রাশিয়ায় নববর্ষ / বিজন সাহা

রাশিয়ায় নববর্ষ 

 বিজন সাহা 

আমার জন্ম বাংলাদেশের গ্রামে এক ব্যবসায়ী পরিবারে। তাই নববর্ষ আমার জন্য ছিল হালখাতা। পয়লা বৈশাখ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খদ্দেররা আসত পুরনো বাকি শোধ করে নতুন করে হিসেবের খাতা খুলতে। সে সময় শুধু মানিকগঞ্জ নয়, অনেক দূর দূরান্ত থেকেও লোকজন আসত আমাদের কাছে রং করা সুতা কেনার জন্য। তাই হালখাতা করা হত বেশ জাঁকজমক করে। গুদামে গনেশের মূর্তির সামনে থাকত বিশাল পিতলের থালা। সেখানে আমরা টাকা রেখে দিন শুরু করতাম। সারাদিন একের পর এক লোকজন আসত। খাবার মেন্যু ছিল দই, মুড়ি, মুড়কি, মিষ্টি এসব। সেই সময়ে এটাই ছিল আমাদের একমাত্র নববর্ষ। পয়লা জানুয়ারি নববর্ষ হলেও সেটা ছিল স্কুলের প্রথম দিন। কোন ছুটি ছিল না, ছিল না এ নিয়ে কোন আনন্দ উৎসব। তাই ১৯৮৩ সালে মস্কো আসার আগে পর্যন্ত পয়লা জানুয়ারি ছিল আর দশটা দিনের মত। 

ছাত্রজীবনে নববর্ষ পালন সাদামাটা না হলেও আহামরি কিছু ছিল না। প্রথমত এই সময়টা ছিল পরীক্ষার সিজন। অনেকেরই পরীক্ষা হত দোসরা জানুয়ারি। তাছাড়া সবাই চেষ্টা করত এটা নিজেদের ইয়ারমেট অথবা বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে পালন করতে, যদিও এর পর আমরা একে অন্যের ওখানে যেতাম, ঠিক যেমনটা বিজয়া দশমী, ঈদ বা নববর্ষের পরে বাড়ি বাড়ি যেতাম কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখ করতে। ১৯৮৪ সালের পয়লা জানুয়ারি  মস্কোয় আমার প্রথম নববর্ষ – সেটা আমরা প্রিপারেটরির বন্ধুরা মিলে করি আর এর পর ঘুরতে যাই বিভিন্ন ব্লকে। পরের বছর টেক্সটাইলের হোস্টেলে শাহীনের ওখানে জালাল, আনোয়ার আর আমি নববর্ষ পালন করি। ১৯৮৬ সালে আমাদের আড্ডা চলে দীপুর প্রথম মেডিক্যালের হোস্টেলে। এরপর থেকে আমার ঘরেই আড্ডা জমে দুই নম্বর ব্লকের বাংলাদেশি ছেলেদের নিয়ে। এ সময় রুশ বন্ধুরা প্রায় সবাই বাড়ি চলে যেত, তাই হোস্টেল ছিল আমাদের মানে ল্যাটিন, আফ্রিকান আর এশিয়ানদের দখলে। অনেক সময় আমাদের নববর্ষ পালন শুরু হত কারও না কারও জন্মদিন পালনের মধ্য দিতে। অমলের জন্মদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর। সারা রাত হইচই, নাচানাচি, খাদ্য আর পানীয়ের বন্যায় ভেসে ঘুমুতে যেতাম ভোর সকালে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটত সারাদিন আর সন্ধ্যার যখন ঘুম ভাঙ্গত চলে যেতাম মস্কো পাওয়ার ইনস্টিটিউট বা মেই এর হোস্টেলে। মঞ্জু ভাইয়ের জন্মদিন পালন হত বেশ ঘটা করে। আমাদের অনেকের জন্য নতুন বছরে এটাই ছিল খাবারের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ। 

তবে সত্যিকার অর্থে নববর্ষ পালন আমার শুরু হয় ১৯৯৫ সালে যখন ফ্যামিলি লাইফ লীড করতে শুরু করি মস্কো শহরে। আর তখনই বুঝি নববর্ষ মানে বন্ধুদের নিয়ে বিভিন্ন রকমের ওয়াইন বা ভোদকা খাওয়া নয়, এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা অনুষ্ঠান – সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়ার সবচেয়ে বড় পারিবারিক অনুষ্ঠান। উল্লেখ করা যেতে পারে যে সোভিয়েত ইউনিয়নে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করত খুব অল্প সংখ্যক মানুষ, মূলত বৃদ্ধারা। সারা বছরে হাতে গণা কয়েকটা মাত্র সরকারি ছুটি ছিল – ১ জানুয়ারি নববর্ষ, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ১ মে – মে ডে, ৯ মে ভিক্টরি দিবস, ৭ নভেম্বর অক্টোবর বিপ্লব দিবস। নববর্ষ বাদে আর সবগুলো অনুষ্ঠান ছিল কমিউনিস্ট পার্টি বা বাম আন্দোলনের সাথে জড়িত, বিজয় দিবস ছিল সার্বজনীন, তবে পারিবারিক নয়, যদিও এ দেশের খুব কম পরিবারই ছিল যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কাউকে  না কাউকে হারায়নি, ফলে এসব অনুষ্ঠান ছিল কমবেশি রাজনৈতিক। একমাত্র নববর্ষই ছিল এসবের বাইরে, সার্বজনীন আর একান্তই পারিবারিক, যখন পরিবারের সবাই একত্রে মিলিত হয়, আগত বছরে একে অন্যের সুখ ও শান্তি কামনা করে। আসলে ছাত্রজীবনে আমাদের পরিবার ছিল না, বন্ধুরাই ছিল পরিবার – তাই এ নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা ছিল না। আমার ধারণাও ছিল না। যদিও আমার ঘরে ছোট্ট একটা ইয়ল্কা বা ক্রিস্টমাস ট্রি সাজাতাম প্রতি বছরই, সেটা ছিল জাস্ট ফর্মালিটি। এটা অনেকটা ঈশ্বরে বিশ্বাস না করে পূজার মণ্ডপে গিয়ে লাফালাফি করা, আনন্দ ফুর্তি করার মত। ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মত নববর্ষ পালন করলাম আমার স্ত্রী গুলিয়ার লেনিনস্কি প্রস্পেক্টের বাসায় একেবারে রুশ স্টাইলে। বেশ কয়েকদিন আগে বাজারে গিয়ে জ্যান্ত ক্রিস্টমাস ট্রি কিনে নিয়ে এলাম। অনেক সময় নিয়ে সেটাকে সাজানো হল নানা রকম খেলনা দিয়ে। কিছু নতুন খেলনা আর সেই সাথে অনেক পুরনো, যার কোনটা গুলিয়ার দিদিমার দেওয়া। আসলে জেনারেশনের পর জেনারেশনের কাছে এই খেলনা হস্তান্তর করা এক ধরণের রীতি। সে সময় খেলনা তেমন একটা পাওয়া যেত না, সেটাও কারণ হতে পারে। তবে আমাদের বাসায় এখনও সেই সময়ের কিছু খেলনা রয়ে গেছে, অতি সাধারণ হলেও এদের মূল্য আমাদের কাছে অনেক। দেশে সাধারণত গয়নাগাটি উত্তরাধিকার সূত্রে দেওয়ার প্রচলন আছে, তাই বলে খেলনা? আমাদের বাড়িতে শুধুমাত্র আমার ছোটবেলার খেলনাগুলো এখনও সেভাবেই রয়ে গেছে। সেটা দিদির কল্যাণে আর আমি দেশ ছেড়ে চলে এসেছি বলে। 

১৯৯৬ সালে গুলিয়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে দুবনা চলে এলে নববর্ষ পালনেও নতুনত্ব আসে। তখন আমাদের বাসায় ইওল্কা বসানো হত ২৫ ডিসেম্বর, আমার জন্মদিনে। বলতে গেলে সেদিন থেকেই বাসায় মেলা মেলা ভাব। এই সময় আমরা থাকতাম লেসনায়ায় একটা কটেজে একেবারে বনের ভেতর। তাই সমস্ত পরিবেশটাই ছিল রূপকথার মত।  ১৯৯৮ সালে ক্রিস্টিনা আর ২০০৩ সালে সেভার জন্মের পর অনুষ্ঠান আকারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৯ সালে আমরা চলে আসি পন্তেকরভ ৫ এ, অন্য বাসায়। আগের বাসা ছিল কটেজ, এখন ফ্ল্যাট। তবে বাচ্চাদের সংখ্যা বাড়ায় আগের ছোট ইয়ল্কার জায়গায় এল বড় ইয়ল্কা। বাসার পাশে ইওল্কার বাজার বসে ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ থেকেই। সেখানে যাই, মোটামুটি এক থেকে দেড় মিটার উঁচু ইয়ল্কা কিনে আনি। এক মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে উঠে। শুরু হয় ইয়ল্কা সাজানো। এর আগে তাকে বসাতে হয় উপযুক্ত জায়গায়। প্রথম দিকে বালতিতে বালি ভরে সেখানে ইয়ল্কা বসাতাম, পরে ইনস্টিটিউটের মিস্ত্রিদের দিয়ে কাঠের কাঠামো তৈরি করে নিয়েছিলাম। এরপর চারিদিক থেকে সুতা দিয়ে সেটা বাঁধতাম যাতে বাচ্চাদের অত্যাচারে পড়ে না যায়। এরপর শুরু হত লাইটিং। রংবেরঙের বাল্বের কয়েক মিটার লম্বা তার দিয়ে পেচাতাম ওকে। তার আগে অবশ্য টেস্ট করে নিতাম ওটা কাজ করছে কিনা। না করলে বাল্ব বদলাতাম, কখনও নতুন কিনতাম নতুন আলোর মালা। তারপরেই শুরু হত খেলনা ঝুলানো। কখনও মস্কো যেতাম নতুন নতুন খেলনা কিনতে। নববর্ষ তো নয়, এ যেন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল বাচ্চাদের চোখ এড়িয়ে এক সময় ইয়ল্কার নীচে উপহার সহ বিভিন্ন প্যাকেট লুকিয়ে রাখা। এর আগে ওদের সান্টা ক্লাউসের রুশ ভার্সন দেদুশকা মারোজের কাছে চিঠি লিখতে বলতাম কি চায় সেটা জানিয়ে। আর সেটা জেনে নিজেরা সাধ্যমত সেসব উপহার আর চকোলেট সহ থলে রাখতাম ইয়ল্কার নীচে। নববর্ষ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতাম, নেমে আসত অন্ধকার যাতে দেদ মারোজ ঘরে এসে উপহার রেখে যেতে পারে। তারপর এক ফাঁকে আমি বা গুলিয়া অন্ধকারে ঘরে ঢুঁকে থলেগুলো রাখতাম। কখনও কখনও এটা করতাম দেদ মারোজের পোশাক পরে। নববর্ষকে বরণের কাজ শুরু হত সেদিন সকাল থেকেই। বিভিন্ন রকমের রান্না, টেবিল সাজানো আরও কত কী! আর সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হত পুরাতন বছরকে বিদায় জানানোর পালা। বারোটা বাজলে নববর্ষ বরণ করে নিতাম, বড়রা শ্যাম্পেন দিয়ে, ওদের জন্য থাকত বাচ্চাদের শ্যাম্পেন (ঐ রকম বোতলে কোক জাতীয় পানীয়) বা ফলের রস। তারপর সবাই মিলে যেতাম সেই ঘরে যেখানে ইয়ল্কা বসানো। ওদের বলতাম অন্ধকারে দেদ মারোজ এসে সেখানে উপহার রেখে যাবে। এই সময়টা মনে হয় বাচ্চাদের চেয়েও আমরা বেশি উত্তেজিত হতাম। অনেক খুঁজে বের করতাম থলেগুলো। চেষ্টা করতাম ওরা যেন এই রুপকথায় বিশ্বাস করে, ওরাও যেন স্বপ্ন দেখতে শেখে। এটাই মনে হয় হোস্টেল লাইফের নববর্ষ থেকে বাসার, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের নববর্ষের প্রধান পার্থক্য। দু এক বার সত্যিকার দেদ মারোজকেও বাসায় ডেকেছি। এরা পেশাদার কেউ নয়, আমাদের কলিগদের কেউ দেদ মারোজের পোশাকে আসত আমাদের বাসায়। এই ইয়ল্কা অবশ্য নববর্ষের আগমনের সাথে সাথেই বিদায় নিত না। আরও অনেক দিন পর্যন্ত আমাদের ঘর সুগন্ধে ভরিয়ে রাখত। যদিও আমরা রেগুলার ওর গোঁড়ায় জল ঢালতাম, একসময় ও ধীরে ধীরে সমস্ত কাঁটা হারিয়ে ন্যাড়া হয়ে যেত। তখন আমরা সেটা অনেক যত্ন সহকারে নীচে রেখে আসতাম। আরেকটা কথা না বললেই নয়, সেটা হল ৩১ ডিসেম্বর নববর্ষকে বরণ করার মধ্য দিয়েই আমাদের উৎসব শেষ হত না। পয়লা জানুয়ারি আগের রাতের উৎসবের আমেজ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২ তারিখে সেভার জন্মদিনের আয়োজন হত। এটা অবশ্য যোগ হয়েছে ২০০৩ সালে সেভার জন্মের পর থেকে। তখন অনুষ্ঠান আর পারিবারিক থাকত না, বন্ধুদের নিয়ে আমরা সেটা পালন করতাম। এরপর ৭ জানুয়ারি আসত রুশ অর্থোডক্স চার্চের ক্রিস্টমাস বা রদঝেস্তভো। সেদিন আবার নতুন করে বাচ্চাদের জন্য উপহার রাখা হত ইয়ল্কার নীচে, আবারও ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে। তবে এবার কোন থলেতে নয়, শীতের জুতা বা সাপাগির ভেতরে। আবার আতশবাজি পুড়ত ঘরে। ওদের সাথে সাথে আমিও ফিরে যেতাম সেই ফেলে আসা ছোটবেলায়। তবে এখানেই শেষ নয়। এ দেশে আরও একটা অদ্ভুত উৎসব আছে, ওল্ড নিউ ইয়ার বা পুরানো নববর্ষ। এর আগমন ১৩ জানুয়ারি রাতে, কারণ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গ্রেগরিয়ান ১৪ জানুয়ারি হল পয়লা জানুয়ারি। স্বাভাবিক ভাবে এদেশে সেই দিনও আমরা সবাইকে অভিনন্দন জানাই আর বাড়ির সবাই, বিশেষ করে বাচ্চারা উপহারের অপেক্ষা করে।   
তবে এসব ঘরের কথা। এ সময় বাইরেও বিভিন্ন প্রোগ্রাম থাকত, বিশেষ করে ছেলেমেয়েরা যখন ছোট ছিল। এ দেশে বাচ্চারা স্কুলে যায় ৭ বছর বয়সে, একেবারে দ্বিতীয় শ্রেণিতে, তাও যদি সেপ্টম্বরের আগে কারও বয়স পূর্ণ ৭ হয়। জানি না এখনও সেটা আছে কিনা, তবে আমার ছেলেমেয়েরা যখন পড়ত তখন এই ব্যবস্থায়ই ছিল। বাচ্চারা কমবেশি হাঁটতে শিখলেই ওদের দেওয়া যেত ইয়াস্লি বা বেবী গ্রুপে। সেটা ওদের বয়স যখন দুই। অনেক বাবা মা দুজনেই যেহেতু চাকরি করেন তাই এই ব্যবস্থা। চার বছর বয়স থেকে কিন্ডার গারটেন, যেখানে শিশুর বয়স ছয় হলে সে প্রথম শ্রেণির ক্লাস শুরু করত। তবে এ সবই খেলাচ্ছলে। অক্ষর জ্ঞান শুরু হত আগে থেকেই, অনেক সময় বাসায়। লেখা শুরু হত পরে। আমার ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করেছে কিন্ডার গারটেনে আর সেই সংলগ্ন স্কুলে। ফলে ওরা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে আর চতুর্থ শ্রেণি এখানে শেষ করে পঞ্চম শ্রেণিতে গেছে স্বাভাবিক  স্কুলে। তবে আন্তন আর সেভার স্কুল শুরু হয়েছে সাধারণ স্কুলে মস্কোয়, মনিকা আর ক্রিস্টিনার দুবনায়। যাহোক, এসব স্কুলে পড়াশুনার সাথে সাথে অন্যান্য বিভিন্ন সাবজেক্ট ছিল, বছরে অনেকগুলো প্রোগ্রাম হত। নববর্ষও বাদ পড়ত না। ফলে সে অর্থে নববর্ষের তোড়জোড় শুরু হত আরও আগে। এসব অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ওদের বিভিন্ন রোল থাকত আর সে অনুযায়ী পোশাক তৈরি করতে হত। গুলিয়া নিজে বাসায় এসব তৈরি করত। সেলাই মেশিন ছিল, বিভিন্ন কাপড় কিনে নিজ নিজ ফ্যান্টাসি দিয়ে তৈরি হত বিভিন্ন রকমের পোশাক। এ ছাড়াও মিউজিক স্কুল, আর্ট স্কুল এসব জায়গায়ও ছিল নিজ নিজ প্রোগ্রাম। এক কথায় ডিসেম্বরের শেষ ভাগটা ছিল প্রোগ্রাম দিয়ে ঠাঁসা। একদিকে বছরের শেষ, নিজের কাজের চাপ, তার উপর বাচ্চাদের একের পর এক অনুষ্ঠান। ফলে এ কয়দিনে নাভিশ্বাস উঠে যেত। তাছাড়া সে সময় ওদের নিয়ে বনে ঘুরতে যাওয়া তো ছিলই। কখনও স্কি, কখনও সানকি বা স্লেজ নিয়ে উঁচু ঢিবি থেকে নীচে নেমে আসা। একবার, সেভার বয়স তখন চার, নামছে তো নামছেই। সামনে পাইন গাছ। ওটার সাথে ধাক্কা লাগলে নির্ঘাত হাত পা ভাঙ্গবে। আমি চিৎকার করে ওকে বলছি ওর তিন চাকার সাইকেলের মত স্নেগোকাত ঘুরাতে। এ সবই ঘটছে খুব দ্রুত। ও শুনছে কিনা বুঝছি না। আমার আত্মারাম একেবারে খাঁচা ছাড়া হওয়ার উপক্রম। গাছের ঠিক মিটার দেড়েক আগে হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে সেভা অন্য দিকে চলে গেল। আমিও দম ফিরে পেলাম। এর পর থেকে খুব ভয় পেতাম ওদের নিয়ে ওখানে যেতে।     

২০০৯ সালে গুলিয়া বাচ্চাদের নিয়ে মস্কো চলে গেলে আমি হলাম ছুটির দিনের পাপা, মানে ছুটির দিনে যেতাম ওদের ওখানে। শুরু হল নতুন জীবন। বাসা দুবনার তুলনায় বেশ ছোট, তাই ইয়ল্কা ছোট হয়ে গেল। তবে এখানে অন্য ধরণের ঘোরাফেরা বাড়ল যার একটা ছিল ক্রেমলিনের ইয়ল্কায় যাওয়া আর রেড স্কয়ারে ঘোরা। সে এক অন্য জগত। তবে বিভিন্ন কারণে এসব নববর্ষে বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটত। ২০১০ এর নববর্ষে আমার মস্কোর চাবির গোছা পরে গেল লিফটের মাইনে। সেটা ছুটির সময়, অনেক কষ্ট করে, এক জনকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে ওটা তোলা হল। তবে সব চেয়ে ঝামেলায় পড়েছিলাম ২০১১ সালে। নববর্ষ শেষ। ২ জানুয়ারি বন্ধুদের ডেকেছি সেভার জন্মদিনে। দু একজন ইতিমধ্যে চলে এসেছে। আরও দু একজন দরজার বাইরে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ কী যে ঘটল, দরজা খুলতে পারছি না। কি করা? কি করা? এক বন্ধু বলল কিছুদিন আগে সে এই বিপদে পড়েছিল, তখন এক কোম্পানির লোক এসে ওদের উদ্ধার করেছিল। সেখানে ফোন করা হল। একজন এসে তালা ভেঙ্গে আমাদের বের করলেন। উল্লেখ্য যে আমাদের দরজাগুলো মেটালিক, তাই চাইলেই ভাঙ্গা যায় না। চোর জোচ্চোরদের হাত থেকে রক্ষা পেতে গিয়ে কখনও কখনও নিজেদেরই বন্দী হতে হয়। এ কাজে সে নিল ৫০০ রুবল। এরপর কথা উঠল সে তালা লাগাবে নাকি পরে আমরা লাগাব। নিজেরা লাগালে সেটা করা যেত ৫০০ থেকে ১০০০ রুবলের মধ্যে। তবে গুলিয়া রাজি হল না, ওকে দিয়েই করাল ৭৫০০ রুবল বা ৩০০ ডলারের বিনিময়ে। যে তালা দিল সেটা একেবারেই কম দামী একটা। আমাদের এর বাইরেও একটা দরোজা ছিল, এই দরোজায় আরও একটা তালা ছিল। তাই এই ব্যয় ছিল একেবারেই বোকামি। যেহেতু আমি নিজে এসব কাজ অনায়াসে করতে পারি তাই এই বোকামির জন্য ভীষণ রাগ হয়েছিল। আর এ কারণেই হয়তো মনে আছে।  