ড. প্রবালকান্তি হাজরা ( আঞ্চলিক ইতিহাসকার, প্রধান শিক্ষক, খেজুরী )/ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১০

ড. প্রবালকান্তি হাজরা ( আঞ্চলিক ইতিহাসকার, প্রধান শিক্ষক, খেজুরী )

ভাস্করব্রত পতি

তাঁর স্মরণে, মননে, চিন্তনে কড়া নাড়ে রবি কবি। তাঁর চেতনায় মূর্ত হয় রবি কবি। তাঁর লেখনীতে প্রতিভাত হয় রবি কবি। এ হেন বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব যে কারও জীবনে ঠাঁই পেতে পারেন। সকলেই চায় তাঁকে অনুসরণ করতে। অনুধ্যান করতে। প্রবালবাবুও চেয়েছেন। পেরেছেন। আত্মীকরণ করেছেন রবি কবিকে।

খেজুরির দেউলপোতা গ্রামের ড. প্রবালকান্তি হাজরা অন্য পথে চলতে ভালোবাসেন। অন্য সুরে গাইতে ভালোবাসেন। রবি কবিকে আশ্রয় করেই গড়ে তুলতে চেয়েছেন নিজের জীবনবোধ। তা তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন সবাকার মাঝে। আশ্রয় নিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবাদর্শে। এই দুই মহাপুরুষ যেন তাঁর জীবনপথকে রাঙিয়ে দিয়েছে। অন্য ভুবনের পথ দেখিয়েছে। বেঁচে থাকার পাথেয় পেয়েছেন।

১৯৪৫ এর ১৭ ই অক্টোবর খেজুরীর দেউলপোতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. প্রবালকান্তি হাজরা। প্রফুল্লকুমার ও কমলাদেবীর ছয় সন্তানের মধ্যে তিনিই বড়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর স্তরে প্রথম স্থান লাভের পর বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। UGC ফেলোশিপ নিয়ে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. নীলরতন সেনের অধীনে থেকে 'রবীন্দ্রনাথের সমাজভাবনা' বিষয়ে গবেষণা করেন। ১৯৮২ তে ডক্টরেট লাভ করেন। ১৯৭৬ থেকে প্রকাশিত 'খেজুরী' সংবাদপত্রের সহকারী সম্পাদক হিসেবে যুক্ত থাকেন প্রথম থেকেই। পুষ্পপ্রেমীদের জন্য প্রকাশিত 'কূসুমিকা' সম্পাদনা করেন প্রবালবাবু। এরকম অসংখ্য পত্র পত্রিকার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত। জেলাজুড়ে প্রকাশিত ভুরি ভুরি পত্র পত্রিকাতে নানা বিষয়ে তাঁর লেখা ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়েছে মেদিনীপুর জেলার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসময়ই মুখর তিনি। বিশ্বাস করেন, নিরলস পরিশ্রমই যাবতীয় সাফল্যের চাবিকাঠি। শঠতা করে কোনো কিছুই পাওয়া নাপসন্দ তাঁর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাছে স্বপ্ন। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে রক্তমাংসের এই 'ঠাকুর'ই তাঁর পথপ্রদর্শক বলে মনে করেন তিনি। নানা দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর আলোচনা তাঁর লেখনীতে। যথার্থ রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবেই তাঁকে আমরা পেয়েছি মেদিনীপুরের বুকে।
দক্ষিণ ২৪ পরগণার মনসা দ্বীপ। জোয়ারের জলে ডোবে এখানকার গ্রাম, এখানকার প্রান্তর। সেই মনসা দ্বীপের রামকৃষ্ণ মিশন হাইস্কুলে মনপ্রাণ ডুবিয়েছিলেন খেজুরির প্রবালকান্তিবাবু। প্রথাগত শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর অতিক্রম করেই এসেছিলেন এখানে। শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন এবং নিয়মানুবর্তিতাকে পাথেয় করেই গড়ে ওঠা এই বিদ্যালয়ের। প্রবালকান্তির জীবনবোধের সাথে মিলে গিয়েছিল তা। পল্লীপ্রেমী, কৃষক রবীন্দ্রনাথ এবং মানুষপ্রেমী রামকৃষ্ণকে জড়িয়ে ধরতে শুরু করেন নিজের খেয়ালে।

সেখান থেকেই তিনি লিখেছেন 'রবীন্দ্র ভাবনায় কৃষি বাণিজ্য ও শিল্প' গ্রন্থটি। সেখানে তিনি অকপটে উল্লেখ করেছেন— "ছাত্রজীবনে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় পড়াশোনার সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন ভাবনাটা আমাকে বারে বারে টানত। সামগ্রিক রবীন্দ্রনাথের রূপরেখা আমার পাঠ্য বিষয়ই ছিল এম এ তে। যাকে 'স্পেশাল পেপার' বলে। এই বিষয়টিকে গভীরতা দেন রবীন্দ্র ভারতীর ওই সময়ের উপাচার্য হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। বারে বারে হোঁচট খেতাম, ঠাকুরবাড়ির রবি, সাহিত্য গান-নাচের কবি, কেমন করে জমিদার কবি হয়ে উঠলেন পল্লী উন্নয়ন, গো-খামার, আলুচাষে উদ্যোগী রবীন্দ্রনাথ। এই খোঁজ থেকেই এখানে পৌঁছানো।"

প্রবালকান্তি হাজরার লেখা বইয়ের তালিকা দেখলে চোখ কপালে উঠবেই। মেদিনীপুরকে কেন্দ্র করে তাঁর লেখার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ স্থান পেয়েছে সেই তালিকায়। তিনি লিখেছেন গ্রামীন সংস্কৃতির ঝাঁপি (২০০৯), গ্রামীন ঐতিহ্যের ঝলক (২০০৯), খেজুরীর কথা (২০০৯), গুণিজন সান্নিধ্যে (২০১০), কথার পাঁচকাহন (২০১০), রবীন্দ্র ভাবনায় কৃষি বানিজ্য ও শিল্প (২০১০), গ্রামীণ জীবনরাগের ঝিলিক (২০১১), চরিত কথামালা (২০১১), রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন ভাবনার আলোকে আজকের গ্রামোন্নয়ন (২০১১), বিতত মনন (২০১২), রবীন্দ্র অনুধ্যান (২০১২), সংস্কৃতি চারণা (২০১২), বিবেকানন্দ অনুধ্যান (২০১৩), রবীন্দ্র ভাবনার নানাদিক (২০১৩), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২০১৪), পদ্মাবোটের কবি রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), মননে শিক্ষা ও সংস্কৃতি (২০১৬), আত্মার সুঘ্রাণ (২০১৬), গ্রামীণ সংস্কৃতির ঝুলি (২০১৭), নানা অনুভবে রবীন্দ্রনাথ (২০১৮), সমকালীন ভাবনা (২০১৯) ইত্যাদি। প্রতিটি বই আজ পাঠক সমাজে ঋদ্ধ। গবেষকদের কাছে পরম পাওয়া এগুলি। আঞ্চলিক ইতিহাসপ্রিয়দের কাছে জীবন্ত দলিল।

গ্রামের ছাপোষা মানুষ তিনি। বিস্তীর্ণ ধানজমি, বেনা ঘাস আর আলপথ পেরিয়ে তিনি যাতায়াত করেন। তাই ভালোবাসেন গ্রামকে। ভালোবাসেন গ্রামের মানুষকে। ভালোবাসেন গ্রামের ঐতিহ্যকে। কিন্তু সেই সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। এই পরিবর্তন ধরা পড়েছে প্রবালকান্তির চোখে। শুধুমাত্র চাকরি, অবসর আর অবসর পরবর্তী আয়েসী জীবনে তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন না। চান না, তেমন জীবন কাটাতে। পরিবেশ প্রকৃতি আর মানুষজনকে নিয়ে তাঁর ভাবনা। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের খুঁটিনাটি তুলে ধরা ভবিষ্যতের দলিল হিসেবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা লিখিত ইতিহাস তুলে ধরার অদম্য ইচ্ছা। আজ জীবন সায়াহ্ণে পৌঁছেও থেমে নেই কলম। থেমে নেই পথচলা।

আজ আর অমলের দইওলারা হাঁক দেয় না। শিল কাটাইকারীদের দেখা মেলে না! গ্রামীণ যাত্রার আসরও বসে না হ্যাজাক জ্বালিয়ে! পালকি চলার ঐতিহ্য দেখা যায় না গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে! আকাশপ্রদীপ বিলুপ্তপ্রায়। এখনকার প্রজন্ম জানেই না সেসব। ঢেঁকিতে ধান ভানে না গাঁয়ের মেয়েরা! এরকম নানা ঘটনা তাঁকে আঘাত করেছে। বিপর্যস্ত করেছে তাঁর সাংস্কৃতিক মনকে। মনে মনে কষ্ট পান। অথচ মেদিনীপুরের মানুষ হিসেবে একসময় আকছার দেখা মিলতো। এগুলোই তো গ্রামের পরিচয়। এগুলোই তো বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতি। এগুলোকে তো হারিয়ে দিতে যাওয়া যায়না। তাই সেসব তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর নানা স্বাদের বইতে। যা যে কোনো সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষের কাছে অন্যতম পাথেয়। খোদ খেজুরির তথা তাঁর জন্মভূমির নানা ইতিহাসও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন আঞ্চলিক ইতিহাসকে ভালোবেসেই।
গ্রাম ভালোবাসেন। গ্রামে থাকতে পছন্দ করেন। তাই স্বভাবতই তাঁর লেখনীতে আলাদা মাত্রা পায় গ্রাম। মেদিনীপুরের বুকে প্রবালকান্তি হাজরার মতো এমন গ্রামপ্রিয় গবেষক এবং লেখক মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আসলে তিনি নিজের জীবনকে ভাসিয়ে দিয়েছেন রবি কবি এবং রামকৃষ্ণের ভাবাদর্শেই। এই দুই তপস্বীকে তিনি ছাড়তে চান না আমৃত্যু। তাই গ্রাম গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় ধরা পড়ে প্রবালকান্তি হাজরার লেখনীতে। ক্ষুদ্র চোখে বিশালভাবে দেখার 'চোখ' অর্জন করেছেন ঐ দুই তপস্বীর কাছ থেকেই। মেদিনীপুরের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের রক্ষায় আজও তিনি সচল।

একসময় পেটের তাগিদে গ্রাম থেকে ডিম সংগ্রহ করে বেচতেন। খবরের কাগজ কেটে ঠোঙা বানিয়ে আয় করতেন। পরের বাড়িতে জনমজুরি করতেন। আর লিখতেন। ভালোবাসেন গাছ, পাতা, ফুল। ভালোবাসেন মানুষ। ভালোবাসেন মেদিনীপুর। সেই ভালোবাসার জারক রসে ডুবিয়ে রেখেছেন মেদিনীপুরের মানুষদেরও।

নিজেকে প্রচারের আলো থেকে সরিয়ে রাখা এই মানুষটি আসলে মেদিনীপুরের মানুষ রতন। নীরবে নিভৃতে থেকে উজ্জ্বল উদ্ধার করে চলেছেন জেলার সংস্কৃতির। টালির ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়িতেই থাকেন তিনি। গাছগাছালি ভরা খেজুরীর প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর নিরলস সাহিত্য কীর্তি। 'পেনশনহীন' অবসর জীবন কে তিনি 'টেনশনহীন' জীবনে পর্যবসিত করেছেন লেখার মাধ্যমে ডুবে থেকে। তাঁর কথায়, "আর্থিক দিকটার কথা মাথায় রেখে সংসার, মেয়েদের পড়াশোনা -- সর্বোপরি তাঁদের বিয়ের চিন্তাটা মাথায় দুশ্চিন্তা হয়ে চেপেছিল। অবসরের আগে পরে এঁদেরকে সংসার জীবনে বসিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হই। অতঃপর হিসাব মিলিয়ে দেখি, পেনশনহীন জীবনে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে যে কটাদিন বাঁচব, তাতে মোটা ভাত মোটা কাপড়টুকুর সংস্থান হলেই তৃপ্ত"।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. যথার্থ প্রতিবেদন ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি