বেহা গীত বা বিয়ের গান /সূর্যকান্ত মাহাতো

জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

পর্ব - ২৮

বেহা গীত বা বিয়ের গান

সূর্যকান্ত মাহাতো


"বরের মা রাজার ঝি আমল খাইছে
কন্যার মা হাড়ির ঝি নিচিন্তে ঘুমাছে।
কে আমল খায় বলি কে আমল খায়
যে বরের সদর মাসি সে আমল খায়।"

এটি একটি বেহা গীত বা বিয়ের গান। বিয়ের একটি আবেগ ঘন মুহূর্ত বা অনুষ্ঠান হল "আমল খাওয়া"। সেই আচার অনুষ্ঠানকে ঘিরেই এই গান গাওয়া হয়। বর বিয়ে করতে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে ঘটে এই অনুষ্ঠান। কচিকচি আম পাতার বোঁটাগুলো বর একটু খানি চিবোই। পরে তার মুখের অম্লরস একে একে প্রথমে মা, মাসি, পিসি, জ‍্যঠি, কাকিরা একটু একটু করে মুখে দেয়। এটাই হল "আমল খাওয়া"। সেই আনন্দেই সকলে এ গান গেয়ে উঠেন।

জঙ্গলমহল জুড়ে বিভিন্ন পর্যায়ের লোকসংগীত প্রচলিত। এর মধ্যে কিছু কিছু লোকসংগীত আছে যেগুলো আচার সংগীত। যেমন "বেহা গীত" বা বিয়ের গান। বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতোর মতে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আচার উপলক্ষে এইসব গান গাওয়া হয়ে থাকে। তাই এগুলো আচার সঙ্গীত নামেই প্রচলিত। সমগ্র জঙ্গলমহলের একটা দীর্ঘ অংশজুড়ে কুড়মি মাহাতো সম্প্রদায়ের অবস্থান। তাদের বিবাহ উপলক্ষেই এই গান বিশেষভাবে গীত হয়। এই সম্প্রদায়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের একটি অঙ্গই হল সংগীত বা গান। বৈবাহিক অনুষ্ঠানের যে আবেগ, আনন্দ ও দুঃখ সবকিছুই এই গানগুলোর মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়। সমগ্র বিবাহ পর্ব অনেকগুলো ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত। ছোট ছোট পর্বের সেই আচার অনুষ্ঠানগুলো এই গানে গানেই প্রকাশিত হয়। গানের মধ্য দিয়েই সে সব আচার অনুষ্ঠানগুলো একটা নতুন মাত্রা পায়।

বিয়ের গানগুলো একমাত্র বৈবাহিক অনুষ্ঠান ব্যতীত অন্যত্র গীত বা গাওয়া হয় না। একমাত্র বিয়ের সময়ই এ গান গাওয়া হয়। তাই এই গানকে "বেহা গীত" বা বিয়ের গান বলা হয়। বর বা কনে দেখা থেকে শুরু করে, পাকা দেখা, বিয়ে এবং বিয়ের একাধিক আচার অনুষ্ঠান, পরিশেষে কনে বিদায় থেকে বাড়ির অতিথি বিদায় পর্যন্ত চলে এই গান। বিবাহের পরিবেশকে আরও বেশি করে ভাবগাম্ভীর্য করে তুলে এই গানগুলো। গানগুলো শ্রোতাদের মনে একটা বাড়তি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কষ্টও বাড়ায়।

আচার মূলক এই "বেহা গীত" বা বিয়ের গানগুলো বেশ রক্ষণশীল হয়। কোনও আচার যেমন সহজে পরিবর্তন হতে পারে না। কোনও প্রাচীন আচারের যেমন বদল ঘটে না। বিয়ের গানগুলো তেমন। নতুন করে নাকি এ গান রচিত হয় না। একেবারে প্রাচীন কাল থেকে যেসব গান প্রচলিত রয়েছে সেগুলোই ক্রমান্বয়ে গীত হয়ে আসছে।। বেহা গীতগুলো তাই অনেকটা প্রাচীন। এর ভাষাও কিছুটা প্রাচীন বলে উচ্চারণ একটু কঠিন বলে মনে হয়।

আচার মূলক এই বেহাগীতগুলোর বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন---
এই গানগুলো কেবলমাত্র মেয়েরাই গেয়ে থাকে। পুরুষ কণ্ঠে এ গান সচরাচর গীত হয় না।

এই গান এককভাবে গাওয়া হয় না। সর্বদায় যৌথভাবে বা দলবদ্ধভাবে গাওয়া হয়। বৈবাহিক অনুষ্ঠানে কেউ একজন গানের সুরটা ধরলেই বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে সেই গান ধরে ফেলে।

এ ধরনের গানে কোনও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয় না। একমাত্র খালি গলায় বা মুক্তকণ্ঠেই এই গান গাওয়া হয়।

এ ধরনের গানের সঙ্গে কোনও নৃত্য বা নাচও যুক্ত নয়। কেবলই গান। গানের সঙ্গে নাচানাচি তেমন একটা হয় না। তবে গান গাওয়ার সময় অনেকেই হাত নেড়ে নেড়ে গানগুলো গেয়ে থাকে। তবে সেটা কোনোও ভাবেই নাচ নয়।

বেহা গীত বা গানগুলো বেশ ধীর লয়ে গাওয়া হয়। প্রতি পর্বের শেষে সুরের একটা দীর্ঘ টান থাকে।

গানের সুর সর্বদাই করুন সুর। এমনকি ঠাট্টা তামাশার গান হলেও হাস্যরসের আড়ালে যেন একটা দুঃখরস জড়িয়ে থাকে। করুন সুরে গাওয়া হয় বলেই শ্রোতার চোখ মাঝে মাঝেই অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কনেপক্ষের বাড়িতে আনন্দের মাঝে একটা বিষন্নতাও যেন সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে। গানের এই সুর সেই পরিবেশকে তখন আরও বেশি করে যেন করুণ করে তোলে।

বিয়ে উপলক্ষ্যে, বিয়ের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান অনুযায়ী সেই সম্পর্কিত গানই গাওয়া হয়। যেমন---

কনের দেখাশোনা শুরু হলেই কনে বুঝে যায় তার জীবনের নতুন দিক পরিবর্তন হতে চলেছে। তার মনের অবস্থা নিয়ে যে গান গাওয়া হয় তা হল---

"নদীয়া কা ধারে ধারে কুইলি কা শবদ গ
আস কুইলি বস নিম ডালে গ
পালঙ্কে বসে আছেন মোর যে বাবা গ
শুন বাবা কুইলির শবদ গ।"

মেয়ের বাবার মনও ভারাক্রান্ত। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে এটা যেমন আনন্দের তেমনি দুঃখেরও। তাই বাবার মনও ব্যথাতুর। তার মনের কথায় গান হয়ে উঠে এইভাবে---

"কি অ শুনিব মা কুইলির শবদ গ
আঁখি মোর চরকিছে ছাতি মোর বিদুরিছে গ।"

বরপক্ষ সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। পছন্দ করেন। দরদস্তুর হয়। অবশেষে কথাবার্তা পাকা হয়। কথাবার্তা পাকা হলেও গান গাওয়া হয়---

"বাবার বাড়ি এ কুঁদরীর লত গ
ফুলে ফুলে ঝররলী, ডাল গ
মাচিলায় বস‍্যে আছেন মোর যে বাবা গ
বল বাবা ফুলেকেরি দর গ
সুন্দর সুন্দর ফুল দেখ‍্যে খদ্দার লাগিল গ
বল বাবা ফুলেকেরি দর গ
যদি ফুলের দরকরি দশ কুটুম খুঁজি গ।"

পন নিয়ে দরাদরিরও গান আছে---

"মালিনীর বাড়ি এ রুপল বাইগন, দশ টাকা দিব মাল‍্যান লিব বাইগন
নাই লিব দশ টাকা নাই দিব বাইগন  নাই লিব বিশ টাকা নাই দিব বাইগন।"

