তুর্কী নাচন পর্ব-৪ /মলয় সরকার

 (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

তুর্কী নাচন পর্ব-৪ 
মলয় সরকার


  কাপাদোসিয়া পর্ব-৪

 এখানে অনেকগুলি চার্চ আছে।তার বিভিন্ন রকম নাম দেওয়া হয়েছে, তাতে কি ছবি বা মূর্তি আছে সেই হিসাবে।যেমন, কোনটি স্নেক চার্চ, কোনটি গ্রেপ চার্চ এই রকম। অনেকগুলিতেই বড় সুন্দর ছবি আছে যীশুখ্রীষ্ট বা বাইবেলে বর্ণিত কোন ঘটনার ভিত্তিতে।একটা ঘরে ঢুকে দেখলাম একটা কঙ্কাল পড়ে রয়েছে।এখানেই যে কবর দেওয়া হত, বোঝা যাচ্ছে।উঁচুনীচু পাহাড়ী রুক্ষ জায়গায় ছড়িয়ে থাকা কিছু পাহাড়কে কেটে মনুষ্য বসতি করে , কি করে একটা গ্রাম বা মনাষ্ট্রী করা যেতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না।কত দিন ধরে খোদাই করে এগুলো বানিয়েছিল, সেটাও এক আশ্চর্য। শুধু তাই নয়, এগুলোর ভিতরে ভীষণ সুন্দর চিত্রশিল্প করা আছে, যা বাইজান্টিয়ান অঙ্কনরীতিকেই তুলে ধরে। এগুলো সবই দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর।তবে এখানকার মানুষ যে পাথর কেটে ঘর বানাতে যথেষ্ট দক্ষ ছিল,  এবং সে সম্বন্ধে যথেষ্ট ইঞ্জিনীয়ারিং জ্ঞান ছিল, তা এই ঘরগুলো দেখলেই বোঝা যায়। কোথায় থাম দিতে হবে, কতগুলো থাম রাখতে হবে সমস্তটাই আগে থেকে হিসাব করে তবে খোদাই করতে হত।এখানেই এর শৈল্পিক বা কারিগরীর যা কিছু ।


আমাদের মধ্যে এখানে অনেকেই এত বড় জায়গা পেয়ে ও রোদের জন্য একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। গতি যেন একটু স্লথ হয়ে এল।এর মধ্যে আমি একটা ছবি দেখছি নিবিষ্ট হয়ে, হঠাৎ শুনি,পিছন থেকে, রুইয়া বলল, মুচকি হেসে,থাকবে নাকি এখানে? আমি ঘাড় ঘুরিয়ে বললাম, অসুবিধা কি, যদি তুমি সঙ্গে থাক? সে মুচকি হেসে, ঘুরে পাশের লোকটিকে বোঝাতে শুরু করল।


শেষে রুইয়া জানাল, এবার আমরা যাব, আজকের শেষ দ্রষ্টব্য দেখতে, যেটা আরও সুন্দর। অল্প কিছু পরেই আমরা এসে পৌঁছালাম ‘উচিসর ক্যাসল’ এর কাছে।রুইয়া দূরে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল, সেই দ্রষ্টব্য দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের সামনের দিকে। সেটি একটি বেলেপাথরের ৬০ মিটার উঁচু পাহাড়, যার গোটা গায়ে ইঁদুর গর্তের মত গর্তে ভর্তি। একেবারে নীচে থেকে মাথা পর্যন্ত। শুধু এটাতেই নয়, আশে পাশেও ছড়িয়ে আছে এরকম গায়ে গায়ে লাগা প্রচুর পাহাড়। চারধারে সবুজের চিহ্নহীন শুধু বেলে পাথরের পাহাড় দেখতে দেখতে চোখেরও যেন ক্লান্তি আসছে, তবে আশ্চর্যও কম হচ্ছি না যে, এ রকমও সম্ভব!
এই পাহাড় টা নাকি সপ্তম শতাব্দীতে মুসলমান আক্রমণের থেকে বাঁচবার জন্য বা এত পাহাড়ের গোলক ধাঁধায় কেউ যাতে খুঁজে না পায় তার জন্য তৈরী হয়েছিল। এখানে প্রায় ১০০০ জন মানুষ বাস করতে পারত। এখানে কিছুদিন আগে পর্যন্ত বসতি ছিল এবং গ্রীকরা থাকত। পরে আতাতুর্কের সময় ভিটেমাটি উচ্ছেদ করে তাদের গ্রীসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখন আর এখানে কেউ বাস করে না, অনেক জায়গা বেশ দুর্গমও বটে। কি করে গোটা পাহাড় জুড়ে এত মানুষ তার ভিতরে থাকত তা ভেবে সত্যি আশ্চর্য লাগে যে, মানুষ তো আর পাখী নয় যে এরকম ঘুলঘুলিতে বাস করবে। তার নিত্য নৈমিত্তিক খাওয়া দাওয়া, জলের ব্যবস্থা, স্নান প্রাতঃকৃত্য শৌচাদি, চাষবাস কি করে কি করত কে জানে। ভাবলে কুল পাওয়া যায় না। অথচ সুদীর্ঘ দিন  তো এত মানুষ এখানে থাকত!

ফেরার সময় জিজ্ঞাসা করলাম, চুপিচুপি রুইয়া কে, কাল তুমি থাকছ তো? সে চোখ কুঁচকে, মুখে ছদ্মরাগ ফুটিয়ে বলল, কেন? অন্য কেউ এলে হবে না, আমাকেই কেন চাই? আমি ঠোঁট কাটার মত বললাম, তুমি না দেখালে এই সমস্ত নীরস পাহাড় দেখতে ভাল লাগবে না তাই। সে মুচকি হেসে চোখের এক মোহময়ী ভ্রুভঙ্গী করল।  


পরদিন ভোরে উঠে হোটেলের দোতলায় যে খোলা চত্বর আছে, সেখানে গেলাম আমি আর বুলু। দেখি সূর্য তখনও ওঠে নি। তবে আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। আর বাতাসে একটা হাল্কা ঠাণ্ডা ভাব আছে। সূর্যের লাল আভা আছে দিগন্তে , সঙ্গে আছে খুব হাল্কা একটা কুয়াসার ভাব। এখনই প্রকৃষ্ট সময় “ হট এয়ার বেলুন” এর। পূব দিকে তাকিয়ে দেখি গত কালকের মতই, আকাশ ছেয়ে গেছে নানা রঙের আর নানা আয়তনের বেলুনে। আমরা বেলুন চাপব না। অত উঁচুতে বেলুনে ওঠার সাহস নেই এই বয়সে। বেলুনে গরম হাওয়া ভরে তাতে সওয়ারী নিয়ে ওঠে নানা রঙের বেলুন।উপর থেকে জায়গাটাকে দেখা যায় সুন্দর। আমরা নীচে থেকে আর একবার উপভোগ করলাম এই বেলুন দৃশ্য। কিছুক্ষণ বাদে সূর্য উঠে গেল। এবার বেলুনও কমে আসবে। দিনের বেলায় বেলুন ওড়ানো হয় না। ঐ ভোরের সময়টুকুতেই বেলুন ওড়ে। 
আমরা নেমে এসে তৈরী হতে লাগলাম আজকের ঘোরার জন্য।


সকালে আমাদের গাড়ীতে উঠতে গিয়ে দেখি পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে রুইয়া একটা তাজা শিউলি ফুলের মত হাসি নিয়ে।গাড়িতে উঠতে গিয়ে ওর সাথে চোখাচোখি হল। আমরা হাসির ভাষা দিয়েই ভাব বিনিময় করলাম, সঙ্গে গুড মর্ণিং। যাত্রীরাও সবাই সবাইকে গুড মর্ণিং করে শুভেচ্ছা জানাল।কে যে কোন দেশ থেকে এসেছে জানি না।আমাদের পাশে একজন বসে ছিল, সে জার্মানি থেকে এসেছে। আজ গাড়ি ছাড়তেই রুইয়া শুরু করল, গতকাল আপনাদের অনেক গাড়ী চড়িয়েছি, তার শোধ নেব আজ। আজ আপনাদের হাঁটাব। পারবেন তো সবাই? কোম্পানী বলেছে, তেলের দাম বেড়েছে, তাই সবাইকে গাড়ী না চড়ে হাঁটতে হবে। বলেই হেসে উঠল। সবাই সমস্বরে জানাল, হাঁটতে পারব। জবাবে ও বলল, ভেরি গুড, অবশ্য আমি থাকব, আপনাদের একা ছেড়ে দেব না। তারপর গম্ভীর হয়ে,বলল,  না হাঁটলে আপনি এই জিনিস গুলো দেখতে পাবেন না।


কিছু দূরে গিয়ে ও সবাইকে গাড়ী থেকে নামতে বলল। বলল, আমাকে অনুসরণ করে আসুন।


এগোলাম চষা জমির খেতের পাশ দিয়ে, উঁচু নীচু রাস্তা দিয়ে। কখনও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আবার কখনও ছোট ছোট পাহাড়ের পাশ দিয়ে। তবে সব কিন্তু ঐ বেলেপাথরের ছোট ছোট পাহাড় আর বেশির ভাগই ওই একেবারে ছূঁচালো মাথা। কোন পাহাড়ের মাথায়, যেন মনে হচ্ছে, অন্য একটি পাথর কেউ বসিয়ে রেখেছে, একটু ঝড় এলেই পড়ে যাবে।রাস্তার পাশে দেখলাম আঙ্গুরের খেত।তবে এই আঙ্গুর গাছ লতানে নয়। লতানে আঙ্গুর গাছও আছে , লোকে বাড়ীতে লাউ কুমড়ো বা সিম গাছের মত লাগায় আর তার থেকে থোকা থোকা  আঙ্গুর ঝুলছে, তাও দেখেছি অনেক জায়গায়।এই আঙ্গুর গাছ গুলো খুব ছোট ছোট ঝোপের মত। তাতে ফল ধরে রয়েছে। বুঝলাম আঙ্গুর গাছ অনেক রকমের হয়। তার চাষ পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন।আমেরিকার ক্যালিফোর্ণিয়ার নাপা ভ্যালি আঙ্গুর আর মদের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। সেখানে যে গাছ আর চাষ দেখেছি, সে সম্পূর্ণ আলাদা।আমাদের মধ্যে একজন চাষের জমিতে গাছ থেকে আঙ্গুর তুলতে যাচ্ছিলেন, রুইয়া দেখে চোখ বড় বড় করল, বলল, গরীব চাষীর ফসল নষ্ট করবেন না। এরা বড় গরীব। আমি বললাম, আচ্ছা রুইয়া, আমি তোমাদের এখানে তো কোন গরু দেখছি না, তোমরা তো বীফ  (গরুর মাংস) খাও , পাও কোথা থেকে। ও বলল, না এখানে , এই রুক্ষ দেশে গরু কোথায় পাবেন? আমাদের ‘বীফ’  যা লাগে  সব বাইরে থেকে আনতে হয়। তবে এখানে সবাই যে গরু খায় এমন নয়।এরপর চলুন একটা জিনিস দেখাবো, মজা পাবেন।


আমরা যেতে যেতে একটা জায়গায় পৌঁছালাম, যার চারপাশে আবার সেই বেলে পাথরের ছোট ছোট পাহাড়। ভাবছিলাম, কি রে বাবা, এরা শুধু পাহাড় কেটেই থাকত না কি, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের মত? কিন্তু এরা তো যথেষ্ট উন্নত ছিল এবং আছে। কে জানে, যে দেশের ধরণ যেমন।
এখানে একটা কথা বলে রাখি, বলতে ভুলে যাব পরে। রাস্তায় আসতে আসতে দেখি মাঠের পর মাঠ কুমড়ো ফলে আছে। প্রচুর কুমড়ো। কিন্তু গাছ গুলো প্রায় মরে গেছে,  অনেক জায়গায় শুকিয়ে গেছে। শুধু মাঠ ভর্তি হলুদ রঙের গাদা গাদা কুমড়ো পড়ে আছে। ভাবছিলাম, এত কুমড়ো এরা খায় না তো লাগায় কেন, কি ব্যাপার! আশ্চর্য হচ্ছিলাম।অনেক পরে জেনেছি, এরা কুমড়ো খায় না বটে, তবে, কুমড়োর বীচি খায় , যেমন আমরা চানাচুরের মধ্যে শসার বীচি,, কুমড়োর বীচি খাই সে রকম।আবার মার্কিন মুলুক জূড়েও এরকম লালচে হলুদ রঙের কুমড়োর ছড়াছড়ি দেখেছি মাঠ ভর্তি। তার উদ্দেশ্য অন্য। তারা এগুলো ব্যবহার করে তাদের ‘ভূত তাড়ানোর উৎসব ‘হ্যালোউইনে’ ঘর সাজানোর জন্য। ছোট বড় নানা ধরণের কুমড়োই এর কাজে লাগে।


আমরা চলেছি যে অঞ্চল দিয়ে এগুলো সবই কাপাদোসিয়া উপত্যকা অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।এর পরে আসছে আরও মজার তথ্য– পরের পর্বে—
ক্রমশঃ–

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া