয়ে বসি। লন মোয়ার আসবে, শেষে আমাদের সাড়া না পেয়ে টেরেন ফিরে যাবে। ক্যাল-ডে-স্যাক এ বেশ আগাছা জন্মেছে, দেখলাম। সেগুলো পরিষ্কার করলে দারুণ লাগবে । তাই না? ও মাল্চ নিয়ে আসবে কথা দিয়েছে। দেখা যাক।”

--টেরেনের কাছে তো গেট খোলার চাবি আছে। আমরা এই লোকটাকে ভালো পেয়েছি কি বলো? সব কালোরাই কি আর খারাপ হয় নাকি? আমাদের ভ্রান্ত ধারণা যে, কালোরাই খালি খারাপ। ওরাও তো মানুষ। বলা উচিত নয়, তবে ঠাকুর ওদের কাউকে কাউকে বড্ড যেন কেমন সৃষ্টি করেছেন। তাই মাঝে মাঝে ভয় লাগে। তবে টেরেন তো নাইজিরিয়ান। প্রায় সাড়ে ছ ফুট লম্বা, বলো। সোজা একেবারে। নাইজিরিয়ানরা অনেকটা ভারতীয়দের মতো। ওরা যৌথ পরিবার পছন্দ করে। টেরেন থাকে তার স্ত্রী, এক মেয়ে, দুই ছেলে আর এক হ্যান্ডিক্যাপ ভাই কে নিয়ে। গরমকালে ঘাস কাটে আর স্কুল বাস চালায়। খুব হাসিখুশী আর পরোপকারী যাই বলো। আমাকে একদিন ওর বাড়ির গল্প করছিল।

--তাই তো ওকে বিশ্বাস করে গেটের চাবি দিয়ে রেখেছি। আমাদের বাগান নিয়ে চিন্তা করতে হয় না, একদম। তাও চলো সেখানেই গল্প হবে। তুমি অনেক রসদ পাবে।

--ইয়ার্কি মারছ? বলে এইবার শিমুল পলাশের পিঠে একটা ভালোবাসার ছোট্ট করে চাঁটি দিল। তারপর দুজনে হেঁটে এসে সামনের ব্যালকনিতে গিয়ে বসল।

শিমুল নিখুঁত করে সাজিয়েছে এই বাড়ি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম দেয় তার বাড়ির। বসন্তকালের নাম “ম্যাগ্নোলিয়া”, গরমকালে “বেলি”, হেমন্তকালে “গোলাপ” আর শীতকালে “ড্যাফনে ওডোরা।” আইরিশ পেন, অরিগ্যামি মিক্স, ড্যাফনে ওডোরা, ডোয়ার্ফ গোলাপ, প্যান্সি, লেস্লি, পেচক পেওনি কত অদ্ভুত সব ফুলেদের ভিড়। সামনে ফুলের আর পেছনে প্যাটিও তে টবে টবে স্যালারি, লংকা, লেটুস, বেলপেপার, শিম, উচ্ছে, বেগুন, ক্যানটালুপের সব গাছ। পেছনের বাগানে আরও আছে। আছে পাখিদের থাকার, খাবার আর জল খাবার জায়গা আর আছে তাদের দোলনা। সকালের আলো পরিষ্কার হয়ে এসেছে। গাছপালার উপর ঝিকমিক করে জ্বলছে...উফ! যেন একটা নিখুঁত রোমান্টিক ধারা। ঐ দেখো! টেরেন এসে গেছে, ওর সব জিনিসপত্র নামাচ্ছে। দেখো দুই ছেলেকে সাথে করে নিয়ে আসে কিন্তু। ভালো লাগে দেখতে, তাই না?

ওদের দেখে টেরেন ও একগাল হেসে 'গুড-মর্নিং' বলল। শিমুল ব্যালকনির রেলিং এ ঠেস দিয়ে টেরেন কে ওপর থেকেই সব বুঝিয়ে দিল। বড্ড ভালো লোকটা।

--তোমার কাছে কে খারাপ জানি না। তোমার এই সরল ব্যবহারের জন্য সবাই ভালবাসে। এটা মানতেই হয়। কলকাতায় গিয়ে ম্যান্ডেভিলি গার্ডেন্সে তোমাদের বাড়িতে যে মেয়েটা কাজ করত, তার মুখে শুনলাম তোমায় কী ভিষণ ভালোবাসত। কত কাঁদছিল তোমায় দেখে। ওকে নিয়ে আসতে বলছিল। অদ্ভুত লাগে কিন্তু। মা-কেও বলছিলাম। শেষে তো আমাদের সাথে এল ছোট ভাই চঞ্চলের বাড়ি।

--হ্যাঁ, ওকে আমি কখনই কাজের মেয়ে ভাবতাম না। আমাদের বাড়িতেই থাকত। ম্যান্ডেভিলিতে 'জয়-জয়ন্তী'-এর দো তলা থেকে বারো তলার ফ্লাটের সবাই বলত আমি নাকি ওর স্বভাব খারাপ করে দিচ্ছি। সব কাজ সেরে সে যদি পুরানো শাড়ি কেচে কুচে ইস্ত্রি করে সুন্দর ভাবে পরে বিকেলে গল্প করতে বেড়োয় দোষ কি আমার? তুমি বলো? আহারে নিজেকে 'ইস্মিতা পাটিল' বলত। সেও তো মেয়ে তাই না? তারও শখ সৌখিনতা থাকতে পারে। কিন্তু আমরা বুঝি না-বুঝতে চেষ্টা করি না। ওপর-নীচ স্বভাবটাকে মুছতে পারে না মানুষ। এদেশে কিন্তু তা নয়, লক্ষ্য করেছো? অনেক কিছু শেখার আছে এদেশ থেকে।

--এখন আমার সব বড় ভাই বোনেদের তো বয়স বেড়েছে । নাতি, নাতনি, ছেলে, মেয়ে, বউ, জামাই নিয়ে ঘোরতর সংসারী সবাই। আমিই শুধু পারলাম না সংসারী হতে। এখনো সেই পনেরো বছরের কিশোরী মন নিয়ে বুড়ি হতে চললাম। না, ভুল বললাম, আমি বুড়ি হই নি। আমি বুড়ি হতে চাই না। সবাই বলে আমি বুড়ি হব না। তাই তো আজও পাখির ডাক, ঝরাপাতা, জঙ্গলের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, নদীর কলকলানি, ঝরনার উচ্ছলতা, পাহাড়ের মৌনতা, সাগরের উদ্দামতা আর রঙিন প্রজাপতির ফুলেদের সাথে ফিসফিসানি আমাকে পাগল করে দেয়। সত্যি বলছি, আমি পালাতে চাই এই গম্বুজ, লোহা, কাঠ, কংক্রিটের জগত থেকে। আমি ছুঁতে চাই সরলতা, বন্যতা, নির্জনতা, স্বাভাবিকতা, সুন্দরতা ঠিক আগের মতন করে। আমি প্রকৃতির মাঝে নিজেকে মেলে ধরতে চাই, একদম নিজের করে। নিজের মধ্যের আমিকে খোঁজার অনন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাই সর্বক্ষণ। অনেক কথা বললাম, এইগুলো না বললে তো পটভূমিকাকে হেনস্তা করা হবে। দেখবে পৃথক হয়েছে শেডট্রির সারি- ফ্রেদ্রিচ এর ভাষায় বলি: “বিলিভ ইন ফর্ম, বাট ডিসবিলিভ ইন কন্টেন্ট- দ্যাটস হোয়াট মেকস অ্যান এফোরিজম চার্মিং নভেল।”

কি গো-কি মনে হচ্ছে? কার পাল্লায় পড়লাম রে বাব্বাঃ? ঠোঁট টিপে হেসে উঠল শিমুল। এইবার শুরু করি শিমুলের জীবনকে ফিরে দেখা......কি বলো? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতা দিয়েই শুরু করি...
"বিধাতা যেখানে অধিকার বেশি দিয়াছেন
সেইখানেই দুঃখ এবং পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন করিয়াছেন।" আমি বিশ্বাস করি জীবনদেবতার সঙ্গে জীবনকে পৃথক করে দেখলেই দুঃখ, আর মিলিয়ে দেখলেই মুক্তি।
(চলবে)


জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া