তুর্কী নাচন /পর্ব --২ /মলয় সরকার

তুর্কী নাচন
পর্ব --২

মলয় সরকার


কাপাদোসিয়া পর্ব

নতুন অভিজ্ঞতা হওয়ার আগে আর একবার ধাক্কা খাওয়ার বাকী ছিল। ভিতরে পা দিয়ে দেখি, ও বাবা, এটা যে শুধু আপাদমস্তক ঝাঁ চকচকে হাল ফ্যাসানের- অত্যন্ত আধুনিক, এবং শুধু তাই নয়, এটা একটা পাহাড়ের দেওয়ালে। দেওয়ালটা কেটে গর্ত করে ভিতরে হোটেলটা বানানো হয়েছে। ফলে ভিতরে দেওয়াল যেখানে যেখানে যা আছে বা সিঁড়ি, বসার জায়গা, ইত্যাদি সব নিছক পাহাড় কাটা, বোঝাই যায়। ইচ্ছা করেই বোধ হয় সেইগুলো মসৃণ করা হয় নি। ছেনি বাটালী দিয়ে কাটার দাগ স্পষ্ট। বসার জায়গায় একটা শুধু সুন্দর গদী পেতে দেওয়া আছে।  শোওয়ার খাট যেটা, সেটা উঁচু পাথরের বেদীর উপর সুন্দর গদী, বালিশ,  চাদর দিয়ে সাজানো। বাথরুমও পাহাড়ের দেওয়াল কেটে তার ভিতর।আর পাশের ঘর থেকে আরম্ভ করে যেখানে যা আছে সবটাই একটা পাহাড়কে কুঁদে ভিতরে করা আছে। যেখানে যা জিনিস ব্যবহার হয়েছে, বেশির ভাগটাই হাতে তৈরী। কুশন থেকে চায়ের কাপ প্লেট, চায়ের টেবিল, ফুলদানি, ইত্যাদি যেখানে যা আছে, সবই হাতে তৈরী এবং এক শৈল্পিক রুচিসম্মত।

                                 
সমস্ত দেখে আমি তো থ'। এগুলোকে বলে 'Rock cut cave hotel'।  এই পাহাড় কাটা নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে।পরে তা' তো বলতেই হবে।

বিশ্রাম নিয়ে আমরা বিকালের দিকে একটু আশপাশটা দেখার জন্য হাঁটতে বের হলাম। দেখে যা বুঝলাম, এটা প্রকৃতই একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত গ্রামীণ বাড়ী। আশপাশের পরিবেশও তাই। এমনকি বাড়ীর সামনে বা পাশে গাড়ী চলার মত রাস্তা থাকলেও তা কোন শহুরে পাকা রাস্তা বা হাই ওয়ে ধরণের রাস্তাও নয়। নিছক আমাদের দেশের গ্রামের রাস্তার মতই। আশেপাশে দোকানপাটের ধরণগুলোও তাই। সাধারণ চাল ডাল আটা বিক্রী হওয়া মুদির দোকান বা পান বিড়ি বিক্রীর দোকানের মত ছোট ছোট দোকান। তবে চারপাশেই ছোট বড় পাহাড়ে ভর্তি। তবে এগুলো যেন আমাদের দার্জিলিং অঞ্চলের পাহাড়ের মত নয়। কেমন যেন রুক্ষ জায়গার উপরে বিশাল বিশাল শুকনো পাথরের স্তুপের মত পড়ে আছে। পাহাড়ের সারিরও যে একটা কেমন শ্রীছন্দ থাকে এখানে তা নেই। এগুলো আসলে লক্ষ কোটি বছর আগের কোন অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উদ্ভূত নরম পাথরের পাহাড়। যা বহুযুগের বাতাস ও বৃষ্টির ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নাকি এই অবস্থা হয়েছে।আশপাশের বাড়ীগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি সেগুলোও সব পাহাড়ের গায়ে গর্ত করে থাকার জায়গা। সামনেটা কিছুটা সিমেন্ট পাথর দিয়ে আধুনিক বাড়ীর রূপ দেওয়াহয়েছে মাত্র।

যাক, বাড়ীওয়ালা,  থুড়ি হোটেল ওয়ালা ঘরের পাশে একটা উঁচু জায়গা দেখিয়ে বলল, কাল ভোর ভোর উঠে ওখান থেকে সূর্যোদয় দেখবেন।খুব ভাল লাগবে। আর কাল সকাল দশটায় তৈরী থাকবেন, গাড়ী নিতে আসবে। 

ক্লান্ত ছিলাম, সন্ধ্যা নামল।  নতুন দেশের ক্লান্ত সূর্যও বিশ্রামে গেলেন। চারিদিকে একটা হাল্কা গরমের হাওয়া চলছে। তাড়াতাড়ি খাওয়া হল, খাওয়া অনেকটা কন্টিনেন্টাল ধরণের। 

ঘুম ভাঙ্গল বেশ ভোরে। উঠেই চোখে মুখে জল দিয়েই বাইরে বেরিয়ে একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে সেই উঁচু চাতাল মত জায়গাটায় উঠলাম।উঠে দেখি, গতকাল লক্ষ্য করিনি, ওখানে বসার মত সুন্দর চেয়ার , চা খাওয়ার টেবিল ইত্যাদির সুন্দর ব্যবস্থা করা আছে। অর্থাৎ মানুষ সকালে এখানে বসে ভোর উপভোগ করেন।হাওয়ায় হাল্কা ঠাণ্ডার আমেজ।

আমরা দূরের দিকে তাকিয়ে দেখি, তখনও সূর্যদেবের সম্পূর্ণ ঘুম ভাঙ্গে নি। সবে আড়মোড়া ভাঙ্গছেন আর ঊষা অল্প কুয়াসার মধ্যে লাল আলো ছড়িয়ে তাঁর আগমনী বার্তা ঘোষণা করছে। তার মধ্যেই আকাশ ভর্তি করে নানা গরম হাওয়ার বেলুন আকাশে উঠে পড়েছে তার সওয়ারীদের নিয়ে।আকাশের সে কি বিচিত্র শোভা। নানা রঙের নানা ধরণের বেলুন, ছোট বড় নানা আকারের, আকাশে উড়ছে।এক এক বেলুনের গায়ে এক এক কোম্পানীর বিজ্ঞাপন।  আরও নতুন নতুন বেলুন ক্রমশঃ উড়ছে। আমাদের আকাশে ওড়ার কোন পরিকল্পনা নেই।অত উঁচুতে উঠলে যদি শ্বাস কষ্ট বা ঐ ধরণের কোন সমস্যা হয়, মুশকিলে পড়ে যাব। তাই সশরীরে না বেলুনে গিয়ে, মনটাকেই পাঠিয়ে দিলাম সওয়ারী করে।

এখানে প্রায় শতাধিক বেলুন ওড়ে এবং এটা চলে প্রায় সারা বছর ধরে। তবে এই বেলুনভ্রমণ মোটেই সস্তা নয়। এগুলোর জন্য অনেক কোম্পানী আছে, তারাই সব ব্যবস্থা করে।তবে রোজই যে এই বেলুন ওড়ে তা নয়, তার কারণ ঝড় , হাওয়ার গতিবেগ, ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বাধা যদি না থাকে তবেই বেলুনে ওড়া সম্ভব।সে জন্যই খুব ভোরে যখন প্রকৃতি শান্ত থাকে তখনই বেলুনে ওড়া যায়, বেলা বাড়লে রোদের তেজ বাড়লে হাওয়ার গতি বেড়ে যায় তখন আর ওড়া সম্ভব নয়।
 কাপাদোসিয়ার ভোরের আকাশে বেলুন সমারোহ। যাক, আমরা ঘরে বসেই অল্প ঠাণ্ডা শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে সুন্দর  প্রকৃতি ও তাতে পক্ষী সমারোহের মত বেলুন সমারোহ দেখে চক্ষু সার্থক করলাম।

এর পর তৈরী হয়ে একেবারেই খাবার ঘরে গিয়ে দেখি, আরও দু একটি পরিবার রয়েছেন এখানে।এনাদের গতকাল দেখিনি। যাই হোক, টিফিনও মোটামুটি কন্টিনেন্টাল ঢঙেই, শুধু বড় বড় জলপাইএর আচার , আর তেলে ডোবানো বড় বড় জলপাই ইত্যাদি রয়েছে দেখলাম। পড়েছিলাম, এখানে নাকি জলপাই খুব হয়। দেখছি এরা জলপাইকে এদের দৈনিক খাবারের একটি অঙ্গ করে নিয়েছে।খেয়ে দেখলাম- বেশ ভাল লাগল। তারপর থেকে যখন যেখানে পেয়েছি জলপাইটা খুব খেতাম। 

নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ী এল।আমরা রোদের জন্য উপযুক্ত সরঞ্জাম নিয়ে তৈরী ছিলাম।একটা গাড়ী  আমাদের নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল একটি জায়গায় , যেখানে আর একটি বাস অপেক্ষা করছে ।ছোট মিনিবাস , বেশ সুন্দর, তাতে বেশ কিছু যাত্রী আগে থেকেই বসে আছেন। আমরা বাসে উঠতেই বাস ছেড়ে দিল। আমরা পৌঁছালাম এক রুক্ষ পাহাড়ী জায়গায় , নাম ‘Derwent Valley’ ‘। জায়গাটা ছোট ছোট ছুঁচালো পাহাড়ে ঘেরা। তবে পাহাড়গুলোর উচ্চতা বেশী নয় সহজেই তার মাথায় ওঠা যায়।যতদূর চোখ যায় শুধু এই ছুঁচালো পাহাড়ের সারি আর বৃক্ষলতা গুল্মহীন রুক্ষ পরিবেশ,। কোন শিল্পী যেন নিটোল করে কেটে এগুলো বানিয়েছে,। তার মধ্যেও আকৃতির কিছু কিছু বিচিত্রতাও আছে। ঠিক বলে বোঝানো যাবে না এর সৌন্দর্য।আসলে লক্ষ লক্ষ বছরের হাওয়া ও প্রাকৃতিক ক্ষয়েই নাকি এরকম হয়েছে। গাইড মেয়েটী আমাদের দেখালো পায়ের তলায় মাথা উঁচু করে থাকা একটি ছুঁচালো পাথর। বলল, বহুদিন পর এই পাথরের চারপাশ থেকে যখন সমস্ত বালি সরে যাবে , তখন এই পাথরটি ওই রকম আকৃতি নেবে। অনেক পাহাড় গুলোর মাথায় আবার যেন টুপি পরানো আছে ।সেটাও আবার পাশাপাশি সব পাহাড়গুলোর টুপির মত একই রকম। কি করে যে হয় এরকম , আমার মাথায় ঢুকলো না। পাহাড়ের নীচের সমতলে তৈরী হয়েছে যেন এক ভুলভুলাইয়া। ঠিক চম্বলের নদীর ধারে বা আমাদের বাঁকুড়ার গনগনির সঙ্গে কিছুটা তুলনা করা যায়।তলায় যেন কোন জলধারা বয়ে গেছে কোন সময়।পাহাড়ের গা গুলো হয় কোণাকৃতি বা শিরা ওঠা জলে ক্ষয়ে যাওয়ার মত।কিছুটা শান্তিনিকেতনের খোয়াইএর মতও বলা যেতে পারে।চারিদিকে এই ধরণের পাহাড় ছড়িয়ে আছে এই উপত্যকা জুড়ে।এই জায়গাটার নাম পাশাবাগ আর এই উঁচু চিমনীর মত পাহাড়গুলিকে বলে পরীদের চিমনী “fairy chimney”।
                                                                 

আমাদের দেশেও যে কোন দর্শনীয় স্থান মানেই তার আশে পাশে থাকে কিছু দোকান , পর্যটক দের আকৃষ্ট করার মত । এখানেও রয়েছে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকানের মত সাধারণ দোকান। সেখানে কিছু খাবার , কিছু মালা এই সবই বিক্রি হচ্ছে আর কি।আমরা এইসব দেখছি এখান থেকে চলে আসার আগে, এমন সময় একটি দোকানের বিক্রেতা মেয়েটি আমার স্ত্রীর কপালে টিপটা দেখে ওটি চাইল, ওর পছন্দ হয়েছে ভারতীয়দের মত এই টিপ। দিতেই সেটি নিয়ে নিজের কপালে লাগিয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখে কি খুশী।ওর আশেপাশের বান্ধবীদের মধ্যেও হাসির ঢল নামল। সবাই কি খুশী। তাকে আমার স্ত্রী ইশারায় বোঝালো আমার আরও আছে, তুমি নাও ওটা।সত্যি কত নির্মল ওদের মন, চাইতেও যেমন বাধা নেই, আবার এই অল্প জিনিসেই খুশী প্রকাশেও খামতি নেই। 
          

বুঝলাম, মেয়েরা মেয়েই হয়, সেটা যে দেশেরই হোক, আর আর্থিক ভাবে যে অবস্থারই হোক। সাজসজ্জা প্রীতি পৃথিবীর সব দেশের সব মেয়ের মধ্যেই বোধ হয় একই রকম।এর পর এগোলাম এখান ছেড়ে নতুনের সন্ধানে।
(ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

  1. চমৎকার ভাষায় প্রাঞ্জল রচনা।

    ReplyDelete
  2. প্রথমটা খুললো না । দ্বিতীয়টা থেকে পড়া শুরু করলাম । অপুর্ব আপনার লেখার শৈলী । খুব ভালো লাগছে । সবসময় তো ট্যাবলেটটা হাতে পাই না । সময় সু্যোগ মতো ঠিক পড়বো সবগুলো ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া