প্রাণীর দেহে রত্নের বাস /নিশান চ্যাটার্জী

জীবনের গভীরে বিজ্ঞান- ৮

প্রাণীর দেহে রত্নের বাস

নিশান চ্যাটার্জী

মুক্তা হলো প্রকৃতির একটি অপূর্ব সুন্দর ঔজ্জ্বল্যময় সৃষ্টি। এটি ভালোবাসেন না এরকম মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিবিধ সামাজিক অনুষ্ঠানে এই বিশেষ জিনিসের চাহিদা থাকে যা একদিকে আভিজাত্য ও অন্যদিকে বনেদিয়ানার সংকেত বহন করে। এই মুক্তার সৃষ্টি কিন্তু জলের মধ্যে। জলের এই অমূল্য সম্পদটি যুগ যুগ ধরে অলঙ্কারের একটি বিশিষ্ট রত্ন রুপে ব্যবহৃত হয়। রাজকীয় এই রত্নটি বৈচিত্র্য ময় আয়তন, আকৃতি ও বর্ণ সমৃদ্ধ হতে পারে।

 হিরে,পোখরাজ এবং অন্যান্য মূল্যবান পাথরের ন্যায় খনি থেকে খনন করে মুক্তা নির্গত করা হয়না। মুক্তাই একমাত্র রত্ন, যা সৃষ্টি হয় একটি জীবিত প্রাণী অর্থাৎ ঝিনুকের বিশেষ ক্ষরণের ফলে। এর সৃষ্টি রহস্যই আজকের আলোচনার প্রধান বিষয়।

             প্রাচীন যুগেও মুক্তার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। বেদ, চীনের প্রাচীন পুথি এবং বাইবেলে মুক্তার উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিক রোম সাম্রাজ্যে মুক্তাকে এতো মূল্যবান রুপে গণ্য করা হতো যে কিছু বিশেষ পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া এই রত্ন গ্রহণ করার অধিকার সকলের ছিলনা। কথিত আছে জুলিয়াস সিজারের ব্রিটেন আক্রমণের কারণই ছিল মুক্তা প্রাপ্তির সম্ভাবনা। ঝিনুক জাতীয় কিছু প্রজাতির ম্যান্টেলের একটি বিশেষ গ্রন্থি ( ন্যাকার গ্রন্থি) থেকে ক্ষরিত পদার্থ সঞ্চিত হয়ে মুক্তা গঠন করে। এই সকল প্রাণীদের দেহাভ্যন্তরে কিছু বহিরাগত কণা প্রবেশ করলে, তাকে ঘিরে ওই ক্ষরিত বস্তুর প্রায় সহস্রাধিক স্তর জমা হয় এবং পুঁতির দানার আকারের নিখুঁত, উজ্জ্বল ও মূল্যবান পদার্থ গঠিত হয়, যাকে মুক্তা বলে। ভারতে মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুকের প্রায় ছয়টি প্রজাতি রয়েছে।

 মুক্তা ঝিনুক গুলো সাধারনত উষ্ণ মহাসাগরীয় পরিবেশে বাস করে। পৃথিবীর অন্যতম মুক্তা উৎপাদনকারী অঞ্চল গুলি হলো পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের সংলগ্ন সমুদ্র। বর্তমানে উন্নত ও বিজ্ঞানসম্মত চাষ এবং মুক্তা সংগ্রহের পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য জাপানকে পৃথিবীর মুক্তা উৎপাদনকারী দেশ রুপে গণ্য করা হয়। ভারতবর্ষের মুক্তা ঝিনুকের স্বাভাবিক বাসস্থান গুলি হলো গুজরাটের কচ্ছ উপসাগর, তামিলনাডুর মান্নার উপসাগর,অন্ধ্র উপকূল প্রভৃতি। 

            মুক্তা প্রধানত দুই প্রকার যথা প্রাকৃতিক মুক্তা এবং কৃত্রিম বা প্রতিপালিত মুক্তা। যখন আকস্মিক ভাবে কোনো বহিরাগত কণা  ঝিনুকের দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন সেই অবাঞ্ছিত পদার্থ কে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় নিউক্লিয়াস। যাকে ঘিরে বিশেষ  ক্ষরণের সঞ্চয় ঘটে। এইভাবে সৃষ্ট মুক্তাকে বলা হয় প্রাকৃতিক মুক্তা। কৃত্রিম মুক্তা সৃষ্টি র পদ্ধতি টি এক ই হলেও এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াস টিকে বাইরে থেকে ঝিনুকের জনন গ্রন্থি তে প্রবেশ করানো হয় একটি বিশেষ অস্ত্রপ্রচারের মাধ্যমে। নিউক্লিয়াসের সাথে মাছ থেকে প্রাপ্ত গুয়ামিন নামক পদার্থের প্রলেপ দেওয়া হলে তখন তাকে নকল মুক্তা বলে।  মুক্তায় উপস্থিত রাসায়নিক উপাদান গুলি হলো আরগোনাইট,কনচিওলিন এবং জল। ভারতে সমুদ্রের তুলনামূলক উষ্ণ জলে মুক্তা চাষের সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। Alagarswami (1973) উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কে কাজে লাগিয়ে CMFRI এবং  CIFA এর উদ্যোগে ভারতে মুক্তা চাষে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। পরিশেষে একথা মানতে কোনো আপত্তি নেই যে প্রকৃতি তার আপন খেয়ালেই জীবজগতকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সাধ মেটাতেও সর্বদাই তৎপর থেকেছে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি