নাস্তিকের ধর্মাধর্ম-- পর্ব--(৩৬) /সন্দীপ কাঞ্জিলাল

নাস্তিকের ধর্মাধর্ম-- পর্ব--(৩৬)

সন্দীপ কাঞ্জিলাল

ধর্মে রাষ্ট্রের ভূমিকা


যে গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তিতে অনেক রাষ্ট্র ধর্মীয় সমস্যার মোকাবিলা করে থাকে, তাকে বলা হয় সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু এই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত অর্থ এবং রাষ্ট্র এবং শাসক শ্রেণীর ধর্মের প্রতি উদাসীনতা এবং বিজ্ঞানের প্রতি আসক্তি। সব ধর্মের মানুষকে তাদের নিজ নিজ ধর্মে আসক্ত করা নয়। কিছু মানুষের যে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বর্তমানে প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে, তারা নিজেরা যদি একটি বিশেষ ধর্মে আসক্ত হয়, তবে রাষ্ট্রের পক্ষে ধর্মের প্রতি উদাসীন থাকা সম্ভব নয়। আর বিজ্ঞানের প্রতি আসক্তি ব্যাপক বিজ্ঞান ভিত্তিক গণশিক্ষা ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না। 

 এ কারণেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় জ্ঞানবাদী আন্দোলনের তাত্ত্বিক নেতারা গণশিক্ষার উপর এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তাছাড়া ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় আইনে এমন কিছু থাকা উচিত নয় যা দ্বারা ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য রচনা করতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ রাষ্ট্র দ্বারা ধর্মের ভিত্তিতে এক ধর্মের মানুষকে সংখ্যাগুরু এবং আরেক ধর্মের মানুষকে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। যে রাষ্ট্র এভাবে জনসাধারণকে চিহ্নিত ও বিভক্ত করে, তাকে আদৌ নিরপেক্ষ বলা যায় না।

 কারণ সে রাষ্ট্র ব্যক্তিমানুষের জন্মলব্ধ ধর্মের মাপকাঠিতেই তার রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক স্থানাঙ্ক নির্ধারিত করছে। বিবাহ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রভৃতি অন্যান্য অনেক আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে ও সর্বজনীন ধর্মহীন আইনের শাসন ধর্মনিরপেক্ষতার আবশ্যিক আঙ্গিক। তাছাড়া শিক্ষা, সরকারি বা বেসরকারি চাকরি, পাসপোর্ট-ভিসা, বা অন্য যে কোনো প্রয়োজনে কোন দরখাস্ত, ফর্ম বা দলিলে ব্যক্তিমানুষের ধর্ম ঘোষণা করা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়। 

 প্রাচীনকাল থেকেই শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শাসক আর্য শ্রেণি শাসিত শূদ্র শ্রেণীকে শোষণশাসনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের মাধ্যমে শস্ত্রশক্তির পরিপূরক হিসেবে শাস্ত্রশক্তিকে ব্যবহার করে এসেছে। এ বিষয়ে প্লেটো তার  Republic গ্রন্থে বিধৃত আদর্শ রাষ্ট্রে শাসক শ্রেণীকে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন তা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন যে শাসক শ্রেণীকে এরকম একটা পৌরাণিক কল্পকাহিনী ভিত্তিক মিথ্যা সৃষ্টিতত্ত্ব জেনেশুনেই সুকৌশলে প্রচার করতে হবে যে আদিতে সব মানুষই পৃথিবীর গর্ভ থেকে উঠে এসেছিলো, আর এ কারণে পৃথিবী তাদের সকলের মা। অতএব যে দেশে তারা বাস করে সে দেশ তাদের মাতৃভূমি, এবং তারা সকলে ভাই ভাই। মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে দেশমাতৃকার সব সন্তানদেরই যুদ্ধ করা কর্তব্য। 

 কিন্তু এই দেশমাতৃকার সন্তানেরা সকলে জন্মগতভাবে সমান নয়। কারণ ঈশ্বর যখন পৃথিবীর গর্ভে মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তিনি শাসক শ্রেণীর অন্তর্গত গার্ডিয়ান ক্লাস বা অভিভাবক শ্রেণীর মধ্যে সোনা, শাসক শ্রেণীরই  অন্তর্গত অক্সিলিয়ারি বা সহায়ক (সৈন্যবাহিনী ও আমলাতন্ত্র) শ্রেণীর মধ্যে রুপো, আর কৃষক শ্রমিক সহ বাকি জনসাধারণের মধ্যে পেতল ও লোহা মিশাল দিয়েছিলেন।

 এ ভাবেই সমাজের উঁচু-নিচু শ্রেণীবিন্যাস ঈশ্বর দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিলো। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সন্তানেরাও এসব ধাতু জন্মগত ভাবে পেয়ে থাকে। অতএব শ্রেণীভেদ ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্ট এবং জন্মগত। প্লেটো বলেছিলেন যে অলীক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং তার উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রেণীবিভাগ জনসাধারণ হয়তো এক প্রজন্মে মেনে নেবে না। কিন্তু শাসক শ্রেণী দ্বারা ক্রমাগত প্রচারের ফলে দ্বিতীয় প্রজন্মে বিশ্বাস ও গ্রহণ করবে। পরবর্তী কালে অ্যারিস্টোটল শ্রেণীভেদ ও ক্রীতদাস প্রথার সমর্থনে একই ধরনের যুক্তি ব্যবহার করেছিলেন। আর শ্রেণীভেদের সমর্থনে মনুস্মৃতি ও ভগবতগীতায় বিধৃত তুলনীয় তত্ত্ব আমরা আগেই আলোচনা করেছি। 

মহাভারতের শান্তিপর্ব ভীষ্ম বলেছেন যে রাজাদের পক্ষে ধর্মকর্মের অনুষ্ঠানই লোকসাধারণকে বশীভূত করার রাখবার শ্রেষ্ঠ উপায়। রাজদণ্ডের প্রভাবেই পৃথিবীতে ধর্মের প্রচার সম্ভব হয়েছে। রাজার দণ্ডনীতি না থাকলে বেদ ও সমুদয় ধর্ম এক কালে বিনষ্ট হয়ে যায়।

 রাজধর্মের প্রাদুর্ভাব না থাকলে কোনো মানুষই নিজ ধর্মের প্রতি আস্থা রাখে না। ভীষ্মের এই উক্তি আজও বহুলাংশে সত্য। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে ইতিহাসে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র জনসাধারণকে বশে রাখবার উদ্দেশ্যে মূলত এ ধরনের প্রচার ও পদ্ধতির মাধ্যমেই ধর্মকে ব্যবহার করে এসেছে। অতএব শ্রেণীবিভক্ত সমাজে, এবং বর্তমানে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও পরিকাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুসরণ করা অত্যন্ত কঠিন। প্রায় অসম্ভব বললেও অত্যুক্তি হয় না। কারন সে আদর্শ শাসক শ্রেণীর মৌলিক শ্রেণীস্বার্থের বিরোধী। অতএব মানব সমাজে ধর্মের বন্ধনকে শিথিল করতে হলে রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক তথা রাজনৈতিক কাঠামোর সাম্য ও স্বাধীনতা ভিত্তিক রূপান্তরের প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া