নবারুণ ভট্টাচার্য /বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

বাংলা গল্পের পালাবদল—২

নবারুণ ভট্টাচার্য 

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩ জুন ১৯৪৮—৩১ জুলাই ২০১৪) এমন একজন লেখক যাঁর রচনার কোনও পূর্বসূরী নেই। এখনও পর্যন্ত তাঁর সাহিত্য ধারার কোনও উত্তরসূরীও চোখে পড়েনি। সমসাময়িক লেখকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম বয়সে গল্প লেখা শুরু করেছিলেন। ষাটের দশকের লেখক হিসেবে পরিচিত তিনি। প্রথম গল্প ‘ভাসান’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে, ‘পরিচয়’-এ। এই প্রথম গল্প থেকেই তিনি নিজের সাহিত্য রচনার স্বতন্ত্র পথটিকে চিহ্নিত করে দিতে পেরেছিলেন। তারপর একটার পর একটা গল্প— ‘স্টিমরোলার’ (সপ্তাহ, ১৯৭০), ‘খোঁচড়’ (সাহিত্যপত্র, ১৯৭১), ‘প্রতিবিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ (সাহিত্যপত্র, ১৯৭৩) ইত্যাদি। সচেতন পাঠককে হতচকিত করেছিল নবারুণের এইসব গল্প। বারবার সেদিন মনে হয়েছিল— এরকম গল্প তো ইতোপূর্বে চোখে পড়েনি! 

সময়টাই তখন অন্যরকম। চারিদিকে আতঙ্ক—অন্তর্ঘাত—সংঘর্ষ—অস্থিরতা—হল্লা। আকাশ-বাতাসে সমাজ বদলের শ্লোগান। তারই সঙ্গে বারুদের গন্ধ, গুলির শব্দ, পুলিশের ভারী বুটের শব্দ ...। সেই দ্রোহকালকে আকাঁড়া তুলে ধরলেন নবারুণ। শুধু নৈর্ব্যক্তিকভাবে তুলে ধরা নয়, তাঁর গল্পে উদগ্র হয়ে থাকল প্রতিবাদ-ক্ষোভ-জ্বালা-ঘৃণা-অন্তর্দাহ ...। সেই পোড়া-ঝলসানো সময়, ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের ক্যানভাস তাঁর রচনা। বাংলার অন্যরকম একটা সময়ে অন্যরকম গল্প নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটল নবারুণ ভট্টাচার্যের। ব্রয়লার পত্রিকার ব্রয়লার সাহিত্যের আঙিনায় তিনি উড়িয়ে দিলেন হালাল ঝাণ্ডা। 

তাঁর সাহিত্য রচনার প্রথম থেকেই নতুন স্বর। বক্তব্য এবং বলবার ভঙ্গি দুটোই অভিনব। ‘ভাসান’ রচিত হয়েছে সাধু গদ্যে, একজন মৃত মানুষের জবানিতে। প্রধান চরিত্র একজন মৃত মানুষ! লোকচক্ষুর আড়ালে মৃত্যু হয়েছে একজন পাগলের। এক পাগলি তাকে ভালোবেসে আঁকড়ে রাখতে চাইছে। আর সেই মৃত মানুষটির অনুভবের ভাষ্য এই গল্প।  

“পার্কের বাসিন্দা ডেঁও পিঁপিড়েরা মহানন্দে আমার উপর নাচানাচি করিতে লাগিল। আমার তখন দিব্যকর্ণ লাভ হইয়াছে। শুনিলাম তাহারা দীর্ঘদিন মনুষ্যচক্ষু খায় নাই। “কী আনন্দ, কী আনন্দ”। তাহাদের নাচানাচির মধ্যে কয়েকটি বুদ্ধিমান পিঁপিড়া তাহাদের বাকি দলবলকে ডাকতে গেল। দীর্ঘদিন পূর্বে এই মাঠেই আমি একটি মিটিং শুনিয়াছিলাম। লাল পতাকার উপরে কাস্তে-হাতুড়ি আঁকা ছিল। লোকটি কী সব বলিতেছিল— সকলের খাইবার দাবি।...সেই প্রথমবারের লোকটির কথা এখনও আমার মনে আছে। সে থাকিলে সুখী হইত পিঁপিড়ারা অন্তত তাহার কথামতো কাজ করিতেছে।...পিঁপড়াদের ন্যায় আমিও বলিলাম, “কী আনন্দ! কী আনন্দ!” পিঁপড়ারা তাহাদের কাজ ইতিমধ্যেই আরম্ভ করিয়া দিয়াছিল। আমার ডান চক্ষু এবং বাঁ চক্ষুর মধ্যে যে একটি গোপন পথ আছে তাহা আমি জানিতাম না। ডেঁওর দল এক চোখ দিয়া ঢুকিয়া অন্য চোখ দিয়া বাহির হইতেছিল। পথটি কিছুক্ষণ বাদে পুরনো হইয়া যাওয়ায় তাহারা নাক ও কান, কান ও চোখ ইত্যাদি নূতন নূতন পথ খুঁজিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।”   
   
পিঁপড়েদের কাছ থেকে খবর পেল মাঠের ইঁদুর। ইঁদুরদের কাছ থেকে কুকুর। শেষে দেখি পুলিশ এসে কালো গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল নগ্ন দেহ। গর-গর শব্দে গাড়ি চলল। আর ততক্ষণে মনে হল যে সে পাগলিকে বড় ভালোবাসে।  

অনায়াসে সাবলীল ভাবে এ গল্প পড়ে ফেলা যায় না। বার বার থামতে হয়। লেখকের দর্শন এবং বক্তব্যকে বুঝতে হয়। নবারুণের গল্প প্রথমাবধি পাঠককে ধাক্কা দিয়েছে। খুব সচেতনভাবে ধাক্কাটা দিতে চেয়েছেন তিনি। কারণ তিনি ‘ভাতঘুম সাহিত্যে’ বিশ্বাসী নন। পাঠক তাঁর লেখা পড়ে যদি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে না পারে তবে তাঁর মনে হয় কিছু একটা হল। তাঁর অধিকাংশ গল্পের পাঠক্রিয়ায় পাঠক নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন না। ঘুমে জাগরণে বারবার মনে পড়ে তাঁর গল্পের ছোট ছোট দৃশ্য। আর ভেসে ওঠা সেইসব দৃশ্য-দৃশ্যকল্প জোর ঝাঁকুনি দেয়। 

‘খোঁচড়’ গল্পের সেই লোকটাকে আমরা ভুলতে পারি না— যার শার্টের কলারটা শেষ হবার কাছে ঘাড় আর পিঠের মাঝামাঝি ইঞ্চি দুয়েক জায়গা জুড়ে একটা চুলকুনির অসুখ। চামড়াটা ওখানে নরম, লোম নেই, তেলতেলে আর ছিট ছিট দাগ। অসুখটা ইচ্ছের সঙ্গে বাড়ে কমে। কাউকে খুন করার আগে জায়গাটা ভিজে দাগড়া হয়ে ফুলে ওঠে। আর চিড়বিড় করে চুলকোয়—রস কাটে—তখন ওর চোখদুটো ঠাণ্ডা বরফকুচি হয়ে আসে। আর ও বুঝতে পারে যে কারুর লাশ আনবার সময় এখন খুব কাছে।
এই লোকটা প্লেন ড্রেসের পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে যায় কালীতলা যুবক সমিতির জলসায়। বোম্বের আর্টিস্ট এসেছে বলে খুব ভিড় সেখানে। সেই জলসায় গান শুনছে গৌতম বিশ্বাস। ভিড় ঠেলে একেবারে পেছনে।

“রিভলবারটা প্রায় পেটের সঙ্গে ঠেকিয়ে ট্রিগার টানে...ব্লব্‌...ছেলেটার বিস্ফারিত চোখ...সাইলেন্সারে গুম হয়ে যাওয়া আওয়াজ...ওয়াক্‌ ছেলেটার পেট থেকে রক্ত ছিটকোয়...মুখটা হাঁ করা...বাতাস উগরোয়...হাঁটু ভেঙে সামনে এগিয়ে আসে...চোখদুটো সহসা আঘাতে বিস্ময়ে বোবা...ওর মুখ থেকে লালা পড়ছে...ছেলেটা যেন ওকে ছুঁতে আসে...না পেরে উল্টে হাঁটু গেড়ে শরীরটা পড়ে...ও এক পা সরে আসে তারপর খুলির নীচে গলায় রিভলবারের মুখটা ঠেকিয়ে গুলি করে ব্লব্‌ শরীরটা ছিটকে যায়...লালা টানার অশ্লীল শব্দ...হাতদুটো একটু কাঁপে...চারপাশে চিৎকার...ফিকে একটু কর্ডাইট আর রক্তের গন্ধ...আলোগুলো দুলছে...লোক দৌড়োয়...চিৎকার...”

সাইলেন্সারের শব্দ বেশি দূরে না গেলেও খুনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পাশের পাড়ার গৌতমের রক্তমাংসের গা গুলিয়ে ওঠা দৃশ্যে সমিতির ছেলেরা জলসা থামিয়ে দেওয়ার কথা ভাবে। কিন্তু পুলিশের অর্ডার—“জলসা ফলসা থামানো চলবে না, গান হোক, গান চলুক—আমরা লাশ বার করে নিয়ে যাচ্ছি—শুরু করতে বলুন।” দুজন প্লেনড্রেস ছেলেটাকে নিয়ে চলে। একজন একটা হাত, আর একজন একটা পা ধরে ছেলেটাকে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—রক্তাক্ত গলার পর অসহায় মাথাটা ঝুলছে—চোখটা খোলা। ওদের চলার ধরনে মাথাটা যেন এই বহুদৃষ্ট যাত্রার প্রতি গভীর সম্মতিতে দুলছে। রক্ত ছড়িয়ে গেছে সারা জামা। মুখটা খোলা, কিছুটা বিস্ময় এখনো মুখ থেকে যায়নি। ডান পা মাটিতে ছেঁচড়ে চলে, হাতের আঙুলগুলো টেনে টেনে মাটিতে দাগ কাটতে চেষ্টা করে যেন। লাশের পেছনে পিস্তল নিয়ে সেই লোকটা। মাইকের যান্ত্রিক শব্দটা আবার শুরু হয়—সেটাকে ছাপিয়ে পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়নের দু-একটা সুর শোনা যায়। যে জায়গাটায় ছেলেটা পড়েছিল সেখানে রক্ত থেকে থেকে জমাট বেঁধে আছে। এক পাটি চটি উল্টে পড়ে আছে। কে একজন বলে—চুন এনে ছড়িয়ে দিতে শুষে নেবে।

এই গল্প পড়ার পর কেই-বা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে! প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া একটা নির্মম হত্যা-দৃশ্যের পরেও মানুষের সন্ত্রস্ত হওয়ার উপায় নেই। ভয় পাওয়ার সুযোগ নেই! প্রশাসনিক নির্দেশে আনন্দ-উচ্ছ্বাস চালিয়ে যেতে হবে! মৃত্যুর ভারী বাতাসের উপর ততোধিক ভারী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চেপে বসেছে। মানুষের সকল আশঙ্কাকে তছনছ করে দিচ্ছে ভারী বুট। আর সদর্পে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে খোঁচড়েরা। শুধু এই গল্পে নয় তাঁর সকল রচনার মধ্য দিয়ে নবারুণ আসলে খোঁচড়দের চিনিয়ে দিতে চেয়েছেন। চিহ্নিত করতে চেয়েছেন গুপ্ত ঘাতকদের।  

‘ভাসান’-এ দেখেছি মরে যাওয়ার পর লোকটির মনে পড়েছে লালপাটির মিটিং-এর কথা। সবার খাওয়ার দাবির প্রসঙ্গ এসেছে তার অনুভবে। আর এখানে দেখছি মৃত্যুর পরও ছেলেটা হাতের আঙুলগুলো দিয়ে টেনে টেনে মাটিতে দাগ কাটতে চেষ্টা করছে। মৃত্যুর পরেও তার অধিকার-দাবী-প্রতিবাদ-প্রত্যাখ্যান... থেকে বিন্দুমাত্রও সরে আসেছে না। মর্গের অন্ধকারে যখন সে একা তখনও তার সঙ্গে অনেক অনেক কথা বলেছেন লেখক। রাষ্ট্র-ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা অনুভব মৃত গৌতমের সঙ্গে কথোপকথনে প্রকাশ পেয়েছে। লেখকের প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্ন-আত্মজিজ্ঞাসা প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেখানে। নবারুণ জীবন-মৃত্যুর বিভাজন রেখাটিকে অস্বীকার করেছেন। শুধু মাত্র সজীব অস্তিত্বের জগতের মধ্যে আটকে থাকেনি তাঁর গল্প। সেখানে আবহমানের ধ্বনি জেগে আছে। 