এটা ঘটেছিল আকাদেমিচেস্কায়ার বাসায়। ওখানেই আমরা শেষ বারের মত সবাই মিলে নববর্ষ পালন করি ২০১৬ আর ২০১৭ সালে। এরপর গুলিয়া চলে আসে দুবনা আমাদের নতুন বাসায়, ছেলেমেয়েরা মস্কোয়। মনিকা আর ক্রিস্টিনা স্পোরতিভনায়ায় থাকতে শুরু করে, আন্তন কানকোভায়। ফলে সবাই মিলে একসাথে নববর্ষ পালন করা আর হয়ে ওঠেনি। ২০১৮ সালে দুবনায় ছিলাম গুলিয়া, আন্তন, সেভা আর আমি। কথা ছিল মনিকা আর ক্রিস্টিনা চলে আসবে। হঠাৎ করেই ওদের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, ওরা ঘরে আটকা পড়ে। ভাগ্যিস আমাদের ফ্ল্যাট এক তলায়, তাই ওরা জানালা দিয়ে বেরিয়ে দোকান করতে পারত। তবে আমি আর রিস্ক নেইনি, ছুটি শেষ হলেই নতুন মেটালিক দরজা লাগিয়ে দিয়েছি।  এর মধ্যে অবশ্য আন্তন ফিরে যায় মস্কোয় আর মনিকা, ক্রিস্টিনা দুজন মিলে ২ জানুয়ারি আসে দুবনায় সেভার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। এরপর আমাদের আর একসাথে বসা হয়নি নববর্ষে। গত সেপ্টেম্বরে ক্রিস্টিনা চলে গেছে সাঙ্কত পিতেরবুরগে (সেন্ট পিটারসবারগ) পড়াশুনা করতে। তবে ও এসেছে মস্কোয় মনিকা আর সেভার সাথে নববর্ষ পালন করতে। এবার আমরা বরণ করছি ২০২২ সালকে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ রাত সাড়ে এগারটার দিকে সেভা ভিডিও কল করল। অনেক গল্পগুজব, অনেক হাসাহাসি। আন্তন চলে গেছে ওর বন্ধুর ওখানে। বাসায় আমরা দুজন। গল্প করতে করতে ভ্লাদিমির পুতিন নববর্ষ উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে শুরু করলেন। এটা অবশ্য সেই সোভিয়েত আমল থেকেই চলে আসছে। রাত এগারটা পঞ্চান্ন মিনিটে পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি অথবা দেশের প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। আমি ব্রেঝনেভকে পাইনি, শুনেছি শেষের দিকে ওনার পক্ষ থেকে লিখিত ভাষণ পাঠ করতেন নামকরা এক সংবাদ পাঠক। আন্দ্রোপভ  আর চেরনেঙ্কোর সময় মনে হয় এই রীতি বহাল ছিল ওনাদের বার্ধক্যের কারণে। গরবাচভ নিজেই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। ইয়েলৎসিনও। এরা সবাই ভাষণ দিতেন ক্রেমলিনে তাদের ক্যাবিনেট থেকে (হতে পারে বাসা থেকে, তবে সেটা ছিল অফিসে)। যতদূর মনে হয় ভাষণগুলো আগে থেকেই রেকর্ড করে রাখা হত। কেননা সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়ায় দশটা টাইম জোন, তাই নববর্ষ এ দেশে আসে পায়ে হেঁটে একেকটা টাইম জোনে এক ঘন্টা পরপর। সবাই এই ভাষণের অপেক্ষা করে। তাই এটা রেকর্ড না করলে দেশের নেতাদের সারাদিন বসে বসে ভাষণ দিতে হত। ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন সমস্ত নিয়ম ভঙ্গ করে নববর্ষের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি নিজের অবসর গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করেন এই বলে যে «২০০০ সাল আগত দুয়ারে, নতুন শতাব্দী, নতুন সহস্রাব্দ। আজ পুরানো শতাব্দীর শেষ দিনে আমি অবসর গ্রহণ করছি।» এরপর থেকে শুরু হয় ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনকাল। মাঝে চার বছরের জন্য মেদ্ভেদেভ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হলেও পুতিনই ছিলেন ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র। তিনি আগের নিয়ম ভেঙ্গে বেরিয়ে আসেন ক্রেমলিনের ইয়ল্কায় নীচে। সেখানে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানান রাশিয়ার জনগণকে। এর আগে অবশ্য এদেশের মানুষ পুরানো বছরকে বিদায় জানিয়ে পান করে। ওয়াইন, ভোদকা, কনিয়াক – যে যা খুশি। তবে নতুন বছরকে বরণ করে শ্যাম্পেন দিয়ে। প্রেসিডেন্টের ভাষণের শুরুতেই ফুঝেরে (শ্যাম্পেন পানের গ্লাস) ঢালা হয় শ্যাম্পেন। এ সময় অনেকেই তাদের মনের ইচ্ছার কথা বলে মনে মনে। কেউ কেউ সেটা কাগজে লিখে কাগজ পুড়িয়ে সেই ভস্ম শ্যাম্পেনের সাথে মিশিয়ে দেয়। ভাষণের শেষে বেজে ওঠে ক্রেমলিনের সেই বিখ্যাত ঘড়ি। এক এক করে বারোটা ঘণ্টাধ্বনি। উরা (হুররে) বলে সবাই গ্লাসে গ্লাসে টোকা দেয়, পান করে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে। 

এবার আমরা সেটা করলাম ভিডিও কলে। ছেলেমেয়েরা কাগজে লিখে সেটা পুড়িয়ে শ্যাম্পেনে গুলিয়ে নিল। আমরা কিছুই লিখলাম না। অনেক দিন থেকেই আমাদের একটাই চাওয়া – ছেলেমেয়েদের সুখ আর শান্তি। মনেই হল না যে আমরা পরস্পর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে দুই আলাদা শহরে – ওরা মস্কোয় আমরা দুবনায়। হঠাৎ করেই ওরাও যেন আমাদের মাঝে এসে হাজির হল। আন্তন পারিবারিক চাটে সবাইকে শুভ নববর্ষ জানাল। শুরু হল নতুন বছর, নতুন করে পথচলা। ওরা চলে গেল বাইরে বাজি পোড়াতে, আমরা বসে বসে নববর্ষ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন প্রোগ্রাম দেখতে শুরু করলাম। 

বিগত কয়েক বছর হল আমরা আর জীবন্ত ইয়ল্কা কিনি না। এখন আর্টিফিশিয়াল ইয়ল্কার যুগ। ফলে ছোটবেলার সেই গন্ধ আর পাওয়া যায় না, যদিও সারা বছর ধরে কাঁটার যন্ত্রণা সইতে হয় না। প্রতি বছর না কিনলেও ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ইয়ল্কা জমে গেছে। একটা তো সেই সোভিয়েত আমলের। বাচ্চাদেরও তাই। আমাদের ট্র্যাডিশনাল সবুজ ইয়ল্কা, ওদের একটা সোনালি, আরেকটা রূপালী। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এটাই ভাল লাগে। 

দেশেও শুনি ইদানিং ঘটা করে ইংরেজি নববর্ষ পালন করা হয়। মনে হয় মূলত শহর এলাকায়। ফেসবুকে বিভিন্ন স্ট্যাটাস পড়ে মনে হয় সেখানেও বাইরের জাঁকজমকটাই আমদানি করা হয়েছে এর অন্তরাত্মা বাদ দিয়ে। আমার মনে আছে, যখন ১৯৮৩ সালে মস্কো আসি তখন এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন অ্যামেরিকা আর আরব দেশগুলো মিলে শতাধিক দেশের ছেলেমেয়েরা পড়ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই সবাই চেষ্টা করত নতুন নতুন ভাষা কিছুটা শিখতে আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা শুরু হত বিভিন্ন স্ল্যাং বা গালিগালাজ দিয়ে। অনেক সময় ভাল কথার আবরণে খারাপ বুলিও অনেকে শেখাত আর সেটা ঐ ভাষাভাষী কাউকে বলে বিপদে পড়তে হত। সোভিয়েত ইউনিয়নে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল কালোবাজারি আর লোক ঠকানো দিয়ে। এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সভিয়েতায়ন হচ্ছে ফেক নিউজ, ভিন্ন মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এসব দিয়ে। আমরা মনে হয় খারাপ দিয়েই শুরু করতে চাই “সব ভাল যার শেষ ভাল” এই কথাটা মাথায় রেখে। ও হ্যাঁ, ভুলেই গেছি, পশ্চিমা বিশ্বে এই ছুটি শুরু হয় ২৪ ডিসেম্বর ক্রিস্টমাসের দিন থেকে আর শেষ হয় নববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে আর একে বলে ক্রিস্টমাসের ছুটি। রাশিয়ায় এই ছুটির শুরু ৩১ ডিসেম্বর নববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে আর এর শেষ ক্রিস্টমাসে।  একে বলে নব বর্ষের ছুটি। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল তখন হইচই করে আমরা অর্থোডক্স ক্রিস্টমাস আর পুরানো নববর্ষও পালন করতাম। এখন আর করা হয় না। এটা হতে পারে আমরা বিভিন্ন জায়গায় থাকি বলে, অথবা দেদ মারোজ, ঈশ্বর এদের আবেদন ওদের কাছে কমে গেছে বলে। তবে যখনই বা যে উপলক্ষ্যেই আমাদের সবার মিলিত হবার সুযোগ আসে, চেষ্টা করি সেটা দুই হাতে লুফে নিতে।  

ঘুমুতে গেলাম প্রায় সকাল বেলায় আর ঘুম যখন ভাঙল দুপুর গড়িয়ে গেছে। বছরের প্রথম দিন মনে হয় সূর্যেরও সরকারি ছুটি ছিল। ওর টিকিটির দেখা মিলল না কোথাও। যখন হাঁটতে গেলাম ভোলগার তীরে, মনে হল এ যেন এক মৃত শহর। বিগত কয়েক দিন শহর, বিশেষ করে দোকানগুলো ছিল লোকে লোকারণ্য। আজ সব বন্ধ। এমন কি রাতের বেলায়ও দুবনা এতটা শান্ত থাকে না। ভোলগাও শান্ত। তাপমাত্রা মাইনাস দশের কাছাকাছি। নদীতে বরফ নেই বললেই চলে। সেখানে শুধুই ধুসর জলরাশি – আকাশের রঙের সাথে ম্যাচ করে সে আজ সেজেছে। কালেভদ্রে দু একজনের সাথে দেখা হয়। একটু হেসে শুভ নববর্ষ বলে অভিনন্দন জানায়। যখন থেকে কসমোলজির উপর কাজ করতে শুরু করেছি, জানি প্রকৃতির কোন জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি নেই, নেই কোন সালের হিসাব, এটা আমাদের মানুষের সৃষ্টি নিজেদের কাজকর্মের সুবিধার জন্য। তারপরেও মাঝে মঝ্যে নিজেকে ফাঁকি দিতে ভাল লাগে, ভাল লাগে এই ভেবে যে আরও একটা বছরের সাথে দেখা হয়ে গেল। কেমন সে হবে? ভাল, মন্দ? সেটা অবশ্য একান্তই আমাদের উপর নির্ভর করে। আমরা যেভাবে তাকে গড়ে তুলব – বছরটাও তেমনি হবে। জীবন মানেই তো পথ চলা, নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। প্রতিটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার শক্তি ও প্রতিটি কাজ উপভোগ করার মানসিকতা নিয়ে আমরা যদি নতুন বছরে প্রবেশ করি, সুখের জন্য, শান্তির জন্য লড়াই করতে শিখি কেবল তখনই ২০২২ এ আমাদের যাত্রাপথ হবে রোমাঞ্চকর, হবে উপভোগ্য। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।  

গবেষক ও শিক্ষক 
জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ 
পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো, রাশিয়া

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া