এখানে পাত্রীকে যেন বেগুনের রূপকেই দেখানো হয়েছে।

পিতা কেবল চায়, মেয়ে যেন শ্বশুর বাড়িতে সচ্ছল ভাবে ভাত ও কাপড় পায়। উদ্বিগ্ন কনের বাবা তাই অনুরোধ করেন মেয়ের যেন কখনও ভাত কাপড়ের অভাব না হয়। সেই সম্পর্কেও গান গাওয়া হয়---

"বাবা এ মোর সমুদয় দেশ ডাকিয়ে গ
মা এ মোর সমুদয় দেশের পাশে গ
অন্নবস্তুর না হয় যেমন জ্বালা গ
অন্নর জ্বালা পরভূ বহুত জ্বালা গ বস্তুর বিনে বড় মানে হীন।"

বিয়ের নিমন্ত্রণ পর্বও গানে গানে মুখরিত হয়। কোনও চিঠি নয়। হলুদ মাখা "হাড়কা" বা ছোট হাড়ি নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ করা হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় গোটা সুপারি। নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের মধ্যে বহনোই আর ভগ্নিপতির সম্মান সব থেকে বেশি। তাই এদেরকে নিমন্ত্রণ করার সময় জোড়াসুপারি দিতে হয়। সে সম্পর্কেও গান আছে।

"জোড় উড়াল দিয়ে বালা বহনোই আন, বহনোই এর বড় মান গ
বিরহী কুত্থি ঘড়ার দানা, ধর চাবুক ছুটাও ঘড়া গ।"

বিয়ের একটি উল্লেখযোগ্য আচার অনুষ্ঠান হল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। হলুদ মাখাতে মাখাতে উপস্থিত নারীরা সমবেতভাবে গেয়ে ওঠে---

"কঠা ঘরের দুয়ারে কঠা ঘরের দুয়ারে
বালার মা, কিসের বাতি জ্বলে?
আমাদের বালা হলদ মাখে ঘি এর বাতি জ্বলে।"

আইবুড়ো ভাত খাওয়ার অনুষ্ঠান ও গানে গানে মুখরিত। একে "আভ্ডাব ভাত খাওয়া" বলে। সেই সময়ের গান হল---

"ডুগুঁরি কা ধারে ধারে কুড়ারি কা শবদ
কে কাটিছে পাঁজনের গাছ
পাঁজন তরুতলে এই বালার জনম মা গ বালা আভ্ডাব হলদ।"

বিয়েতে নাপিতের নখ কাটাকে ঘিরেও চলে রঙ্গ রসিকতা। সেটাও গানে গানে---

"এক পইলা চাউলে নাপিত ভুলিয়ে রহিল
চাঁদের রকম বহু লাপিত চোরে নিয়ে গেল।"

"আমল" খাওয়ার অনুষ্ঠান শেষে মা ছেলেকে কোলে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করে সে কোথায় যাচ্ছে? ছেলে তখন বলে, সে কামিন আনতে যাচ্ছে। তবে এই "কামিন" শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত। বহু বা বউ, কাজের মেয়ে, রানী ইত্যাদি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। তখন গাওয়া হয়---

"রাম ঝাড়ের বাঁশ গ বালা সীতা ঝাড়ের শর
বালা চল‍্যে যা ন রাণী দরশন
এক কাঁড় বিঁধিবি বালা আদাড়ে বাদাড়ে
দশ কাঁড় বিঁধিবি বালা রাণীর বাসঘরে।"

বরকে বিয়ে করতে পাঠানোর সময় মায়েরা গান ধরেন---

"লক্ষ লক্ষ হাতি সাজে লক্ষ লক্ষ ঘড়া সাজে
রাজা মিথি সেন সাজে মথুরা গ যাও ন গ রাণীর মহলে।"

বর বাজনা নিয়ে গ্রামে পৌঁছালেই কনে ঘরের লোক সেই বাজনা শুনে গান ধরে---

"ডুগুঁরি কা ধারে ধারে কিসের বাজনা বাজে?
অই দিগের লে আসছে ধনি, তরি  শিবের লক।"

বর যাত্রীদের লক্ষ্য করে বিশেষ করে বরের ভাইকে রাগাতে মেয়েরা বেশ ইয়ার্কি মারতেও শুরু করে। গানে গানে তারা বলে ওঠে---

"বরের ভাইয়ের এলেং ঝেলেং তেলেং ধুতি
বিরালে মারিল লাথি
পিঁড়া শলের কুলহি আড়ায় সঁজনা ফুল ফুট‍্যেছে
আমরা বলি বরের ভাই ফুলঝুড়ি সাজাছে।"

বর আসতে দেরি করলেও সকলে অনুযোগ করে গান ধরেন---

"কিসের এত দেরী বর কিসের এত দেরী
আম জাম ডাল দিলি ছাঁহিরা হবেক বলি
ধারে পাশে গাছ নাই মহকে আসে বাস
কুথায় পালি রে বর কিয়া ফুলের বাস।"

মালা বদল এর সময় গাওয়া হয়---

"কচা বাড়ির ভিতরে, গুলাচ ফুলের গাছ
ডাল ভাঙি ফুল তুল‍্যে বিদেশী ভমরা
সে ফুলের হার গাথ‍্যে দিল ধনির গলে
ফুলের মালা গলে দিয়ে, গিরহ জ্বালা দিলে
নাই লিব ফুলের মালা নাই লিব জ্বালা
গিরহ জ্বালা বড় জ্বালা নয়নে বহে ধারা।"

বর নতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলে গ্রামের সকলেই নতুন বউ দেখতে ভিড় করতে শুরু করে। নব বধূ দেখার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই গেয়ে ওঠে---

"তেঁতলিপাতে ধান ঘাঁটিলাম হেলকি হেলকি পড়ে ডাল
লহকি লহকি পড়ে ডাল
ছামড়াতলে রাজকুঁয়ার জামাই গ
ছামড়াতলে রাজকুঁয়ারী কন্যা গ
হের‍্যে হের‍্যে প্রাণ গ জুড়ায়
হের‍্যে হের‍্যে মন গ জুড়ায়।"

বরের মা নতুন বউ বরণ করেন। আগত পুর নারীরা তখন গেয়ে ওঠে---

"আঁক দুয়ারে পিঁপল গাছ করে লহলহ গ
লহগি লহগি মেলে ডাল।
ছামড়ার তলে রাজপুত্র-কন্যা গ
হের‍্যে হের‍্যে মন গ জুড়ায়, হের‍্যে হের‍্যে প্রাণ গ জুড়ায়।"

আনন্দ ও দুঃখ মাখা আবেগময় এই সঙ্গীতগুলো একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্ম এখন আর এসব গানে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখন বিয়ে বাড়িতে ডি জে বক্সের সাউন্ড এই প্রাণমাখা গানগুলোর গলা টিপে ধরেছে। নিজস্ব সংস্কৃতির এই গান এখন কিছু বয়স্ক মহিলারাই গেয়ে থাকেন। এটা দুঃখের। তাই এই ধরণের গানগুলোকে বাঁচাতে হলে এখনকার মেয়েরাকেও উৎসাহী হতে হবে। না হলে এইসব আচার সঙ্গীতগুলো বাঁচবে না।

তথ্যসূত্র: ঝাড়খণ্ডের লোকসাহিত্য/ বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতো
ঋণ স্বীকার: নিবন্ধের গানগুলো "ঝাড়খণ্ডের লোকসাহিত্য" গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. খুব ভালো লাগল।মুসলিম বিয়ের গান শুনেছি। বিহার থেকে আসা অনেকেই আমাদের এখানে বসবাস করেন ।তাদের বিয়ের গান অল্প বিস্তর শুনেছি। কিন্তু জঙ্গলমহলের বিয়ের গান নিয়ে এই আলোচনা সত্যিই মনকাড়া।শুভেচ্ছা।

    ReplyDelete
  2. ভালো।গবেষণাধর্মী লেখা।―যযাতি দেবল, পানাগড়।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি