শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা -৯ /প্রীতম সেনগুপ্ত

শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা -৯

প্রীতম সেনগুপ্ত

                                                   
স্বামী ব্রহ্মানন্দ
                                          
শ্রীরামকৃষ্ণ মানসপুত্র ও শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘের প্রথম অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ (রাখাল মহারাজ) বিষয়ে আরেক শ্রীরামকৃষ্ণ তনয় ও সঙ্ঘের চতুর্থ অধ্যক্ষ স্বামী বিজ্ঞানানন্দজী লিখছেন--“শ্রীশ্রী রাখাল মহারাজের সাদর অনুগ্রহ আমরা অনেক পাইয়াছি। উনি মিষ্টি কথায় শ্রীশ্রীঠাকুরের উপদেশ বাণী আমাদের নিকট কতই না বলিয়াছেন। দেবদেবীর বিষয়ে তিনি বলিতেন যে তাঁহারা সত্যসত্যই আছেন। কল্পনার কথা নহে। উনি তাঁহাদিগকে সাক্ষাৎ দর্শন করিতেন ও তাঁহাদের সহিত কথা বলিতেন ও তাঁহাদের প্রত্যুত্তর শুনিতেন। একদিকে স্বামীজীর নিরাকার অনুভূতি ও আর একদিকে রাখাল মহারাজের দেবদেবীর দর্শন এই দুইয়ের মধ্য দিয়াই ঈশ্বরের সম্যকরূপ উপলব্ধি করা যায় এইরূপ আমার মনে হয়।” 

        ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মানসপুত্র’ কথাটির তাৎপর্য অনুধাবন করতে গেলে এই বিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের উক্তি অনুসরণ করাই বাঞ্ছনীয়। ঠাকুর সবসময়ই মা'য়ের কাছে একটি শুদ্ধসত্ত্ব ত্যাগী ভক্ত ছেলে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করতেন, যে কিনা সর্বক্ষণ তাঁর কাছে থাকবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বলছেন--“একদিন দেখি, মা একটি ছেলে এনে আমার কোলে বসিয়ে দিয়ে বললেন--এইটি তোমার ছেলে। আমি তো শিউরে উঠলাম। মা আমার ভাব দেখে হেসে বললেন--সাধারণ সংসারীভাবের ছেলে নয়, ত্যাগী মানসপুত্র। রাখাল আসতেই চিনতে পারলাম, এই সেই।” পরবর্তীকালে গুরুভ্রাতা আচার্য স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর সম্বন্ধে বলেন--“আধ্যাত্মিকতায়(Spirituality) রাখাল আমাদের সকলের চেয়ে বড়।” ঠাকুর তাঁর সম্বন্ধে আরও বলেছেন--“রাখাল নিত্যসিদ্ধ, জন্মে জন্মে ঈশ্বরের ভক্ত। অনেকের সাধ্যসাধনা করে একটু ভক্তি হয়, এর আজন্ম ঈশ্বরে ভালোবাসা-- যেন পাতাল-ফোঁড়া শিব,বসানো শিব নয়।”

         বস্তুতপক্ষে দক্ষিণেশ্বরে এক অলৌকিক, অবিশ্বাস্য দীর্ঘ সাধনার শেষে ত্যাগী ভক্তদের সঙ্গলাভের ইচ্ছায় ‌শ্রীরামকৃষ্ণদেব শ্রীশ্রীজগন্মাতার কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেন,“বিষয়ী সংসারী লোকদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জিভ জ্বলে গেল।” জগন্মাতা অভয়দান করে আশ্বাস দিয়েছিলেন--“ত্যাগী শুদ্ধসত্ত্ব ভক্তরা আসছে।” ফলস্বরূপ যথাসময়ে ত্যাগী অন্তরঙ্গ যুবক ভক্তদের আগমন ঘটতে লাগল। এই অন্তরঙ্গদের মধ্যে রাখাল ছিলেন উচ্চমার্গের। ঈশ্বরকোটি। পূর্বাশ্রমের নাম রাখালচন্দ্র ঘোষ। ১৮৬৩ সালের ২১ জানুয়ারি মঙ্গলবার (১২৬৯ বঙ্গাব্দের ৮ই মাঘ, চান্দ্রমাঘ শুক্লাদ্বিতীয়া তিথিতে, রাত্রি প্রায় একটায়) বসিরহাট মহকুমার অন্তর্গত শিকরা-কুলীন গ্রামে এক অতি সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আনন্দমোহন ঘোষ অবস্থাপন্ন জমিদার ছিলেন। মাতা কৈলাসকামিনী রাখালের যখন পাঁচ বৎসর বয়স তখন ইহধাম ত্যাগ করেন‌। পিতা দ্বিতীয়বার বিবাহ করলে বিমাতা হেমাঙ্গিনীর স্নেহচ্ছায়ায় রাখাল লালিত পালিত হতে থাকেন। বালক রাখালের কমনীয় রূপ ও স্বভাবমাধুর্যে সকলেই আকর্ষণ অনুভব করত। তাঁর কোমল প্রেমপূর্ণ হৃদয়েরও সন্ধান পাওয়া যায় বিশেষরূপে। পাঠশালায় সহপাঠীর অঙ্গে বেত্রাঘাতে সমবেদনায় তাঁর চোখ জলে ভরে উঠত। এই পরিস্থিতিতে তাঁর প্রতি স্নেহসম্পন্ন শিক্ষকেরা এই কার্যে আর প্রবৃত্ত হতেন না। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হৃদয়ে দেবভক্তির ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার বাইরে অন্যান্য বিষয়েও রাখালের বেশ মনযোগ ছিল। খেলাধুলায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। কুস্তিতেও পারদর্শিতা ছিল। এছাড়া পিতৃদেবের অনুসারী হয়ে ফলফুলের বাগানের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়। পুকুরের ধারে বসে মাছ ধরা তাঁর অত্যন্ত প্রিয় কাজ ছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি যখন রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের শীর্ষে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন সেইসময়ও এই অভ্যাস থেকে বিরত হন নি। মাছধরা, সঙ্গে তাস খেলাও তাঁর কাছে অবসর যাপনের প্রিয় মাধ্যম ছিল। গুরুভ্রাতা মহাপুরুষ মহারাজ (স্বামী শিবানন্দ) এই দুই থেকেই মহারাজকে বিরত করার চেষ্টা করতেন। বলতেন,“মহারাজ তুমি মঠের প্রেসিডেন্ট, তুমি এসব করলে লোকে কী বলবে!” মহারাজ একথার উত্তর দিতেন না। বরং মহাপুরুষ যেন জানতে না পারেন এমনভাবে লুকিয়ে মাছ ধরতে যেতেন। তবে এই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা জানা যায়। এখানে দুটি ঘটনার উল্লেখ করব। প্রথমটি এইরকম-- মেদিনীপুর থেকে এক অফিসার মঠে মহারাজকে দর্শন করতে আসলে বাবুরাম মহারাজ (স্বামী প্রেমানন্দ) বলেন, “মহারাজ ওই পুকুরে মাছ ধরছেন।” ভদ্রলোকের মনে কেমন অশ্রদ্ধার উদয় হয় ও দূর থেকে তাঁকে দেখে প্রস্থান করেন। ইত্যবসরে মহারাজ শুধুমাত্র একবার তার দিকে আড়চোখে তাকিয়েছিলেন। বিস্ময়করভাবে দশদিন পরে ওই ভদ্রলোক পুনরায় মঠে আসেন এবং মহারাজকে দর্শন করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। মহারাজকে সম্যকভাবে বুঝতে পারেন নি বলে অনুতপ্ত হন। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে বারুইপুরে। মহারাজ ছিপ হাতে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি অন্য কোথাও যেন নিবদ্ধ। এক যুবক তাঁকে বারবার ডেকেও কোনও সাড়া পেল না। আসলে মহারাজের মন ঐহিক জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্করহিত হয়ে পড়েছিল! এই ঘটনায় সেই যুবক আকৃষ্ট হয় তাঁর প্রতি ও তাঁর কাছ থেকে দীক্ষাপ্রাপ্ত হয়।

        শৈশবে নিজ হাতে কালী প্রতিমা তৈরি করে বালক রাখাল সঙ্গীদের সঙ্গে পূজা-পূজা খেলা করত। আবার বৈষ্ণব ভিখারির গাওয়া কৃষ্ণলীলাগান শুনে অনায়াসে গাইতে পারত। সন্ধ্যার সময় বাড়ির পাশেই বোধনতলায় সে ও তাঁর ভাই-বোনেরা হাততালি সহযোগে হরিনাম কীর্তন করত--‘জয় রাধে রাধে গোবিন্দ জয়, জয় জয় শ্যামসুন্দর মদনমোহন বৃন্দাবনচন্দ্র।’ রাখালের প্রাথমিক শিক্ষা অন্তে আনন্দমোহন পুত্রকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। এখানে কাঁসারিপাড়া বারাণসী ঘাট স্ট্রিটে তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের শ্বশুরবাড়ি ছিল। এখানেই রাখালকে রাখার ব্যবস্থা হল। ভর্তি করা হল নিকটবর্তী ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে। ১৮৭৫ সাল ছিল সেটি। রাখালের বয়স তখন বারো বছর। এই সময়ে নিকটবর্তী সিমলা অঞ্চলের নরেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। উত্তরকালের বিশ্বজয়ী বিবেকানন্দ তখন পল্লীর কিশোরবৃন্দের নেতা। রাখাল তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলেন স্বাভাবিকভাবেই। ক্রমে দু'জনের মধ্যে গভীর সখ্যতা তৈরি হল। তাঁরা দু'জনে একই সঙ্গে একই আখড়ায় কুস্তি লড়তেন। ক্রমে বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নরেন্দ্রর সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াতও শুরু হয়। এই প্রসঙ্গে বলা যায় শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবধারার দুই মুখ্য ধারক ও বাহক বিধাতার অঙ্গুলিহেলনে কৈশোরাবস্থা থেকেই সখ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এরা হলেন নরেন্দ্রনাথ ও রাখাল। উত্তরকালে বিশ্বজয়ী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের প্রথম সঙ্ঘাধ্যক্ষ রামকৃষ্ণ মানসপুত্র স্বামী ব্রহ্মানন্দ। বিবেকানন্দ মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে জগত তোলপাড় করে দিয়ে চিরবিদায় নিলেন। অন্যদিকে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘকে শৈশবাবস্থায় আধ্যাত্মিক পরিপুষ্টি প্রদানের গুরুদায়িত্বটি পালন করেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ। দীর্ঘ ২১ বছর সঙ্ঘনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৯৭ সালে আমেরিকা থেকে ফিরে স্বামীজী শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। মহারাজ অর্থাৎ স্বামী ব্রহ্মানন্দজী এর কার্য পরিচালনা করতেন। ১৮৯৯ সালে স্বামীজী বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। মহারাজের উপর পরিচালন সভার সভাপতির দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন,“রাখাল একটা রাজ্য চালাতে পারে।” মঠের সমস্ত দায়িত্ব মহরাজকে অর্পণ করে স্বামীজী বলেছিলেন,“রাখাল, আজ হতে এ সমস্ত তোর, আমি কেউ নই!”

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া