শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা /পর্ব ৭ /প্রীতম সেনগুপ্ত


শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা

পর্ব ৭

প্রীতম সেনগুপ্ত


স্বামী বিবেকানন্দ বাবুরাম মহারাজকে সাবধান করে বলেছিলেন,“তুই দীক্ষা দিস না, দিলে তোর চেলাতে আর রাখালের চেলাতে ঝগড়া হবে।” রাখাল অর্থাৎ শ্রীরামকৃষ্ণ মানসপুত্র ও রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের প্রথম অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ। কিন্তু স্বামীজী এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন কেন? কারণ অপার প্রেমের আধার প্রেমানন্দের সর্বগ্রাসী প্রেমের সামনে সব ভেসে যেতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল তাঁর। প্রেমানন্দজী অবশ্য স্বামীজীর এই সতর্কবাণী অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছিলেন। তাঁর প্রেমে আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই দীক্ষাপ্রার্থী হতেন। কিন্তু কোনওসময়েই তাদের দীক্ষাদানে প্রবৃত্ত হন নি তিনি। হয় সঙ্ঘজননী শ্রীশ্রীমা কিংবা সংঘাধ্যক্ষ শ্রীরামকৃষ্ণ মানসপুত্র স্বামী ব্রহ্মানন্দের চরণপ্রান্তে তাদের সঁপে দিতেন। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মানুষকে ঠাকুর-স্বামীজীর ভাবে আকৃষ্ট করেন। ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ময়মনসিংহের জিতেন্দ্র দত্ত ৺কাশীধামে গিয়েছিলেন। সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্বৈতাশ্রমে প্রেমানন্দজীর মুখে ঠাকুর-স্বামীজীর কথা শুনে মোহিত হন। স্থির করেন ঠাকুরের জন্মোৎসবে বাবুরাম মহারাজকে ময়মনসিংহে আনবেন। ময়মনসিংহবাসীদের এই বিষয়ে সবিশেষ আগ্রহকে মান্যতা দিতে প্রেমানন্দজী শেষমেশ ময়মনসিংহে যাত্রা করেন ১৯১৪ সালে। সেখানে জিতেনবাবুর বাসভবনে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়। প্রতিদিন সকালে বাবুরাম মহারাজের শ্রীমুখ-নিঃসৃত কথামৃতের আস্বাদন গ্রহণ করতে জিতেনবাবুর বৈঠকখানা ঘরে বহু লোক আসতেন। তিনি সেখানে উপস্থিত জনেদের বলতেন--“তোমরা আগে স্বামীজীকে বুঝতে চেষ্টা কর, পরে ঠাকুরকে বুঝবে; ঠাকুর সূত্র স্বামীজী সেই সূত্রের ভাষ্য।” তাঁর কথায় বহু যুবক অনুপ্রাণিত হয়। তিনজন বেলুড় মঠে যোগদান যোগদান করেন এবং অনেকে ঠাকুরের ভক্তে রূপান্তরিত হন। ১৯১২ সালের শুরুতে নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্তর্গত ভগবানগঞ্জে শ্রীশ্রীঠাকুরের নামাঙ্কিত একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিষয়ে শ্রীশ্রীমায়ের মন্ত্রশিষ্য ধীরেন্দ্র সোমের বিশেষ উদ্যোগ ছিল। আশ্রম প্রতিষ্ঠায় তাঁকে অনুপ্রেরণা দান করেন প্রেমানন্দজী। ১৯১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি ধীরেনবাবুকে পত্র লেখেন এইরকম--

                                   প্রীতিভাজনেষু--

যদি তোমরা সুবিধা বোধ কর তাহা হইলে প্রাতে ঠাকুরঘর খুলিবার পর ধুনা দিবে এবং সক্ষম হইলে প্রত্যহ অন্ততঃ আধ পয়সার বাতাসা সকালে ও আধ পয়সার সন্ধ্যার সময় আরতির পর ভোগ দিবে এবং উপস্থিত সকলকে একটু একটু প্রসাদ বিতরণ করিবে।...অন্তরের ব্যাকুলতা শ্রদ্ধা প্রীতি ও সরলতার সহিত যাঁহাকে দিবে তিনি তাহাই গ্রহণ করেন।

                               ...পূজ্যপাদ স্বামীজীর পুস্তকাদি ও কথামৃত প্রভৃতি নিয়মিতরূপে পাঠ ও চর্চা করিবে। ভাগবত পুরাণ ও দর্শনাদির চর্চা করা খুব উচিত। বিদ্যার আলোচনা না থাকিলে, বুদ্ধি মার্জিত হয় না, তাই দর্শনশাস্ত্রের-- সাংখ্য ও পাতঞ্জলের চর্চা রাখা খুব দরকার।...

                                                                          শুভাকাঙ্ক্ষী-প্রেমানন্দ


     নারায়ণগঞ্জে বাবুরাম মহারাজ এসেছিলেন। কিন্তু ভক্তরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাইলে তিনি রাজি হন নি যেতে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ঢাকা বিদ্বান মানুষদের জায়গা, তিনি মূর্খ, সুতরাং সেখানে গিয়ে তাঁর  করণীয় কিছু নেই। শেষ পর্যন্ত ভক্তদের অনুনয় বিনয়ে জানান, শ্রীশ্রীমা তাঁকে যেতে আদেশ করলে তবেই যাবেন। ভক্তেরা সমবেতভাবে কলকাতায় সারদানন্দজী বা শরৎ মহারাজকে বিস্তারিত লিখে জানালেন। তারযোগে তিনি উত্তর দিলেন-- “প্রেমানন্দ ঢাকায় যাইতে পারেন, শ্রীশ্রীমা আশীর্বাদ করিতেছেন।” এরপর বাবুরাম মহারাজ ঢাকায় যান। এখানে তাঁর অনুপ্রেরণায় যোগেশ দাস আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রী দাসের সাত হাজার টাকায় কেনা সাত বিঘা জমির উপরেই ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। 

                                বাবুরাম মহারাজ অলৌকিকত্ব দেখিয়েছিলেন খুদিরাম নামে এক যুবকের জীবনে আমূ‌ল পরিবর্তন ঘটিয়ে। তার প্রতি অপার স্নেহ ছিল তাঁর। আদর করে ডাকতেন খুদুমণি বলে। এই বিষয়টি নিয়ে ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য ‘প্রেমানন্দ-প্রেমকথা’ গ্রন্থটিতে লিখছেন--“সঙ্গদোষে কলিকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে খুদিরাম গাঁজা আফিম ইত্যাদি মাদক দ্রব্যে আসক্ত হইয়া পড়ে, আনুষঙ্গিক দোষগুলিও তাহাতে সংক্রমিত হয়। তাহার চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করিয়া অভিভাবকরা নিরাশ হইয়া যান। তাহার এক দাদা (রাম মহারাজ) ছিলেন মঠের সাধু; তাঁহার মুখে সব বৃত্তান্ত শুনিয়া বাবুরাম মহারাজ একদিন তাঁহাদের বাড়ীতে যাইয়া উপস্থিত হন এবং মিষ্ট কথায় আপ্যায়িত করিয়া খুদিরামকে একদিন মঠে প্রসাদ পাইতে আমন্ত্রণ করেন। সে মঠে আসিলে নিজের কাছে বসাইয়া পরম যত্নে তাহাকে ভোজন করান, আবার একদিন আসিয়া কয়েকদিন মঠে থাকিয়া যাইতেও বলেন। দ্বিতীয়বার মঠে আসিয়া সে দেখিল, বাবুরাম মহারাজ তাঁহার জন্য গাঁজা, আফিম ও দুধের বন্দোবস্ত করিয়া রাখিয়াছেন! খুদিরাম এক অপার্থিব স্নেহের আস্বাদ পাইল, তথাপি স্বভাব দুরতিক্রম্য। সে মাঝে মাঝে পলাইয়া তাহার পূর্বের সঙ্গীদের কাছে চলিয়া যায়, আর বাবুরাম মহারাজ কলিকাতায় গিয়া অকুস্থলে তাহাকে ধরিয়া বুঝাইয়া মঠে লইয়া আসেন। অন্যান্য সাধুরা ইহাতে বিরক্তি বোধ ও বিরূপ সমালোচনা করিতে থাকিলেও চুপ করিয়া থাকেন। ভগবান লাভের সাধনা হইতেও দুরূহতর তাঁহার রূপান্তরীকরণের সাধনা পরিশেষে জয়যুক্ত হইল। সুপ্তা কুণ্ডলিনীর জাগরণের মত অহেতুক ভালবাসার কুসুমকোমল আঘাতে আঘাতে যুবকের সুপ্ত বিবেক জাগিয়া উঠিল। বিবেক আনিয়া দিল বৈরাগ্য। বৈরাগ্যের সহজাত প্রেরণায় গৃহত্যাগ করিয়া খুদুমণি ঠাকুর-স্বামীজীর কাজে দেহমন উৎসর্গ করিয়া দিলেন।” এই বিষয়ে গুরুভাই আরেক ধুরন্ধর শ্রীরামকৃষ্ণ তনয় হরি মহারাজ(স্বামী তুরীয়ানন্দ) বাবুরাম মহারাজকে পত্রে লিখলেন--“মহারাজের অকাতরে কৃপা বিতরণ শুনে বড়ই আনন্দ হচ্ছে।...তুমিও কি কম ব্যাপার করেছ? সাক্ষী আমার কাছেই রয়েছে। খুদুকে সাধু করা এক দৈব শক্তির প্রকাশ। ঈশা এক জেলেকে বল্লেন,‘আয় আমার সঙ্গে’, আর সে সুড়সুড় করে তাঁর অনুগমন করল-- এ আমরা বাইবেলে পড়ি। আর একদিন সকালে বাবুরাম মহারাজ একজনের বাড়ী গিয়ে বল্লেন,‘চল মঠে’, আর সে সুড়সুড় করে মঠে এসে জীবন পরিবর্তন কল্লে-- এ চাক্ষুষ দেখেছি। জীবন কিরকম তা বিশেষ করে বলবার প্রয়োজন নাই।”

                                       শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানদের ভিতর প্রেমের সম্বন্ধ কত নিবিড় ছিল তা একটি ঘটনায় পরিস্ফুট হয়। স্বামীজী সেই সময় বেলুড় মঠে নিয়ম করেছিলেন যে, সকালে ঠিক সময়ে যিনি ঘুম থেকে উঠতে পারবেন না তাঁকে সেইদিন ভিক্ষান্নে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হবে। একদিন বাবুরাম মহারাজের শয্যাত্যাগে বিলম্ব হল। স্বামীজীর আদেশ অনুযায়ী তাঁর কানের কাছে ঘণ্টা বাজানো হল। এমতাবস্থায় তিনি শয্যাত্যাগ করলেন এবং সমস্ত পরিস্থিতি অনুধাবন করে স্বামীজীর কাছে এসে বললেন,“আজ উঠতে পারি নি। আমার জন্য সকলের অসুবিধা হয়েছে বুঝতে পারছি। তা ভাই, তুমি তো নিয়ম করেছ, যে উঠতে পারবে না, তার শাস্তি হবে-- আমায় শাস্তি দাও।” একথা শোনামাত্র স্বামীজী গম্ভীর হয়ে বললেন,“তোকে আমি শাস্তি দেব একথা তুই ভাবতে পারলি বাবুরাম?” স্বামীজীর দুই চোখ জলে ভরে গেল। আর কিছু বলতে পারলেন না। বাবুরাম মহারাজও সমানভাবে আবেগাপ্লুত হলেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বামী ব্রহ্মানন্দ মধ্যস্থতা করে বললেন,“শাস্তির প্রশ্ন হচ্ছে না; তবে নিয়ম আছে বটে যে, ভিক্ষা করতে হবে।” তখন প্রেমানন্দজী মাধুকরীর জন্য রওনা হলেন। বাস্তবিকভাবে উদ্ভূত সঙ্ঘর্ষে শেষমেশ প্রেমই বিজয়ী হল!

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


                                                                



Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া