মৃত্যুর পরেও জীবনের কণ্ঠস্বর। জীবনের পুনর্নির্মান। নাকি পুনর্জন্ম। এই গল্পের নায়ক নিজের সত্তাকে নিজেই খুঁজেছে। নিজেই নিজের শেষযাত্রার সঙ্গী হয়েছে। মৃত্যুর পরেও ব্যক্ত করেছে জীবনের অভিলাষ। মৃত্যু-পরবর্তী জীবন বাংলা গল্পে এর আগে এতটা গুরুত্ব পায়নি। বস্তুত নবারুণের গল্পে একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে মৃত্যুর প্রসঙ্গ। মৃত্যু তাঁর লেখায় নানান ভাবে এসেছে। মৃত্যুর আগের এবং পরের— অস্তিত্বের দুই স্বরূপকেই তিনি উন্মোচন করতে চেয়েছেন। ব্যক্তিসত্তাকেই যেন ডিটেকশন টেবিলে শুইয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ছিন্ন ভিন্ন করে দেখেছেন। সেই পরীক্ষাগারে জীবন-মৃত্যু একাকার হয়ে গেছে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একটা মানুষ মুহূর্তে নামগোত্রহীন একটা বডিতে পরিণত হবে— নবারুণ তা মানেন না। তাই তাঁর চরিত্ররা মৃত্যুর পরেও সমান ক্রিয়াশীল।   

উল্লেখ্য ‘মৃতদেহ দর্শন’ (অমৃতলোক, ১৯৯৬) গল্পটি। একজন লেখক মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করতে গিয়ে দেখে ভোটের বাজারে মার্ডার হয়ে যাওয়া একটি যুবক উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পায়ে সস্তার স্নিকার। জিনস। শার্টের উপর জ্যাকেট। বাড়ি ফিরেই সে ফোন করে লালবাজারে। যে রাস্তাটা আনোয়ার শাহ রোড থেকে ঢুকেছে সেখানে পড়ে আছে বডিটা— তাও জানিয়ে দেয় পুলিশকে। নিজের নাম ঠিকানা অবশ্য বলেনি। পরদিন এরকম কোনও খবর বেরোয়নি কাগজে। বিমলেন্দুর বন্ধুরা চোরাগোপ্তা অনুসন্ধান চালিয়েও এরকম স্নিকার, জিনস, জ্যাকেট পরা মড়ার খোঁজ পায়নি। ওরকম কোনও মার্ডার হয়েছে বলেও কেউ শোনেনি। বিমলেন্দুর চিকিৎসা শুরু হয়। 

বাড়িতে ফিরে এসেছে বিমলেন্দু। অনেকটা ভালো। ওষুধ খায়। সঙ্গে এক পেগ। লিখবে ভাবছিল। তারপরের দিনই কাগজে দেখা গিয়েছিল যে— “যে রাস্তটা আনোয়ার শাহ রোড থেকে ঢুকেছে, সেখানে পাওয়া গেছে একটি মৃতদেহ। স্নিকার, জিনস, উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা—সবই মিলে গেল। গলাকাটা। বিমলেন্দুর ট্রিটমেন্ট চলছে। কিন্তু, অকারণে সে মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠছে,—‘হার্মাদ! হার্মাদ!”  

একই সত্তার মধ্যে বহু সত্তার অবস্থান। বিমলেন্দুর এই মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠার অভিব্যক্তি বহুকোণিক। এর মধ্য দিয়ে একটা রাজনৈতিক বয়ানও উঠে এসেছে। তলিয়ে যাওয়া দিশাহারা মানুষের একাকীত্বের কথা বলতে গিয়ে শুধু সেখানেই ঘুরপাক খায়নি নবারুণের কলম। লেখক আরও অনেক কথা বলে দেন। সব চেপে-ঘেঁটে-জড়িয়ে কম্প্রেস্ট হয়ে থাকার ফলে কখনও কখনও অ্যাবসার্ড মনে হয়। নবারুণের গল্পের এই অ্যাবসার্ডিটির মহাবিশ্বে ঢুকে থাকে দর্শন-রাজনীতি-অস্তিবাদ-আধ্যাত্মিকতা...সব। এসবের ব্যাখ্যাও করা যায় না সবসময়। আবার সেগুলিকে অগ্রাহ্যও করা যায় না। তাই তাঁর গল্পগুলিকে একটি কোনও বর্গে আটকে রাখা যায় না।    

একটি সাক্ষাৎকারে নবারুণ বলছেন— “আমি যতই যুক্তি দিয়ে বুঝি, মৃত্যু কী সে সম্বন্ধে আমার জানা শেষ হয়নি। হয়তো যে মোমেন্টে আমি মরব আমি জানতে পারব বা পারব না কিন্তু ওই মুহূর্তটাকেও আমাকে ধরতে হবে জানতে হবে। এই ইটারনাল problems যা মানুষ ফেস করে যা আমরা শ্মশানে গেলে ফেস করি। কোনো প্রিয়জনকে যখন শেষবারের মতো চলে যেতে দেখি— এগুলোর ব্যাখ্যা আমরা জানি না।” (মল্লার, ১৪১০-১১) 

এক ধরনের অধ্যাত্মিকতাও ছিল নবারুণের মধ্যে। এই অধ্যাত্মিকতার সঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতার কোনও বিরোধ নেই। ‘রাজনৈতিক’—এই কথাটাকে তিনি সবসময় একটা দার্শনিক অবস্থান থেকে দেখেন। “অস্তিত্বের যথার্থতা বজায় রাখার একটা তাগিদ সেখানে থাকে, অস্তিত্বের ভেতরে ও বাইরে যে বিস্ফোরক অন্ধকার ও জায়মান আলো রয়েছে সেটাকে মেনে নিয়েই”।

তিনি আমৃত্যু বামপন্থী, মার্কসিস্ট। কিন্তু তাঁর সেই বামপন্থার সঙ্গে প্রচলিত মার্কসাবাদী বামপন্থী দলের কোনও সম্পর্ক নেই। বৌদ্ধদর্শনের সঙ্গে মার্কসবাদের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক বীক্ষা স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব। তার মধ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা আছে। তাই ডান-বাম কোনও দলের সঙ্গেই ঘনিষ্টতা জন্মেনি তাঁর। সরকার এবং ক্ষমতার থেকে বহুদূরে অবস্থান করেছেন চিরকাল। তাঁর উপলব্ধির রাজনৈতিক দর্শন চুপিসাড়ে ঢুকে পড়েছে লেখার মধ্যেও। রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে সাহিত্য রচনা করেছেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে বাতিল, হেরো মানুষদের কথা। তাঁর গল্পে কাহিনির থেকেও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষ-চরিত্র-সময়-সমাজ। 

নবারুণ হেরো মানুষদের হিরো করে তুলেছেন। প্রান্তিকদের দিয়েছেন প্রতিষ্ঠা। পরিত্যক্ত মানুষদের মুখে বসিয়েছেন প্রত্যাখ্যানের বুলি। মাথা হেঁট করে চলা মানুষেদের মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছেন। পরাজিতদের জিতিয়ে দিয়েছেন। লাথখোর মানুষদের সপ্রশ্ন আঙুল তুলতে শিখিয়েছেন। সমাজে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের অপরিহার্য করে তুলেছেন সভ্যতায়। তাদের দিয়ে তিনি বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছেন। প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন সন্ত্রাসের—শোষণের। মানুষের তথাকথিত সামাজিক অবস্থানের যে কাঠামো তাকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন।  

মানুষের ক্রূর-কদর্য-বিভীষিকাময় স্বরূপ উন্মোচিত নবারুণের গল্পে। ‘অন্ধ বেড়াল’ (প্রতিক্ষণ, ১৯৯৭) গল্পেও নির্মমতার আরেক বয়ান। এক অন্ধ বেড়ালের গল্প এটি। সুন্দরবনের দিকে নদী লাগোয়া একটা ছোট্ট হোটেলে থাকে অন্ধ বেড়ালটি। হোটেলে যারা আসে তাদের সব কথা শোনে সে। দেখতে না পেলেও সব শব্দ শুনতে পায়। কালের সাক্ষী সে। হোটেলের ফেলে দেওয়া এঁটোকাঁটা খেয়ে দিন চলে। একটি বিধবা মেয়ে তার দুটো বাচ্চা নিয়ে রোজ আসে হোটেলে। বাসন ধোয়, কাজকর্ম করে। তারাও বেঁচে থাকে বেড়ালের মতো। থালার থেকে ফেলে যাওয়া ভাত-ডাল-ঝোল একটা বাটিতে জমায়। অনেকটা জমে। এছাড়া হোটেলের মালিক ওকে একথালা ভাত আর দুহাতা ডাল দেয়। তিনজনের হয়ে যায় তাতে। 

গল্প বলতে বলতে নৈর্ব্যক্তিকভাবে অমোঘ কিছু কথা বলে দেন লেখক। জগত এবং জীবনের কিছু চিরন্তন সত্য। যেমন—“খাদ্যের এলাকায় থাকলে খাদ্য জুটেই যায়। এটাই টিকে থাকার নিয়ম।” 

বাঁধ বাঁধার উপরে একটা ওয়ার্কশপে আসা মানুষেরা এসে খেতেন হোটেলে। এদের মধ্যে একজন আসতেন মদ খেয়ে। তিনি বেড়ালটাকে দেখে সঙ্গীদের বলে ছিলেন বইতে পড়া একটা ঘটনার কথা। সাতটা সদ্যোজাত বেড়ালছানাকে নিয়ে ইংল্যান্ডে একটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়েছিল। পরীক্ষাটি করেছিল প্রতিরক্ষা বিভাগ। বেড়ালছানা জন্মাবার কয়েকদিন পর তাদের চোখ ফোটে। ওই সাতটা বেড়ালছানার চোখ ফুটতে দেওয়া হয়নি। ওদের চোখ সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের উপরে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। যেমন চড়া শব্দে তারা কীকরে। ছ্যাঁকা খেলে কীকরে ইত্যাদি। এরপরে মেরে ফেলা হয়। তাদের মস্তিষ্কের ওপরে অন্ধকারের মধ্যে হানা নানা ধরনের আক্রমণের কী ছাপ পড়েছে তা খুঁটিয়ে বিশ্লষণ করা হয়। ব্যাপারটি জানতে পেরে ইংল্যান্ডের পশুপ্রেমীরা শোরগোল তোলে। এই জাতীয় নৃশংস পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। 

বেড়ালটা কথাগুলো শুনেছিল। এরপর লেখকের উক্তি—“কিন্তু যে কোনো অন্ধকার আশ্রয়েই তো আক্রমণ আসতে পারে।...আর সে আক্রমণ যে মানুষের কাছ থেকে আসবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তো নেই!” 

তাই হল। অন্ধকারে আক্রমণ নেমে এল। নদীতে জলোচ্ছ্বাসের আগাম সতর্কতা পেয়ে হোটেল মালিক সরে পড়ল জিনিসপত্র নিয়ে। আর অন্ধ বেড়ালটা ঘর ছেড়ে বেরোল না। দুটো সম্ভাবনার কথা বলেছেন লেখক। ঘরটায় আস্তে আস্তে জল বাড়তে পারে। অথবা এক ঝটকায় দোতলাসমেত হোটেলটার গোটা কাঠামোটাই নদীতে ধ্বসে পড়তে পারে।  

এখানেও আক্রমণ—নৃশংসতা। কিন্তু তা একমাত্রিকভাবে আসেনি। প্রতিটি গল্পে এর মাত্রা বদলে গেছে। নবারুণের গল্পে প্রতিফলিত সন্ত্রাস-আক্রমণের স্বরূপ বহুমাত্রিক। সাইবার-টেকনোলজি-নির্ভর অবয়বহীন সময়ে (নাকি দুঃসময়ে) আক্রমণও যে বলে-কয়ে আসবে না নবারুণের গল্প বারবার সেই সংকেত দেয়। তিনি সময়ের নির্মমতা-নির্দয়তার কাছে নতিস্বীকার করেননি। বরং লেখক হিসেবে সেই দুঃসময়কে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর গল্প ভাবনায় তাই সময় অমোঘ ও প্রকট হয়ে এসেছে।   

সময়ের উত্তাপটাকে নবারুণ ছুঁতে পারেন। সেই ষাট-সত্তরের দশকেও পারতেন, একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসেও পেরেছেন। শুধু ছুঁতে পারা নয়, কটাক্ষ করতেও পিছ্‌পা হননি। আমৃত্যু লেখায় লেখায় শানিয়ে গেছেন আক্রমণ।  

প্রায় সাড়ে চার দশকের সাহিত্যজীবন। এই কালপর্বে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁর গল্পের বিষয় এবং আঙ্গিকের কিছু বদল ঘটেছে। কিন্তু কলমে মরচে পড়েনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর গল্প ধারালো এবং বারুদগন্ধী। আখ্যান এবং আঙ্গিক নিয়ে শেষ পর্যন্তও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন। আর তাঁর এই নিরীক্ষার ধারক হয়ে উঠেছে লিট্‌ল ম্যাগাজিন। নবারুণের অন্তর্ঘাতী সব গল্প ছাপার সাহস ছিল না অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক কাগজের। নবারুণ ওমুখো হনও-নি। সেলিব্রিটি কাগজের সেলিব্রিটি লেখক হতে চাননি বলেই গল্পের বিন্যাসকে ভেঙেছেন। ন্যারেশনকে তছনছ করেছেন। তাঁর গল্পের আপাত কার্যকারণহীন উন্মাদ বিন্যাস পাঠকের যুক্তিজালকে ভেঙে দেয়। পাঠপ্রতিক্রিয়ায় ধাক্কা দেয়। বুদ্ধিনির্ভর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতার বাইরে গিয়ে অন্য এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়।        

মাত্র শ-খানেক গল্প লিখেছেন নবারুণ। পরিমাণগত দিকে থেকে তেমন বেশি নয়। কিন্তু প্রতিটি গল্পই যেন বিধ্বংসী ডিনামাইট। এক একটা বিস্ফোরণ! নিজের লেখালেখি সম্পর্কে তিনি বলেছেন— “আমি লেখা ব্যাপারটা যেভাবে বুঝি সেটা নিছক আনন্দ দেওয়া বা নেওয়া নয়। আরও গভীর এক অ্যালকেমি যেখানে বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে।” (‘অন্ধ বেড়াল’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা, ১ জানুয়ারি, ২০০১)। নবারুণের গল্পের পাঠকও পড়তে পড়তে তাঁর সাহিত্যের একজন অন্যতম চরিত্র হয়ে ওঠে। তাই ঝুঁকি থেকে যায় পাঠকেরও। পাঠকের মধ্যেও ঘটতে পারে সেই অনিবার্য বিস্ফোরণ।     
 
সাবধান! সর্বদা তাঁর সাহিত্যের কথার গুঁড়ো গুঁড়ো ছাই উড়ছে আকাশে-বাতাসে। সেই ছাই পড়ছে জলের উপর, ভদ্রলোকদের ইজ্জতের উপর, সাফ চকচকে জুতোর উপর, খাবারের উপর—শহরের সর্বত্র। এর অনিবার্য অভিঘাত পাঠককে সুস্থির থাকতে দেয় না। বিভ্রান্ত-বিকারগ্রস্ত-উপদ্রুত এই সময়ে নবারুণের দৃঢ়-অবর্থ্য-অন্তর্ভেদী গল্পগুলির বয়ান আমাদের অবচেতনে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে। ক্ষমতার বিপরীতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায়।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. অসাধারন!

    ReplyDelete
  2. অনবদ্য লেখা, অনেক কিছু জানলাম শিখলাম, খুব ভালো লাগলো

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি