যেতে যেতে পথে--১৭/রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে

রোশেনারা খান

পর্ব  ১৭

ধিরে ধিরে গ্রাম বদলাতে শুরু করেছে। গড়বেতার ময়রাকাটা থেকে মঙ্গলাপোতা হাইস্কুল পর্যন্ত কাঁচা রাস্তায় পিচ ঢালা হয়েছে কয়েক বছর পূর্বে। ব্যাঙ্ক, অফিস ইত্যাদিও হয়েছে। কাছারি বাড়ির সামনে বাসস্ট্যান্ড হলেও নাম খড়কুশমা  বাসস্ট্যান্ড। বাজারের ভেতরের  রাস্তা ঘিঞ্জি হওয়ার কারণে বড় বাস ঢুকতে পারেনা। আগে তো ছোট মোটরগাড়ি চলত।  সেই গাড়ির পিছনে হ্যান্ডেল দিয়ে  স্টার্ট দিতে হত। হেল্পারা কাজটি করত। তখন একটা মাত্র বাস আমলাগুড়া স্টেশন থেকা খড়কুশমা বাজার দুবেলা যাতায়াত করত। হেল্পার ছিল ডোম পাড়ার নিবারণ কাকা। নিবারণ কাকার স্ত্রীকে কোনদিন দেখিনি, একমাত্র ছেলেকে নিয়ে থাকত। অন্য সময় বাঁশের ঝুড়ি, কুলো ইত্যাদি বানিয়ে বিক্রি করত। ফুল চাষের খুব শখ ছিল, শীতকালে উঠোন আলোকরে ফুটে থাকত গাঁদা চন্দ্রমল্লিকা, মোরগঝুটি নানারকম মরশুমি ফুল।

    রাস্তায় পিচঢালার পরে পরেই ওই রাস্তা ধরে বিদ্যুৎ এসে গেছল খড়কুশমায় ।বিয়ের পর একবছরের মধ্যে স্বামী, সংসার, মা বাবা হওয়ার রহস্য সবই প্রায় জানা হয়ে গেছে। আগেই বলেছি উনি এলে আমরা দু’জনে জঙ্গলে, নদীর ধারে বেড়াতে যাই। সেদিনও গেছলাম, ফিরে এসে সন্ধ্যাবেলা শুনি কালির নাকি বাচ্চা  হবে। এই নিয়ে সারা পাড়া জুড়ে গুজগুজ ফুসফুস চলছে। কালি আমাদের এক জ্ঞাতির বাড়িতে কাজ করত। পাশের মল্লিক পাড়ায় ওদের বাড়ি। বাবা অসুখে ভুগে মারা গেলে মা অন্য একজনকে বিয়ে করে চলে গেছে। ওর কাকা ওদের দুইবোনের ছোটটিকে আমাদের বাড়িতে, বড়বোন কালিকে আমাদের ওই জ্ঞাতির বাড়িতে কাজে রেখে দেয়। ছোট বোনটি খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন  সমজদার ছিল। কালি কিছুটা বোধবুদ্ধিহীন, নোংরা। সামনের বড় বড় উঁচু দুটি দাঁতের মাঝখানে মস্ত  ফাঁক, মুখের দুই কসে ঘা, জটাধরা চুলে উকুন ভর্তি। দুহাত দিয়ে চুলকোলে উকুন ঝরে পড়ে। সারাগায়ে নোংরা। মস্তবড় পেট (অনেক ভাত খেত)। ওকে দিয়ে বাইরের কাজ করানো  হত। রাতে এই বাড়িতেই থাকত, মাঝে মঘ্যে মল্লিকপাড়া যেত কাকা, কাকিমার  সঙ্গে দেখা করতে।

      আজও বিকেলে গিয়েছিল। প্রতিবেশী বৌ-ঝিদের ওকে দেখে সন্দেহ হয়। তারা কালিকে ঘিরে ধরে জিগ্যেস করে, কালি তোর পেটটা কেন বড়? তুই কী খেয়েছিস? কোথায় ঘুমাস? কালি শুধু হাসে। একজন ওর স্তনের ওপর জোরে চাপ দিলে ফিনকি দিয়ে দুধ বেরিয়ে আসে। আর কোন সন্দেহ থাকেনা যে কালি গর্ভবতী। নিমেষে খবরটা আমাদের পাড়ায় এসে পৌঁছায়। কালির কাজের বাড়ির কর্ত্রী সেই রাতেই গিয়ে কালির কাকার হাতে কিছু টাকা দিয়ে, কালিকে ফিরিয়ে  নিয়ে আসেন। পরদিন দূরের গ্রাম থেকে একজন দাইকে ডেকে নিয়ে আসা হয়। সে গর্ভপাতে সিদ্ধহস্থ।দাই বিশেষ ধরণের একটি শক্ত সূচলো কাঠি গর্ভবতী কালির জরায়ুতে প্রবেশ করিয়ে  দেয়। হাঁটাচলার ফলে সেই কাঠি গর্ভস্থ সন্তানের গায়ে খোঁচা দিতে থাকে এবং একসময় শিশুটি বেরিয়ে আসে। এইভাবে গর্ভপাত করানো হল। বাড়ির কর্ত্রী গর্ভপাত্রপর কালির খুব যত্ন করেছিলেন, কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেননি। এখন যেমন গ্রামেগঞ্জে কোন সমস্যা হলে পার্টি(রাজনৈতিক) মীমাংসা করে, সেইসময় ছিল গ্রামের মোড়লদের বিচার। এইরকম বড় কোন সমস্যা হলে সাত গ্রামের মোড়ল মিলে বিচার করত। এই মোড়লদের আদেশে কালির কাকা  এসে কালিকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সাত গ্রামের বিচারে ওই বাড়ির এক ছেলেকে দোষী সাবস্ত্য করা হয়। সে তার অপরাধ স্বীকারও করে। শাস্তি ও জরিমানা দুটিই হয়। তবে অপরাধী আরও একজন ছিল, এটা তার মামাবারি।বেড়াতে এসে এই কাণ্ড ঘটিয়ে ছিল। এরপর উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা এক বৃদ্ধের সঙ্গে কালির বিয়ে দিয়ে দেয় ওর কাকা। আর কোনদিন কালিকে দেখা যায়নি।

      ১৯৭৩ সালে স্কুল ফ্যাইনাল পরীক্ষা দিলাম। পাশও করে গেলাম। মেজদিদের বাড়িতে থেকে রিক্সায় করে গড়বেতা হাইস্কুলে পরীক্ষা দিতে যেতাম। রিক্সার সঙ্গে বাবার পিসতুতো ভাই আশরাফকাকা সাইকেলে আমার সঙ্গে যেতেন আসতেন। খান সাহেবও পরীক্ষার সময় মেজদিদের বাড়িতে এসে কয়েকদিন ছিলেন। কিছুদিন হল  মেজদির ভাশুরঝি মিনুরও বিয়ে হয়েছে পূর্ব নির্ধারিত পাত্র ওর মামার ছেলের সঙ্গে। ওর শ্বশুরবাড়ি মিনুকে আর পড়াতে রাজি ছিলেনা বলে মিনুরবাবা মহিনুদ্দিনদা মেয়ের তালাক নিয়ে আবার স্কুলে ভর্তি করে দেন। গ্র্যাজুয়েশনের পর মিনুর আবার বিয়ে দেন। মিনু মেদিনীপুরে একটি মাদ্রাসায় চাকরি পেয়ে যায়। 

    পরীক্ষার পরেই শ্বশুরবাড়ি হল আমার স্থায়ী ঠিকানা। এই ঠিকানায় থাকতে থাকতে এই বাড়ি, এই গ্রাম সম্বন্ধে আরও অনেক কিছুই জানলাম। উপলব্ধি করলাম। অন্যান্য গ্রামের তুলনায় মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সচ্ছল পরিবারের জীবনযাত্রার মানও খুব খারাপ। লেখাপড়ার চর্চা খুবই কম। আমার দেওররা স্কুলে পড়লেও ননদরা সে সুযোগ পায়নি। গ্রামের কোন  বাবা-মায়ের মেয়েদের গ্রামের বাইরে পড়তে পাঠানোর কথা ভাবনাতেও আসত না।  গ্রামের স্কুলে প্রাইমারি পাশ করলেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। বেশিরভাগ বয়স্ক মহিলারা সায়া-ব্লাউজ পরেন না। আদ্ভুত কায়দায় সাড়ি পরেন। অনেক পুরুষই একাধিক বিয়ে করে। একজন পুরুষকে একসঙ্গে তিনজন স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে দেখেছি। স্ত্রীরা কিন্তু কেউ বন্ধ্যা ছিলেন না। কেউ কেউ রাগের বশে তালাকও দিয়ে থাকে। পরের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মেয়ের কপালে ভালমন্দ খাবার জুটবে না ধরে নিয়েই মা আমাকে সেরা খাবারটি খেতে দিতেন। শাশুড়িমাকে দেখলাম, তিনি তাঁর দশ ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলেদের খাওয়ার প্রতি বেশি যত্নবান। মেয়েদের জন্য যা হোক হলেই হল।

      কথায় আছে জল আর নারীকে যে পাত্রে রাখা হয় তারই আকার ধারণ করে। আমিও নিজেকে শ্বশুর বাড়ির ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলাম। কবিতা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। এখন আমি সুনিপুণভাবে মাটির উনুন তৈরি করি। খেজুরপাতার চাটাই, তালপাতার পাখা বুনতে শিখেছি। কাঁথা সেলাই করি।  রোজ দুপুরে আমার বয়সী মেয়েদের কাপড়ে সুতোর নক্সা শেখায়।(খান সাহেব আমার এসব কাজ পছন্দ করতেন না)। ১৯/২০ জনের রান্না করি।পরিবেশন করি। মুনিষদের জন্য মাঠে খাবার সাজিয়ে পাঠায়। বিকেলে বাউরি মুনিষদের  চাল, ডাল, সবজি, তেল-নুন-মশলা ,কাঠ, কেরোসিন ইত্যাদি কাঁচা সিধা মেপে দি। এসব কাজের মধ্যে গল্প-উপন্যাসে পড়া, সিনেমায় দেখা শহুরে ছিমছাম সুখি জীবনের স্বপ্ন ক্রমশ আবছা হয়ে আসে।

     খান সাহেব কিন্তু তাঁর স্বপ্নপূরণের লড়াই জারি রেখেছেন। কিন্তু ভাগ্য কিছুতেই সঙ্গ দিচ্ছে না। আজ থেকে অর্ধ শতাব্দী পূর্বে এইরকম একটি পিছিয়ে থাকা গ্রামের এইরকম কৃষক পরিবারের একটি যুবকের পক্ষে এ লড়াই কতটা কঠিন তা প্রাক্তন আই পি এস নজরুল ইসলামের  জীবন সম্বন্ধে জানলে আন্দাজ করা যাবে। নানারকম প্রতিবন্ধকতা তো ছিলই। বাড়িতে ডব্লিউ বি সি এস ও এই ধরণের প্রতিযোগিতা মুলক পরীক্ষার গুরুত্ব কেউ বুঝতেন না। তাছাড়া তখন কোচিং এর ব্যবস্থা ছিলনা, ছিলনা এত রকম সাজেশনের বই। যার জন্য সবই পড়তে হত। কোন ইংরেজি সংবাদপত্র কেশপুর বাজারে আসত না, উনি মেদিনীপুর থেকে অমৃতবাজার পত্রিকা আনাতেন। সেটা বাসে আসত। বাসরাস্তা বাড়ি থেকে অনেক দূরে হওয়ার জন্য বাস স্টপেজে কাগজ নেওয়ার জন্য লোক পাঠাতে হত। কম্পিটিশন মাস্টার, কম্পিটিশন রিভিউ ইত্যাদি জার্নাল কলকাতা থেকে আনাতে হত।

    ডব্লিউ বি সি এস এর প্রস্তুতি নেওয়ার মাঝেই উনি ১৯৭১ সালে ‘ইনকাম ট্যাক্স ইন্সপেক্টর’ পদের জন্য পরীক্ষা দেওয়ার পর ইন্টার্ভিউতে ডাক পেয়ে  ইন্টার্ভিউও দিয়েছিলেন। ১৯৭২ এ চিঠি মারফৎ জানানো হয়, উনি এই পদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। সময় মত নিয়োগপত্র পাঠানো হবে। কিন্তু বছর কেটে গিয়েও নিয়োগপত্র আসে না। শেষে পরিচিত একজনের(আসাদ মাদানি) সুপারিশ পত্র নিয়ে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লী গেলেন তৎকালীন কেন্দ্রিয়মন্ত্রী সুবোধ হাসদার কাছে ।উনি হয়ত চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্যানেলে নাম থাকা স্বত্বেও চাকরিটা ওনার হয় নি। অপ্রিয় শোনালেও তখন নানান অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণা হয়েছিল, যাদের কোন ভাবেই বাদ দেওয়া যায় না তাদেরই এসব পদে নেওয়া হয়। এতে ওনার মন এতটাই ভেঙ্গে গেল যে ভাল প্রস্তুতি এবং শূন্যপদ বেশি  থাকা স্বত্বেও সে বছর পরীক্ষায় বসতে পারলেন না। 

 (ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Post a Comment

0 Comments