দূরদেশের লোক গল্প—তিব্বত/ঘরকুনো ছেলে /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোক গল্প—তিব্বত

ঘরকুনো ছেলে

চিন্ময় দাশ

পাহাড়-জঙ্গলের দেশ। সেখানে থাকে এক মা আর তার ছেলে। একেবারে ছোটবেলাতেই বাবা মারা গেছে ছেলেটার। থাকবার মধ্যে এই ছেলেটাই আছে মায়ের। তার বুকের ধন, চোখের মণি।
যতই বয়স বাড়ে ছেলের, ততই তাকে আঁকড়ে ধরে মা। চোখের আড়াল হতে দেয় না ছেলেকে। সব সময় ভয়, বাইরে বেরোলে, কখন কী বিপদ ঘটে যায়! ছেলের কিছু হয়ে গেলে, তাকে দেখবে কে? 
গাঁয়ের লোকেরা তাকে কতো বোঝায়—এমন কোর না গো। বড় হতে দাও ছেলেকে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাও। চিনতে দাও বাইরের দুনিয়াটাকে।
দেখতে দেখতে বয়স হোল ছেলের। তার বয়সী গাঁয়ের কোন ছেলে ঘরে বসে নেই। সবাই কাজকর্মের খোঁজে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। তেমনটাই রেওয়াজ এই দেশের।
 মা আর কী করে? অগত্যা একদিন যেতে দিতেই হোল ছেলেকে। যাবার দিন নতুন এক প্রস্থ জামাকাপড়, একটা ঘোড়া, একটা কুকুর, একটা বন্দুক আর একটা তলোয়ার ছেলেকে দিয়ে, রওণা করিয়ে দিল মা। ছেলেকে বলল—যাও বাছা, নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নাও। এত দিন বুকে আগলে রেখেছিলাম। এবার গোটা দুনিয়া তোমার সামনে খুলে দিলাম। 
এই প্রথম মায়ের আঁচলের তলা থেকে বেরোতে পেরেছে। আনন্দ যেন ধরে না ছেলেটার। কতো দেশ দেখব। কতো কিছু জানব। ভারি আনন্দ হোল ছেলের। 
সারাদিন ঘোড়ার পিঠে কেটে গেল। জনমনিষ্যির দেখা নাই কোথাও। উপত্যকার মত একটা এলাকায় পৌঁছেছে, সূর্য তখন ডুবু ডুবু। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়।
আচমকা একটা শেয়াল এসে হাজির সামনে। সামনে কুকুর আর আস্ত একটা ঘোড়া দেখে, শেয়ালও গেল ঘাবড়ে। সাথে সাথে লম্বা এক দৌড়। সোজা পাহাড়ের দিকে। 
শেয়াল চোখে পড়েছে, কুকুর কি আর স্থির থাকে? সে তাড়া করে গেল শেয়ালের দিকে। সব দেখে, ছেলেটাও মজা পেয়েছে বেশ। সেও ঘোড়া ছুটিয়ে দিল কুকুরের পেছন পেছন। 
শেয়াল অতি ধুরন্ধর জীব। খানিক দূর গিয়েই, সুড়ুৎ করে নিজের গর্তে গিয়ে ঢুকে পড়ল সে। 
কী করা যায় এখন? একটা শেয়াল তিন জনকে বোকা বানিয়ে দেবে, এটা মানা যায় না। কিছু একটা বিহিত করা দরকার। 
অনেক ভেবে, একটা বুদ্ধি এল ছেলেটার মাথায়। ঘোড়াটাকে এনে গর্তের একদিকে দাঁড় করাল। বন্দুক আর তলোয়ারটাকে পুঁতল গর্তের দু’দিকে। নতুন পোষাক দিয়েছে মা। জোব্বাটা বের করে, জিনের রেকাবি, বন্দুক আর তলোয়ারের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে দিল। কুকুরকে দাঁড় করিয়ে রাখল ফাঁকা দিকটায়। বেশ একটা ফাঁদের মত হয়ে গেছে।
এবার মাথা থেকে টুপি খুলে গর্তের মুখে চাপা দিয়ে, একটা পাথর হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপটি করে। 
বেশি সময় লাগল না। হঠাৎই গর্ত থেকে বেরিয়ে এল শেয়াল। গর্তের মুখে টুপি চাপা দেওয়া ছিল। সেটা চেপে বসেছে শেয়ালের মাথায়। চমকে গিয়ে, আবার লম্বা দৌড় শেয়ালের। তা দেখে, বিকট চেঁচিয়ে কুকুর ছুটল তার পিছনে। কুকুরের হঠাৎ চিৎকারে ঘোড়া গেল চমকে। প্রথমে লাফিয়ে উঠে, উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল ঘোড়াও। 
হায়, কপাল, এখন কী হবে? ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে লাগল, কুকুর, ঘোড়া তো গেলই, তার বন্দুক, তলোয়ার, নতুন জোব্বা—সবকিছু লোটাতে লোটাতে চলে গেল জিনের সাথে বাঁধা হয়ে। এমনকি, নিজের টুপিখানাও এখন শেয়ালের মাথায়। 
এখন পুরাণো ময়লা পোষাকটা ছাড়া কিছুই নাই আর। এদিকে অন্ধকারও হয়ে এসেছে। অগত্যা একটা বুড়ো তিরুল গাছের নীচে শুয়ে রইল রাতের মত।
জেগে উঠল যখন, আলো ফুটে গেছে। উপরে চোখে পড়ল, গাছের ডালে একটা দাঁড়কাকের বাসা। কাক বলছে—গাছের নীচে কে বল তো লোকটা? 
অন্য কাকটা বলল—আর বোল না, ঘরকুনো ছেলে একটা। দুনিয়ার আটঘাট কিচ্ছু জানে না। ঘর থেকে বেরিয়েছে। শেয়াল পাকড়াও করতে গিয়ে, নিজের কুকুর, ঘোড়া, বন্দুক, তলোয়ার সব জলাঞ্জলি দিয়েছে কাল রাতে। পরণের পোষাকটাও হারিয়ে ফেলেছে বেচারা। বোকার বেহদ্দ একেবারে।
--আহারে! কী হবে এখন ছেলেটার? 
--হতে আর বাকি আছে কী? কাক বলল—তবে, যতদূর বুঝছি, যা গেছে, সেসব আর পাবেনা কোন দিন। তবে, যদি পূবদিকের দেশটার দিকে যায়, কপাল খুলে যেতে পারে। 
এসব শুনে, ধড়মড়িয়ে উঠে বসল ছেলেটা। সত্যিই তার এখন একেবারেই নিস্ব অবস্থা। পাখির কথা বিশ্বাস করে দেখাই যাক। পূবমুখো হয়ে রওণা দিয়ে দিল।
খানিক দূর গিয়েছে, এক বুড়োর সাথে দেখা। একেবারে উলুঝুলু পোষাক। মুখময় দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। চেহারা দেখে, ভিখিরি ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায় না। ছেলেটা ভাবল ভিখিরি মানুষ। বহু জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। এর কাছে খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। 
--একটু দাঁড়াও নাগো, ভালোমানুষ। ভারি বিপদ আমার। 
এক এক করে সব কথা গড়গড় করে বলে গেল লোকটাকে। পরে বলল—ঘোড়াটার সন্ধান দিতে পারো আমাকে? 
মাথা একবার ঝুঁকিয়ে একবার উঁচিয়ে ছেলেটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত জরীপ করতে লাগল লোকটা। এই ছেলের ঘোড়া ছিল, কুকুর ছিল, বন্দুক ছিল, তলোয়ার ছিল? পোষাক-টোশাক আরও কীসব নাকি ছিল! একটা বর্ণও বিশ্বাস করা যায় না কি? 
লোকটা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল-- গল্প শোনাবার জায়গা পাওনি আর? মিথ্যুক কোথাকার। বুদ্ধু পেয়েছে আমাকে?  
মিথ্যুক তো বললই, এমনভাবে টিটকিরি দিল যে ভীষণ রাগ হয়ে গেল ছেলেটার। রাগ দেখে, লোকটা তেড়ে এসে দু’ঘা লাগিয়েই দিল ছেলেটাকে। 
কী আর করা যায়? আবার এগোতে লাগল সে।  
এবার একটা গঞ্জমতো জায়গায় এসে হাজির। সেখানে বিশাল এক বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলছে। অনেক লোকজনের সমাগম। একটা চাকরমত লোককে সামনে পেয়ে, কিছু বলতে গেছে, বরবাবাজী স্বয়ং দেখতে পেয়ে গেল ছেলেটাকে। কটমট করে চেয়ে, বলল—এই হতভাগা, তুই এখানে কেন? কোন ভবঘুরে ভিখিরিকে আজ এখানে চোখেও দেখতে চাই না আমরা। ভাগ এখান থেকে। নইলে, এমন এক থাপ্পড় কষাবো, জন্মেও ভুলবি না। 
প্রায় গলা ধাক্কা দিয়েই তাড়িয়ে দিল ছেলেটাকে। 
সারা দিন অসহায়ের মত ঘুরে বেড়াল ছেলেটা। এদিকে সূর্য ঢলে পড়েছে। রাত ঘনিয়ে আসবে। কাল খুব কষ্ট গিয়েছে গাছের তলায়। কোথাও একটা মাথা গুঁজতেই হবে আজ। শেষমেশ বেশ বড় একটা বাড়ি চোখে পড়ল তার। 
বিয়ে বাড়ির অভ্যর্থনাটা মনে খচখচ করছে খনও। এখানে সে ভুল করা চলবে না আর। কাউকে ডাকল না। দরজায় কড়া নাড়ল না। এদিক ওদিক একটু উঁকিঝুঁকি মেরে, বাড়িটার পেছন দিকে গিয়ে ভিতরে সেঁধিয়ে গেল। 
এ বাড়ির মালিকের অনেক গরু-মহিষ আছে নিশ্চয়। এখানটায় ঘুঁটের গাদা, খড়-বিচালি-ভূষি ডাঁই করা। সেগুলোর একটাতে ঢুকে পড়ল ছেলেটা।
রাত মোটামুটি ভালোই কেটে গেল। সকাল হতেই একপাল শুকর বেরিয়ে ভেতরের গোয়াল থেকে। ঘোঁৎঘোঁৎ করতে করতে ঘুরে বেড়াতে লাগল গাদাগুলোর ভিতর। 
শুকর দেখে চোখ চকচক করে উঠল তার। একটু মরিয়াও হয়ে উঠল। ঘুঁটের খোঁদল থেকে বেরিয়ে, বাড়িটার অন্দর মহলের দিকে এগিয়ে গেল। সামনে একটা লোককে দেখে বলল—শুকনো মাংস আছে আমার ঝুলিতে। কিন্তু ছুরিটা হারিয়ে ফেলেছি। মাংস কাটবার মত একটা ছুরি দেবে আমাকে। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে আমার। 
দয়া হোল বুঝি লোকটার। একটা ছুরি এনে দিল ভেতর থেকে।
নিজের জায়গায় ফিরে এসে, খপ করে একটা শুকরকে ধরে ফেলল। জীবনে এই প্রথম শুকর জবাই তার। মাথা আর কয়েক টুকরো মাংস রেখে, শুকরের বাকি দেহটা একটা ভূষির গাদার মধ্যে গুঁজে দিল। নিজে ঢুকে পড়ল একটা বিচালির গাদায়। চোখ দুটো ছাড়া পুরো শরীর ঢাকা। 
বেলা বাড়ছে। তেমন কিছুই ঘটল না। দূপুরবেলা এক মহিলা এলেন সেই জায়গাটায়। বেশ খানদানি চেহারা। নিশ্চয় এই বাড়ির গিন্নি তিনি। গোয়ালঘর, আশপাশের এলাকা দেখভাল, চাকর-বাকরদের কাজকর্ম তদারকি করতে বেরিয়েছেন। 
খড়ের গাদার ভিতর ভয়ে সিঁটিয়ে গেল ছেলেটা। যদি চোখে পড়ে যায়। মড়ার মত স্থির হয়ে পড়ে রইল সে। 
এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছেন মহিলা। হয়েছে কী, এক সময় তাঁর পোষাক থেকে কিছু একটা যেন টুক করে খসে পড়ল মাটিতে, তিনি জানতে পারলেন না। তবে, পড়বি তো পড়—ছেলেটার চোখে পড়ে গেল জিনিষটা। কী সুন্দর হালকা সবুজ রঙ! চোখ আটকে গেল তার। 
কিছু সময় ঘোরাঘুরি করে, মহিলা চলে গেলেন। এদিকে ছেলেটা ভাবছে, জিনিষটা কাজে লেগে যেতে পারে। কিন্তু বেরোতে সাহস হচ্ছে না। কেউ যদি দেখে ফেলে! কিন্তু হাতছাড়াও করা যায় না এটাকে। 
এদিক ওদিক চেয়ে, একটা ছেঁড়া কাপড় চোখে পড়ল। সবুজ রঙের পাথর। কী দারুণ দেখতে। কাপড়টা ছুঁড়ে দিল পাথরের উপর। আবার ভিতরে সেঁধিয়ে গেল ছেলেটা। খানিক বাদে একটা মেয়ে বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। একঝুড়ি গোবর ঢালতে এসেছে সে। ফেরার সময় রাস্তার উপর ছেঁড়া কাপড় পড়ে থাকতে দেখে, সেটা তুলে পাঁচিলের ফাঁকে গুঁজে দিয়ে দিয়ে গেল। ছেলেটা দেখল, পাথরটাও চলে গিয়েছে কাপড়ের সাথে।
বিকেল হতে না হতেই, বাড়ির ভিতর থেকে একটা হৈ-হল্লার শব্দ ভেসে এল। একটু একটু করে এদিকেই এগিয়ে আসছে শব্দটা। হন্তদন্ত হয়ে কয়েকজন লোক পেছন দিকের এই ঘেরা জায়গাটায় এসে হাজির হোল। তন্ন তন্ন করে খোঁজ চলছে। কথাবার্তায় বোঝা গেল, গিন্নিমার পোষাকের ফিরোজা পাথর পাওয়া যাচ্ছে না। হালকা সবুজ রঙের দামী পাথর। কোথায় যে পড়ে গেল! 
বাড়শুদ্ধ লোক হন্যে হয়ে গেল খুঁজে খুঁজে। কোথাও পাথরের দেখা নাই। এদিকটাতেও এসেছিলেন গিন্নিমা। এখানেও হদিশ হোল না কিছুই। 
হবে কী করে। প্রতিটি জায়গা খোঁজা হল বটে, প্রতিটি ঘাসের গোড়াও—কিন্তু ইটের দেওয়ালে গোঁজা ছেঁড়া কাপড়ে হাত দেওয়ার কথা ভাবতেও পারেনি কেউ।
খাওয়া নাই কারও, চোখে ঘুম নাই। কোন রকমে কাটল রাতটা। সকাল হতেই, কর্তাবাবুর হুকুম। লোক ছুটল চারদিকে। গোটা মুল্লুকে যত ওঝা-গুনিন-যাদুকর আছে, তুলে আনা হল সব্বাইকে। সারাদিন চলল তাদের কেরামতি দেখানোর প্রতিযোগিতা। 
কেউ মন্ত্র আওড়ায় বাড়ির ছাত ফাটিয়ে। কেউ আগুন জ্বেলে ফেলল হোমের জন্য। গনগনে আগুনের ভিতর মুঠো মুঠো সরষে ছেটাতে লাগল। ব্যোম-ব্যোম শব্দে কেঁপে উঠল সারা এলাকার আকাশ বাতাস। কেউ আবার কাঠকয়লার ছক কেটে অঙ্ক কষতে কষতে গোটা উঠোন ভরিয়ে ফেলল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। অঙ্ক কষে উঠোন কালো হোল। কিন্তু সবুজ রঙের পাথরের সন্ধান দিতে পারল না কেউ। অগত্যা হাল ছেড়ে দিয়ে, মুখ নামিয়ে বিদায় নিল লোকগুলো। যত সব বুজরুকের দল। 
এদিকে গিন্নিমার অবস্থা কাহিল। তিনি ঘোষণা করে দিয়েছেন—তোমাদের কত্তামশাইকে বলে দাও, ফিরোজা না পাওয়া পর্যন্ত, জলস্পর্শ করব না আমি।
মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে কর্তামশাইর। কী উপায় আছে আর। গোটা মুল্লুকের তাবড় সব গণৎকার ঘোল খেয়ে গেল। কে আর খুঁজে দেব হারানো ফিরোজা। 
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা গাদা থেকে চুপিসারে বেরিয়ে, হেলতে দুলতে বাড়ির সদর ফটকে এসে হাজির হল। পাহারাদারকে বলল—কত্তামশাইকে বলো গিয়ে, হতাশ হওয়ার দরকার নাই। এতক্ষণে আসল লোক এসে গেছে, ফিরোজা ফিরিয়ে দেবার। 
লোকটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। হাতি-ঘোড়া গেল তল, আর এ ছেলে বলে কি না …।
--ভ্যাবলার মতো চেয়ে আছো কী হে। ভেতরে যাও। সোজা কত্তামশাইর কাছে। আর শোন, সেই সাথে গিন্নিমাকেও দিয়ে এসো খবরটা। 
দোনামনা করে ভেতরে গেল লোকটা। বললও কর্তাবাবুকে। ছেলেটার বয়স আর চেহারার বর্ণনা দিতে শুরু করেছিল পাহারাদার। কিন্তু সেসব শোনে কে? কর্তাবাবুর এখন ডুবন্ত অবস্থা। খড়কুটো পেলেও, আঁকড়ে ধরেন। নিজেই হন্তদন্ত হয়ে চললেন দেউড়ির দিকে। তা দেখে, পাহারাদার লোকটা দৌড় লাগালো ভিতরবাড়িতে।  গিন্নিমাকে জানাতে হবে কথাটা। 
সারা বাড়ি হুলুস্থুল কান্ড। ঘরশুদ্ধ লোক যে যেখানে ছিল দেউড়িতে এসে হাজির হয়েছে। ছেলেটার চেহারা দেখে, কর্তাবাবুও ভড়কে গেলেন প্রথমে। এই ছেলে ফিরোজা উদ্ধার করবে? বলে কী? 
তাঁর সন্দেহ দেখে, গিন্নিমা বললেন—আচ্ছা বেকুব তো। তুমি কি জামাই পছন্দ করতে বসেছ না কি? আমার ফিরোজা ফিরে চাই। তা সে যেই খুঁজে দিক না কেন। এই বলে দিলাম। 
ছেলেটা দেখল গুমোর দেখাবার এমন সুযোগ আর আসবে না। সে গম্ভীর গলা করে বলল-- দুটি কথা আমার। কাল সকালে পাথরটা খুঁজব আমি। রাত্তিরেই লোক পাঠিয়ে দিন। যারা আজ ভেলকি দেখিয়ে ফিরে গিয়েছে, তাদের সবাইকে ডাকতে হবে আবার। আর দুই, বাড়ির সামনে এত বড় মাঠ আপনার। যদি খুঁজে দিতে না পারি, এই মাঠে জ্যান্ত পুঁতে দেবেন আমাকে। মন চাইলে, গাছের ডালে ঝুলিয়েও দিতে পারেন। শূলেও চড়াতে পারেন ইচ্ছে করলে। 
এত বড় কথা কেউ শোনেনি বাপ-ঠাকুর্দার কালে। গিন্নিমা বেশ ভরসা পেলেন মনে। বেশ খাতির করে, ছেলেটাকে বাড়িতেই রেখে দিলেন তিনি। 
কর্তামশাইর লোকেরা বেরিয়ে পড়ল সন্ধ্যা না হতেই। চারদিকে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দেওয়া হোল। ছোট বয়সে দেশের সব চেয়ে বড় ওঝা হাজির হয়েছে। যারা ওঝার কেরামতি দেখতে চাও, সকাল বেলা চলে আসতে পারো।
পরের দিন। সকাল হয়েছে। ভিড়ে থিকথিক করতে লাগল বাড়ির সামনেটা। গতকালের ওঝা, গুনিন, লামার দলকেও ডেকে আনা হয়েছে। তারাও দেখতে চায়, কে এই নতুন ওঝা!
ভিড়ের ভিতর সেই ভিখিরীর মত লোকটাও ছিল, ঘোড়া খুঁজে দেওয়ার কথা শুনে, যে প্রথম মারধোর করেছিল ছেলেটাকে। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল বিয়েবাড়ির  যে বর, সেই ছেলেটিও এসেছে মজা দেখতে।
ভীড়ের সামনে এসে দাঁড়াল ছেলেটি। হাতে শুকরের সেই কাটা মাথাটা। সবাইকে উদ্দেশ করে বলল—ভন্ডামি করতে জানি না আমি। জীবনে কোনদিন ভন্ডামি করিওনি। কর্তামশাইকে বলেই দিয়েছি, আজ যদি ফিরোজা খুঁজে দিতে না পারি, আমাকে শূলে চড়িয়ে দেওয়া হবে এই মাঠে। পুঁতেও দিতে পারেন। গাছে ঝুলিয়েও দিতে পারেন। 
তবে, একটা কথা আগেই বলে রাখি। আমি কোনও যাদু জানি না। যা কিছু ক্ষমতা, সব এই শুকরের মাথাটার। নিজের খাদ্য খোঁজা ছাড়া, জীবনে কোনও অপরাধ বা অন্যায় করে না শুকরেরা। তাই মরার পরেও, কারও অপরাধ বা অন্যায় সে সহ্যও করে না। 
আমি নয়, আজ এখানে ফিরোজা খোঁজার কাজ এই মরা মাথাটাই করবে। এটা হাতে নিয়েই আমি তোমাদের ভীড়ের মধ্যে যাব। চুরি যাওয়া পাথর, চোর কিংবা অন্য কোনও কাজে অপরাধি কেউ থাকলে, নিশ্চয়ই এ চিনে ফেলবে। আর হ্যাঁ, শেষে একটা কথা বলে রাখি, যতক্ষণ এটা আমার হাতে আছে, ততক্ষণই এর ক্ষমতা। অন্যের হাতে গেলে, নেহাতই একটা খুলি ছাড়া এটা আর কিছুই নয়।
সূঁচালো মুখ শুকরদের। সেই সূঁচালো দিকটা সামনের দিকে এগিয়ে ধরে, ভীড়ের ভিতর ঢুকে পড়ল ছেলেটা। প্রত্যেকের সামনে গিয়ে এক মূহুর্ত দাঁড়ায়। তার পর পরের লোকের সামনে চলে যায়।
এই ভাবে সেই বর ছেলেটার সামনে এসে হাজির হোল। অমনি হাতে ধরা মাথাটাকে থরথর করে কাঁপাতে শুরু করল সে। সবাই অবাক। সকলের চোখ ছানাবড়া।
ছেলেটা গম্ভীর গলায় বলল— এ নিশ্চয় দুষ্টু লোক। শাস্তি দেওয়া হবে কি না, আমি জানি না। তবে, একে এখান থেকে বের করে দেওয়া হোক। 
বলা শেষ না হতেই, আশপাশের লোকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল বরবাবাজীর উপর। টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করে নিয়ে গেল। এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষির বৃষ্টি হতেই থাকল বেচারার উপর।
ছেলেটা তখন ঘুরেই চলেছে ভীড়ের লোকেদের সামনে সামনে। সেদিনের ভিখিরীর সামনে এসে আবার হাত কাঁপাল। শুকরের মাথাটা যেন ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে তার উপর। বরের মতো একই অবস্থা হোল লোকটার। 
কিন্তু আসল কাজ তো কিছুই হচ্ছে না এখনও। অস্থির হয়ে উঠছে সবাই। এদিকে, দুজনকে ধোলাই দেওয়াতে পেরে, ছেলেটার মনে বেশ আনন্দ। এবার আসল কাজে মন দেওয়া যাক। এই ভেবে, মাথাটাকে সেই ভাবে ধরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগল। যেন পাথর খুঁজছে। 
ঘুরতে ঘুরতে খড়-বিচালীর জায়গাটায় গিয়ে হাজির হোল ছেলে। তার পিছনে লম্বা একটা ভীড়। ছেলেটা এখানে ওখানে খোঁজাখুঁজির অভিনয় করল কিছুক্ষণ। তার পর পাঁচিলের সামনে পৌঁছে, খুঁজতে লাগল। কাপড় গোঁজা জায়গাটায় পৌঁছে, হাত ঝাঁকাতে লাগলো জোরে জোরে। যেন হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে মাথাটা। যেন ধরে রাখাই দায় হচ্ছে। 
অমনি জোর গলায় চেঁচিয়ে উঠল ছেলেটা—পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি। এই মাথাটা কখনো বিফল হয় না। এখানেই কোথাও আছে পাথরটা। ভালো করে খুঁজে দেখা হোক। 
খোঁজা শুরু হল তন্ন তন্ন করে। কিন্তু পাথরের হদিশ নাই। তখন ছেলেটা বলল—ঐ ন্যাকড়াটা ওখানে গোঁজা কেন? টেনে দ্যাখো তো। 
অমনি হই হই। ন্যাকড়ায় জড়ানো বহুমূল্য ফিরোজা। রোদ লেগে ঝলমল করে উঠল পাথরটা। 
ছেলেটার মুখে হাসি। বুক চিতিয়ে বলল—বলেছিলাম কি না, এ কখনো বিফল হয়নি। 
গিন্নিমা তো আহ্লাদে আটখানা। পারলে বুকে জড়িয়ে ধরেন এই পথের ছেলেকে। বললেন—একটা কথা বলি তোমাকে, বাবা। তুমি থেকে যাও আমার বাড়িতে। বয়স হচ্ছে। কখন আবার কবে কী হারিয়ে বসি। তুমি থাকলে, নিশ্চিন্তে থাকতে পারব। 
ভীষণ ভড়কে গেল ছেলেটা। নিজের চোখে পাথরটা পড়ে যেতে দেখেছিল, তাই এবারের মতো উতরে গেছে। দ্বিতীয় বার কেরামতি দেখাবার ক্ষমতা তার কোথায়? এখান থেকে সরে পড়তে না পারলে, বেঘোরে প্রাণটাই খোয়াতে হবে।
ঢিপ করে গিন্নিমাকে একটা গড় করে ফেলল সে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—গরীর-গুর্বো মানুষ আমি। আপনার কাছে থাকতে পারব, সে কপাল কি আমার আছে, মা? ঘরে যে আমার বুড়ি মা বসে আছে পথ চেয়ে। তার কাছেই তো ফিরতে হবে আমাকে।
একথা শুনে, ভারি খুশি হলেন গিন্নি মা। তবে সেদিনই ছাড়লেন না ছেলেটাকে। দিনকয় বাড়িতে রেখে, ভালো মন্দ খাইয়ে, তবে ছাড়লেন। যাওয়ার দিন ভালো কাপড়-চোপড়, অনেক টাকা-পয়সা দিলেন ছেলেকে। একটা ঘোড়াও দিলেন তাকে ঘরে ফেরার জন্য।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি