পৃথিবী ২০৭৭/ পর্ব-২/ রাজ অধিকারী

পৃথিবী ২০৭৭ 

রাজ অধিকারী


পর্ব ২

শেষ অব্দি পাপানকে রাজি করানো গেল। নেটফ্লিক্সের এক বছরের সাবস্ক্রিপশন নিয়ে রাজি হয়েছে সে। পাপানদের জেল থেকে মোট তিনটে কয়েদিভ্যান রওনা দিয়েছে। দু'টোতে পাপানদের আত্মীয়স্বজন এবং আরেকটায় অন্য কোনও অনুষ্ঠানের জন্য রওনা দেওয়া লোকজন। দু'টোতে কাকিমা, মাসিমা, পিসিমা, ননদ, দেওর এবং বর-বউতে পুরো ভরে গেল। বাচ্চা বলতে এক পিসির ছোট্ট মেয়ে। সেও কোলে। রীতিমতো গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে বসেছে সব। পাপানকে নিরুপায় হয়ে অচেনা সেই লোকেদের গাড়িতে উঠতে হলো। ভাগ্যিস একই রাস্তায় যাচ্ছে। যাওয়ার পথে পাপানকে ওরা নামিয়ে দেবে। সাউথ দমদমের সেন্ট্রাল জেল থেকে আলিপুর জেল অব্দি যাত্রাপথ।

যে ভ্যানে পাপান উঠেছে, সেটা আদেও কোনও অনুষ্ঠানের যাচ্ছে না এটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল। একেকটা দাগী আসামি। যমদূতের মতো চেহারা। ডানের দিকের বেঞ্চে প্রথম থেকে একজন পুলিশ, তারপর একটা ষণ্ডামার্কা কালো মিশমিশে লোক। বয়স চল্লিশের ওপারেই যা মনে হলো। কান ঘেঁষে একটা কাটা দাগ চলে গেছে গলা অব্দি। নাপিত যেন ক্ষেপে গিয়ে ওরকম খুর চালিয়ে দিয়েছে। তারপর একজন নাতিদীর্ঘ শ্যামবর্ণ লোক। পঁয়ত্রিশের বেশি বয়স নয়। খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চেহারা। হালকা সেন্টের গন্ধও আসছে নাকে। ঠোঁটের ওপর খুব যত্ন করে ছাঁটা পাতলা গোঁফ। সরু সরু চোখ। দেহের আকৃতি সেরকম বিশাল না হলেও লোকটার দৃষ্টি যেন সাপের মতো। সেই তাকানো যেন মানুষের ভেতরে ঢুকে চিরে বেরিয়ে যেতে পারে। ওনার পরে আরেকজন পুলিশ।

ভ্যানের বাঁদিকে প্রথমেই আবার পুলিশ, তারপরে একজন বৃদ্ধা। বয়সের ভারে একদমই নুইয়ে যাননি। মেরুদন্ড সোজা। কপালে বড়ো লাল টিপ। একটা 'ক' আঁকা থাকলে উষা উত্থুপের কথা মনে পড়ে যেত। সদ্য পাট ভাঙা গরদের সাদা শাড়ি। লাল এবং সোনালী পাড়ের কাজ করা। কপালের মাঝে সিঁথিতে মোটা একটা সিঁদুরের লাইন চলে গেছে মাথার পেছন অব্দি। চোখটা আধবোজা অবস্থায় বসে আছেন। ওনার পাশে গিয়ে বসলো পাপান। পাপানের পাশে উঠলো শেষে আরেকটা পুলিশ। 

পাপান যেন চিড়িয়াখানা বা সার্কাসে এসে উপস্থিত হয়েছে। আশেপাশে সব একেকটা নমুনা। সবাইকে ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখলো, সবার হাতে হাতকড়া পড়ানো। সাধারণত জেলের ভ্যানে কয়েদিদের আর কেউই হাতকড়া পড়ায় না। তাছাড়া কেনই বা পড়াবে! সবাই তো প্রায় চেনা লোকজন। কয়েক জেনারেশন ধরে জেলে। জেলের বয়স্ক কয়েদিরা তো মাঝেমধ্যে নতুন ছোকরা পুলিশ দেখলেই গাকগাক করে ওঠে, "তোর বাপের জন্মের আগে থেকে এই জেলে আছি রে আটকুঁড়ের ব্যাটা! আমাকে নিয়ম শেখাতে আসিসনি!"

হাতকড়া দেখে পাপান একটু ভয়ই পেল। ভয়ে মানুষ দু'রকমের কাজ করে; নয় চোখ বন্ধ করে ফেলে অথবা আশেপাশে বারবার দেখতে থাকে পালানোর রাস্তার খুঁজতে। দ্বিতীয় দলের ছেলে হলো পাপান। এবং আশেপাশে মাথা ঘোরাতেই সে দেখতে পেল ওর পাশের বৃদ্ধার হাতে শুধু হাতকড়া নয়, মুখ রীতিমতো কাপড়ের ওপরে ব্ল্যাকটেপ দিয়ে বাঁধা। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! কে জানে আর কি আছে বরাতে।

ভ্যান চলতে শুরু করলো। পাপানদের বাকি দু'টো গাড়ি ওদের আগে চলছে, শেষে এই আসামীদের ভ্যান। পেছনে বাবামায়ের গাড়ির আলো দেখতে পেলে তবু একটু নিশ্চিন্ত হওয়া যেত। কিন্তু সেই উপায়ও নেই। সেই ষণ্ডামার্কা লোকটা একভাবে পাপানের দিকে তাকিয়ে আছে। আর মাঝে মাঝে চোখাচোখি হতেই পাপান ভয় পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। উফঃ! মহা জ্বালায় পড়া গেল তো! লোকটার দাবি কি! 

কপালে যা আছে হবে। এভাবে আর বসে থাকা যায়না। পাপান পটেকে হাত ঢোকালো ফোন বের করার জন্যে। ফোন বের করে অন করতেই ষণ্ডামার্কা লোকের পাশের পুলিশটা খবরদার বলে চেঁচিয়ে উঠলো। পাপান চমকে গেছে। পুলিশটা তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে আসতেই ষণ্ডামার্কা সেই যমদূত পা এগিয়ে দিল। চলন্ত গাড়িতে টাল সামলাতে না পেরে হোঁচট খেয়ে পাপানের পায়ের সামনে উল্টে পড়লো পুলিশটা। তাকে তোলার জন্যে বাকি দু'জন পুলিশ এগিয়ে আসতেই সেই যমদূত একটার বুকে সজোরে লাথি চালালো। আরেকটাকে হাতকড়া পড়া হাতেই ক্যারেটের প্যাঁচ মেরে অজ্ঞান করে দিল। সবকিছু সাউথের অ্যাকশন সিনেমার মতো যেন সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেল। সেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন লোকটা শুধু মিটিমিটি হেসেই যাচ্ছে। যেন সবই ওঁর পরিকল্পনা মতো ঘটছে। ওঁ যেন সবই জানতো। শুধু আশ্চর্যের ব্যাপার, সেই বৃদ্ধা মহিলা একটা টু শব্দ করলেন না। এমনকি চোখও খোলেননি। সেই আধবোজা অবস্থায়। মরেটরে গেল নাকি! পেছনের এত হট্টগোলে ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিয়েছে। সাধারণত ড্রাইভারের পাশে বড়ো পদের কোনও পুলিশ থাকে। কিন্তু সেও বরযাত্রীদের ভ্যানে। ওঁর-ও নেমতন্ন। সেই ড্রাইভার নেমে এসে পেছনের দরজা খুলতেই যমদূত তার বুকে সজোরে একটা লাথি চালালো। লোকটা ছিটকে গিয়ে পড়লো রাস্তায়। মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেল। খেলনার মতো যমদূত নিজের হাতকড়া ভেঙে দিল। তারপর এক এক করে সেই সাপের দৃষ্টিওয়ালা লোকের এবং সেই বৃদ্ধার হাতকড়া খুলে ফেলল। ভ্যানের খোলা দরজা দিয়ে নামতে নামতে তারা খেয়াল করলো, পাপান অনেকক্ষণ ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া