শাঁখের করাত /সন্দীপ দত্ত

 শাঁখের করাত

সন্দীপ দত্ত 


গোকুলেশ্বরের চোখদুটো এমনিতেই গোল গোল,আজ বেজির কথা শুনে আরও বেশি গোল হয়ে গেল। চোখ গোল হওয়াই শুধু নয়,চরকির মতোন একপাক ঘুরে গেল মাথাটা। সেদিনের ছোকরা,এখনও নাক টিপলে দুধ বেরোয়,সে কিনা মুখের ওপর কথা বলে! গোকুলেশ্বরকে বলে কিনা,"চোপ!"
      ঘটনাটা ঘটেছিল এক ভ‍্যাপসা গরমের মেঘাচ্ছন্ন মাঘের সোমবারের সকালে। বেজি সেই সবে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে গরম চায়ের সাথে কাঁসার বাটিতে দুটো মুড়ি নিয়ে বসেছে। এ বাড়িতে কাঁসা পিতলের গল্প বলতে এই একটাই আছে সাকুল‍্যে। তাও ওটা বেজি নিজের টাকায় কেনেনি। বউয়ের এক জেঠিমা সাধের সময় দিয়েছিল। প্রায় দিনই ও বাটি নিয়ে সাতসকালে বউয়ের সাথে কাড়াকাড়ি করে বেজি। জয়টা বউয়েরই হয়। বউয়ের জেঠিমার দেওয়া উপহার,তাই শেষটায় ইচ্ছে করেই হাল ছাড়ে বেজি আর নিজে তার পুরনো,হাজারটা টোল খাওয়া অ‍্যালুমিনিয়ামের বাটিটাতে মুড়ি নেয়। 
     আজ বউয়ের সকালের চা মুড়ি আগেই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে পায়ে হেঁটে মিনিট তিরিশেক দূরত্বে নতুন এক বাবুদের বাড়িতে কাজে ঢুকেছে বউ। বাসনকোসন ধোওয়া আর ঘর মোছার কাজ। আজই প্রথমদিন। সেকারনেই সব ওলোটপালোট হয়ে গেছে। সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে বউ আর জম্পেশ করে নতুন এক ঘুম দিয়ে বেজির ঘুম ভেঙেছে দেরিতে।
     দরজায় একটা টোকা নয়,একাধিক টোকা পড়ার পর দরজা খুলেছে বেজি। আর দরজা খুলতেই অবাক। এ কাকে দেখছে সে! এ যে খোদ গোকুলেশ্বর পতি। পার্টির লোক।
      পার্টিফার্টি একদমই পছন্দ করেনা বেজি। কেন কে জানে,তার মনে হয় পার্টির লোক মানেই খারাপ আর সুবিধেবাদী। সুবিধেবাদী আর দুষ্টু। দুষ্টু আর প্রতারক। টাকার খাই তাদের বেশি। কাজের বদলে বড় বড় কথা বলে জনগণের মন পালিশ করে। কথাগুলো তো পুরোপুরি মিথ্যেও নয়। আজ ছ'মাস ধরে এখানকার স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলছে না,টাইমকলের জল সুতোর চেয়েও সরু,পাকারাস্তা নামেই পাকা,পিচ প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ ভোট আসে ভোট যায়। আর উন্নয়নের টাকাগুলো যায় এই গোকুলেশ্বর পতির মতো লোকগুলোর পকেটে। যাদের হাতে থানা থেকে পুলিশ, বেয়ারা থেকে বেশ‍্যা। টাকা নামক ঘাস ছড়িয়ে যারা মানুষের ঘিলুগুলো ম‍্যাজিকের মতো পাল্টে করে তোলে ছাগলের ঘিলু।
     গোকুলেশ্বর পতি যে আসবে,বেজি জানত। আর দু সপ্তাহ পর এখানের পুরভোট। এখন ওদের ভিখিরি হওয়ার সময়। লোকের দরজায় দরজায় কড়া নাড়বে আর হাত পেতে বলবে,"একটু সাহায্য।" শালা! ভোট পেরোলো কি এরা ডুমুরের ফুল। বেজি তাই তক্কে তক্কে ছিল। কবে আসে ব‍্যাটা। এলেই মুখে ঝামাটা ঘষে দিই। প্রতিশ্রুতির বহর শুনতে শুনতে বেজিদের মতো মানুষগুলোর গা গুলিয়ে যায় অথচ গোকুলেশ্বরদের কোনও  ক্লান্তি নেই। তাই বেজির এক এক সময় নেতামন্ত্রীদের রাবণ বলে মনে হয়। যার দশটা মাথা আর অসীম ক্ষমতা।
      বেজি পেশায় ছুতোর। এখান থেকে চার কিলোমিটার দূরত্বে এক দোকানের সে সাধারণ কর্মচারী। সকাল ন'টায় সে বেরোয়,বাড়ি ফেরে রাত আটটার পর। তবে গত পাঁচদিন মালিক তার দোকান বন্ধ রেখেছে। মালিকের বাবার হার্নিয়া অপারেশন হয়েছে পরশু। এখন ভাল আছে। মালিক বেজিকে ফোন করেছিল,বলেছে বুধবার থেকে কাজে আসতে। বুধবার খুলবে দোকান।
      বেজির নাম আসলে গয়ারাম। পদবি বেইজ। পদবি ধরেই সবাই ডাকে তাকে। বেইজ না বলে বলে বেজি। বেজির তাতে রাগ হয়না। 
        আজ গোকুলেশ্বরকে শায়েস্তা করবার ক্ষণ যখন এলই,বেজি ঠিক করল ফি বারের মতো ঐ পথে সে হাঁটবে না। কেননা,গত পরশু গোকুলেশ্বর তাকে যে শাস্তিটা দিয়েছিল,সেই একই শাস্তি আজ বেজি তাকে দেবে। তাই বেজি গলার স্বর চড়িয়ে বলল,"চোপ!"
     গত পরশু বেজি যখন সকালবেলা বাজারে যায়,হঠাৎ দু'চারটে শুকনো কাশি হওয়ার জন‍্য মাস্কটা সে কিছুক্ষণের জন‍্য খুলে রাখে। বাড়ি বাড়ি ভোট চাইতে গিয়ে সেটাই চোখে পড়ে যায় গোকুলেশ্বরের। ব‍্যস,পুলিশকে দিয়ে কি মারটাই না মারল বেজিকে।ঠোঁট দিয়ে রক্তও গরাল একটু। পায়ের গাঁট ফুলে ঢোল হল। শুধু কি মার? বাজারের একগাদা লোকের ভিড়ে এই গোকুলেশ্বরের কথাতেই পুলিশের লাঠির সামনে বেজিকে করতে হল একশোবার কান ধরে ওঠবোস।
     সেই গোকুলেশ্বর পতির নিজের নাকমুখই আজ আলগা। মাস্ক নেই। সহজে ছাড়ে নাকি বেজি। তাই শুরু হল ভেলকি।
"দাদা আজ আপনার মুখে মাস্ক নেই কেন?সেদিন তো খুব শিক্ষা দিয়েছিলেন আমায়। করোনার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখি।এখন কান্ডজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করলে চলে না। বলেছিলেন না আমাকে? তারপর পুলিশকে দিয়ে মার খাওয়ালেন। মনে পড়ছে?"
কাচুমাচু হয়ে গেল গোকুলেশ্বর। সত্যিই তো,তার নিজেরই মাস্কটা আজ পরে আসা হয়নি!
"আসলে নির্বাচনী প্রচারের চাপ রয়েছে তো,তাই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মাস্কটা নিতে ভুলে গিয়েছি।" বলল গোকুলেশ্বর।
"আপনারা পার্টির লোক। নেতামন্ত্রীর ডান হাত বাঁ হাত। আপনাদের হাতের মুঠোয় পুলিশ। তাই সহজেই সাত খুন মাপ হয়ে যায়। আমাদের হাতে পুলিশ নেই। তাবলে আপনাকে আমি ছেড়ে দেব?" বলেই গোকুলেশ্বরের নাকে একটা ঘুসি মেরে বসে বেজি। সঙ্গে সঙ্গে রক্তপাত। গলগল করে পড়ে গেল ক'ফোঁটা।
      রেগে ফায়ার হতে যাচ্ছিল গোকুলেশ্বর। পারল না। ভোট বড় বালাই। প‍্যান্টের পকেট থেকে বাম হাত দিয়ে রুমালটা বের করে নাকের উপর ধরে ডান হাতটা নাড়ালো একবার। তারপর দেঁতো হাসি হাসবার চেষ্টা করল। মুখে বলল,"সাতাশ তারিখে সকাল সকাল গিয়ে ভোটটা দিয়ে এসো। চিহ্নটা মনে থাকবে তো? শাঁখের করাত।" 

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া